Categories
মুক্তমত

পিতার চোখের মনি

একটি উপস্থাপিত স্বপ্ন প্রস্তাবনার পরিকল্পিত মৃত্যুর কথা উঠে আসবে এখন। আর শুরুটা করতে চাই ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দিয়ে। সামরিক তৎকালীন শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের চাপিয়ে দেওয়া গণবিরোধী ‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ বাতিল করে সবার জন্য শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণমুখী, বিজ্ঞানমনস্ক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষাব্যবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে ছাত্রসমাজ অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। সেসময়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। ইতিহাস জানায় তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব বেগবান করেছিল সে আন্দোলনকে। গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল সেসময়, কারাভোগ ছয়মাসের অধিক সময়। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা শেখ ফজলুল হক মনি শুধু ছাত্র অধিকার নিয়েই কাজ করেছেন বিষয়টা তেমন না। বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভেবেছেন, লিখেছেন আইডিয়া আকাড়ে এবং তা দেখিয়েছেন জাতির পিতাকে, এমন সাক্ষ্যই দেয় বিভিন্ন দলিল।

কীভাবে রাজনীতিতে এলেন শেখ ফজলুল হক মনি? আসলে তিনি রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে ভাবতেন, বলতেন, জন্ম দিতেন নতুন নতুন আইডিয়ার। জহরত চিনতে তো খাটি জহুরির ভুল হবার কথা নয়, জাতির পিতাও সে ভুল করেন নি। বঙ্গবন্ধুর মেজ বোন শেখ আছিয়া বেগম স্বামীর চাকরিসূত্রে কলকাতায় থাকতেন। বঙ্গবন্ধু কলকাতায় থাকা কালীন সময়ে অধিকাংশ সময় এই বোনের বাড়িতে থাকতেন।সেই সুত্রেই শেখ মনির মেধা ও মননের সাথে পরিচয় ঘটে বঙ্গবন্ধুর। একদিন তিনি আছিয়া বেগমকে বললেন, “বুঁজি তোমার মনিকে আমারে দাও, ও রাজনীতি করুক।”

আছিয়া বেগমও আপত্তি করেন নি। যে ছেলেটি লিখতেন কবিতা ও ছোটগল্প, তার হাতে ১৯৬০ এল দক্ষিণ এশিয়ার সবচে বড় সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। পর পর দুই মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ছাত্রলীগের। ছাত্রদের মননে রোপন করেছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন, যা তিনি দেখেছিলেন পিতা মুজিবের চোখে।

তখন দেশের যুদ্ধ চলছে। চলছে নানাদেশীয় ষড়যন্ত্র। মুক্তিপাগল যোদ্ধাদের আবেগ তো আর কিনে নেয়া যায় না, তাই ষড়যন্ত্রকারীদের লক্ষ্য ছিল দেশপাগল মানুষগুলোকে বিভ্রান্ত করা। কিন্তু তা ঠেকাতে প্রকাশ্যে আসে মুজিববাহিনি। যার নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। তার সাথী হয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদের মত নেতারা। তাদের বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিটি পদক্ষেপের কারণেই বিভ্রান্ত করা যায় নি দেশের জন্য জীবনবাজি রাখা মহাত্মাদের।
শেখ ফজলুল হোক মনির রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় মুগ্ধ বঙ্গবন্ধু দেশকে বঞ্চিত করতে চান নি এমন আইডিয়াবাজ নেতৃত্ব থেকে। এদিকে ছাত্র সংগঠনে থাকার বয়স ও যে নেই তার। সদ্য স্বাধীন দেশের বিভিন্ন সমস্যাসঙ্কুল বাস্তবতার মুখোমুখি দাড়াতে মনিকে দরকার। দরকার তার একটা টিম। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিলেন যুবলীগ গঠনের।

পরাধীন দেশের ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি যখন স্বাধীন দেশের একটি যুব সংগঠনের নেতৃত্ব কাঁধে নিলেন তখন প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। চারিদিকে যুদ্ধের ক্ষত, পরাজিত শক্তিরা বিভিন্ন প্রচারণায় মত্ত। সদ্য স্বাধীন দেশের যুবসমাজ নানাবিধ হতাশায় ভুগবে,এটা স্বাভাবিক। সেই প্রেক্ষাপটে যুবসমাজের চোখে দেশ পুননিরমানের স্বপ্ন পুতে দেয়ার এক ব্রত নিয়ে নামলেন শেখ ফজলুল হক মনি। বোঝালেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যুব সমাজের দায়ের কথা। একজন সাংবাদিককে পেশাগত কারণেই পড়তে হয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, শেখ ফজলুল হক মনি সাংবাদিকতাও করেছেন। নিজের পাঠঅভ্যাসের সুফল কাজে লাগিয়ে যুবসমাজকে বইমুখী করার এক আইডিয়াও তিনি বাস্তবায়ন করেছিলেন। যে দৃশ্য আজ মৃতপ্রায় কিংবা নেই বললেও চলে।

কারো উপর বাজি ধরে জিতে গেলে মানুষ আকাশের মত আনন্দিত হন, বঙ্গবন্ধুও বাজি ধরেছিলেন কবি ও গল্পকার শেখ মনির উপরে। রাজনীতিতে এসে নিত্যনতুন আইডিয়া বাস্তবায়ন করে শেখ মনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেলেন, জিতিয়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকে।

কিন্তু দেশকে জিততে দিতে চায় নি যারা, সেই পাকিস্তানি পরাজিত শক্তির এদেশীয় দোসররা সপরিবারে হত্যা করলেন স্বপ্নদ্রষ্টাকে। সেসময় বাদ যান নি পিতার চোখের মনি হয়ে ওঠা শেখ ফজলুল হক মনিও। এই অতীত আমাদের জন্য যেমন করুণ তেমন অগ্নিশপথেরও। সেদিনের মরে যাওয়া স্বপ্নে যত্ন করে পরিচর্যা করে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কচি সবুজ পাতা জন্মিয়েছেন। এই বৃক্ষ একদিন মহীরুহ হবে, ঠিক বিশালায়তনের বাংলাদেশ এঁকেছিলেন বঙ্গবন্ধু, এমন স্বপ্নই দেখেন মুজিব কন্যা। আর এই বৃক্ষের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে যুবলীগের ভুমিকাও অপরিসীম। তাইতো শেখ ফজলুল হক মনির বড় পুত্র শেখ পরশের হাতে তুলে দিয়েছেন যুবলীগের দায়িত্ব। যে যুবলীগ নিয়ে চারপাশ থেকে আসছিল নানাবিধ অভিযোগ, শেখ পরশের হাত ধরে যেন হঠাত এক পরশপাথর ছোঁয়ায় বদলে গেলো সমস্ত দৃশ্যপট। যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির মত শেখ পরশও সাহিত্যঝোঁকা, পড়িয়েছেন একটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।আর তার মাথা থেকে আসা বেশ কিছু আইডিয়া করোনা মহামারিতে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে, কারণ প্রতিটি ধারণাই ছিল নতুন। আমি বিশ্বাস রাখি এই যুবলীগের ধারণায় একদিন বদলাবে বাংলাদেশ, আমি স্বপ্ন দেখি এই যাত্রার একজন গর্বিত অংশিদার হওয়ার। আমি এবং আমরা হয়ে উঠতে চাই শেখ ফজলুল হক মনির চোখের মনি, যেমনটা তিনি হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর।

লেখক : কেন্দ্রীয় সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ

Categories
মুক্তমত

টেলিভিশন সাংবাদিকতা চর্চা

সাংবাদিকতা নিয়ে লেখা সত্যাই খুব মুশকিল। কারণ যেনতেন লোক সাংবাদিকতা পেশা বেছে নেয় না। যারা অনেক কিছু বোঝে, অন্য সবার থেকে একটু বেশি বোঝে, বেশি জানে, জানার চেষ্টা করে এবং নিয়মিত চর্চা করে; তারাই মূলত সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে বেছে নেন। একিন্তু চারটিখানি কথা নয়। একজন সাংবাদিকের কাছে শুধু দেশ নয়; বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিসহ নানা ভূ-সমীকরণের খবর থাকে। আর এর সঠিক বিশ্লেষণও সাংবাদিকদের কাছেই পাওয়া যায়। যা সবাই জানে।

আমার মনে হয়- সব সাংবাদিকেরই একটি অভিজ্ঞতা আছে; কোনো গ্রাম বা শহরের চায়ের দোকান। হতে পারে যে কোনো রাজনৈতিক আড্ডা। সেখানে কোনো সংবাদিক যাওয়া মাত্রই সবাই থেমে গেছেন। ‘এবিষয়ে সাংবাদিক ভাই আপনি বলেন’। এর অর্থ হলো- সাংবাদিক সব জানে এবং সঠিক জানে। তাই তাদের কাছে সবারই জানার আগ্রহ। এই জন্যে সাংবাদিকদেরও সঠিক জানা এবং সঠিকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।

আমি আগেই নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি সাংবাদিকরা জ্ঞানী। তাই জ্ঞান দেয়ার কোনো রকম ইচ্ছা আমার নেই। এই ধৃষ্টতা দেখাতেও চাই না। সম্পাদনা ডেস্কের কিছু অভিজ্ঞতা জানাবো- এমন ভেবেছিলাম। কিন্তু নেটওয়ার্ক বিভ্রাট- সেই সময় কেড়ে নিয়েছে। বিষয়টি একটু বাড়িয়ে বললে বুঝতে সহজ হবে।

মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক বিভ্রাট থাকলেও বিকল্প মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হবে। পত্রিকা বা টেলিভিশনে মোবাইল ফোনে কোনো খবর জানাতে খুব সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে কোনো প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে কী-না। জরুরি হলে অবশ্যই কয়েকটি মাধ্যমে অফিস বা ডেস্কের দৃষ্টি আকর্ষণ করাও দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কোনোভাবেই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই- সবার ফোন ব্যস্ত ছিল বা দায়িত্বশীল কেউ ফোন ধরেননি।

টেলিভিশনের সাংবাদিকরা লক্ষ্য করে থাকবেন- কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা একটি টেলিভিশনে ব্রেকিং যাওয়া মাত্রই পরপর সবগুলো টেলিভিশনে অনএয়ার হয়। হতে পারে সবাই এক সঙ্গে অফিসকে জানায়। আবার এও হতে পারে একটি টেলিভিশন দেখে অন্যরাও অনএয়ার করে। আদালতের কোনো রায় ঘোষণার ক্ষেত্রে কারো কাছে অস্বাভাবিক মনে হয় না। তবে যখন অন্য ঘটনাগুলো একইভাবে অনএয়ার হয়, তথনই প্রশ্ন ওঠে। আর যখন সব টেলিভিশনে একযোগে ব্রেকিং/টিকারে ভুল সংবাদ অনএয়ার হতে থাকে; তখন এর উত্তর সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। যেকোনো এলাকার সাংবাদিক যদি নিজেকে প্রমাণ করতে সক্ষম হন; তাহলে ওই টেলিভিশন কখনই বিভ্রান্তিতে পড়বে না। যতক্ষণ না আপনি সংবাদটি দিচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনার ডেস্ক অপেক্ষা করবে। আর মৃত্যুর সংবাদ অবশ্যই কয়েকটি মাধ্যমে যাচাই করে তবেই ডেস্ককে জানানো উচিত। সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সংখ্যা বিভ্রাট থেকেই যায়। এর সহজ সমাধান হতে পারে ঘটনাস্থল, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং হাসপাতাল। এর যেকোনো একটি সূত্রের তথ্য নিয়েই ডেস্কে জানানো উচিত নয়। কারণ কম বা বেশি হতেই পারে। যে ভুলের মাশুল কোনোভাবেই পূরণ হতে পারে না। কেননা সঠিক খবর আসার আগেই কয়েকটি সংবাদে তা প্রচার হয়ে যায়। একারণে সতর্ক হওয়া দরকার।

আগে সাংবাদিক মানেই ছিল পত্রিকার। হাতে বুম না থাকলে এখনও পরিচয় দিলেই প্রশ্ন আসে- কোন পত্রিকার? তার মানে, এখনও অনেকেই মনে করেন সাংবাদিক মানেই পত্রিকার। অথচ টেলিভিশন, বেতার এবং সংবাদ সংস্থাসহ এখন কতো গণমাধ্যম। তাই, কে সাংবাদিক; আর কে সাংবাদিক নয়, বুঝে ওঠা মুশকিল। অবশ্য প্রযুক্তির কল্যাণে এই অবস্থা। সবাই খবর জানেন এবং কোনো খবর জেনে সাংবাদিকের জন্য কেউ আর অপেক্ষা করে না। যে যার মতো তা প্রকাশ বা প্রচার করে দিচ্ছে। পাঠক বা দর্শক সাংবাদিকের অনেক ভিডিও বা স্থিরচিত্রও বেশ আলোচনায় এসেছে। এবং বুলেটিনে গুরুত্বও পেয়েছে। তাই এই উৎসুক মানুষগুলোকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তাদের কারণেও অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা উঠে এসেছে। যা শুধু খবরের খোরাকই হয়নি, সেইসব দুর্বৃত্তরা বিচারের আওতায়ও এসেছে। আগেকার দিনে শুধু সাংবাদিকদের কল্যাণেই এই নজির সৃষ্টি হয়েছে। এই বিষয়টি তুলে ধরার অর্থ এই, খবর এখন সবার কাছে; তাই চোখ-কান খোলা রাখুন।

বিভাগ বা জেলা শহর থেকে প্রতিদিন বেশকিছু খবর ডেস্কে আসে। সেগুলো প্রিন্ট করে সংশ্লিষ্ট বুলেটিনের নিউজ এডিটর বা ডিএনই-কে দেখানো হয়। তারা গুরুত্ব বুঝে ব্যবস্থা নিতে বলেন। ভাবুন সারাদেশের খবর। সেখানে আপনার খবরটিও আছে। আপনি টেলিভিশনের সংবাদিক। কিন্তু সাংবাদিক মানেই পত্রিকার। সেই প্রভাবই যদি থেকে যায়। তাহলে রীতিমত বিভ্রান্তি। মানে, একটি ঘটনা কয়েক পাতা লিখে পাঠিয়েছেন। যা পত্রিকার সাংবাদিক গুরুত্ব বিবেচনায় প্রয়োজনে পাঠাতে পারে। আপনি টেলিভিশনের সাংবাদিক। কোনো ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, একটি ছোট ঘটনা (উভ নিউজ), বুলেটিনে কত সেকেন্ড অনএয়ার হয়, সে ধারণা নিশ্চয় আপনার আছে। খুব বেশি হলে ৫০টি শব্দ। মানে ২৫ সেকেন্ড। যা আপনি পাঠিয়েছেন দু’পাতা বা দেড়পাতা। যা দু’তিন’শো শব্দের গাঁধুনি। কখনই কাম্য নয়। অনএয়ার দেখে আজ থেকেই শিখুন বা সহকর্মীদের সহায়তা নিন। দেখবেন যেকোনো ঘটনা দ্রুত লিখে ডেস্কে পাঠাতে পারছেন। আর যেভাবে পাঠাচ্ছেন, অনেকটা সেভাবেই অনএয়ার হচ্ছে। আর বড় বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা (প্যাকেজ নিউজ)। এই খবর পাঠাতে কেউ কেউ চার পাতাও লিখে পাঠান। আপনার সেই খবরটি ক’মিনিট অনএয়ার হচ্ছে। লক্ষ্য করুন- একটি প্যাকেজ নিউজের স্ক্রিপ্ট তৈরি করা হয় বেশি হলেও ৯০ বা ১০০ শব্দের। সেখানে বক্তব্য সংযুক্ত করে দেড় মিনিট বা বেশি হলে দুই মিনিট অনএয়ার হয়। গাঁধুনিটা এভাবে হলে কখনই আপনার প্যাকেজ নিউজ ডেস্কে পড়ে থাকবে না। তাই এই সহজ কাজটি শিখে নিন। কয়েকদিন মন দিয়ে টেলিভিশনের বুলেটিন দেখুন- খুব সহজে প্যাকেজ নিউজও ছোট করে লিখতে পারবেন। অনেকে বলেন, ডেস্কের বোঝার জন্য বেশি করে পাঠাচ্ছেন। কেউ বলেন, সব করে দিলে ডেস্কের কাজ কী। এরকম অনেক ধরনের অজুহাত শোনা যায়। বিষয়টি হলো নিজেকে তৈরি করার ব্যাপার। টেলিভিশন নিউজের নির্দিষ্ট ছক অনুসরণ করে খবর পাঠান। কাউকে ফোন করতে হবে না। সব অনএয়ার হবে। বেশি লিখে পাঠাবেন, ডেস্কেই পড়ে থাকবে বা থাকছে আপনার অনেক কষ্ট করে সংগ্রহ করা খবরটি।

আরও পড়ুন : ‘গল্পে আড্ডায় সাংবাদিকতা’

সাংবাদিককে অবশ্যই কিছু অভ্যাস রপ্ত করতে হবে। নিয়মিত টেলিভিশন দেখা, শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা এবং চর্চার মধ্যে থাকা। এগুলো ভালো সাংবাদিকের গুণ। যখন আপনার টেলিভিশন দেখার সুযোগ নেই। অন্য কাউকে দেখতে বলুন, কী-কী খবর প্রচার হয়েছে জেনে রাখুন। কোন ধরনের খবর গুরুত্ব পাচ্ছে, এথেকে তাও জানা যাবে। আর আপনার খবরটি প্রচার হলো কী-না, সেটা জানাও জরুরি।

শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা কঠিন কিছু নয়; শুধু একটু সতর্ক হলেই সম্ভব। যদি খুব বেশি জড়তা থাকে, আবৃত্তি সংগঠনে কিছুদিন ক্লাস করলেই ঠিক হয়ে যাবে। অথবা ঘরে বসে কিছু শব্দ নিয়ে কাজ করলে সব জড়তা কেটে যাবে। বর্তমানে খবরে নিজে ভয়েজ দেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কেউ ভয়ে দিচ্ছেন না, কেউ আঞ্চলিকতা দূর করতে পারছেন না। এরকম নানা কারণ আছে। তবে কিছু সমস্যা থাকবেই। এরপরও নিজেকে তৈরি করা সম্ভব।

শব্দ নিয়ে যেমন চর্চা করতে হবে; তেমনি সোর্স তৈরি এবং দেশ-বিদেশের ঘটনাবলি জানার চেষ্টা থাকতে হবে। সবসাময়িক ঘটনা অনুসরণ করতে হবে। সেইসঙ্গে অবশ্যই রাজনৈতিক সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তবে সব চর্চার প্রতিফলনই যে খবরে পড়বে, তা নয়। তবু নিজেকে তৈরি করতে এরচেয়ে বড় মাধ্যম আছে বলে আমার জানা নেই।

দেশে জঙ্গি গোষ্ঠির মাথাচাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা বিভিন্ন সময় লক্ষ্য করা গেছে। এই গোষ্ঠির বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নভাবে সামাজিক আন্দোলনও গড়ে উঠেছে। আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই খবরগুলোকে গুরুত্ব দেয়া এবং ভূমিকা রাখা সময়ের দাবি। তাই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে নিজে সচেতন হওয়া এবং অন্যদেরও সচেতন করতে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে ভূমিকা রাখতে হবে। শুধু জঙ্গিবাদই নয়; সংক্রামক যেকোনো কিছুর বিরুদ্ধেই সংবাদিকের ভূমিকা থাকতে হবে অগ্রগণ্য।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
rizvynca@gmail.com

Categories
মুক্তমত

বাদ্যচুম্বিত মানুষ সত্যনারায়ন

যাকে নিয়ে আমার এ লেখা, কখনই তার সঙ্গে কথা হয়নি। তবে তাকে দেখেছি। যে ক’বার দেখার সুযোগ হয়েছে, তার বাড়ির সামনে। কালো মোটা ফ্রেমের চশমা এবং বর্ডার দেয়া সাদা শর্ট পাঞ্জাবী এবং সাদা ধুতি পরে দাঁড়িয়ে থাকতেন তিনি। তখনও জানা হয়নি তার পরিচয়। অনেক পরে জেনেছি তিনি খ্যাতিমান বাদ্যশিল্পী সত্যনারায়ন রায়।

আমি ১৯৯৯ সালে কুষ্টিয়ার স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ডেক্সে সাংবাদিকতা শুরু করি। তখন পত্রিকার অফিস ছিল হাজী মার্কেটে। এনএস রোডের সঙ্গে নামকরা এই মার্কেট এবং সেখানকার রহমান ফার্মেসীর কথা সবার জানা। এখন সেই মার্কেটের চিহ্নটি পর্যন্ত নেই। বর্তমানে লাভলী টাওয়ারের ঠিক পূর্ব পার্শ্বে একটি বাড়ি সংলগ্ন চারকোণা সরু আয়তনের ছিল মার্কেটটি। সেখানে রশনী ইলেক্ট্রনিক্স, পল্টুর ইলেক্ট্রনিক্স, আজাদের টেলিভিশন মেরামতের দোকান, ফটো স্টুডিও, আকুর পান-বিড়ির দোকানসহ বেশ কিছু দোকান এবং আলো কম্পিউটারস ছিল। পরে সেটিই রূপ নেয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকায়। এই পত্রিকা অফিসের খুব সন্নিকটে সত্যনারায়ন বাবুর বাড়ি। তার বাড়ির সামনে এখনও বেশ কয়েকটি চটপটির দোকান বসে। সেখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে যেতাম। তখন এক বয়োজ্যেষ্ঠকে দেখেছি কালো মোটা ফ্রেমের চশমা এবং বর্ডার দেয়া সাদা শর্ট পাঞ্জাবী এবং সাদা ধুতি পরে অবাক দৃষ্টিতে এনএস রোডের দিকে চেয়ে থাকতেন। কী ভাবনা ছিল তার, কখনও জানা হয়নি। তবে তিনি হয়তো ভাবতেন, একদিন এই শহর অচেনা হবে। তিনি থাকেন না, থাকবে না তার শিল্পিত তালের ধ্বনী। তার বাদ্যের তালে আর কেউ গান করবে না। বিদায় বেলার বিকেল এবং সন্ধ্যা তিনি উপভোগ করতেন নিঃসঙ্গ নির্বাক দৃষ্টিতে। তার এই অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকা দেখে মাঝে-মাঝেই আমাদের নজর আটকে যেতো। বলাবলি করতাম তিনি এখানে দাঁড়িয়ে থাকেন কেন? একেক জনের একেক কথা বিশ্বাস হতো না। এরই মাঝে চটপটি খাওয়া শেষ হলে আবার এসে অফিসে ঢুকতাম। এভাবে ওই বয়োজ্যেষ্ঠকে নিয়ে আমার ভাবনাও হারিয়ে যেতো।

কুষ্টিয়া সরকারী কলেজে আমি যখন অনার্সে পড়ি। তখন হঠাৎ করেই কুষ্টিয়ায় থিয়েটারের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। কলেজ থিয়েটার এবং বোধন থিয়েটার নিয়ে খুব ব্যস্ত সময় কাটতো। তখন আমার কাজ ছিল তিনটি- লেখাপড়া, সাংবাদিকতা এবং থিয়েটার চর্চা। এই থিয়েটার চর্চা করতে এসে ২০০০ সালের দিকে জানতে পেলাম এনএস রোডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি প্রখ্যাত দিলরুবা বাদক সত্যনারায়ন রায়। কুষ্টিয়ায় তার মতো বাদক আর দ্বিতীয়টি ছিল না। তার সম্পর্কে পরম শ্রদ্ধাভাজন মহাত্মা লালিম হক, জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম এবং নাট্য ব্যক্তিত্ব আলী আফরোজ পিনুর কাছে খুব বেশি জেনেছি। পরে যখন দৈনিক আন্দোলনের বাজার পত্রিকার বার্তা সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করি, তখন তার সম্পর্কে আরো বিস্তর জেনেছি। তিনি তৎকালে একজন দাপুটে তাল বাদক ছিলেন। প্রতিটি সঙ্গীতের আসরেই তাকে দেখা যেতো। সদালাপী, মিষ্টভাষী এবং নিরব শ্রোতা হিসেবেও তার সু-খ্যাতি ছিল। তিনি বাদ্য-বাজনার পাশাপাশি স্বর্ণ ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু ব্যবসায় কখনই খুব একটা মনোযোগী ছিলেন না। তার দাদা নিমাই রায় অঙ্কন শিল্পী এবং সুবল চন্দ্র রায় ছিলেন তবলা বাদক। তার বেড়ে ওঠাও ছিল শিল্পী পরিবারে। একারণে জীবনের প্রতিটি মূহুর্তে তিনি শিল্পী সত্ত্বা নিয়েই বেঁচে থেকেছেন।

সত্যনারায়ন সম্পর্কে আরো জানার সুযোগ হয়েছে তার ছেলে সাধনের মাধ্যমে। বয়সে সে আমার অনেক বড়। তবু তার সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। সাধন দা কিছুটা উদাস মনের মানুষ। তবে তার যখন যে দিকে খেয়াল, সেদিকে জোঁকের মতো লেগে থাকতো। কোনো আলসি আবোদ বা উগ্রতা নেই, আদায় করতেই হবে যেকোনো উপায়ে; এটা তার অত্যন্ত ভাল একটা স্বভাব। এটা উপলব্ধি করলাম তার বাবাকে নিয়ে আমার এই লেখা আদায় করার ধৈর্য্য দেখে। আমি যে খুব উচুমানের লেখিয়ে তা নয়, এরপরও তার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বোধোদয়ে এক আড্ডায় সাধন দা বলে বসলেন, তার বাবাকে নিয়ে একটা লেখা দিতে হবে। আমি অকপটে স্বীকারও করলাম। এটা যে আমার জন্য কাল হবে জানতাম না। আর সাধন দাও এতো নাছোড়বান্দা, কখনও ভাবতে পারিনি। আমি আজ, কাল বলে কয়েক মাস পার করেছি। ভেবেছি সে হয়তো ভুলে গেছে আর লেখার তাগিদ দিতে আসবে না। বারবার প্রতিশ্রুত ভঙ্গ করার পরও সে আমার অফিসে এসে বসে থাকেছে। আন্দোলনের বাজার পত্রিকা অফিসে তার নিয়মিত অপেক্ষা দেখে একসময় বিরক্ত হয়েই লেখায় মনোযোগি হলাম। আসলে আমি ভেবেছিলাম সাধন দা এক সময় আমার ওপর রাগান্বিত হয়ে লেখাটির খবর নিতে আসবে না। বরং সে এতোবার এসেছে এবং মোবাইল করেছে, আমার হিসেব নেই। আমি তার কাছে হেরে গেছি। আর এই হেরে যাওয়াটা একজন গুণী মানুষের নিয়ে লেখার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যা আমাকে কৃতজ্ঞতায় বেঁধে ফেলল অনন্তকালের জন্য। আসলে আমি সাধন দা’কে বারবার ঘুরিয়েছি, এর অর্থ লিখতে চাইনি তা নয়; স্থানীয় পত্রিকা আন্দোলনের বাজার এবং জাতীয় পত্রিকা যায়যায়দিনের জন্য সারাদিন কাজ করে লেখার শক্তি হারিয়ে যেতো। পরে লিখবো করে আর হয়ে উঠতো না। একারণে সাধন দা’কে আমার কাছে বারবার ঘুরতে হয়েছে।

সাধন দা তার বাবার খুবই প্রিয় ছিল। অনেক স্মৃতিকথা তার জানা। একদিন কথা বলতেই তার বাবাকে নিয়ে সে বললো- কত লোক আসতো বাবাকে ডাকতে। বাবা না হলে কোনো অনুষ্ঠানই হতো না।

এই দিলরুবা বাদক এখন আর নেই। এক দুপুরে আমার মোবাইলে লালিম হকের নাম ভেসে উঠলো। তিনি খুব আবেগ তাড়িতো হয়ে বললেন, সত্যনারায়ন বাবু আর নেই। তিনি স্বর্গীয় জীবন লাভ করেছেন।

সেদিন ছিল ২০০৫ সালের ৭ নভেম্বর সোমবার ভোর। এই দিনেই তিনি জাগতিক আশ্রম ত্যাগ করেন। এই সংবাদটি আমি ছবিসহ আন্দোলনের বাজার পত্রিকায় ‘কুষ্টিয়ার খ্যাতিমান বাদক সত্যনারায়নের দেহবসান’ শিরোনামে ছেপেছি। সংবাদটি শুধু আমাদের পত্রিকাতেই ছাপা হয়েছিল। সেই সংবাদটি ছিল- ‘কুষ্টিয়ার খ্যাতিমান এসরাজ ও দিলরুবা বাদক সত্যনারায়ন রায়ের দেহবসান হয়েছে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। দীর্ঘদিন রোগভোগের পর তিনি সোমবার ভোরে কুষ্টিয়া শহরের আমলাপাড়ার নিজ বাসভবনে স্বর্গীয় জীবন লাভ করেন। কুমারখালী এলঙ্গীপাড়ার রাধা বিনোত রায় ও কৃষ্ণমতি রায়ের পুত্র সত্যনারায়ন রায় ছোট বেলা থেকেই ছিলেন সাংস্কৃতি অনুরাগী। তৎকালে প্রখ্যাত ওস্তাদ ও ক্লাব থেকে তিনি বাদ্যজ্ঞান লাভ করেন। তখন তিনিই ছিলেন একমাত্র নামকরা বাদক। তাকে নিয়েই সল্প জনবহুল এই শহরে বসতো গানের আসর। এখন সেই আসরের গায়েনরা না থাকলেও রয়েছে অনেক নবীন শ্রোতা। তাদের মুখেই শোনা এই খ্যাতিমান বাদকের কথা। দেহবসানকালে তিনি রেখে যান স্ত্রী গীতা রানী রায় ও এক পুত্র সুব্রত রায় সাধন। বাদক সত্য নারায়ন রায় বাংলা ১৩২৫ সালের ২৩ আশ্বিন এবং ইংরেজী ১৯১৮ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। এই গুণী বাদকের মরদেহ সোমবার বিকেল ৩টায় কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে দাহ্য করা হয়েছে।’ তার দেহবসানের খবর অনেকের কাছে না পৌঁছালেও তার নিরব শব যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন গুণী সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ। শ্রাদ্ধি অনুষ্ঠানে এক ঝাঁক তার ভক্তদের দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। একই সঙ্গে অনুমান করতে সক্ষম হয়েছি তাঁর জনপ্রিয়তার গভীরতা নিয়ে। তাঁর মতো মানুষের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখা দরকার। এতে আরো অনেক সত্যনারায়ন সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
rizvynca@gmail.com

Categories
জাতীয় মুক্তমত

২১শে আগস্ট: রাজনীতিতে অবিশ্বাসের দিন

২১শে আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা শুধু একটি বিভীষিকা নয়। রাজনীতিতে নেতৃত্ব শূন্য করার ঘৃণ্য এক চক্রান্তের অধ্যায়। আওয়ামী লীগকে বিলীন করার অভিপ্রায় ছিল ঘাতকদের। স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের ভূমিকা মুছে ফেলার চক্রান্তে মেতে ছিল তথাকথিত রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা। একথাগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত নয়। চিরন্তন এই সত্য কখনই মুছে ফেলা যাবে না।

ইতিহাস সাক্ষী- ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগের শান্তিপূর্ণ সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে গ্রেনেড হামলা করা হলো। যা কখনই কাম্য ছিল না। অথচ যা ছিল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে পরিকল্পিত এক হত্যা-নির্মমতার মিশন। রাজনীতিতে রাজ করার বাসনায় এমন হত্যাযজ্ঞের মিশন হতে পারে। যা ছিল একেবারেই অবিশ্বাস্য। তবে ভুলে যাওয়ার নয়- এই আগস্টেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রায় সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল। আর এর পেছনে যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের ষড়যন্ত্র ছিল, তা একেবারে অস্বীকার করার উপায় নেই। যদিও বিষয়টি এখনো জনসম্মুখে তুলে ধরা হয়নি। নাম প্রকাশ করা হয়নি- সেইসব মুখোশধারীদের। যারা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে গেছেন।

জাতির পিতার হত্যা মিশনের কুশিলবদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে। কমিশন গঠন করে অবশ্যই জাতির সামনে তাদের নাম প্রকাশ করা প্রয়োজন। তা না হলে জাতি অন্ধকারেই থেকে যাবে। ঘৃণ্য চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র আর হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনাকারী ও সমর্থনকারীদের নাম এ কারণেই সামনে আনতে হবে। যেন জাতি তাদের ঘৃণাভরে স্মরণ করে। তাদের উত্তরসূরীদের মনে করিয়ে দেয় তারা সেই বর্বরদের। তারা মানুষ নয়। তারা বাঙালি নয়। তারা দানব, ভিন দেশি প্রেতাত্মা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট কারা টার্গেট করেছিল এবং কেন? পেছনে নীলনকশার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল? তাদের নামও প্রকাশ করতে হবে। তা জাতির সামনে দলিল হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের রাজনীতির পথ ও মত ভিন্ন হলেও যেন নৃশংসতার না হয়।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে কেউ যেন নৃশংসতার পথ বেছে না নেয়, সতর্ক থাকতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচন হলে অনেকে নিশ্চয় সতর্কও হবে। একটি রাজনৈতিক দল স্বাধীনতা পরবর্তীতে যে ঘৃণ্য কাজ করেছে, তা তাদের রাজনৈতিকভাবে পরাজিত হতে বাধ্য করেছে। অদূরদর্শিতার বলি হয়ে তারা ইতিহাসের অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে থেকে মৌলবাদ এবং জঙ্গিবাদ উত্থানে তাদের ভূমিকাও এখন সবার জানা। যা দলটির জন্যে কখনই শুভকর হয়নি।

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শান্তি সমাবেশে ছোড়া হয় আর্জেস গ্রেনেড। লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগ সভাপতি, আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই ঘটনায় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মী। আর শরীরে এখনও গ্রেনেডের স্প্রিন্টার বহন করছেন দলটির অসংখ্য নেতাকর্মী। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট তখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই হামলার বিচার তো করেইনি, বরং ভয়াবহ এই ঘটনার আলামত নষ্ট করেছে তৎকালীন সরকার।

জাতীয় নেতাদের বক্তব্য শেষে ট্রাকের উপর তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তব্য রাখেন। সেসময় অন্য নেতারাও মঞ্চে ছিলেন। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছিলেন। তখনই ফটো সাংবাদিকদের আবদার রক্ষায় ফটোসেশনে দাঁড়ান। এতেই হয়তো ঘাতকরা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। মূহূর্তেই মুহুর্মুহু গ্রেনেড হামলা শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনাস্থলে আহত মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী এবং আওয়ামী লীগ নেতারা মানববর্ম তৈরি করে সেখান থেকে তাকে রক্ষা করেন। গাড়িতে ওঠানোর পর সেই গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী করপোরাল মাহাবুব ঘটনাস্থলে নিহত হন। শেখ হাসিনাকে বহনকারী গাড়ি দ্রুত ধানমণ্ডির ৫ নম্বর বাসায় চলে আসে। সেখানে পুলিশ এসে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ছুঁড়তে থাকে। এই মিশনে যে রাষ্ট্রযন্ত্র জড়িত নয়। কোনোভাবেই প্রমাণ করা যাবে না।

এখনই সময় তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্তদেরও বিচারের আওতায় আনা। কেননা, তারা বিচারের মুখোমুখি না হলে আবারও রাজনীতিতে নৃশংসতা চর্চার পথ উন্মুক্ত হবে। সুষ্ঠুধারার রাজনীতিকে পদদলিত করতে সোচ্চার হবে কোনো একটি পক্ষ। আর হঠাৎ রাজনীতিতে আসা মানুষগুলোও সহজ পথ হিসেবে বেছে নেবে হত্যার রাজনীতি। যা কোনোভাবেই রাজনীতি হতে পারে না। রাজনীতি গণমানুষের। রাজনীতি অধিকার আদায়ের। রাজনীতি কৌশলে গড়ে তোলা এক পথ। যেখানে মানুষের বিকল্প কেবলই মানুষ। এই চর্চা অব্যাহত থাকলে রাজনীতিতে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হওয়ার অপকৌশলও চিরতরে বন্ধ হবে।

রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে নারকীয় গ্রেনেড হামলার বিচার হবে। দোষীরা কাঠোর শাস্তি পাবে। এ বিশ্বাস জনগণের আছে। তবে গ্রেনেড হামলা মিশনের কুশিলবরা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে না যায়। তাদের মুখোশ উন্মোচিত হতে হবে। তারা কীভাবে সরকারের আড়ালে আরেকটি সরকার এবং একটি ভবন কেন্দ্রিক দেশ পরিচালনার যে রীতি গড়ে তুলেছিল। সেই শেকড় সমূলে উৎপাটন করতে হবে। যেন বাংলায় আর কখনও রাজনীতিতে হত্যাযজ্ঞের চর্চা না হয়। ঘাতকরা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের উপর; কিম্বা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা ঘাতকদের উপর ভর করতে না পারে। একটি রাষ্ট্রযন্ত্র সবার নিরাপত্তা ও নির্ভরতার হবে। এই প্রত্যাশা সব সময় করে এসেছে জনগণ। কিন্তু রাজনীতিতে অবিশ্বাসের যে জায়গা ও ক্ষত তৈরি করেছে বিএনপি-জামায়াত জোট। তা হয়তো আর কখনই পূরণ হওয়ার নয়। একটি ২১শে আগস্ট শুধু বিএনপি-জামায়াতকে ছন্নছাড়াই করেনি। রাজনীতিতে যে অবিশ্বাসের কৃষ্ণগহ্বর তৈরি করেছে। কীভাবে পূরণ হবে কেউ জানে না। আওয়ামী লীগ সবসময় সবপক্ষকে বিশ্বাসই করে এসেছে। কিন্তু দিন শেষে তাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। যা কখনই প্রত্যাশিত ছিল না।

আজকের আওয়ামী লীগ কঠোর ও কঠিন। অনেক বিশ্লেষকই মন্তব্য করে থাকেন। তাদের একটু পেছনে ফিরে ভাবতে হবে। কেন আজ বাস্তবতার জায়গায় এই দলটিকে দাঁড়াতে হয়েছে। ১৯৭৫ থেকে এখন পর্যন্ত তাদের শুধু হারাতেই হয়েছে। বারবার টার্গেট করা হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনিতো কখনই কার্পন্য করেননি। সবটুকুই উজাড় করে দিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী ও মুখোশধারীরা বারবারই তাঁকে সরিয়ে দিতে চেয়েছে। বিশ্বাসের দরজায় বারবারই আঘাত, অনেক বড় প্রশ্ন। ভবিষ্যতের রাজনীতিতে এই বাধা উৎরাতে হবে। যা এই মূহূর্তে সহজ ভাবার কোনো কারণ নেই।

রনজক রিজভী : গণমাধ্যমকর্মী
rizvynca@gmail.com

Categories
জাতীয় মুক্তমত

তালেবান উত্থানে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা!

কী ঘটতে যাচ্ছে আফগানিস্তানে। প্রায় বাধাহীনভাবে একের পর এক প্রদেশ দখলের পর আফগান সরকারের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে তালেবান। যদিও সবকিছুই হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। পরিস্থিতি বদলাতে দেশটির সেনাপ্রধানকেও সরিয়েছিল দেশটি। কিন্তু প্রতিরোধ বা রুখে দাঁড়ানোর কোনো ঘটনাই চোখে পড়েনি। একসময় তালেবান নিয়ে যেসব পক্ষের অনেক মাথা ব্যথা ছিল। আফগান প্রশ্নে তারাও নীরব থেকেছে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ আগের সব ইতিহাসই বলে দেয় জনসমর্থন না পাওয়ায় কেউই দেশটিতে টিকতে পারেনি। সবাইকে খুব বাজে ভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। এখন বড় প্রশ্নটি হচ্ছে- তালেবানকেই কী জনগণ সমর্থন দিচ্ছে? বিশ্বের মোড়ল রাষ্ট্রগুলোর চুপ থাকার এটাই কারণ কী না তাও পরিস্কার নয়। আর তালেবান উত্থানে আঞ্চলিক রাজনীতির কী হবে। স্বস্তি-অস্বস্তির পাল্লাই বা কারা বহন করবে, এ নিয়ে নিশ্চয় হিসেব করার সময় এসেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই রাষ্ট্রটির অবস্থান ইরান, পাকিস্তান, চীন, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মধ্যস্থলে। আফগানিস্তানের পূর্বে ও দক্ষিণে পাকিস্তান, পশ্চিমে ইরান, উত্তরে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান এবং উত্তর-পূর্বে গণচীন। প্রাচীনকাল থেকেই এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত আফগান। তাদের সংঘাতের ইতিহাসও দীর্ঘ। অবশ্য এই সংঘাতে সবাই যে খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় থেকেছে, সেটা বলার কারণ একেবারেই নেই। যা বিগত ২০ বছর এবং বর্তমান পরিস্থিতিই তার জলন্ত উদাহরণ। সে যাই হোক, সার্বিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা নজরে রাখা প্রয়োজন।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান শাসন করেছে তালেবান। অর্থাৎ নব্বয়ের দশকেই ধর্মভিত্তিক এই উগ্রসংগঠনটির তৎপরতা শুরু এবং সরকার গঠন করতেও সক্ষম হয়। এরপরের ঘটনাগুলো সবারই জানা। যে ধরনের শাসনের কবলে পড়েছিল দেশটি। যা সভ্যতার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। তাদের সেই বর্বরতাও দেখতে হয়েছে। সেইসঙ্গে আল কায়েদাকে সমর্থন এবং ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেয়ার ফলও তাদের ভোগ করতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলা পরবর্তী আগ্রাসনের শিকারও হতে হয়েছে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে তালিবান শাসনের অবসান ঘটানো হয়।

আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানের হাওয়া সেসময় অনেক দেশেই লেগেছে। বাদ যায়নি বাংলাদেশও। ৯০-র দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের উপর সশস্ত্র আক্রমণ, যশোরে উদীচীর সম্মেলনে হামলা, গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর জলিরপাড়ে হামলা, পুরানা পল্টনে সিপিবি’র সমাবেশে হামলা, নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে হামলা, সিলেটে হযরত শাহজালাল (রা.) এর মাজার শরীফ-এ বার্ষিক ওরশ চলাকালে হামলা, বাগেরহাটে শেখ হেলালের জনসভায় মুফতি হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশে জঙ্গিরা বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। তখনই নজরে আসে, জঙ্গিরা দেশের অভ্যন্তরে কড়া নাড়ছে।

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একসঙ্গে সিরিজ বোমা হামলা চালায় ওহাবী মাও. আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইয়ের সন্ত্রাসী দল জেএমবি। ওই হামলার মাধ্যমে জেএমবি তাদের শক্তির মহড়া দেয়। এর আগে হরকাতুল জিহাদের সদস্যরা ১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকায় কবি শামসুর রাহমানের বাড়িতে তার উপর হামলা, ২০০৩ সালের ২৩ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সভাস্থলে বোমা স্থাপন করে, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে বোমা হামলা, ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট পল্টনে গ্রেনেড হামলা, ২০০৪ সালে সিলেটে হযরত শাহজালাল (রা.) এর মাজার শরীফ জিয়ারতের সময় সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর বোমা হামলা, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যেরবাজারে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়ার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে হত্যা, ২০০১ সালে লেখক হুমায়ুন আজাদকে ছুরিকাহত করা ছাড়াও অনেক ঘটনা ঘটেছে। যার সবই জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদের নেতৃত্বে হয়েছে। বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা এবং উত্থানের ইতিহাসের সঙ্গে আফগানিস্তানের যোগসূত্র আছে। যার প্রকাশ্য রূপ পায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়। তখনই বাংলার মাটিতে উচ্চারিত হয়েছে- ‘আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান’। বাংলাদেশে যাদের হাত ধরে জঙ্গিবাদের উত্থান। তাদের বড় অংশই আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তাদের হয়ে যুদ্ধ করেছে। তাদের বলা হতো আফগানফেরত বাংলাদেশি মুজাহিদ।

১৯৮৬ সালে পাকিস্তান হয়ে যারা আফগানিস্তানে তালেবানের পক্ষ হয়ে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তাদেরই একটি অংশ পাকিস্তান-আফগানিস্তানের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রথম জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলে। আফগানফেরত এসব যোদ্ধার বড় একটি অংশ বাংলাদেশে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলাসহ জঙ্গি তৎপরতা উত্থানে কাজ করেছে। এদের মধ্যে অন্যতম আফগানফেরত যোদ্ধা জঙ্গি মুফতি হান্নান, মুফতি আবদুর রউফ ও আবদুস সালাম। এদের এই তালিকা অবশ্য বেশ লম্বা।

৮০ দশকের দিকে আফগানিস্তানের রণাঙ্গনে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) জন্ম হয়। ১৯৮৯ সালের শেষ দিকে মুফতি আবদুল হান্নানের নেতৃত্বে প্রায় অর্ধশত যোদ্ধা বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পরে এসব যোদ্ধা দেশের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশিদের আফগান যুদ্ধে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতে থাকে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই তালেবান, তেহরি-ই-ইসলামী, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন, বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি, লস্কর-ই তৈয়বার অর্থ সহযোগিতায় এসব যোদ্ধা ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময় কয়েকশ বাংলাদেশিকে আফগানযুদ্ধে পাঠাতে সক্ষম হয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেখান থেকে বাংলাদেশি কথিত মুজাহিদরা ফিরে এসে ১৯৯৩ সালে এদেশে হুজির কার্যক্রম শুরু করে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পাঁচ বছরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় সাত হাজার এনজিওকে রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়। এনজিওগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা আসে বাংলাদেশে। এসব টাকা জঙ্গি তৎপরতার কাজে ব্যয় করা হয় বলে গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তবে আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানে নতুন করে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এই শঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই। একারণে বাংলাদেশে এক ধরনের অস্বস্তি ভর করে আছে।

বড় ভয়ের কারণ হলো- তালেবান প্রায় বাধাহীনভাবে আফগানিস্তানের ৩৪ প্রদেশের ২৮টির বেশি প্রাদেশিক রাজধানী দখলের পর কাবুল ঘিরে ফেলে প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করাতে বাধ্য করেছে। এরআগে বিনাযুদ্ধেও কোনো কোনো প্রদেশের দখল করে তারা। এতে দেশটির সরকারি বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তালেবানকে পরাজিত করতে আফগান সরকার যে তিন ধাপের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার কথা বলেছিল- এর প্রথমটি ছিল- পরাজয় বন্ধ করা। দ্বিতীয় ধাপে সরকারি বাহিনীকে জড়ো করে শহরগুলোর বাইরে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা। এবং তৃতীয়ত. আক্রমণাত্মক কার্যক্রম শুরু করা। এর কোনোটিই শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। অবশ্য আফগান সরকারকে তালেবানের সঙ্গে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য আফগান সরকারের উচিত তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিষ্পত্তি, সব স্টেকহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি ও একতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইইউ আফগান সরকারকে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগে উৎসাহিত করেছে। তাদের বক্তব্য ছিল- তালেবান যদি জোর করে ক্ষমতা নেয় এবং একটি ইসলামী আমিরাত পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাবে না। বিচ্ছিন্নতা ও আন্তর্জাতিক অসহযোগিতার মুখে পড়বে এবং আফগানিস্তানে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হবে।

তালেবান উত্থানে অনেক হিসাব নিকাশ চলছে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও। আফগান থেকে যুক্তরাষ্ট্র চলে যাওয়ার কারণে স্বস্তিতে আছে চীন। তাদের কাছে গুরুত্ব ব্যবসা। সেদিকেই নজর চীনের। আর তালেবানদের কারণে অস্বস্তিতে আছে রাশিয়া ও ভারত। যদিও এই দুই দেশের অস্বস্তির কারণ ভিন্ন। রাশিয়া এরইমধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বৈঠক আহ্বান করে বসেছে। অন্যদিকে, কেবল পাকিস্তানই বেশি স্বস্তিতে। কারণ আফগান সরকারের পাশাপাশি তালেবানদের সঙ্গেও তারা সম্পর্ক রেখে আসছিল।

আধিপত্য এবং ব্যবসা নিয়ে বিভিন্ন দেশের ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের বিষয়টি পুরোপুরি বিপরীত। দেশে জঙ্গিবাদ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়ে যাবে। পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে উন্নয়ন এবং সম্ভবনার দুয়ারেও। তাই ভাবনার সময় এখনই।

রনজক রিজভী : গণমাধ্যমকর্মী
rizvynca@gmail.com

Categories
জাতীয় মুক্তমত

লজ্জার দিন ১৫ই আগস্ট

জাতির পিতাকে হত্যা। এ বড় লজ্জার। যতোদিন বাংলাদেশ থাকবে। টিকে থাকবে বাঙালি জাতি। ততোদিন এ লজ্জা ও শোক বইতে হবে। বর্ণাঢ্য জীবন ছিল জাতির পিতার। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালি ও বাংলার নেতা। তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি অধিকার বঞ্চিতদের প্রদীপ। জ্বলন্ত শিখা। বিশ্ব মানচিত্রে জাতি-ভূ-খণ্ড প্রতিষ্ঠার মহানায়ক। তাঁকেই হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছে। এই ঘৃণ্যদের বাঙালিয়ানায় বাস করার অধিকার নেই। তাদের কোনো পরিচয় নেই। জাতির পিতা বাঙালিদের পরিচিত করেছেন। অধিকার ও ভূখণ্ড দিয়েছেন। জাতি হিসেবে মর্যাদাও তারই দেয়া। অথচ সেই ঋণ শোধ করেনি তারা। মর্যাদা দিতে পারেনি। তাদের জন্যে এই বাংলা নয়। তারা বাঙালি নয়।

যে ক্ষত বাঙালি বয়ে বেড়াচ্ছে। তা গুটি কয়েক ঘৃণ্যদের জন্যে। তাদের ব্যক্তি স্বার্থের জন্যে। আক্রোশের নীল ক্ষত কখনই মুছে যাওয়ার নয়। রাজনীতি গণমানুষের জন্যে। সংগ্রাম অধিকার আদায়ের জন্যে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছেন জনগণের জন্যে। জেল জুলুম হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঘুরেছেন সারা বাংলা। সবাইকে এনেছিলেন এক স্রোতে। যার ফল বাংলা ও বাংলাদেশ। তাঁর প্রতিটি ভাষণ গণমানুষের। তিনিও তাই। রাজনীতিতে তিনি তীব্র স্রোত হয়ে ছুটেছেন। আর ঢেউয়ের তালে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

এমন মহান নেতা বিশ্বে ক’জন আছেন। রাষ্ট্রীয় বাসভবন ছেড়ে নিজের বাড়িতে থেকেছেন। কোনো ভয় শঙ্কা কখনই তার মাঝে বাসা বাধতে পারেনি। বাঙালি কখনও তার বিপক্ষে দাঁড়াতে পারে না। বাঙালিদের কেউ তার দিকে অস্ত্র তাক করতে পারে বিশ্বাস করেননি। যে পাকিস্তানিরা সাহস করেনি। সেখানে বাঙালির হৃদস্পন্দন তিনি। যা বঙ্গবন্ধু সবসময় মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। সেই বাঙালি সেনা জান্তাদের বুলেট বিদ্ধ হবেন। তা ভাবনারও বাইরে থেকেছে সবসময়। যার মানচিত্রের চেয়েও বিশাল হৃদয়। তাঁর এমন ভাবনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। অথচ এই বিশালের বুকে বুলেট ছুঁড়েছি আমরা।

মাথা নত না করার চেতনা শিখিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ। শোষিত মানুষের পক্ষে প্রতিরোধ। দুর্বার আন্দোলন। কেবলই একটি দল নয়। পুরো জাতিকে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু ধন্যবাদ জানিয়েছেন। বন্ধুপ্রতীম দেশ জনগণ এবং শুভকাঙ্খিদের। তাদের ধন্যবাদ দেননি, যারা বাঙালিদের বুকে রক্ত ঝরিয়েছে। বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধীতা করেছে, প্রকাশ্যে তাদের নাম উচ্চারণ করেছেন। এমন সাহসী উচ্চারণ কেবল শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। তিনি যৌক্তিক অবস্থানে থেকেছেন সবসময়। রাজনীতিতে কোনো ভুল তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। একারণে পাকিস্তানি জান্তারা বঙ্গবন্ধুকে ভয় পেয়েছে। তিনি কখনও ভয় পাননি।

একটি জাতির পিতা সবাই হতে পারে না। একদিনেও সম্ভব নয়। শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশব-কৈশোর থেকে সেই ছাপ লক্ষ্য করা গেছে। তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। দলের হয়ে মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। নিজে দল গঠন করে ছুটেছে মানুষের কাছে। আস্থা-বিশ্বাসে তিনি হয়ে উঠেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি জাতির একমাত্র নেতা। যার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল জনগণকে নিয়ে। সেভাবেই আওয়ামী লীগও পরিচালিত হয়েছে। তার সব নির্দেশনা পৌঁছে গেছে মানুষের ঘরে ঘরে। পৌঁছে গেছেন তিনিও।

সেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রায় সপরিবারে হত্যা, বাঙালি হিসেবে মেনে নেয়া যায় না। ১৫ই আগস্ট লজ্জার দিন। সেইসব দানবদের প্রতি ঘৃণার দিন। বাঙালির গৌরবে যারা আঘাত করেছে। চেতনা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাদের প্রতি ঘৃণা। বাঙালি হিসেবে আমরা লজ্জিত হে বঙ্গবন্ধু…

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
rizvynca@gmail.com

Categories
মুক্তমত

রবীন্দ্রনাথ ও বাউল

শিলাইদহে এসেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউল মতবাদের একটি সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি বাউল গানের ভাব-সাধন এখান থেকেই উলোটপালোট করে দেখেছেন। জেনেছেন বাউলদের সম্পর্কেও। সংগ্রহ করেছেন বাউল গান। আর এই বাউল গানের সুর ও ভাব তাঁকে কখন আকৃষ্ট করেছিল, তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। যার প্রভাব তাঁর বেশ কিছু গানে রয়েছে। বাউল মতবাদে আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ যে একজন বড় মাপের আবিস্কারক, এ প্রমাণও তিনি দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে। তখন লালন ফকিরের আনুমানিক বয়স ৮৭ বছর। রবীন্দ্রনাথ আশি বছর তিন মাস বয়সে ২২ শ্রাবন ১৩৪৮ সালে (৭ আগষ্ট ১৯৪১) পরলোকগমন করেন। আর লালন ১৮৯০ সালে ১৭ অক্টোবর প্রায় ১১৬ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ত্রিশ বছর। এই সূত্রে বলা যায়, জমিদারীর কারণে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে এসে লালন ফকিরের জীবিতকালেই জেনেছিলেন। যা তিনি শিলাইদহে না এলে এই সুযোগ পেতেন না। তাঁর প্রাণধর্মের প্রেরণা আর বাউলের প্রেরণার উৎস ছিলো অভিন্ন। তাই বাউলের ‘মনের মানুষ’-তত্ত্বের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র একটি ঐক্য ও সাযুজ্যবোধ সহজেই আবিস্কার করা সম্ভব। বাউলগানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানববাদী জীবনচেতনার প্রেরণা অনুভব করেছিলেন। একারণে নিজে রবীন্দ্র বাউল বলেও ভেবেছেন।

জমিদারী পরিচালনার সূত্রে শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বাউল-ফকির ও বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর সংস্পর্শে আসেন। এখানেই বাউলগানের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। এই শিলাইদহেই বাউল-সংস্পর্শ লাভের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘হারামণি’র ভূমিকায় নিজেই বলেছেন- “শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউলদের সঙ্গে আমার সর্ব্বদাই দেখাসাক্ষাৎ ও আলাপ আলোচনা হ’ত। আমার অনেক গানেই বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞতসারে বাউলসুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে তখন আমার নবীন বয়স, Ñ শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল, ‘কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে/ হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে/ দেশ বিদেশ বেড়াই ঘুরে।’

লালন-শিষ্যদের সঙ্গে শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের দেখাসাক্ষাৎ ও দীর্ঘসময় আলাপ আলোচনা হয়েছে, এ-কথা তিনি কালীমোহন ঘোষের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজেই উল্লেখ করেছেন। লালন-শিষ্যদের মধ্যে পাঁচু শাহ, শীতল শাহ, ভোলাই শাহ, মলম শাহ, মানিক শাহ ও মনিরদ্দীন শাহ শিলাদিহে ঠাকুর কবির কাছে যাতায়াত করতেন বলে জানা যায়। কুঠিবাড়ির সঙ্গে ছেঁউড়িয়ার আখড়ার একটি অন্তরঙ্গ সম্পর্কও হয়েছিল।
শিলাইদহ পোস্ট-অফিসের ডাকহরকরা বাউলকবি গগন হরকরাকে রবীন্দ্রনাথই আবিষ্কার করে দেশ-বিদেশে পরিচিত করেন। বাউলগান রচয়িতা ও সুগায়ক হিসেবে তার বিশেষ খ্যাতি ছিলো। সেই সুবাদে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। গগনের থেকেই তিনি বিভিন্ন সাধকের বাউলগান শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রমানসে বাউলচেতনা সঞ্চারের মূলে রয়েছেন লালন ফকির ও গগন হরকরা। বাউলতত্ত্ব ও দর্শন সম্পর্কে তাঁর ধারণা-গঠনে গগনের ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটির ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট।

শিলাইদহে গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ, গোঁসাই রামলাল, গোঁসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী ও লালনের শিষ্যসম্প্রদায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হয়েছে। শিলাইদহ ও ছেঁউড়িয়া-অঞ্চল থেকে সংগৃহীত লালন ফকির ও গগন হরকরার গান তিনি সুধীসমাজে প্রচার করেন। একই সঙ্গে বাউলগান-রচয়িতা কুমারখালীর সাধক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের (১৮৩৩-১৮৯৬) সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের আলাপ-পরিচয়ের কথা জানা যায়। তবে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ ও পিতার সময়ে শিলাইদহে প্রজা-পীড়নের কথা হরিনাথ ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় প্রকাশ করে ঠাকুর-পরিবারের বিরাগভাজন হন। এইসব কারণে উভয়ের মধ্যে খুব একটা সহজ সম্পর্ক ¯’াপিত হতে পারেনি। এরপরও কাঙাল হরিনাথ প্রতিষ্ঠিত কুমারখালী মথুরানাথ মুদ্রাযন্ত্রের বাংলা ১৩০৭ সনের পত্র-নকল খাতার ২২০ নং পত্রে (১০ পৌষ ১৩০৭) জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ হরিনাথের বাউলগীতি-গ্রš’সহ অন্যান্য কয়েকটি গ্রন্থ’ সংগ্রহ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের পরিচিত শিলাইদহ গ্রামের বাউলসাধকদের মধ্যে গোঁসাই রামলাল (১৮৪৬-১৮৯৪) ও গোঁসাই গোপালের (১৮৬৯-১৯১২) নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই দুই সাধকের সাধনপীঠও শিলাইদহ গ্রাম, কবির কুঠিবাড়ির অতি নিকটে। গোঁসাই রামলালের সঙ্গে অবশ্য কবির পরিচয় দীর্ঘ হতে পারেনি। সুকণ্ঠ গোঁসাই গোপালের সাধনতত্ত্ববিষয়ক সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মাঝে-মধ্যে তিনি কুঠিবাড়িতে গোপালকে আমন্ত্রণ জানাতেন গান শোনার জন্য। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ গোঁসাই গোপালেরও কিছু গান সংগ্রহ করেছিলেন। এভাবে তিনি অনেককেই মূল্যায়ন করেছেন এবং অনেকের সাহিত্যকর্ম সংগ্রহও করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁকে আবিস্কারক বলা যেতে পারে। তাঁর সংগ্রহশালা থেকেই এঅঞ্চলের গুণীদের সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

রনজক রিজভী, গণমাধ্যম কর্মী।
www.ranjakrizvy.com
01711787379

Categories
মুক্তমত

বঙ্গবন্ধু কন্যা কথা রেখেছেন…

প্রায় ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে লাখো জনতার সামনে তিনি বলেছিলেন- “সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছু নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেলকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই”। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর কথা রেখেছেন। প্রতিশ্রুতি থেকে কখনই সরে যাননি। দেশে ফেরার দিনটির মতো ঝড়-তুফান কখনই তাঁর পিছু ছাড়েনি। তবুও জনগণের পাশেই আছেন। ১৯ বার হত্যা চেষ্টার পরও শেখ হাসিনার ভাবনায় জনগণ ও দেশ। এর জন্যে বারবার তাঁকে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। সামরিক শাসকের অস্ত্র, রক্তচক্ষু, নিষেধাজ্ঞা আর নানামুখী ষড়যন্ত্র তাঁকে রুখতে পারেনি। তবে আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল ঘরে তুলতে দেয়নি ষড়যন্ত্রকারীরা। যার বড় প্রমাণ একানব্বইয়ের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়। কেন আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার পথে এতো বাধা, এতো ষড়যন্ত্র। এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূ-লুণ্ঠিত করা হয়েছে। বাঙালি জাতির অস্তিত্ব বিপন্ন করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরুও সেখান থেকে। বঙ্গবন্ধু ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিরুদ্ধে হুংকার দিয়েছিলেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ উচ্চারণ করেছিলেন। জনগণের পক্ষ ও স্বার্থ নিয়ে কথা বলে অনেকেরই প্রতিপক্ষ হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিকে কখনই প্রশ্রয় দেননি। দেশ ও জাতির কল্যাণ ছিল তাঁর স্বপ্ন ও লক্ষ্য। সেই জায়গা থেকে দেশকে পিছিয়ে দিতেই যতো ষড়যন্ত্র। সাম্প্রদায়িক শক্তি, পরাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদীরা বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছে তলাবিহীন ঝুড়ি। একটি সাম্প্রদায়িক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আধিপত্য বিস্তারও ছিল অগ্রগন্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা পরবর্তী রাজনীতিতে এর অনেক কিছুই দৃশ্যমান হয়েছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং পরাশক্তির উত্থান ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে, থাকবে। যা শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকাকালে কখনই সম্ভব হতো না। ষড়যন্ত্রকারীরা জানতো, আওয়ামী লীগ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে অনেক কিছুই বদলে দিতে পারে। আদায় করতেও জানে। দলটির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এমনই ইতিহাস। আর বঙ্গবন্ধুর তেজদীপ্ত নেতৃত্ব আওয়ামী লীগকে দিয়েছিল ভিন্নমাত্রা। একারণে সেই রক্তের ধারা চিরতরে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টাই ছিল ঘাতকদের লক্ষ্য। আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে বারবার টার্গেট করার কারণও একই।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যদি দেশে না ফিরতেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দায়িত্ব না নিতেন। গণতন্ত্র, উন্নয়ন, প্রগতিশীল রাজনীতি, আধুনিক উন্নত সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আর জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ কতোটা সম্ভব হতো। এই প্রশ্ন বারবারই সামনে আসে। কেননা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও এখনও চলমান। এরই মধ্যে সাম্প্রদায়িক শক্তি মাঝে মধ্যেই উঁকি দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল বা অংশীদার হতে সেই শক্তি জানান দিচ্ছে। যা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পতাকা নিয়ে শেখ হাসিনা শক্ত হাতে মোকাবেলা করে চলেছেন। দেশের অর্থনীতিসহ সামগ্রীক অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে নতুন এক চক্রান্তে অনেকেই যুক্ত। যা প্রতিহত করা একমাত্র শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব। একারণে বলার অপেক্ষা রাখে না, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না হলে অন্য এক বাংলাদেশকে দেখতে হতো। সাম্প্রদায়িক, পরাজিত শক্তি ও জঙ্গিবাদের উত্থান হতো। তাদের দাপটে পশ্চাৎমুখী হতো দেশ। সম্ভাবনার সব দুয়ার থমকে দাঁড়াতো। দীর্ঘ সামরিক শাসন আর সাম্প্রদায়িক শক্তির অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গঠিত সরকারের সময় পিছিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বকে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন শেখ হাসিনা। বিশ্ব মোড়ল তথা, নীতি নির্ধারণী দেশগুলোর সংলাপে তাঁর অংশগ্রহণ এবং পরামর্শও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। যা বাঙালি জাতির জন্যে গর্বের। এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান সৃষ্টি সামগ্রিক বিষয়েই ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ সবই শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ফল।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আন্দোলন সংগ্রামের রাজনীতি ও সরকার গঠনে সফল। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠা বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন মাইলফলক স্থাপন করেছে। সেই দিন বেশি দূরে নয়; বিশ্ব রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু কন্যা বারবার প্রাসঙ্গিক ও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবেন। সংকটেও সম্ভাবনা কীভাবে জাগিয়ে রাখতে হয়, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হয়, তা শেখ হাসিনার কাছ থেকেই বিশ্বকে শিখতে হবে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতি তাঁর কাছ থেকে কতোটা শিখতে পেরেছে। জনগণ কতোখানি নিজেদের বদলেছে। ভাবার সময় এসেছে। কেননা শেখ হাসিনা যতো দূরে দেখতে পান, দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ এবং দেশের মানুষ সেই জায়গা থেকে এখনও অনেক পিছিয়ে। তাই সবাইকে শেখ হাসিনার মতো দূরদর্শী হওয়া দরকার। তবেই সবক্ষেত্রে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তাহলে জনগণের পিছিয়ে থাকার দায় কে নেবে। অবশ্যই এ দায় সরকারের একার নয়। কারণ রক্ষণশীল মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে জনগণকেই। একই সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক চেতনা জাগ্রত করতে হবে। ধর্মপরায়নের লেবাসে জঙ্গিবাদ বা উগ্রপন্থা লালন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। শিক্ষার সত্যিকারের আলো ছড়াতে হবে। এবং সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হলেই কেবল উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতিচর্চা ও বিকাশের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকবে। সেখানে পিছিয়ে থাকার কারণে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে মাঝে-মধ্যে সাম্প্রদায়িক শক্তির উল্লম্ফন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা দূর করতে শেখ হাসিনা নিশ্চয় সফল হবেন। বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে। সফল হতেই হবে। তা না হলে বাঙালি জাতি পিছিয়ে যাবে বহু দূর। অর্জনের বেশির ভাগই কালো ছায়ায় ঢেকে যেতে পারে।

রনজক রিজভী, গণমাধ্যম কর্মী।
rizvynca@gmail.com
01711787379

Categories
মুক্তমত

অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ

বিশ্বকবি, মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। তিনি সাহিত্য সৌধের এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যকে করেছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত। সাহিত্যের সব অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের ছিল সমান পদচারণা। যেখানে তাঁর চিন্তা-দর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি কখনও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন না। সহজ, সামগ্রিক এবং সাম্য ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের বেশিরভাগ সৃষ্টিকর্মে। উদার সংস্কৃতির জগত তাঁকে বাঙালির আত্ম-অন্বেষণে যেমন সহায়তা করেছে। তেমনি বাঙালি সংস্কৃতির রূপকারও হয়ে উঠেছেন। অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সংস্কৃতি বিকাশে যাঁরা অগ্রগন্য; তাঁদেরও বাতিঘর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি অনেক বিতর্কের বেড়াজাল ভেদ করেছেন। তীব্র বিরোধীতার মুখোমুখি হয়েও রবীন্দ্রনাথ বাঙালির কবি এবং সকল সংকটে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে আছেন আজও।

রবীন্দ্রনাথ অবিভক্ত ভারতের কবি। তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এক শ্রেণীর রক্ষণশীল শিক্ষিতরা তাঁকে ভারতীয় এবং হিন্দু কবি বলে প্রচার শুরু করেন। তাদের দাবি এবং পাকিস্তানের বিদ্বেষের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্র সাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চা সংকুচিত হলেও থেমে থাকেনি। পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা অব্যাহত থেকেছে। তাঁর সাহিত্যকর্মে অসাম্পদায়িক চেতনার জয়োগান ক্রমেই ধ্বনিত হতে থাকে। একটি সময় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বলয় থেকে রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের কবি হয়ে ওঠেন।

রবীন্দ্রনাথের অসাম্প্রদায়িক চেতনার স্বরূপ অনুসন্ধানে ধর্মচিন্তা ঘুরে দেখা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপূরুষরা উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। ইংরেজ আমলে রবীন্দ্রনাথের ষষ্ঠতম পূর্ব পুরুষ পঞ্চানন ‘ঠাকুর’ পদবী লাভ করেন। এরপর তাঁর উত্তরসূরীরাও নামের শেষে যুক্ত করতে থাকেন ঠাকুর পদবী। পঞ্চানন ঠাকুরের আদি নিবাস ছিল যশোরে। সেখান থেকে তিনি তৎকালীন কলকাতার গোবিন্দপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পূর্বপুরুষদের এই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ যে হিন্দু ব্রাহ্মণ বলা যাবে না। কারণ রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

(১৮১৭-১৯০৫) ব্রাহ্মধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারি ছিলেন। রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) প্রবর্তিত ‘ব্রাহ্মধর্ম’ ছিল- উদার এবং মানবিক এক ধর্ম বিশ্বাস। তাঁর সংস্পর্শে এসে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধারণা বদলে যায়। এবং পৌত্তলিকতা বর্জন করেন। সেই অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী একেশ্বরবাদী ছিলেন।

ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্ম সমাজদের কোনো মূর্তি নেই। জ্ঞান-ভিত্তিক আধুনিক বিজ্ঞানমনষ্ক চিন্তাধারার ভিত্তিতে ব্রাহ্ম মতের ভিত্তি স্থাপিত। তৎকালে অনেক শিক্ষিত জ্ঞানী-গুণী হিন্দু এ মতের অনুসারী হন। তবে রাজা রামমোহন রায় কোনো ধর্ম মন্দির প্রতিষ্ঠা করেননি। সম্পাদন করেন একটি দলিল। সেখানে উল্লেখ আছে, একেশ্বরের উপাসনা এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলে উপাসনায় যোগ দিতে পারবেন এবং কোনোরূপ চিত্রকর্ম, প্রতিমূর্তি, প্রতিমা বা খোদিত মূর্তি এ উপাসনায় স্থান পাবে না। অথচ দেবেন্দ্রনাথ নিজ গৃহে ব্রাহ্মমন্দির স্থাপন করেন। সেখানে নিয়মিত উপাসনা ও ব্রহ্মসঙ্গীত গাওয়া হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শৈশব থেকে এ ধরনের সঙ্গীত শ্রবণের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছেন।

তাঁর বাবা ফরাসি কবি রুমী ও হাফিজের ভক্ত ছিলেন। ইসলামের সুফিবাদ ও বাউল মতাদর্শের প্রতি ভীষণ আকর্ষণও ছিল তাঁর। ছেলেদের ফারসি ভাষা শিক্ষাদানের জন্য বাড়িতে ফারসি মুন্সীও নিয়োগ দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মানস গঠিত হয়েছে বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদর্শে। যে কারণে তাঁর সাহিত্যে এর প্রচ্ছন্ন প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। বলা হয়ে থাকে, বাল্যকাল থেকে উদার চেতনা ও বিশ্বাসের মাঝে বেড়ে ওঠার কারণে রবীন্দ্র সাহিত্য হিন্দু, ব্রাহ্ম, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরাও খুব সহজে গ্রহণ করেছে।

১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার জন্য প্রথম কুষ্টিয়ার শিলাইদহে আসেন। এখানে এসেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউল মতবাদের একটি সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি বাউল গানের ভাব সাধনা এখান থেকেই উলোটপালোট করে দেখেছেন। জেনেছেন বাউলদের সম্পর্কেও। সংগ্রহ করেছেন বাউল গান। আর এই বাউল গানের সুর ও ভাব তাঁকে কখন আকৃষ্ট করেছিল, তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। যার প্রভাব তাঁর বেশ কিছু গানে রয়েছে। বাউল মতবাদে আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ যে একজন বড় মাপের আবিস্কারক, এ প্রমাণও তিনি দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে। তখন লালন ফকিরের আনুমানিক বয়স ৮৭ বছর। রবীন্দ্রনাথ ৮০ বছর তিন মাস বয়সে ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ সালে (৭ আগস্ট ১৯৪১) পরলোকগমন করেন। আর লালন ১৮৯০ সালে ১৭ অক্টোবর প্রায় ১১৬ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ৩০ বছর। এই সূত্রে বলা যায়, জমিদারীর কারণে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে এসে লালন ফকিরের জীবিতকালেই জেনেছিলেন। যা তিনি শিলাইদহে না এলে এই সুযোগ পেতেন না। তাঁর প্রাণধর্মের প্রেরণা আর বাউলের প্রেরণার উৎস ছিলো অভিন্ন। তাই বাউলের ‘মনের মানুষ’-তত্ত্বের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র একটি ঐক্য ও সাযুজ্যবোধ সহজেই আবিস্কার করা সম্ভব। বাউলগানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানববাদী জীবনচেতনার প্রেরণা অনুভব করেছিলেন। একারণে নিজে রবীন্দ্র বাউল বলেও ভেবেছেন।

আরও পড়ুন : বাউল মতবাদ ও আবিস্কারক রবীন্দ্রনাথ ভাবনা

জমিদারী পরিচালনার সূত্রে শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বাউল-ফকির ও বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর সংস্পর্শে আসেন। এখানেই বাউলগানের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। এই শিলাইদহেই বাউল-সংস্পর্শ লাভের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘হারামণি’র ভূমিকায় নিজেই বলেছেন : “শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউলদের সঙ্গে আমার সর্ব্বদাই দেখাসাক্ষাৎ ও আলাপ আলোচনা হ’ত। আমার অনেক গানেই বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞতসারে বাউলসুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে তখন আমার নবীন বয়স, শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল, ‘কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে/ হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে/ দেশ বিদেশ বেড়াই ঘুরে। ‘এ থেকেও খুব সহজে অনুমেয় তিনি বাউলদের ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

অসাম্প্রদায়িক উদার চেতনার কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবন-চৈতন্যকে গভীরভাবে আলোড়িত করতে পেরেছিলেন। হয়েছেন সবার স্বস্তির ঠিকানা। উৎসব-পার্বন থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি অনুসঙ্গেও মিশে আছে। যেখানে ব্যক্তি আর ধর্মচিন্তা মিশেছে গভীর এক গহ্বরে। প্রাণে আর প্রকৃতিতে শুধু ধ্বনীত হচ্ছে- রবীন্দ্রনাথের গানের কথা- ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি…

রনজক রিজভী
গণমাধ্যম কর্মী।
০১৭১১৭৮৭৩৭৯
ranjakrizvy.com

Categories
মুক্তমত

তবু অনন্ত জাগে

কলিকাতায় পঁচিশ বছর আগে সত্যজিৎ রায় স্মারক বক্তৃতা দিয়াছিলেন অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। সেই বক্তৃতার শিরোনাম ছিল: আওয়ার কালচার দেয়ার কালচার। আমাদের সংস্কৃতি, তাহাদের সংস্কৃতি। বাংলা, ভারত তথা প্রাচ্যের সহিত পশ্চিম দুনিয়ার সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের বিষয়টিকে এই উপলক্ষে নির্বাচন করিবার পিছনে এক দিকে ছিল বক্তা অমর্ত্য সেনের নিজস্ব চিন্তাভাবনা, অন্য দিকে ছিল সত্যজিৎ রায়ের জীবনদর্শন সম্পর্কে তাঁহার গভীর মূল্যায়ন। তাহা এক উদার, সহিষ্ণু, আন্তর্জাতিকতার দর্শন। তাহার মূলে রহিয়াছে আপন সংস্কৃতির গভীর চর্চা ও অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বসংস্কৃতির সহিত সংযোগ সাধন এবং সেই সংযোগ হইতে রসদ সংগ্রহ করিয়া আপন ভাবনা ও সৃষ্টিকে আবার বিশ্বের দরবারে পৌঁছাইয়া দেওয়া। ঘর ও বাহিরের এই নিরন্তর আদানপ্রদানের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি, গত দুই শতাব্দীর বাঙালি তাহারই ধারক এবং বাহক। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়াই সে বৃহৎ বাঙালি হইয়া উঠিতে পারিয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত তাহার শ্রেষ্ঠ প্রতিমূর্তি। সত্যজিৎ রায় সেই ধারার কৃতী অনুসারী। যেমন অমর্ত্য সেনও।

সত্যজিৎ রায় নিজে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। সারা জীবন আপন সৃষ্টিতে, কথায় ও লেখায় তিনি নিজেকে প্রসারিত বিশ্বের নাগরিক হিসাবেই দেখিয়াছেন। ভারতীয় তথা বাঙালির জীবন-ঐতিহ্য ছানিয়া আপন চলচ্চিত্র গড়িয়া তুলিবার সঙ্গে সঙ্গে সেই সৃষ্টিকে বিশ্বের দরবারে হাজির করিবার সুযোগও এই কারণেই তাঁহার নিকট অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। ১৯৮২ সালে এক নিবন্ধে তিনি লিখিয়াছিলেন, পথের পাঁচালী-র দীর্ঘ নির্মাণপর্বের মধ্যেই যখন অপ্রত্যাশিত ভাবে নিউ ইয়র্কের একটি ভবিষ্যৎ প্রদর্শনীতে তাহা দেখাইবার অগ্রিম প্রস্তাব আসে, তখন তাঁহার মন নাচিয়া উঠিয়াছিল। কারণ, তাঁহার অকপট উক্তি: “(ছবিটি নির্মাণের আর্থিক সংস্থানের তীব্র অভাব হেতু) ক্রমাগত বিপুল সঙ্কটে পড়িয়াও যে একটি কারণে আমি হাল ছাড়িয়া দিয়া সমগ্র প্রকল্পটি বন্ধ করিয়া দিই নাই, তাহা হইল এই আশা যে, এক দিন আমার ছবিটি পশ্চিম দুনিয়ার দর্শকদের নিকট পৌঁছাইবে।” ইহাকে নিছক পশ্চিমের বাহবা কুড়াইবার ক্ষুদ্র আগ্রহ মনে করিলে কেবল তাঁহার প্রতি বিরাট অন্যায় হইবে না, অন্যায় হইবে বৃহৎ বাঙালির ধারণাটির প্রতি। সেই বাঙালি আপন কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পেশ করিয়া তবেই তাহার মূল্যায়ন করিতে চাহিয়াছে, কূপমণ্ডূকের আত্মপ্রশস্তি এবং পারস্পরিক পৃষ্ঠকণ্ডূয়নে তাহার মন ভরে নাই। সত্যজিৎ বৃহৎ বাঙালি ছিলেন।

আগামী কাল সত্যজিৎ রায়ের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হইতে চলিয়াছে। বাঙালি তাঁহাকে নানা ভাবে স্মরণ করিবে। কোন বাঙালি? সে কি আপন চিন্তায় চেতনায় বৃহৎ? তাহার আত্ম-অন্বেষা কি বিশ্বমুখী? বাহিরের সহিত নিরন্তর আদানপ্রদানের মধ্য দিয়া সে কি আত্মসংস্কৃতির বিকাশ ঘটাইতে আগ্রহী? পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকাইয়া এই প্রশ্নের উত্তরে একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস উঠিয়া আসে। বাঙালি এখন বিভিন্ন বিষয়ে তুচ্ছতার সাধক, বড় করিয়া কিছু ভাবিবার ক্ষমতাই সে যেন হারাইয়াছে। ব্যতিক্রম নিশ্চয় আছে, কিন্তু তাহা ব্যতিক্রম। সত্যজিৎ রায় আজ নাগরিক বাঙালির সমাজকে দেখিলে কী বলিবেন, তাহা লইয়া জল্পনার বিশেষ অবকাশ নাই। শেষ ছবি আগন্তুক-এ মনোমোহন মিত্রের কণ্ঠস্বরে তিনি তাঁহার কঠিন রায় শুনাইয়া দিয়া গিয়াছেন। তবে ইহাও সত্য যে, শেষ পর্যন্ত তিনি মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারান নাই। ছবির উপসংহারে মনোমোহন যখন তাঁহার বালক বন্ধু সাত্যকিকে জিজ্ঞাসা করেন, বড় হইয়া সে কী হইবে না, সেই কথা তাহার মনে আছে কি না, তখন তাহার বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুইটি সটান ছোটদাদুর চোখে রাখিয়া সেই ভাবী নাগরিক উত্তর দেয়: কূপমণ্ডূক। বাঙালি চিরকাল কূপমণ্ডূকই থাকিবে, সত্যজিৎ তাহা ভাবিতেন না।

সূত্র: আনন্দবাজার