Categories
মুক্তমত

বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষাকে যেভাবে বাস্তবে রূপ দিলো ড্যাফোডিল

আমাদের এ যুগে করোনা অতিমারী (কোভিড-১৯) একটি সুনির্দিষ্ট বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সমস্যার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অদ্যাবধি আমরা যে সর্ববৃহৎ চ্যালেঞ্জটির মুখোমুখি হয়েছি তা এ করোনা অতিমারী। ২০১৯ সালের শেষদিকে এশিয়া মহাদেশে এর প্রাদুর্ভাব শুরু হলেও খুব দ্রুত এন্টার্কটিকা বাদে সবকটি মহাদেশে এ মহামারী ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিনিয়তই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রতিটি দেশই করোনা বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে, সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব মেনে চলতে বাধ্য করে, এমনকি ভ্রমণকে সীমাবদ্ধ করে, নাগরিকদের কোয়ারেন্টাইনে রাখে, এলাকা বিশেষে লক ডাউন ঘোষণা করা হয়, ক্রীড়া ইভেন্ট, কনসার্ট, জনসমাবেশ এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বৃহৎ সমাবেশগুলো বাতিল করে।

বাংলাদেশের যে সেক্টরটি এখনও লকডাউনের মুখোমুখি তা হল সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে আছে। বাংলাদেশে এবারের এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়াও সম্ভব হয়নি। শীতের শুরুতে বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় ধাপ আঘাত হানতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ও এর বাইরে নয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের বিকল্প উপায় খুজঁছে সবাই। অনলাইন কার্যক্রমের গতির ব্যবহার আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। মানুষ এ ভয়াবহ পরিস্থিতিকে কাটিয়ে উঠতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে।

তবে এতসব বাধাবিপত্তি এবং প্রতিবন্ধকতাকে পিছনে ফেলে সকল প্রকার একাডেমিক ও প্রশাসনিক শিক্ষা কার্যক্রম সফলতার সাথে সম্পন্ন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে যে প্রতিষ্ঠান তা কোন উন্নত দেশের নয় বরং উন্নয়নশীল আমাদের এই ডিজিটাল বাংলাদেশেরই ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)। সকল প্রকার শিক্ষা কার্যক্রমকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে ড্যাফোডিল যে শক্তিশালী টুলসটি ব্যবহার করছে তা হল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস) এবং বেøন্ডেড লার্নিং সিস্টেম (বিএলসি)।

লক ডাউনের প্রথম দিন থেকেই ডিআইইউ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বিএলসি (মিশ্রিত শিক্ষণ কেন্দ্র) ব্যবহার শুরু করে। ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ক্লাস নেয়ার যথেষ্ট পূর্ব অভিজ্ঞতাও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম মাহবুব উল হক মজুমদার বলেন, ৮ বছর আগেই ২০১৩ সাল থেকে হরতাল, অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ডিআইইউ সকল শিক্ষাকার্যক্রম বিএলসি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করে আসছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় লক ডাউনের শুরু থেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনলাইন শিক্ষায় পারদর্শীতার প্রমাণ রেখে চলেছে এবং শিক্ষার্থীরাও প্রযুক্তির সাথে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনাও শিক্ষকদের জন্য শতভাগ সহজতর হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সম্পূর্ণ অটোমেশন এবং ডিজিটাইজেশনের লক্ষ্যে ডিআইইউ বিএলসি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ‘স্মার্ট এড’ু প্ল্যাটফর্ম সম্পৃক্ত করেছে যার মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রমও পরিচালনা ও মনিটরিং করা হচ্ছে। ডিআইইউ’র এই ‘বিএলসি’ ডিজিাল টিচিং এবং লার্নিং এর হাব হিসেবে কাজ করছে। ‘বিএলসি’ প্লাট ফর্মের লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের কার্যকরভাবে সংযুক্ত রেখে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অগ্রগতি ট্র্যাক করা ও স্বতন্ত্র মূল্যায়ন নিরীক্ষণ এবং তাদের শেখাকে সহজতর করতে অধিকতর সহযোগিতা প্রদান করা।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পথিকৃৎ ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রসেস অটোমেশন এবং ডিজিটাল শিক্ষা দান এবং শেখার ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সমস্ত কর্মপ্রক্রিয়া এবং কার্যক্রম ডিজিটাল অবকাঠামো, ওয়েব এপ্লিকেশন এবং সফট্ওয়্যার দ্বারা পরিচালিত হয়। একাডেমিক বিভাগগুলোও দ্রততম সময়ের মধ্যে বিএলসি প্লাটফর্মের টুলস্ গুলোকে রপ্ত করে নিয়ে নিজেদেরকে দক্ষভাবে প্রস্তুত করে নিয়েছে। ফলশ্রæতিতে কোভিড-১৯ অতিমারীকালেও ডিআইইউ বিএলসি প্লাটফর্ম ব্যবহার করে অত্যন্ত সফলতার সাথেই অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, একাডেমিক এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের পরিষেবা দিচ্ছে যা বাংলাদেশে অভূতপূর্ব ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।

সম্পূর্ণ অনলাইনে ক্লাস চালুর শুরুতে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত শিক্ষার্থীদের দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে কিছু সমস্যা থাকলেও বিএলসি প্লাটফর্মের স্বল্প মাত্রার নেটে ডেটা কার্যকারিতা নির্বিঘœ হওয়ায় শিক্ষার্থীদের খুব একটা বেশী বেগ পেতে হয়নি। তারপরও ডিআইইউ শিক্ষার্থীদের জন্য ‘গ্রামীন ফোন’ ও ‘রবি’র সাথে তুলনামূলকভাবে স্বল্পমূল্যের ডেটা প্যাকেজের চুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। বর্তমানে বিএলসি প্লাটফর্মে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২৯ হাজারের বেশী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা একযোগে কাজ বরতে পারছে এবং শক্তিশালী ক্লাউড ভিক্তিক অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রায় চার হাজারের বেশী কোর্স পরিচালনা করছে।

বিএলসি একটি সুগঠিত ও শক্তিশালী ই-লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং কোর্স তৈরী, গঠন, যোগাযোগ ও পরিচালনা করার ওয়ান স্টপ সমাধান। অবিশ্বাস্যভাবে শক্তিশালী প্লাগ ইনস্ এবং ইন্টিগ্রেশন এর সমন্বয়ে গঠিত এই বিএলসি প্লাটফর্ম শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহার ও পরিচালনা করা খুব সহজ। প্লাটফর্মটিতে একটি ‘ড্র্যাগ এন্ড ড্রপ’ কোর্স বিল্ডার রয়েছে যা শিক্ষকদের সহজেই কোর্স প্রকাশ করতে সহায়তা করে। কোর্স উপকরণ, নতুন পাঠ্য ভিডিও, অডিও, পাওয়ারপয়েন্ট, ড্রাইভ রিসোর্স, ডেস্কটপ থেকে যেকোনও ফাইল এমনকি ইন্টারেক্টিভ সামগ্রী অন্তভ‚ক্ত করা বা তৈরী করা (লিংন্ক বা এম্বেড) সুবিধাজনক। প্লাটফর্মটিতে শতাধিক প্লাগ ইন এবং ইন্টিগ্রেশনসহ ২৫টিরও বেশী ইনবিল্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা শিক্ষকদের তাদের শিক্ষার্থীদের একাধিক এবং নমনীয় উপায়ে যুক্ত করার সম্ভাবনাগুলি প্রসারিত করে।

কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট, ফোরাম এবং অনলাইন ওয়ার্কশপগুলি শিক্ষার্থীদের কৌতূহলকে উৎসাহিত করে এবং আরও কোর্সে অংশ নিতে বাধ্য করে। এটি একটি সর্বাধিক উন্নত কুইজ স্রষ্টা যা শিক্ষকদের নির্ধারিত সময় সীমার সাথে কুইজ সেট করার এবং শিক্ষার্থীদের প্রচেষ্টা ট্র্যাক করার দক্ষতাসহ যে কোনও ধরণের প্রশ্ন সেট করার সুযোগ রয়েছে।

এর মাধ্যমে শিক্ষকরা কুইজ বা পরীক্ষার মান এবং সততা বজায় রাখতে পারেন এবং প্ল্যাটফর্মটি টারনিটিন চৌর্যবৃত্তির চেকারের সাথে সমন্বিত করা আছে যাতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত আবেদনের মৌলিকত্ব যাচাই প্রতিবেদন সহজেই পেতে পারে।

এমন আরো অনেকগুলো মাধ্যমে ‘বøুম টেক্সোনমি’ অনুসরণ করে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করার জন্য শিক্ষকরা প্রশ্ন তৈরি করতে সক্ষম হন যাতে তারা শিক্ষার্থীদের বর্তমান অবস্থান সহজেই সনাক্ত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও গাইডলাইন সরবরাহ করতে পারে। সমস্ত মূল্যায়নের ফলাফলগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি উন্নতমানের স্বনির্ধারিত গ্রেড বইতে সঞ্চিত হয় যা শিক্ষকদের প্রতিটি কোর্স শিক্ষার্থীরা কীভাবে সম্পাদন করছে তার একটি সংক্ষিপ্ত ধারণা দেয়। শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে যে কোনও সময তাদের রেকর্ডগুলি দেখতে পারে যাতে তারা পরবর্তী মূল্যায়নের জন্য পরিকল্পনা করতে এবং আরও ভালভাবে প্রস্তুত করতে পারে।

এক কথায় প্ল্যাটফর্মটি শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক উভয়ের জন্য স্বচ্ছতা এবং মিথস্ক্রিয়তা বৃদ্ধি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ বিভাগও এই রেকর্ডগুলি ট্র্যাক এবং পরীক্ষা করতে পারে যা তাদের পরীক্ষার মান, স্বচ্ছতা এবং সততা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।

বিএলসি প্ল্যাটফর্ম একক কোর্সের জন্য একাধিক প্রশিক্ষককেও অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এটা কোর্স কনটেন্ট প্রস্তুুতির জন্যে শিক্ষকদেরকে একে অপরের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে এবং কোর্স কনটেন্টের মানের উন্নতি করতে সহায়তা করে। স্ব-স্ব বিভাগগুলিও এ প্লাটফর্মে কোর্স রিপোজিটরিগুলি পৃথকভাবে রাখতে পারে যাতে নতুন সেমিস্টারের কোর্স অফার দেওয়ার আগে শিক্ষকগণ সময় সময় তাদের কোর্সগুলো আপডেট করতে পারে। বিভাগগুলিও এই রিপোজিটরিগুলি পরীক্ষা করতে পারে এবং শিক্ষকদের উন্নতির স্কোপগুলিতে নির্দেশিকা সরবরাহ করতে পারে।

অধিকন্তু, বিএলসি প্ল্যাটফর্মের তিনটি পৃথক ড্যাশবোর্ডসহ নিজস্ব বিশ্লেষণ সরঞ্জাম রয়েছে : শিক্ষক ড্যাশবোর্ড, শিক্ষার্থী ড্যাশবোর্ড এবং অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড। এর সাহায্যে শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স এবং তাদের কোর্সগুলি একটি একক ড্যাশবোর্ড থেকে যাচাই করতে পারেন এবং কয়েকটি ক্লিকে তাদের কোর্স সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেতে পারেন।

একইভাবে, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কোর্স থেকে তাদের বর্তমান পারফরম্যান্স সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি বা ধারনা পেতে পারে যাতে তারা ভবিষ্যতের জন্য ভালভাবে প্রস্তুত হতে পারে এবং সংগঠিত হতে পারে বা তাদের শিক্ষকদের সাহায্য নিতে পারে। অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালন সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি পেতে এবং প্লাটফর্মের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা এবং ক্রিয়াকলাপের প্রতিবেদন দেয় যাতে তাদের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর সাফল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

রিপোর্টগুলি সক্রিয় শিক্ষক, কোর্স সমাপ্তি, শিক্ষক সম্পৃক্ততা, অস্বাভাবিক গ্রেড, উদ্ভাবনী শিক্ষক, সক্রিয় শিক্ষার্থী, ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থী ইত্যাদির মতো দরকারী ভাগে বিভক্ত। এই প্রতিবেদনগুলি অনুষদ, বিভাগ এবং সেমিস্টার অনুসারে বাছাই করা যায়। এছাড়াও এর মাধ্যমে একটি সুনির্দিস্ট সময়ের রিপোর্ট পাওয়া সম্ভব।

বিএলসির মাধ্যমে অনলাইনে শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা হ’ল ইউটিউব, গুগল, ড্রাইভ, এডপজল, এইচ ৫ পি ইন্টারেক্টিভ সামগ্রীর মতো একাধিক উৎস থেকে ভিডিওসহ ক্লাসগুলি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণীয় এবং ইন্টার‌্যাক্টিভ করা যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য কোর্স তৈরি করতে, শিক্ষকরা বিভিন্ন ধরণের মাল্টিমিডিয়া ফাইল, চিত্র, পিডিএফ, ডক্স, এক্সেল শীট এবং অন্যান্য কনটেস্ট সহজেই আপলোড করতে পারেন।

শিক্ষার্থীরা স্বাচ্ছন্দে ‘সমস্যা আলোচনার ফোরাম’ বিভাগগুলির সাথে অনায়াসে যোগাযোগ করতে পারে, যেখানে তারা শিক্ষকদের কাছে মন্তব্য করতে এবং প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারে, শিক্ষার্থীরা তাদের কোর্সগুলিতে পর্যালোচনা, রেট ও প্রতিক্রিয়াও জানাতে পারে। শিক্ষকরা বিএলসি প্লাটফর্মের মধ্যে থেকেই শিক্ষার্থীদের পর্যায়ক্রমিক প্রতিক্রিয়া এবং সমীক্ষাও নিতে পারে।

আরও দেখুন-ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ

‘বিএলসি’ প্ল্যাটফর্ম বর্তমানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শে ক্লাউড অবকাঠামোর উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে যা শিক্ষার্থীদের প্রান্তিক অবস্থান বা ইন্টারনেট সংযোগ নির্বিশেষে তাদের শিখতে সক্ষম করে এবং শিক্ষাকে ইন্টারেক্টিভ এবং প্রাণবন্ত করে তোলে। সাম্প্রতিক সেমিস্টারে ডিআইইউ শিক্ষকরা বিএলসি প্লাটফর্মের মাধ্যমে মোট ১৬৪৭ টি কোর্স চালু করেছেন যেখানে ১৬০০০ এর বেশি সক্রিয় শিক্ষার্থী অনলাইনে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে ওয়বিনার পরিচালনার প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্বসেরা অধ্যাপকদের ক্লাস করার সুযোগ পায়।

শিক্ষার্থীরা যাতে সহজেই অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারে সেই লক্ষ্যে ডিআইইউ আগে থেকেই শিক্ষার্থীদেরকে বিনামূল্যে ল্যাপটপ প্রদান করে আসছে এবং এই বর্তমান সেমিস্টারেও শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে নির্ধারিত সময়ের আগেই ২৫০০ ল্যাপটপ প্রদান করেছে। করোনা অতিমারীর কারণে ডিআইইউ ‘সামার ২০২০’ সেমিস্টারে শিক্ষার্থীদের মোট ২০ কোটি টাকার বৃত্তি প্রদান করেছে এবং ‘ফল ২০২০’ সেমিস্টারের শিক্ষার্থীদের জন্য ৫০% পর্যন্ত টিউশন ফি মওকুফ এবং আরো ২০ কোটি টাকার বৃত্তি প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষার মানোন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে যে কঠিন চ্যালেঞ্জেগুলোর মুখোমুখি হতে হয় তা হলো বিশ্বাসযোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং বৈধতা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে বৃহত্তম একশত পঞ্চাশ একর জায়গার উপর ড্যাফোডিল সবুজ স্থায়ী ক্যাম্পাস, যেটি বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বাধিক সজ্জিত, নান্দনিক এবং সেরা ক্যাম্পাসগুলির অন্যতম একটি হিসেবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। শিক্ষা এবং গবেষণার দিক দিয়ে ক্রমাগত বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়েও ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষস্থানীয়। এই অতিমারীকালেও ডিআইইউ তার স্বাভাবিক গতিতে চলছে, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে অতীতের চেয়ে আরও দ্রুত গতিতে।

আরও পড়ুন- শতবর্ষীয় নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ

কোভিড-১৯ এর প্রভাবে সমগ্র বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও শিক্ষার নিয়মিত সমস্ত কার্যক্রমসমূহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে সেশন জটের বিষয়ে ভয়ে আছে। তবে, ডিআইইউ’র ‘এলএম এস’ ও ‘বিএলসি’ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থাগুলিকে এই সংকটেও কিভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হয় তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এবং অনুপ্রাণিত করেছে।

শুধু কেবল একাডেমিকই নয়, যে কোনও প্রতিষ্ঠানই ‘স্মার্ট ইডু’র মতো তার প্রচেষ্টা দ্বারা উৎসাহিত এবং পরিচালিত হতে পারে।

আগামী নিউ নরমাল চ্যালেঞ্জিং বিশ্বে, যেখানে বেঁচে থাকাও একটি বড় ম্বার্থকতা হতে পারে, সেখানে ডিআইইউ তার শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি উদ্যোক্তা মানসিকতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতায় সজ্জিত করে গড়ে তুলতে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। মহামারীর এই সময়ে ডিআইইউ প্রকৃতপক্ষে দেশের শিক্ষাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ডিআইইউ এখন অনলাইনে বিশ্বখ্যাত অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটফর্মগুলিতে বিশেষ করে ‘উদেমি’, ‘কোর্সএরা’ ইত্যাদিতে অবদানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে।

ড্যাফোডিল জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী অবদান রাখতে অগ্রসরমান। তাই ড্যাফোডিল হতে পারে অনলাইন শিক্ষায় অনগ্রসরমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য্যে অনুকরণীয় আদর্শ।

লেখক- মো. আনোয়ার হাবিব কাজল
ঊর্ধ্বতন সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ)
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ভয়েস টিভি/ডিএইচ

Categories
মুক্তমত

পত্রিকা পড়ার গল্প

এক

ভোরে ঘুম থেকে উঠে একে একে সকলে জড়ো হতাম মায়ের শোবার ঘরে। হাতে চায়ের পেয়ালা, বিছানার উপর ছড়ানো-ছিটানো খবরের কাগজ… একজনের পর আরেকজন, এক-একটা খবর পড়ছে আর অন্যেরা মন দিয়ে শুনছে বা মতামত দিচ্ছে। কখনও কখনও তর্কও চলছে– কাগজে কী লিখল বা কী বার্তা দিতে চাচ্ছে? যার যার চিন্তা থেকে মতামত দিয়ে যাচ্ছে। এমনিভাবে জমে উঠছে সকালের চায়ের আসর আর খবরের কাগজ পড়া।

আমাদের দিনটা এভাবেই শুরু হতো। অন্তত ঘণ্টা তিনেক এভাবেই চলতো। আব্বা প্রস্তুত হয়ে যেতেন। আমরাও স্কুলের জন্য তৈরি হতাম। আব্বার অফিস এক মিনিটও এদিক-সেদিক হওয়ার জো নেই। সময়ানুবর্তিতা তার কাছে থেকেই আমরা পেয়েছি। সংবাদপত্র পড়া ও বিভিন্ন মতামত দেয়া দেখে আব্বা একদিন বললেন: ‘বলতো, কে কোন খবরটা বেশি মন দিয়ে পড়?’

আমরা খুব হকচকিয়ে গেলাম। কেউ কোনো কথা বলতে পারি না। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা, খোকা কাকা, জেনী সকলকেই সেখানে। এমনকি ছোট্ট রাসেলও আমাদের সাথে। তবে, সে পড়ে না, কাগজ কেড়ে নেয়ার জন্য ব্যস্ত থাকে।

আমরা কিছু বলতে পারছি না দেখে আব্বা নিজেই বলে দিলেন– কে কোন খবরটা নিয়ে আমরা বেশি আগ্রহী। আমারা তো হতবাক। আব্বা এত খেয়াল করেন! মা সংবাদপত্রের ভিতরের ছোট ছোট খবরগুলো, বিশেষ করে সামাজিক বিষয়গুলো বেশি পড়তেন। আর কোথায় কী ঘটনা ঘটছে তা-ও দেখতেন। কামাল স্পোর্টসের খবর বেশি দেখতো। জামালও মোটামুটি তাই। আমি সাহিত্যের পাতা, আর সিনেমার সংবাদ নিয়ে ব্যস্ত হতাম। এভাবে একেকজনের একেক দিকে আগ্রহ।

খুব ছোটবেলা থেকেই কাগজের প্রতি রেহানার একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল। আব্বা ওকে কোলে নিয়ে বারান্দায় চা খেতেন আর কাগজ পড়তেন। কাগজ দেখলেই রেহানা তা নিয়ে টানাটানি শুরু করতো– নিজেই পড়বে– এমনটা তার ভাব ছিল। এর পর ধানমন্ডির বাড়িতে যখন আমরা চলে আসি, তখন আমাদের সাথে সাথে ওরও কাগজ পড়া শুরু হয়। যখন একটু বড় হলো, তখন তো তার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খবর পড়ার অভ্যাস হলো। ওর দৃষ্টি থেকে কোনো খবরই এড়াতো না, তা সিনেমার খবর হোক বা অন্য কিছু। আর ছোটদের পাতায় অনেক গল্প, কবিতা, কুইজ থাকতো। রেহানা সেগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তো।

এখন রেহানা লন্ডনে থাকে। সেখানে সে অনলাইনে নিয়মিত দেশের পত্রপত্রিকা পড়ে। শুধু যে পড়ে তাই না, কোথায়ও কোনো মানুষের দুঃখ-কষ্টের খবর দেখতে পেলে সাথে সাথে আমাকে মেসেজ পাঠায়– অমুককে সাহায্য কর, এখানে কেন এ ঘটনা ঘটলো, ব্যবস্থা নাও…। উদাহরণ দিচ্ছি। এই তো করোনাভাইরাসের মহামারির সময়েরই ঘটনা। একজন ভিক্ষুক ভিক্ষা করে টাকা জমিয়েছিলেন ঘর বানাবেন বলে। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারি শুরু হওয়ায় ওই ভিক্ষুক তার সব জমানো টাকা দান করে দেন করোনাভাইরাস রোগীদের চিকিৎসার জন্য। খবরের কাগজে এই মহানুভবতার খবর রেহানার মনকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। আমাকে সাথে সাথে সে বিষয়টা জানায়। আমরা তার জন্য ঘর তৈরি করে দিয়েছি। এভাবে এ পর্যন্ত অনেক মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছি শুধুমাত্র আমার ছোট্ট বোনটির উদার মানবিক গুণাবলীর জন্য, ওর খবরের কাগজ পড়ার অভ্যাসের কারণে। সুদূর প্রবাসে থেকেও প্রতিনিয়ত সে দেশের মানুষের কথা ভাবে। পত্রিকায় পাতা থেকে খবর সংগ্রহ করে মানুষের সেবা করে।

দুই

আমার ও কামালের ছোটবেলা কেটেছে টুঙ্গিপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে। সেকালে ঢাকা থেকে টুঙ্গিপাড়ায় যেতে সময় লাগতো দুুই রাত একদিন। অর্থাৎ সন্ধ্যার স্টিমারে চড়লে পরের দিন স্টিমারে কাটাতে হতো। এরপর শেষ রাতে স্টিমার পাটগাতি স্টেশনে থামতো। সেখান থেকে নৌকার দুই-আড়াই ঘণ্টার নদীপথ পেরিয়ে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে পৌঁছানো যেতো।

কাজেই সেখানে কাগজ পৌঁছাত অনিয়মিতভাবে। তখন কাগজ বা পত্রিকা পড়া কাকে বলে তা শিখতে পারিনি। তবে একখানা কাগজ আসতো আমাদের বাড়িতে। তা পড়ায় বড়দের যে প্রচণ্ড আগ্রহ তা দেখতাম।

ঢাকায় আমরা আসি ১৯৫৪ সালে। তখন রাজনৈতিক অনেক চড়াই-উৎড়াই চলছে। আব্বাকে তো আমরা পেতামই না। তিনি প্রদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আবার মন্ত্রিত্বও পেলেন। তিনি এত ব্যস্ত থাকতেন যে গভীর রাতে ফিরতেন। আমরা তখন ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালে উঠে আমি আর কামাল স্কুলে চলে যেতাম। মাঝেমধ্যে যখন দুপুরে খেতে আসতেন, তখন আব্বার দেখা পেতাম। ওই সময়টুকুই আমাদের কাছে ভীষণ মূল্যবান ছিল। আব্বার আদর-ভালবাসা অল্প সময়ের জন্য পেলেও আমাদের জন্য ছিল তা অনেক পাওয়া।

বাংলার মানুষের জন্য তিনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। তার জীবনের সবটুকু সময়ই যেন বাংলার দুঃখী মানুষের জন্য নিবেদিত ছিল। এর পরই কারাগারে বন্দি তিনি। বাইরে থাকলে মানুষের ভিড়ে আমরা খুব কমই আব্বাকে কাছে পেতাম। আর কারাগারে যখন বন্দি থাকতেন তখন ১৫ দিনে মাত্র এক ঘণ্টার জন্য দেখা পেতাম। এইতো ছিল আমাদের জীবন!

আমার মা আমাদের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিতেন তার স্নেহ ভালবাসা দিয়ে। আর আমার দাদা-দাদি ও চাচা শেখ আবু নাসের– আমাদের সব আবদার তারা মেটাতেন। যা প্রয়োজন তিনিই এনে দিতেন। আর আব্বার ফুফাতো ভাই– খোকা কাকা– সব সময় আমাদের সাথে থাকতেন। আমাদের স্কুলে নেয়া, আব্বার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সরকার যে মামলা দিত তার জন্য আইনজীবীদের বাড়ি যাওয়া– সবই মা’র সাথে সাথে থেকে খোকা কাকা সহযোগিতা করতেন।

তবে আমার মা পড়াশেখা করতে পছন্দ করতেন। আমার দাদা বাড়িতে নানা ধরনের পত্রিকা রাখতেন। আব্বার লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে দাদার পত্রিকা কেনা ও পড়ার কথা উল্লেখ আছে। তখন থেকেই আব্বার পত্রিকা পড়ার অভ্যাস। আর আমরা তার কাছ থেকেই পত্রিকা পড়তে শিখেছি।

পত্রিকার সঙ্গে আব্বার একটা আত্মিক যোগসূত্র ছিল। আব্বা যখন কলকাতায় পড়ালেখা করছিলেন, তখনই একটা পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। জনাব হাশেম এ পত্রিকার তত্ত্বাবধান করতেন এবং তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন। পত্রিকাটির প্রচারের কাজে আব্বা যুক্ত ছিলেন। ‘মিল্লাত’ ও ‘ইত্তেহাদ’ নামে ২টি পত্রিকাও প্রকাশিত হয়েছিল। সেগুলোর সঙ্গেও আব্বা জড়িত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে ‘নতুন দিন’ নামে আরেকটি পত্রিকার সঙ্গে আব্বা সম্পৃক্ত হন। কবি লুৎফর রহমান জুলফিকার ছিলেন এর সম্পাদক।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আর্থিক সহায়তায় ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এ পত্রিকার সঙ্গেও আব্বা সংযুক্ত ছিলেন এবং কাজ করেছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর আব্বা ১৯৫৭ সালে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। সংগঠনকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে সংগঠনের কাজে মনোনিবেশ করেন। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল জারি করে আইয়ুব খান। আব্বা গ্রেফতার হন। ১৯৬০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি পান।

মুক্তি পেয়ে তিনি আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি শুরু করেন। কারণ, এ সময় তার রাজনীতি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। এমনকি ঢাকার বাইরে যেতে গেলেও থানায় খবর দিয়ে যেতে হতো, গোয়েন্দা সংস্থাকে জানিয়ে যেতে হতো। তবে আমাদের জন্য সে সময়টা আব্বাকে কাছে পাওয়ার এক বিরল সুযোগ এনে দেয়। খুব ভোরে উঠে আব্বার সাথে প্রাতঃভ্রমণে বের হতাম। আমরা তখন সেগুনবাগিচার একটি বাড়িতে থাকতাম। রমনা পার্ক তখন তৈরি হচ্ছে। ৭৬ নম্বর সেগুনবাগিচার সেই বাসা থেকে হেঁটে পার্কে যেতাম। সেখানে একটা ছোট চিড়িয়াখানা ছিল। কয়েকটা হরিণ, ময়ূর পাখিসহ কিছু জীবজন্তু ছিল তাতে। বাসায় ফিরে এসে আব্বা চা ও খবরের কাগজ নিয়ে বসতেন। মা ও আব্বা মিলে কাগজ পড়তেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন।

ইত্তেফাক পত্রিকার ‘কচিকাঁচার আসর’ নামে ছোটদের একটা অংশ প্রতি সপ্তাহে বের হতো। সেখানে জালাল আহমেদ নামে একজন ‘জাপানের চিঠি’ বলে একটা লেখা লিখতেন। ধাঁধাঁর আসর ছিল। আমি ধাঁধাঁর আসরে মাঝেমধ্যে ধাঁধাঁর জবাব দিতাম। কখনও কখনও মিলাতেও পারতাম। পত্রিকাগুলোতে তখন সাহিত্যের পাতা থাকতো। বারান্দায় বসে চা ও কাগজ পড়া প্রতিদিনের কাজ ছিল। আমার মা খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজ পড়তেন। দুপুরে খাবার খেয়ে মা পত্রিকা ও ডাকবাক্সের চিঠিপত্র নিয়ে বসতেন। আমাদের বাসায় নিয়মিত ‘বেগম’ পত্রিকা রাখা হতো। ন্যাশনাল ‘জিওগ্রাফি’, ‘লাইফ’ এবং ‘রিডার্স ডাইজেস্ট’– কোনোটা সাপ্তাহিক, কোনোটা মাসিক আবার কোনোটা বা ত্রৈমাসিক– এই পত্রিকাগুলো রাখা হতো। ‘সমকাল’ সাহিত্য পত্রিকাও বাসায় রাখা হতো। মা খুব পছন্দ করতেন। ‘বেগম’ ও ‘সমকাল’– এ দুটোর লেখা মায়ের খুব পছন্দ ছিল।

সে সময়ে সাপ্তাহিক ‘বাংলার বাণী’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করলেন আব্বা। সেগুনবাগিচায় একটা জায়গা নিয়ে সেখানে একটা ট্রেড মেশিন বসানো হলো। যেখান থেকে ‘বাংলার বাণী’ প্রকাশিত হতো। মণি ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় পড়তেন। তাকেই কাগজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। ১৯৬২ সালে আব্বা আবার গ্রেফতার হন। আমরা তখন ধানমন্ডির বাড়িতে চলে এসেছি। কারাগারে আব্বা যখন বন্দি থাকতেন, বাইরের খবর পাওয়ার একমাত্র উপায় থাকতো খবরের কাগজ। কিন্তু যে পত্রিকা দেয়া হতো সেগুলো সেন্সর করে দেয়া হতো।

বন্দি থাকাবস্থায় পত্রিকা পড়ার যে আগ্রহ তা আপনারা যদি আমার আব্বার লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ পড়েন তখনই বুঝতে পারবেন। একজন বন্দির জীবনে, আর যদি সে হয় রাজবন্দি, তার জন্য পত্রিকা কত গুরুত্বপূর্ণ– তাতে প্রকাশ পেয়েছে। যদিও বাইরের খবরাখবর পেতে আব্বার খুব বেশি বেগ পেতে হতো না, কারণ জেলের ভেতরে যারা কাজ করতেন বা অন্য বন্দিরা থাকতেন, তাদের কাছ থেকেই অনায়াসে তিনি খবরগুলো পেতেন।

আমার মা যখন সাক্ষাৎ করতে যেতেন, তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তিনি আব্বাকে অবহিত করতেন। আর আব্বা যেসব দিক-নির্দেশনা দিতেন, সেগুলো তিনি দলের নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। বিশেষ করে ছয় দফা দেয়ার পর যে আন্দোলনটা গড়ে ওঠে, তার সবটুকু কৃতিত্বই আমার মায়ের। তার ছিল প্রখর স্মরণশক্তি।

বন্দি থাকাবস্থায় পত্রিকা যে কত বড় সহায়ক সাথী তা আমি নিজেও জানি। ২০০৭-০৮ সময়ে যখন বন্দি ছিলাম আমি নিজের টাকায় ৪টি পত্রিকা কিনতাম। তবে নিজের পছন্দমত কাগজ নেয়া যেতো না। সরকার ৪টা পত্রিকার নাম দিয়েছিল, তাই নিতাম। কিছু খবর তো পাওয়া যেতো।

তিন

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঘাতকদের নির্মম বুলেটে আমার আব্বা, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন। সেই সাথে আমার মা, তিন ভাইসহ পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে হত্যা করা হয়।

আমি ও আমার ছোট বোন শেখ রেহানা বিদেশে ছিলাম। সব হারিয়ে রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে রিফিউজি হিসেবে যখন পরাশ্রয়ে জীবনযাপন করি, তখনও পত্রিকা জোগাড় করেছি এবং নিয়মিত পত্রিকা পড়েছি।

১৯৮০ সালে দিল্লি থেকে লন্ডন গিয়েছিলাম। রেহানার সাথে ছিলাম বেশকিছু দিন। তখন যে পাড়ায় আমরা থাকতাম, ওই পাড়ার ৮-১০ জন ছেলেমেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিতাম। ছুটি হলে সকলকে নিয়ে আবার ঘরে পৌঁছে দিতাম। বাচ্চাপ্রতি এক পাউন্ড করে মজুরি পেতাম। ওই টাকা থেকে সর্বপ্রথম যে খরচটা আমি প্রতিদিন করতাম তা হলো, কর্নারশপ থেকে একটা পত্রিকা কেনা। বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ঘরে ফেরার সময় পত্রিকা, রুটি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে বাসায় ফিরতাম। তখন একটা পত্রিকা হাতে না নিলে মনে হতো সমস্ত দিনটাই যেন ‘পানসে’ হয়ে গেছে।

সব সময়ই আব্বা ও মায়ের কথা চিন্তা করি। তারা দেশ ও দেশের মানুষের কথা ভাবতে শিখিয়েছেন। মানুষের প্রতি কর্তব্যবোধ জাগ্রত করেছেন। সাধাসিধে জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে উন্নততর সুচিন্তা করতে শিখিয়েছেন। মানবপ্রেম ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন করেছেন। সে আদর্শ নিয়ে বড় হয়েছিলাম বলেই আজ দেশসেবার মত কঠিন দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হচ্ছি। প্রতিদিনের রাষ্ট্র পরিচালনায় মানব কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা নিতে পারছি এবং তা বাস্তবায়ন করছি। যার সুফল বাংলাদেশের মানুষ ভোগ করছে।

সমালোচনা, আলোচনা রাজনৈতিক জীবনে থাকবেই। কিন্তু সততা-নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করলে, নিজের আত্মবিশ্বাস থেকে সিদ্ধান্ত নিলে, সে কাজের শুভ ফলটা মানুষের কাছেই পৌঁছাবেই।

গণমাধ্যম সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। আমি সরকার গঠন করার পর সব সরকারি পত্রিকা ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দিই। যদিও সরকারিকরণের বিরুদ্ধে যারা ছিলেন এবং সরকারিকরণ নিয়ে যারা খুবই সমালোচনা করতেন, তারাই আবার যখন বেসরকারিকরণ করলাম, তখন তারা আমার বিরুদ্ধে সমালোচনা করতেন। আন্দোলন, অনশনও হয়েছে।

আমি মাঝেমধ্যে চিন্তা করি, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যে কয়টা পত্রিকা ছিল তা সরকারিকরণ করে সব সাংবাদিকের চাকরি সরকারিভাবে দেয়া হলো, বেতনও সরকারিভাবে পেতে শুরু করলেন তারা, আবার তারাই সকল সুযোগ-সুবিধা নিয়েও আব্বার বিরুদ্ধে সমালোচনা করা শুরু করলেন। কেন?

আবার আমি যখন সব ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দিলাম, সরকারি পত্রিকা তখন কেন বেসরকারি করছি তা নিয়ে সমালোচনা, আন্দোলন, অনশন সবই হলো। কেন? এর উত্তর কেউ দেবেন না, আমি জানি।

১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখন বাংলাদেশে হাতে গোনা কয়েকটা পত্রিকা ছিল। সেগুলোরও নিয়ন্ত্রণ হত বিশেষ জায়গা থেকে। সরকারি মালিকানায় রেডিও, টেলিভিশন। বেসরকারি খাতে কোনো টেলিভিশন, রেডিও চ্যানেল ছিল না।

আমি উদ্যোগ নিয়ে বেসরকারি খাত উন্মুক্ত করে দিলাম। এক্ষেত্রে আমার দুটি লক্ষ্য ছিল– একটা হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, আরেকটা হলো আমাদের সংস্কৃতির বিকাশ– বর্তমান যুগের সাথে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কৃতি-শিল্পের সম্মিলন ঘটানো। যাতে আধুনিকতা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়, তৃণমূলের মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারে।

২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছিলাম। ডিজিটাল ডিভাইস আমাদের কর্মজীবনে বিশেষ অবদান রেখে যাচ্ছে। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের মোকাবিলা করতে সহায়তা করছে। সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার সুযোগ পাচ্ছি। ১৯৯৬ সালেই মোবাইল ফোন বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করে দিয়েছি। আজ সকলের হাতে মোবাইল ফোন।

বাংলাদেশে সিনেমা শিল্পের শুরু হয়েছিল আব্বার হাত ধরে। এ শিল্পকে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন করে বাংলাদেশের মানুষের চিত্তবিনোদনের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। আবার সার্বিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনেও ভূমিকা রাখতে পারে এ শিল্প।

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের কারণে আমরা এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে দিনযাপন করছি। আমি আশাবাদী এ কালোমেঘ শিগগিরই কেটে যাবে, উদয় হবে আলোকোজ্জ্বল নতুন সূর্যের। সকলের জীবন সফল হোক, সুন্দর হোক। সবাই সুস্থ থাকুন, এই কামনা করি।

লেখক: বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

(বি.দ্র. দেশের একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের বিশেষ সংস্করণে লেখাটি প্রথম ছাপা হয়। তারই পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত রূপ বর্তমান লেখাটি। )

Categories
মুক্তমত

দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ১৪২২

পরনে লালপেড়ে শাড়ি, মাথার খোঁপায় গোঁজা একটি তাজা লাল গোলাপ, দুই কানে লালপাথরের দুল, কপালে বড়ো লালটিপ, হাতে একগাছা কাঁচের লাল চুড়ি, হাত নাড়ালেই ঝনাৎ ঝনাৎ করে বাজে, আয়তচোখে বিদ্যুতের দ্যুতি, লালে লালবরণ আঁটোসাটো চেহারার মেয়েটির শরীর যেন আগুনের তৈরি এবং এখনি আগুন থেকে বেরিয়ে এসেছে। ছেলে-মেয়ের মাখামাখির মধ্যে সম্পূর্ণ আলাদা এই মেয়েটির নিরাপত্তা ওর নিজের শরীর। আগুন লেগে যাবার ভয়ে কেউ মেয়েটির শরীর ঘেষে দাঁড়ায় না। সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটে। তাকানো যায় না এতো তীব্র রূপ নিয়ে পাবলিক গেদারিং-এ আসা উচিৎ কিনা এই নিয়ে তুমুল মিষ্টি বিতর্কও চলে কারও কারও মধ্যে। মেয়েটি একটি জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। তৃতীয়বার চেষ্টার পরেও আগুনরূপা মেয়েটির শরীর ঘষে আগুন নিতে ব্যর্থ সম্রাট বিরক্তি নিয়ে বলে, শালী যে ফড়িং-এর মতো উড়ে বেড়াচ্ছে, পাখাটা নেই এই যা। হঠাৎ মেয়েটির ছোটাছুটি বাড়াবাড়ি রকমের বেড়ে গেল। ভয় পেয়ে গেল সম্রাট, মেয়েটির ভাবগতিক কেমন লাগছে, কাউকে খুঁজছে বোধ হয়। টের পেয়ে গেল কি না? এই কথা বলার সাথে সাথে মেয়েটি উড়াল দিয়ে সম্রাটের সামনে এসে পড়ল ডানাভাঙা ফড়িং-এর মতো। যে গাছের ছায়াটির নিচে সম্রাট দাঁড়িয়েছিল আপাত একা, সেখানে মেয়েটা এসেছে একটু ছায়ার জন্য। হাতে ছোট্ট একটি কাগজের রঙিন পাখা। ওটা দিয়ে শরীরের আগুন নেবানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। যে দূরত্বে দাঁড়িয়েছে, সেখান থেকে মেয়েটির সমগ্রশরীর খুব ভালোভাবেই মনে আঁকিয়ে নিতে পারে সম্রাট। কিন্তু শরীরের ঘ্রাণ নেবার জন্য আরো নৈকট্য প্রয়োজন। এখনি ধাক্কা দিয়ে মেয়েটির কাঁধের উপরে হাত ফেলে সরি বলে চলে আসবে কি না, একথা ভাবছে, ঠিক তখনি হন্যে হয়ে ছুটে এসে মেয়েটির সামনে দাঁড়াল ওর বয়সী এক বলিষ্ঠদেহী তরুণ। ছেলেটি যেন বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এসেছে এমনভাবে ঘামছে, টি-শার্ট ভিজে জবজবে। মেয়েটির মতোই ছটফট করে ছেলেটি। এক মিনিটও দাঁড়ায়নি, ছেলেটির ঘর্মাক্ত হাত ধরে মেয়েটি চলে গেল। যেন জালে আটকা মাছ হাতে তুলে নেবার পরে লাফ দিয়ে পানিতে পড়ল, ইস্ করে ওঠে সম্রাট!

চৌদ্দ’শ উনিশের নববর্ষের রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে টিএসসিতে প্রথম আবিষ্কার করেছিল আগুনরূপা মেয়েটিকে। সেদিন মেয়েটির শরীরের থেকে আগুন এসে ঝলসে দিয়েছিল সম্রাটের শরীর, মন। আগুনপোড়া মানুষের মতো শরীর-মনে সেই যে স্থায়ী দাগ ফেলেছিল, সেই দাগ আর কতোদিন বহন করবে সম্রাট? চৌদ্দ একুশের চৈত্রের শেষ দিবসে কাকডাকা দুপুরে একটি প্রবীণ কাকের গভীর তীব্র চিৎকারে অসহ্য ঠেকলে ভাতঘুমের পরিবর্তে মেয়েটির কথাই ভাবছে সম্রাট। প্রবীণ কাকের গভীর তীব্র চিৎকারের বিরক্তির মধ্যেও সম্রাটের চোখের দু-পাতায় ফর্সা কোমল তুলতুলে নরম দুটি পা ফেলে হাঁটতে শুরু করে আগুনরূপা মেয়েটি। সারা বছর কোথায় যেন লা-পাত্তা হয়ে থাকে। নববর্ষের দিন সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে সূর্যোদয়ের মতোই লালবরণ সাজে মেয়েটির উদয় হয় ক্যাম্পাসে। প্রতিবারই মেয়েটিকে খুঁজে বের করে সম্রাট। সেই একই ছেলে মেয়েটিকে একাই দখলে নিয়ে ক্যাম্পাস দাবড়ে বেড়ায়। নববর্ষের রাতে বন্ধুরা যখন দামি মদ আর ছেরি নিয়ে মত্ত, সম্রাটের অন্তর্জগতে তখন আগুনরূপা মেয়েটি নগ্ন হয়ে নৃত্যু করে। মেয়েটিকে যক্ষ্মেরধনের মতো আগলে বেড়ায় যে ছেলেটি, ওর মাথায় একটা গুলি ঢুকিয়ে শুইয়ে দিয়ে কতবার যে মেয়েটিকে ছিনতাই করে! কিন্তু দুর্ভাগ্য, ছিনতাইয়ের পরেই স্বপ্নটা ভেঙে যায়!

এখন নিভন্ত দুপুর। ভুলেই গেছিল সম্রাট- মোবাইলের সাউন্ড অফ করে শুয়েছে। তড়িঘড়ি করে মোবাইল হাতে নিয়ে তাজ্জব- এই দুই ঘণ্টায় মিসকল ২৫টি। প্রিন্সেরই ২১টি। চারটায় বের হওয়ার কথা ছিল। পার্টির সভাপতি ক্যাম্পাসে নেই, সেক্রেটারির সঙ্গে একপাক দেখা করে বিকেলটা আজিজ মার্কেটের দিকে কাটিয়ে রাতে শান্ত নিরীহ ছেলের মতো রুমে ফেরার ইচ্ছা। কিন্তু ইচ্ছাটা শেষ পর্যন্ত টেকে কিনা কে জানে? প্রিন্স, ডন, বিপ্লব শালারা তো এই দিন আসলে পাগলা পারভার্ট কুকুরের মতো ক্ষ্যাপা হয়ে ওঠে। মদ-মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তির নাম দিয়েছে মিষ্টিমুখ। প্রকাশ্যে বলে বেড়ায়- বছরের প্রথম দিন মিষ্টিমুখ না করলে নাকি বছরটাই মাটি। ধনুকভাঙা পণ করে বসে আছে সম্রাট, মিষ্টিমুখ যদি করতে হয় আগুনরূপা মেয়েটি দিয়েই করবে। কিছুতেই পথ পাচ্ছে না। এই অপ্রাপ্তি জন্য যে পরিমাণ হিংস্রতা আর উন্মত্ততা তৈরি হবার কথা, তা হয়নি বলে চরম বিরক্তি নিজের ওপরে। ফের প্রিন্সের কল, শালা, তুই মরেছিস নাকি, এতোবার কল দিয়ে যাচ্ছি লা-জবাব। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমরা আসছি তোর রুমে।

ভেড়ানো দরজা ঠেলে রুমে ঢুকেই প্রিন্স চেঁচিয়ে ওঠে, ও শালা! তুই এই বেলা ঘুমাচ্ছিস? তোর বিরহের দিন বে! তোর আগুনপরী তো কাল আসবে- হুলো বিড়ালের মতো জিভ চাটবি আর পেছনে পেছনে ঘুরবি। ওদিকে আর একজন ঠিকই টার্গেট করে ফেলেছে। সম্রাটহুড়মুড়িয়ে উঠে বসে, টার্গেট করে ফেলেছে? আমার মিষ্টিমুখ হলো না…। বগলের ভেতর থেকে ছোট্ট একটি বোতল টেবিলে উপরে রাখল ডন। রিভলবারটা পকেট ভারী করে রেখেছে সকাল থেকে, পকেট থেকে বিরক্তির জিনিসটি বের করে বিছানার নিচে রেখে বসতে বসতে বিপ্লব বলে, এখনো সময় আছে। বাজেট দে। কালই মুরগি জবাই করি। তোর মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা করি। এরপরের বছর দেখবি তোর আগুনপরী কোলে বাচ্চা নিয়ে ঘুরছে টিএসসিতে। এতোটা ধৈর্য ডনের নেই, সোজাসাপ্টা কথা বলে-এবারের মিষ্টিমুখ তোর আগুনপরীকে দিয়েই হবে। শালী ফড়িং-এর মতো উড়ে বেড়ায়। আমাদের পাত্তাই দেয় না। প্রতিবছর ফাঁদ পাতি, শালীর ঘুঘু ফাঁদে পা দেয় না। ঠিকই ফসকে যায়। প্রিন্স সম্রাটের নিবুর্দ্ধিতাকে দায়ী করে বলে, তোর নেকামী আর নিবুর্দ্ধিতার কারণে… । গতবার তোর আগুনপরীর আশায় থেকে মিষ্টিমুখ বানচাল হবার দশা, ভাগ্যিস একটা জুটেছিল ডনের কল্যাণে। ডন বলে, এবার আমার হাতখালি। এবার আর তোর বাঁধা মানছি না। তুই মাল খেয়ে শুয়ে থাকবি রুমে। মুরগি জবাই হয়ে গেলে, আমাদের মিষ্টিমুখ হয়ে গেলে, তারপর ডাক পড়বে তোর।

সম্রাটহঠাৎ ভাবিত। আগুনরূপা মেয়েটির শরীরে ওদের নখরাঘাত পড়বে, একথা ভাবতেই শরীর কেমন কেঁপে ওঠে। ওরা তো শকুন-মেয়েটির শরীর ছিঁড়ে মাংস চিবাবে নির্ঘাত। সম্রাটকে চিন্তিত দেখে বিপ্লব বলে, মেয়েটার জন্য তোর এতো কিসের টান! প্রতিবার টার্গেট করি, প্রতিবার হাত-পা ধরিস। বস্তুত, সম্রাটের এই প্রবল বাঁধার কারণেই মেয়েটির প্রতি ডন-বিপ্লবের এতো তীব্র আকর্ষণ। ওদের ভাষ্যে, এই মেয়ের মতো সুন্দরী মেয়ে হাপিস করেছে। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নেবার জন্যে সম্রাট বলে, মাস্টার্স পরীক্ষা নাকি আগামী মাসেই? প্রিন্স লাফিয়ে ওঠে, প্রসঙ্গ পাল্টানোর কৌশল ধরে ফেলে, ওসব বাদ দে। মাস্টার্স পরীক্ষা তাতে আমাদের কী? আমি তো এবার ইয়ার ড্রপ দিচ্ছি। সম্রাট চমকে ওঠে, ইয়ারড্রপ দিচ্ছিস! ওদের মধ্যে ডন এক ইয়ার ড্রপ দেবার অভিজ্ঞতা থেকে বলে, চমকে উঠলি যে! আমি আবারও ইয়ার ড্রপ দেবো। পলিটিক্স করবি, এমপি, মন্ত্রী হবি, মাল কামাবি, বাছা বাছা মেয়েমানুষ নিয়ে শুবি, আর ইয়ার ড্রপ দিবি না, তাই কি হয়? একটা মেয়েমানুষের কথা ভেবে মাস্টারবেট করবা আর হা-পিত্যেশ করবা, এসব ন্যাকামো ছাড়ো পাগলু। এখনো সময় আছে লাইনে আসো। সম্রাট অসহায়ভাবে বলে, তোরা জানিস না। বাবা শুনলে হার্ট ফেইল করবে। প্রিন্স মহাবিরক্তি নিয়ে বলে, ঐ ঘটনাটা ঘটলেই তোর মুক্তি। সারাজীবন স্কুলে মাস্টারি করে স্কুলের বাচ্চাদের মতোই হার্ট তোর বাবার। ছেলেকে নিয়ে বড়ো কিছু ভাবতে পারে না। আরে, তোর ছেলে এমপি-মন্ত্রী হবে, তুই ব্যাটা বাহাদুরি করে বেড়াবি, তা না, চাকরি চাকরি করে হেদিয়ে মরল। সম্রাট বলে, কিন্তু আমরা কি সে রকম লিডার হতে পেরেছি। সভাপতি, সেক্রেটারি এসব হতে পারলে না…। ডন চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েছিল, সম্রাটের কথার প্রত্যুত্তর দেবার জন্যে ওঠে বসতে চেষ্টা করে, আঁটোসাটো জিন্সের প্যান্টের কারণে স্বাচ্ছন্দ্যে বসতে পারে না, কোমরের বেল্ট খুলে ফেলেছে, ভুড়িটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ায় গর্ভবর্তী শূকরীর পেটের মতো দেখাচ্ছে। এমনিতে যথেষ্ট কালো, এর উপরে কালো রঙের চাপা টি-শার্ট পড়ার কারণে বিকট কালো লাগছে। দু-হাতে ভুঁড়ি নাচিয়ে কথা বলে, তুই দেখছি, পলিটিক্সের প-ও শিখিস নি! ছাত্রজীবনে দ্বিতীয়-তৃতীয় সারির নেতারাই এলাকায় গিয়ে সাইন করে। এখানে তো খালি শিখবি। ডনের কথার সমর্থন দিয়ে বিপ্লব বলে, আমাদের এলাকার এমপি সরকারি কলেজের পাতি নেতা ছিল, এখন ওর কাছে কেউ পাত্তা পায় না। সাহসটাই আসল ব্যাপার। প্রিন্স এতোক্ষণ একাগ্রমনে সিগারেট ফুঁকছিল, আর ধোঁয়া উড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল। তীব্র বিদ্রƒপের সুরে বলে, কালকেই সম্রাটের সাহসের পরীক্ষা হবে। ডন-বিপ্লব চেঁচিয়ে ওঠে একসঙ্গে, শালা কালই তোর পরীক্ষা…

সম্রাটের জন্য এ এক কঠিন পরীক্ষাই বটে। ওদের সর্বগ্রাসী রাক্ষসমূর্তি দেখেছে- আগুনরূপা মেয়েটিকে যে কোনমূল্যে…। মেয়েটির প্রেমিক আছে- গুলি চালানো থেকে খুন-খারাবি ওদের জন্য ডালভাত। ওরা গুলি চালিয়ে অভ্যস্ত, ডনের কাছে গুলি চালানো ঝালমুড়ি মাখানোর মতো সহজ একটি কাজ। স্কুলশিক্ষক বাবার ছেলে হবার কারণেই কি না, মেয়েমানুষ আর গুলি এই দুটি জিনিসেই সম্রাটের হাত-বুক কাঁপে। পার্টির দেওয়া রিভলবার জংধরে মরিচা পড়ার জো- কোন কাজেই লাগাতে পারে না। পার্টির দ্বি-বাষিক সম্মেলনে সময় বৃষ্টির মতো তুমুল গুলি ছোঁড়াছুড়ি দিনেও সম্রাটের রিভলবার থেকে একটি গুলি বের হয়নি! ভয় একটিই, যদি নিরীহ কোন ছাত্র-ছাত্রীর শরীরে বিঁধে। ঐদিনই ডনের পিস্তলের গুলিতে এক নিরীহ রিক্সাচালকের প্রাণ গেল। ডনের কোন অনুশোচনা নেই-বলে, গ-গোলের মধ্যে মরার জন্য এসেছিল কেন? প্রতি মাসে একবার, কোন মাসে দু-বার তিনবার সম্রাটকে সামনে বসিয়ে মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করে, সম্রাটতাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, কিন্তু মেয়েমানুষের শরীরের হাত দেবার সাহস হয় না। ওদের জোরাজুরিতে দু-একবার চেষ্টা করেছিল বটে, ভয়ে তখন শরীরে ম্যালেরিয়ার কাঁপুনি শুরু হয়, লিঙ্গের উত্থান তো দূরের কথা শুকনো খড়ের মতো শুকিয়ে চিমটে লেগে থাকে। রুমে ফিরে মাস্টারবেট করলে তবে মুক্তি।

কাল আগুনরূপা মেয়েটিকে নিয়ে যা কিছু ঘটবে, তার সম্পূর্ণ দায় আমার, সম্রাটের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। ভাবে- মেয়েটিকে আবিষ্কার করেছি আমি, তিন বৈশাখ ধরে তাড়া করে ফিরছি, যথেষ্ট উত্যক্তও করেছি, গতবছর টিএসসির ভিড়ের মধ্যে হাত ধরে ফেলেছিল বিপ্লব। সম্রাটপেছনে ছিল বলেই রক্ষা। মেয়েটা আগুনচোখে তাকিয়েছিল, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে কে ওর হাত ধরেছে ঠাহর করতে পারেনি।

কী পরিকল্পনা এঁটেছিস তোরা? তোরা কি আর মেয়েমানুষ দেখিছ না চোখে? সম্রাটের কণ্ঠস্বর বিপন্ন মানুষের মতো শোনায়। ওরা তিনজন একসঙ্গে অট্টহাসি দিয়ে লাফিয়ে ওঠে। অট্টহাসির বিকট ভয়াবহ শব্দ সম্রাটের করোটিতে প্রবেশ করে, অসহ্য মাথাব্যাথা রোগীর মতো দুই হাতে মাথা চেপে ধরে প্রচ- জোরে চিৎকার করে, চুপ কর তোরা, তোদের এই শয়তানি হাসি আমার ভালো লাগছে না। তোরা যা ইচ্ছা তাই কর গিয়ে, আমি নেই তোদের সাথে। সম্রাটকে দুইদিক থেকে জাপটে ধরে ডন-বিপ্লব, মুখ চেপে ধরে প্রিন্স, শালা খাসি! এভাবে চিৎকার করছিস কেন? হলের ছাত্ররা যদি ছুটে আসে। সম্পূর্ণ অজান্তে ভেতর থেকে বেরিয়া পড়া চিৎকারটি যে এতো বিকট হবে, ভাবতে পারে নি সম্রাট। বাইরে থেকে কেউ ছুটে এলে বিপত্তি তো বটেই। চারজনই এখন নীরব। নীরবতারও নিজস্ব শব্দ আছে। সেই শব্দটিই উপভোগ করে তারা। ছোট্ট একটি বিছানায় চারটি শরীর পড়ে আছে চতুর্ভুজ আকৃতি হয়ে। নীরবতা উপভোগ অসহ্য হয়ে ওঠে ডনের, বিপ্লবের শরীরে লাথি মারে জাগিয়ে তোলার জন্য, ও শালা খাসির সঙ্গে তোরাও খাসি হলি নাকি? সেক্রেটারির সাথে দেখা করার কথা ছিল মনে আছে?

ওরা ভাবতে পারেনি, রাত ১২টা পর্যন্ত বন্দি থাকবে সেক্রেটারির রুমে। উঠার জন্য পর্যাপ্ত বিরক্তি প্রকাশ করেও লাভ হয়নি। সেক্রেটারির নজর এড়ায়নি। পার্টির তরফে বিশেষ কোন প্রোগ্রাম নেই। নিজের ইচ্ছেমতো বর্ষবরণের দিনটা উপভোগ করবে কর্মীরা। প্রত্যেকের নামে বাজেট আছে, একটি পাঞ্জাবি অথবা টি-শার্ট বরাদ্দ আর্মসধারী কর্মীদের জন্য। এই পাঞ্জাবি-টি-শার্ট কিনে আনতে দেরি হওয়ায় এতো রাত হয়ে গেল। রুমে ফেরার পথে দু-বোতল ব্রান্ডি কিনে নিল, কিন্তু মশকিল হলো- পোড়ামাংস কোথায় পাবে এতো রাতে? মাংস ছাড়া জমবে না। সম্রাটবলে, মাল খেয়েই থাকতে হবে, রাতের খাবার-টাবার খেতে হবে না। ডন রাগে ফুঁসছে, সামান্য একটা টি-শার্ট আর মাত্র দুই হাজার টাকার জন্য এতো হুজ্জুতি! স¤্রাটকে পারলে এখানেই শুইয়ে ফেলে, শালা, তুই আছিস রাতের খাবার নিয়ে, এদিকে পরিকল্পনা যে সব মাটি হয়ে গেল। রাতে মাল খেয়ে থাকবি, না পারলে আমার ইয়েটা চিবোবি।

ওরা ফিরে এলো সম্রাটের রুমে। আর্মসধারী কর্মীর রুম- রুমের জানালা কখনোই খোলা হয় না বিশেষ সতর্কতার অংশ হিসেবে। দরজা কখনো হাট করে খোলা থাকে না। এইসব রুমে প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত- পার্টির নির্দিষ্ট কিছু কর্মী ছাড়া সাধারণের ঢোকার জো নেই। সপ্তাহে একদিন ঝাড়–দার ডেকে এনে নিজে উপস্থিত থেকে রুম পরিস্কার করিয়ে নেয় সম্রাট। প্রিন্স-ডনরা ওদের রুম ছেড়ে এই রুমটাকে নিরাপদ মনে করে। পার্টির রুম- পার্টির ছেলেদের আড্ডা দেবার জন্যেই। উপদ্রব ছাড়া একটি রাতও নিরিবিলি কাটিয়েছে বলে মনে পড়ে না সম্রাটের। কিছুটা নিরীহটাইপের চেহারা আর ভদ্রছেলের মতো চলাফেরা করে বলে সম্রাটের উপরে উৎপাতটা একটু বেশি। এই রুমের একটা চাবি জয়েন সেক্রেটারি জাহিদের কাছে। মাঝেমধ্যেই বোতল বোগলদাবা করে চলে আসে, নিজের ইচ্ছেমতো সময় কাটিয়ে যখন চলে যায়, তখন রুমের চেহারা হয় বোতলবাজ জাহিদের মুখের মতোই এবড়োথেবড়ো। ওরা চলে গেলে এই ফাঁকে জাহিদ এসেছিল এর প্রমাণ বিছানার উপরে পড়ে থাকা বোতলটি। অন্যদিন সম্রাটবিষয়টিকে আমলে না নিলেও আজ কেন জানি অসহ্য ঠেকে, গালি দিতে ইচ্ছে করে, কিন্তু গালি দেবার জন্য যে উদ্যম থাকা দরকার এই মুহূর্তে শরীরে নেই, শরীর ভেঙে পড়েছে। বোতল দু-টা টেবিলে রাখতে রাখতে বিপ্লব বলে, সম্রাটের রুমে আসাটাই ভুল হয়ে গেল। ও শালার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখ, ইঁদুরের চোখের মতো হয়ে গেছে। প্রিন্স শার্ট-প্যান্ট খুলতে খুলতে বলে, এতো ঘুম তোর চোখে আসে কোথা থেকে? আমার চোখে তো ঘুম-ই নেই। একে একে চারজনই টি-শার্ট, প্যান্ট খুলে ফেলে- পরণে শুধু একটি শর্ট টাইপ আন্ডারওয়ার।

রাতের আড্ডা জমেনি। পোড়ামাংস নেই, নেশা হয়নি। বিরক্তি আর অস্বস্তি নিয়ে রাত ২টা পর্যন্ত কাটিয়ে প্রথমে প্রিন্স, তারপর ওরা দু-জন ঘুমিয়ে পড়ে। ছোট্ট একটা চৌকিতে তিনটা শরীরই জুলুম, ফ্লোরে পেপার বিছিয়ে শুয়ে পড়ে সম্রাট। মহিষের মতো শরীর ডনের। ভয়ঙ্কর শব্দ করে নাক ডাকে। এই নাকডাকার অত্যাচারে বরাবরই ঘুম হয় না সম্রাটের, শালার নাকের ভিতরে যেন মেশিনগান সেট করা! বিকেলের পর থেকে একবারও আগুনরূপা মেয়েটির প্রসঙ্গ ওঠেনি। এই স্বস্তি নিয়ে ঘুমানোর কথা ভাবতেই পারে। কিন্তু ঘুম নেই চোখে এখন। চোখ জুড়ে আগুনরূপা মেয়েটি-পরনে সেই লালপেড়ে শাড়ি, খোঁপায় লাল গোলাপ, হাতে একগাছা কাঁচের লালচুড়ি, কপালে লাল টিপ। পাখা নেই, তবু ফড়িং-এর মতো ওড়ে। ওদের প্রবল আকর্ষণই সম্রাটের মনে মেয়েটির আসন পাকাপোক্ত করে দিল। মেয়েটির মধ্যে আশ্চর্য জাদু লুকিয়ে আছে। নিজেকে রক্ষা করে এই জাদুর জোরেই। কিন্তু প্রিন্স-ডন-বিপ্লবরা তো পাষ- পামর, হিংস্র হায়েনারও অধম, ওরা জাল ফেললে, সেই জাল ছিঁড়ে বের হওয়া কঠিনসাধ্য। শালাদের চোখে হিজড়া পর্যন্ত ধরে। থার্টিফাস্ট নাইটে টিএসসিতে এক হিজড়াকে নিয়ে সে কি টানাহেঁচড়া। সম্রাটবাঁধা দেবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ওরা কি তাই শোনে। সিসিটিভির ফুটেজে সেই দৃশ্য ধরা পড়লে সে কী মহা-কেলেংকারী। কপাল ভালো, ছবিগুলো খুব বেশি স্পষ্ট ছিল না। অস্বীকার করে পার পাওয়া গেছে। কাল যদি মেয়েটি টিএসসিতে আসে, এবং প্রতিবারের ধারাবাহিকতায় আসাটাই স্বাভাবিক- ওরা যদি ফাঁদ পাতে, সেই ফাঁদে যেন মেয়েটা না পড়ে সেই চেষ্টা করবে সম্রাট। মেয়েটিকে অথবা তার প্রেমিককে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যদি বশে আনার চেষ্টা করে, ব্যর্থ হয়ে হিজড়াটার মতো ভিড়ের মধ্যে টানাহেঁচড়া করে, সম্রাটবাধা দেবে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে, একান্তই না পারলে যে রিভলবার এতোদিন কোন কাজেই লাগাতে পারেনি, কাল লাগাবে। এসব ভাবনার কোন ফাঁকে মা, বাবা, ছোটবোন রুনা এসে ভিড় জমালো এবং হঠাৎ করেই মনে হলো, পহেলা বৈশাখ বাবা-মার বিবাহবার্ষিকী। এবার কততম বিবাহবার্ষিকী মনে করার চেষ্টা করে। এই দিনটা পালন করে ঘরোয়া আয়োজনে। বাহির থেকে কিছুই কিনতে দেয় না। মা নিজের হাতে পিঠা বানায়। সেই পিঠা তুলে রাখে ছেলের জন্য। ছেলে ফিরলে পিঠাগুলোই খেতে দেবে প্রথমে। এই বছরেই রুনা এইচএসসি দেবে, ডাক্তারি পড়ার টার্গেট নিয়ে বেচারির এখন কঠিন তপস্যা। ওর স্বপ্ন, বাবার স্বপ্ন, মার স্বপ্ন একটাই—আমি চাকরি করব, মাসে মাসে বোনকে ডাক্তারি পড়ার খরচ জোগাবো। বাবার স্কুলের চাকরিটা আর বেশিদিন নেই, বছর দেড়েক। সংসারের হালটা কে ধরবে? আর এদিকে দেখো, ওরা আমার মধ্যে এমপি-মন্ত্রী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আবিষ্কার করে সেই পথে টানার জন্যে মরিয়া। স্কুল মাস্টারে ছেলে মন্ত্রী-এমপি! হতেই তো পারি। বারাক ওবামা যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারে, আমি তো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই হতে পারি। বিদ্রুপের হাসি ফোটে সম্রাটের ঠোঁটে। নিজের সঙ্গে বিদ্রুপে মেতে ওঠে।

মোবাইল বেজে উঠলে লাফিয়ে ওঠে সম্রাট, শুভ নববর্ষ, ভাইয়া।

ঘুমকাতুরে কণ্ঠে সম্রাট শুভ নববর্ষ জানিয়ে বলে, রুনা, তুই এতো সকালে ঘুম থেকে উঠেছিস? নাকি রাতে ঘুমাসনি, সারারাত পড়েছিস?

আমি অনেক সকালে উঠেছি, তুই ঘুমাচ্ছিস বলে ডাকিনি। এই যে মার সাথে কথা বল।

শুভ নববর্ষ, বাবা।

শুভ নববর্ষ, মা। তুমি নিশ্চয় সকালেই পিঠা বানাতে লেগে গেছো?

মা হেসে ওঠে। দিন পনেরোর মধ্যে অবশ্যই বাড়ি আসবি।

মার হাত থেকে প্রায় ছিনতাই করে মোবাইল নিয়ে রুনা বলে, ভাইয়া, তুই কী রে! আজ পহেলা বৈশাখ, মা-বাবার…

ওদের ঘুমের ডিস্টার্ব হবে বলে এতোক্ষণ চাপাকণ্ঠে কথা বলছিল সম্রাট, এবার লাফিয়ে ওঠে, সরি বোন, সরি, মা-কে দে মোবাইলটা।

সম্রাটের বুক কেঁপে ওঠে এবং যেন মাছের কাঁটা আটকে আছে কণ্ঠনালীতে এমনভাবে উচ্চারণ করে, মা, হ্যাপি ম্যারেজ ডে।

মা কিছুটা লাজুক কণ্ঠে বলে, ধন্যবাদ।

বাবা উঠেছে কি?

রুনার হাতে মোবাইল দিয়ে মা বলে, তোর বাবার কাছে দে।

বাবা, শুভ নববর্ষ।

ছেলেকেই প্রথম নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাবে, মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল, কিন্তু এতো সকালে রুনা শুভেচ্ছা বিনিময় করল যে, ছেলেই আগে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। বাবাকে ছেলে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, এই বছরটা দারুণ কাটবে, এই আনন্দে উদ্বেলিত বাবার মন। শুভ নববর্ষ বাবা।

বাবা, হ্যাপি ম্যারেজ ডে। সম্রাটের নিশ্বাস প্রায় রুদ্ধ হবার উপক্রম।

বাবার মন ভীষণ উচ্ছ্বসিত। সেই উচ্ছ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করে ছোট্ট করে বলে, ধন্যবাদ। প্রতিবছর এই রুটিন কথাগুলো বলে বাবা : বেশি ভিড়ের মধ্যে যেও না। রোদের মধ্যে সারাদিন ঘুরে বেড়িও না।

ঘুম ভেঙে যাওয়ার ক্রোধে প্রথমে ডন, অতঃপর বিপ্লব, প্রিন্স তিনজনেই এমনভাবে হাত-পা ছোড়ে যেন ওদের গলায় ছুরি ধরেছে জবাই করার জন্যে। ঘুমের ঘোরেই প্রিন্স বলে, তোর মা-বাপ-বোনরা কি এখনই মরে যাবে নাকি রে! কথা বলার আর টাইম পাইলি না?

বাবা রাখছি, মোবাইল কেটে দিল সম্রাট। রেগে আগুন, তোরা তো বন-বাঁদাড়ে জন্মেছিস! কোনদিন দেখলাম না মা-বাবার সাথে কথা বলেছিস। একদিনও দেখলাম না, ওরা তোদের দেখতে ঢাকায় এসেছে। শিয়াল-কুকুরের বাচ্চার মতো জন্ম দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।

সম্রাটভেবেছিল, ওরা এখন ওকে খুন করবে। মা-বাবা তুলে এভাবে কথা বললে কোন ছেলে সহ্য করে, কিন্তু ওদের কোন প্রতিক্রিয়াই নেই। ডন নাক ডাকছে পূর্ববৎ। প্রিন্সের শরীরের অর্ধেকটা বিছানায়, অর্ধেকটা বাইরে। পা নড়ছে, অর্থাৎ জেগেই আছে। বিপ্লব লাফ পারছে পুঁটিমাছের মতো।

ঘুম থেকে উঠতে সকাল ৯টা বাজে। হল খাঁ খাঁ করছে। নববর্ষের এই দিনে কে আর থাকবে। তাই, ওদের ইচ্ছেমতো গোসল করে। বুকে দোতারা আঁকানো নতুন টি-শার্ট, প্যান্ট পরে, নিজ নিজ রিভলবার নিরাপদে সেট করে, যখন রুম থেকে বের হবে, ঠিক তখনি সম্রাটবেঁকে বসে, পাংশু মুখে জিজ্ঞেস করে, তোরা এখর কোথায় যাচ্ছিস? প্রিন্স ঘাড়ে হাত দিয়ে বলে, কোথাও যাচ্ছি চান্দু। তারপর গান ধরে, আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম…। তোরা কি ঐ মেয়েটার…? বিপ্লব ভীষণ বিরক্ত, ঐ তুই কি শুরু করেছিস? একটা খেলার জিনিস নিয়ে মাতামাতি! প্রেমে পড়েছিস নাকি? বল মুখ ফুটে, তুলে এনে বিয়ে দেবো আজি। ডন তেড়ে ওঠে, কিসের প্রেম? ভেজা বেড়াল সেজে থাকলে কি হবে, ও শালার মতলব খারাপ, একাই মিষ্টিমুখ করার ধান্ধা। তিনজনের আক্রমণের মুখে অসহায় সম্রাট যে মেয়েটিকে চেনে না, চোখের নেশায় ধরেছে কেবল, সেই মেয়েটির জন্য বন্ধুত্ব, পার্টিতে নিজের অবস্থান খোয়াবে কেন? ওদের হাতে অস্ত্র আছে, এতো অনুরোধ, তোষামদ, অপেক্ষা কি ওদের মানায়? ওরা তিনজনই সেক্রেটারির স্পেশাল ব্রাে র কর্মী, ওদের জন্যই সম্রাটের হাতে অস্ত্র, পার্টির অবস্থান, হলে আলাদা একটা রুম, খরচ চালানোর টাকা, এতোটা অকৃতজ্ঞ হয় কী করে? এছাড়া সম্রাটের মতো বন্ধুকে খরচ করে ফেলতে ওদের জন্য কঠিন কিছু নয়। ওর চোখের সামনে পার্টির এক ছেলেকে হলের ছাদ থেকে ফুটবলের মতো লাথি মেরে ফেলে দিয়েছিল বিপ্লব। সেই ছেলে তো আর বাঁচলই না।

এই মুহূর্তে সম্রাটের আর কিছুই করণীয় নেই। এখন একটিই প্রার্থনা—মেয়েটি যদি আজ ক্যাম্পাসেই না আসতো, তাহলে বেঁচে যেতো। এ পর্যন্ত যে কয়বার দেখেছে, প্রতিবার টিএসসিতেই দেখেছে। তাই টিএসসিতে পা ফেলেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে সম্রাট। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। মেয়েটিকে আবিষ্কার করে ফেলে বিপ্লব। ভিড়ের মধ্যে একা একখ- জায়গা দখল করে স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। সেই ফড়িং-স্বভাব, চাঞ্চল্য কিছুই নেই। গম্ভীর মুখ, উদাসভাবে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবছে। পরনে শুধু সেই লাল পেড়ে শাড়িটাই আছে। এছাড়া কপালে লাল টিপ নেই, মাথার খোপায় নেই লাল গোলাপ, হাত খালি। তবু মেয়েটির আগুনরূপ ঠিকরে পড়ছে।

ডন, বিপ্লব, প্রিন্স দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনজনের মাথা এক হয়ে গেল। কিছু একটা শলাপরামর্শ চলছে। সামান্য দূরে কিছু পুলিশ বুকটান করে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সামনে দিয়ে গমণরত বাদাম বিক্রেতা ছেলেটির ডালা থেকে একমুঠ বাদাম তুলে নিল একজন। ছেলেটি আগুনরূপা মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে বাদাম কেনার অজুহাত হাত ছাড়া করা যায় না বলে ছুটে গেল সম্রাট। এই বাদাম দে ১০ টাকার, অর্ডার করেই মেয়েটির মুখের দিকে নয়, চোখ পড়ে পেটের দিকে—জয়ঢাকের মতো পেট কোনমতে লালপেড়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢেকে রেখেছে। সম্রাটঅ্যা করে পেছনে হঠলে ছেলেটির হাত কেঁপে ওঠে, পাল্লা থেকে বাদাম ছিটকে পড়ে। মেয়েটি অবশ্য খেয়াল করেনি। বিশেষ একটা ঘোরের মধ্যে আছে। নিজের শরীরের ভার যে এই মুহূর্তে তার কাছে হিমালয় বহন করার মতো কষ্টের। সম্রাট পিঠ ফেরাতেই বিপ্লব গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটির সামনে। সিগারেট ধরিয়ে ভিড়ের মধ্যে টানতে শুরু করলে একজন মধ্যবয়সী লোক বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, এই ভিড়ের মধ্যে সিগারেট ধরালেন? কিন্তু বিপ্লবের মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলার সাহস পায়নি। মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে দাঁড়ায়নি এমন একটি অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তোলে বিপ্লব। সম্রাটফিরে এসে দেখে, ডন একাই দাঁড়িয়ে আছে অগ্নিমূর্তি নিয়ে। প্রিন্স পুলিশের সাথে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করে ফিরছে। প্রিন্স-ডন চোখ লাল করে তাকাল সম্রাটের দিকে। মুরগির কাছে তুই আগে গিয়েছিলি কেন? তোর কোন বিশ্বাস নেই। সাবধান করে দিতে পারিস। মেয়েটি গর্ভবর্তী, তোরা এতোটা পাষ- হতে পারিস না। স¤্র্টা বলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনি পেছন থেকে বিপ্লব আসে, মুরগির পেটে বাচ্চা রে! টু ইন ওয়ান। কামদ উষ্ণতায় টনটনে ডন ছটফট করে ওঠে, শালার বেল্টুটা গাড়ি নিয়ে এখনো এলো না। ওর কোন কা-জ্ঞান আছে? মুরগি এখন হাতের কাছে, কোন ফাঁকে উড়াল দেয় কে জানে? ওর হাজব্যান্ডকেও দেখছি না আশেপাশে। এই ফাঁকে তুলে নিলে কেউ হৈচৈ করবে না। কেউ এগিয়ে আসতে চাইলে দু-একটা গুলি খরচ করলেই চলবে। গাড়ির কথা শুনে সম্রাটআঁতকে ওঠে, ওরা ভিতরে ভিতরে এতোটা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে! বেল্টু এসে দাঁড়াতেই ডন বলে, গাড়ি কোথায় রেখেছিস? ওসব এনেছিস? হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল কালো গ্লাসের গাড়িটা। বেল্টু গাড়ির দিকে চলে গেল।

আরও পড়ুন: আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

ডানে ডন, বায়ে বিপ্লব, মধ্যে প্রিন্স, তিনজন হাত ধরাধরি করে এগোয় মেয়েটির দিকে। বিপ্লব সম্রাটের হাত ধরতে গেলে, ও ধরতে দেয় নি। ওরা তিনজন মেয়েটির কাছে পৌঁছবে, ঠিক তখনি মেয়েটির স্বামী এসে দাঁড়াল সামনে। মেয়েটির ক্লান্ত অবসাদগ্রস্ত শরীর টেনে পা হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে রাস্তার দিকে সেই কালো গাড়িটার দিকে এগোতে থাকলে, প্রিন্সরা শুধু পিছু নিল। যেই না মেয়েটি গাড়িটিকে অতিক্রম করে যাচ্ছে, ঠিক তখনি প্রিন্স মেয়েটির খোঁপায় ধরে ফেলে খপ করে। মেয়েটির স্বামী হাত ধরে টান দিতে গেলে বিপ্লব তলপেট বরাবর লাথি মেরে ফেলে দিল। সাপ খেলা দেখার মতো লোকজন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল গাড়িটিকে ঘিরে। বিষাক্ত তিনটি সাপ যেন ফণা তুলে ছোবল মারছে ক্রমাগত মেয়েটির শরীরে, আর একটি বিষহীন সাপ নিকটে দাঁড়িয়ে মাতালের মতো মাথা দুলছে। উদ্ধারের জন্য কেউ এগিয়ে গেল না। একে একে সমস্ত কাপড় ছিঁড়েখুঁড়ে মেয়েটির শরীর উদোম করেও গাড়িতে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। ডন হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, শালির শরীরে এতো রস! দাঁড়া, আগে কায়দামতো নিয়ে নেই, শালির রস মেরে গুড় বানাবো। এরমধ্যে তিনটা ককটেল ফুটানো হয়েছে। নপুংস পুরুষের দিকে যে রূপ করুণা চোখে তাকায় যুবতী, মেয়েটি তার নিজের সম্ভ্রম রক্ষার লড়াইয়ের এক ফাঁকে সেই দৃষ্টিতে তাকাল গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে এবং মুখ থেকে একদলা থুথু ফেলল শব্দ করে।

রিভলবার হাত নিয়ে নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে আছে সম্রাট।

লেখক: চন্দন আনোয়ার, সভাপতি, বাংলা বিভাগ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Categories
মুক্তমত

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

শিক্ষা হচ্ছে সে শক্তি বা নিরন্তর প্রক্রিয়া পশুবৎ ব্যক্তির সুকুমার বৃত্তি, মুক্ত চিন্তা-চেতনা, মেধা-মনন ও মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটিয়ে ব্যক্তিকে জীবনযুদ্ধে উপযোগী,দক্ষ কর্মী, আত্মপ্রত্যয়ী, স্বাবলম্বী তথা মানবিক করে তোলে। শিক্ষা ছাড়া কোনো দেশ ও জাতির উন্নয়ন অগ্রগতি সম্ভব নয়। এই উপলব্ধি থেকেই বিশ্বের উন্নয়ন ও অগ্রগতির লক্ষ্যে ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে পৃথিবীর সব দেশ থেকে নিরক্ষরতা দূর করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে একটি প্রস্তাব গৃহীত হশ। ১৯৬৫ সালের ৮-১৯ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কোর উদ্যোগে ইরানের তেহরানে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালিত হয়। এই সম্মেলনে প্রতিবছর ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয়। সভায় পৃথিবীর সকল নাগরিককে নিরক্ষরতামুক্ত করার লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৬৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে সারাবিশ্বে সাক্ষরতা দিবস হিসাবে পালন শুরু হয়।

এক সময় সাক্ষরতা বলতে নিজের নাম লিখতে পারাকেই বুঝাত। কিন্তু বর্তমানে শুধু নাম লিখতে পারলেই হয় না। সাক্ষরতার জন্য আরও তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। একজন ব্যক্তি নিজ ভাষায় সহজ ও ছোট ছোট বাক্য পড়তে ও লিখতে পারা এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ হিসাব করতে পারা।

সুদীর্ঘ দুইশত বছর বৃটিশদের শোষণ নিপীড়ন এবং ২৩ বছর পাকিস্তানের বৈষম্যের ফলে বাংলাদেশ শিক্ষায় অনেক পিছিয়ে পড়ে। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭০ এর নির্বাচনে বলেছিলেন, শিক্ষার চেয়ে বড় কোনো বিনিয়োগ হতে পারে না। তিনি রাষ্ট্রীয় উৎপাদনের ৪ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় করার কথা বলেছিলেন।

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ এ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রীয় বাজেটেই শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের জন্য টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। সে সময় যুদ্ধ বিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যাংকে রিজার্ভ বলতে কিছুই ছিল না। গোডাউনে কোনো খাদ্য মজুত ছিল না, যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সম্পুর্ণ বিধ্বস্ত, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর হামলায় সারা বাংলাদেশ তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল সেই চরম প্রতিকূল অবস্হার মধ্যেই বঙ্গবন্ধু সেদিন শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তিনি ৩৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে এদেশে শিক্ষার ভীত রচনা করেছিলেন।

তিনি বিশ্বের উপযোগী একটি তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর সার্বজনীন আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছিলেন। সেজন্য তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সর্বজন গ্রহণযোগ্য শিক্ষক ডক্টর কুদরত ই খুদার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। পচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সেই শিক্ষানীতি আর আলোর মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন শুরু হয় ১৯৭২ সালে। শিক্ষার উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই গতি ব্যাহত হয়। যার ফলে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ হয়নি।

আমাদের দেশে ১৯১৮ সালে নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাক্ষরতা হার বৃদ্ধির প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ১৯৩৪ সালে খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ ও নবাব আব্দুল লতিফ প্রমুখ কতিপয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিবর্গের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র। ১৯৬০ সালে ভি-এইড কার্যক্রমের আওতায় বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ব্যুরো অব নন ফরমাল এডুকেশন’। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে ছয় থেকে দশ বছরের শিশুদের জন্য বিনামূল্যে মৌলিক শিক্ষা প্রদানের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর সরকার শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০১০ সালে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। ফলে দেশ স্বাধীনতা লাভের সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর পর জাতি একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি পায়। বর্তমান সরকার সাক্ষরতাসহ শিক্ষার হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের বই প্রদান, উপবৃত্তি, স্কুলে বিনামূল্যে খাবার সরবরাহসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করায় শিক্ষার হার বেড়েছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের সময় গত ১০ বছর সাক্ষরতা বৃদ্ধির হার উল্লেখ করার মতো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৩৫.৩, ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯.৮২ শতাংশে। গত ১০ বছরে বেড়ে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৭৪.৭০ শতাংশে। অর্থাৎ গত নয় বছরে বেড়েছে ১৪.৮৮ শতাংশ। তবে একথা সত্য বয়স্ক শিক্ষার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

শিক্ষার সঙ্গে সাক্ষরতা এবং সাক্ষরতার সঙ্গে একটি দেশের উন্নয়ণ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে এবং দেশের জনগণকে জনসম্পদে পরিণত করতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যে দেশ যত বেশি শিক্ষিত সে দেশ তত বেশি উন্নত। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্য, তথ্য-প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক বিশ্বের উপযোগী দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য প্রয়োজন সরকারের টেকসই যথাযথ উদ্যোগের পাশাপাশি সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা।

এবারের (২০২০ সালের) ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ২০২০’ এর প্রতিপাদ্য ‘কোভিড-১৯ সংকট : সাক্ষরতা শিক্ষায় পরিবর্তনশীল শিখন-শেখানো কৌশল এবং শিক্ষাবিদদের ভূমিকা’।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের হিসাবে দেশে গড় সাক্ষরতার হার ৭৩.৯০ শতাংশ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৪.৭০ শতাংশ। গত ১১ বছরে বাংলাদেশ সর্বক্ষেত্রে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তা বিশ্বব্যাপী সকলের দৃষ্টি কেড়েছে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হয়েছে। এ অবস্থায় এখনো প্রায় ২৫.৩০ শতাংশ মানুষ সাক্ষরবিহীন থাকা একবারেই বেমানান। তাছাড়া এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে অবশ্যই ১০০ ভাগ সাক্ষরতা অর্জন করতে হবে। অতিদ্রুত সকলকে সাক্ষরের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সরকারের পাশাপাশি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, সাধারণ সম্পাদক স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ এবং সচিব, শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট, শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

ভয়েস টিভি/এসএফ

Categories
মুক্তমত

অ্যান্টিবডি কিট থেকে পাটকল

ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল : বেশ অনেকদিন হলো আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছি। তারপরও আমার সহকর্মীরা- যারা একসময় প্রায় সবাই আমার ছাত্র-ছাত্রী ছিল, তাদের সাথে আমার যোগাযোগ আছে। আমি কারণে-অকারণে তাদের ফোন করি তারাও নিয়মিত আমার খোঁজ-খবর নেয়। আজকাল জুম-মিটিং নামে এক ধরনের কায়দা বের হয়েছে সেটা ব্যবহার করে যারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, যারা আমেরিকা-কানাডা অথবা ইউরোপে আছে কিংবা যে করোনা আক্রান্ত সন্দেহ করে আইসোলেশনে আছে, তাদের সবার সাথে একসঙ্গে গল্পগুজব করা যায়। একাধিকবার আমি সেভাবে তাদের সাথে রীতিমতো আড্ডা দিয়েছি। শেষবার তাদের সাথে কথা বলার সময় আমার একজন ছাত্রী আমাকে জানালো, “স্যার, ফেব্রুয়ারি মাসে আমার খুব বিচিত্র একটা অসুখ হয়েছিল, জ্বর, গায়ে ব্যথা, তার সাথে খুবই অদ্ভুত এক ধরনের কাশি। কাশতে কাশতে মনে হয় গলা থেকে রক্ত বের করে ফেলি কিন্তু একফোটা কফ নেই। সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হচ্ছে খাবারে বিন্দুমাত্র স্বাদ পাই না, যেটাই খাই সব এক রকম মনে হয়।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার একার? নাকি বাসার সবার?” সে বলল, “বাসার সবার। এটা আমার হাজব্যান্ড ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছিল, তারও হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ভুগেছেন আমার শাশুড়ি, তার নিউমোনিয়ার মতো হয়ে গিয়েছিল তাই হাসপাতালে নিতে হয়েছিল।” আমি নিঃশ্বাস বন্ধ করে জিজ্ঞেস করলাম, “জ্বর নিয়ে ডিপার্টমেন্টে গিয়েছিলে?” সে মাথা নেড়ে বলল, “গিয়েছি। কলিগদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে।” কলিগ বলতে যাদের বুঝিয়েছে তারাও জুম মিটিংয়ে আছে আমি তাদের কাছে জানতে চাইলাম, তাদের তখন শরীর খারাপ হয়েছিল কিনা। তারা সবাই বললো, তাদেরও জ্বর কাশি হয়েছিল কিন্তু সেটা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায়নি। বছরের এই সময় জ্বর-কাশি খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। বাংলাদেশে থাকবে আর সর্দি, জ্বর, কাশি হবে না সেটা তো হতে পারে না!

আমরা এখন যেসব উপসর্গকে করোনার ক্লাসিক উপসর্গ বলে জানি, আমার ছাত্রীর উপসর্গ তার সাথে হুবহু মিলে যায়। তাহলে আমরা কি সন্দেহ করতে পারি যে ফেব্রুয়ারি মাসের দিকে আমার সেই ছাত্রী এবং তার পরিবার করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল? বাড়াবাড়ি পর্যায়ে না গেলে করোনার উপসর্গ আর সাধারণ সর্দি-কাশি-ফ্লুয়ের উপসর্গের মাঝে বিশেষ পার্থক্য নেই। তারপরও এটাকে বিচ্ছিন্ন কাকতালীয় একটা ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে পারি না তার কারণ আমি অনেকের সাথে কথা বলে জেনেছি তারা জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারি মাসে করোনার উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছিল, তারা অবশ্যই সেটা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায়নি। আমি নিজেও জানুয়ারির শেষে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়েছিলাম, “শুকনো কাশি” বলে নূতন একটা অবস্থার সাথে তখন পরিচয় হয়েছিল। জ্বরটির বৈশিষ্ট্য ছিল এক ধরনের অবিশ্বাস্য ক্লান্তি। দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে মড়ার মতো ঘুমিয়েছি। সুস্থ হওয়ার পর এক পার্টিতে সবাই যখন মজা করে কাবাব খাচ্ছে আমি তখন ঘ্যান ঘ্যান করে যাচ্ছি, “এটা কী রেঁধেছে? বিস্বাদ! মুখে দেয়া যায় না।”

এখন সারা পৃথিবীর সবাই বলাবলি করছে ফেব্রুয়ারি মার্চ মাসে করোনার কথা জানাজানি হলেও এটা সম্ভবত ডিসেম্বর জানুয়ারি মাসে একবার “বিশ্বভ্রমণ” করে গেছে। ইতালি এবং স্পেনে বর্জ্য পানি পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে। আমাদের দেশে ফেব্রুয়ারি মাসে হাজার হাজার মানুষ বই মেলায় গিয়েছে, সামাজিক দূরত্বের বিপরীত শব্দ হতে পারে, “অসামাজিক দূরত্ব” কিংবা “সামাজিক নৈকট্য”। “অসামাজিক দূরত্ব” কথাটা জানি কেমন অশালীন শোনায়, “সামাজিক নৈকট্য” মনে হয় মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটা শব্দ! বইমেলায় হাজার হাজার মানুষ এই সামাজিক নৈকট্যের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। কাজেই এটা মোটেও অস্বাভাবিক নয় যে আনুষ্ঠানিকভাবে করোনার উপস্থিতি টের পাবার আগে আমাদের দেশে (কিংবা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে) করোনা একবার চক্কর দিয়ে অনেক মানুষকে তাদের অজান্তে আক্রান্ত করে গেছে।

ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা-সন্দেহ করা যায় কিন্তু যখন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেয়া হলো আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা মিলে করোনার অ্যান্টিবডি (এবং অ্যান্টিজেন) পরীক্ষার একটা কিট তৈরি করেছেন তখন প্রথমবার আমার মনে হলো আমাদের সন্দেহটা শুধুই সন্দেহ নাকি সত্যি সেটা প্রমাণ করার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি করোনার পরীক্ষা নয়, কিন্তু আগে করোনা হয়েছে কিনা তার একটা পরীক্ষা হতে পারে। আমি তখন থেকে আশায় বুকবেঁধে আছি যে এই কিটটি ব্যবহার করার জন্য উন্মুক্ত করা হবে তখন আমরা সবাই পরীক্ষা করে দেখবো আমাদের অজান্তেই কার কার একদফা করোনা হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা দেশে করোনার অবস্থা বোঝার জন্য এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা করার জন্য, এটার ব্যবহার অমূল্য সম্পদ হতে পারে।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সভাপতি ডা. জাফরুল্লাহর রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য পুরো প্রজেক্টটা ধরাশায়ী হয়ে যাবার আশঙ্কা ছিল, শুধু আমাদের প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের কারণে সেটা বেশ খানিকটা এগিয়েছে। তবে সবকিছু যত তাড়াতাড়ি অগ্রসর হওয়া উচিত ছিল এটা মোটেও ততো তাড়াতাড়ি অগ্রসর হচ্ছে না। আমরা সবাই এতদিনে জেনে গেছি যে এটা শতভাগ নিশ্চিত পরীক্ষা নয়, সেটা জেনেই আমরা এটা ব্যবহার করতে চাই, তারপরও কেন জানি এই কিটটি আমাদের হাতে দেয়া হচ্ছে না। আমরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে আছি। অনেক দেশেই কেউ চাইলেই এখন এই পরীক্ষাটা করতে পারে। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ আমাদের পাশের দেশ।

কলকাতায় পরীক্ষা করে শতকরা ১৪ জনের মাঝে করোনা অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে, যার অর্থ কলকাতার জনসংখ্যা দেড়কোটি ধরে হিসাব করলে শুধু সেখানেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা হয়ে যায় ২০ লক্ষ, অবিশ্বাস্য একটা সংখ্যা! এর মাঝে কি শুভংকরের ফাঁকি আছে নাকি কিছু একটা আমরা এখনো জানি না? আমাদের ঢাকা শহরে কত পাব?

আমি অবশ্য করোনার সংখ্যা নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করার জন্য লিখতে বসিনি, তার জন্য খাটি বিশেষজ্ঞরা আছেন। আমি একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে লিখতে বসেছি। যেদিন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. বিজন শীলের নেতৃত্বে এই কিটটি উদ্ভাবনের খবর পত্রিকায় বের হয়েছিল আমি স্বাভাবিকভাবেই খুব আনন্দিত হয়েছিলাম। ড. বিজন শীলকে নিয়ে গর্ব অনুভব করেছিলাম। অনলাইন খবরের কাগজে প্রত্যেকটা খবরের নিচে মন্তব্য লেখার ব্যবস্থা থাকে (কেন কে জানে! আমি কখনো সেগুলো পড়ার চেষ্টা করি না)।

ঘটনাক্রমে সেদিনের খবরের পেছনের সেই মন্তব্যে আমার চোখ পড়ে গেল, আমি হতবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম কোনো একজন পাঠক এই পুরো উদ্যোগটা নিয়ে কুৎসিত একটা মন্তব্য করে রেখেছে। এই দেশের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পত্রিকার কর্মকর্তারা খুবই উৎসাহ নিয়ে চমৎকার একটা খবরের পেছনে কুৎসিত একটা মন্তব্য জুড়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি, তারাও অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, ধরেই নিয়েছেন পাঠকেরা কুৎসিত কথা বলতে এবং শুনতে ভালোবাসে। আমি শুধু সম্ভ্রান্ত পত্রিকার অনুমোদিত একটা মন্তব্য দেখেই হতভম্ব হয়ে গেছি, আমাদের চোখের আড়ালে ফেসবুক নামের সেই অন্ধকার গলিতে অসংখ্য মানুষ কত রকম অশালীন কুৎসিত মন্তব্য না জানি করেছিল যেটা আমি চিন্তাও করতে পারি না।

এটাই শেষ নয়, কয়েকদিন আগে আমি খবরের কাগজে দেখেছি আমাদের দেশের একটি প্রতিষ্ঠান করোনার ভ্যাকসিন বের করা নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে। পশুর ওপর প্রাথমিক পরীক্ষা করে তারা ইতিবাচক ফল পেয়েছে। দেশের কেউ কিছু করলে স্বাভাবিকভাবেই আমি নিজের ভেতর অনুপ্রেরণা অনুভব করি, কাজেই এই খবরটা দেখেও আমি খুশি হয়েছি। সারা পৃথিবীর অনেক নাম না জানা প্রতিষ্ঠান, অনেক ছোট বড় বিশ্ববিদ্যালয় করোনার ভ্যাকসিন তৈরি নিয়ে কাজ করছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ওয়েবসাইটে তার সুদীর্ঘ তালিকা রয়েছে।

আমাদের দেশের কোনো গবেষণাগারে, বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন এই নিয়ে গবেষণার কোনো খবর নেই সেটা আমি নিজেই কয়েকদিন থেকে চিন্তা করছিলাম। কাজেই খবরটা দেখে আমি খুশি হয়েছিলাম তবে বিস্ময়ের কথা হচ্ছে আমি খবর পেয়েছি এই গবেষক টিমের নেতৃত্বে যিনি আছেন- আসিফ মাহমুদ, তাকে নাকি ফেসবুকে তুলোধুনো করা হচ্ছে। কেন? যারা তাকে হেনস্থা করে অমার্জিত বক্তব্যের বান ছুটিয়েছে তারা তাদের জীবনে কি ফেসবুকে একটা কুৎসিত স্ট্যাটাস দেয়ার চাইতে বড় কোনো কাজ করেছে? করার ক্ষমতা আছে? বড় জানতে ইচ্ছা হয়।

যাদের আমাদের দেশ নিয়ে কোনো ভালোবাসা নেই, যারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেও দেশের ভালো কিছু দেখতে পায় না তাদের আমি শুধু করোনার সময়ের কিছু ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিই:

যখন ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আমাদের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসছিল তখন উপকূলের প্রায় ২৪ লাখ মানুষকে রাতারাতি সরিয়ে নিতে হয়েছিল। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে রাতারাতি ২৪ লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া কতটুকু কঠিন কেউ চিন্তা করে দেখেছে? (পৃথিবীর প্রায় শ’খানেক দেশ আছে যাদের জনসংখ্যা এর সমান কিংবা এর চাইতে কম!)

তখন একই সাথে ঘূর্ণিঝড়ের সময় ভাসানচরের নিরাপত্তার একটা পরীক্ষা হয়ে গেছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে শুরু থেকে ভাসানচরে কিছু রোহিঙ্গাদের থাকার ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসছিল, বিষয়টা নিয়ে আমি বিভ্রান্তির মাঝে ছিলাম, তাদের মাথাব্যথাটা কোথায় আমি বুঝতে পারছিলাম না। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমার বিভ্রান্তি দূর করে দিয়েছেন। তিনি একেবারে খোলাখুলি বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, এখন তারা কক্সবাজারের পর্যটক এলাকায় পাঁচতারা হোটেলে থাকেন ঘণ্টা খানেকের মাঝে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলে যান, বিকেলের ভেতর আবার পাঁচতারা হোটেলে ফিরে এসে সারারাত ফুর্তি ফার্তা করতে পারেন, সে জন্য তাদের রয়েছে মাস শেষে মোটা বেতন। রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিলে এই বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সেখানে যেতে এবং ফিরে আসতে কালোঘাম ছুটে যাবে, সেজন্য তাদের এত আপত্তি!

রোহিঙ্গাদের কথাই যদি বলা হবে তাহলে নিশ্চয়ই বলতে হবে পৃথিবীর বৃহত্তম এই ক্যাম্পে লাখ লাখ রোহিঙ্গা গাদাগাদি করে আছে, সেখানে করোনার মহামারি ছড়িয়ে গেলে কী ভয়াবহ ব্যাপার ঘটবে সেটা নিয়ে সবার ভেতরে দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু সেই ক্যাম্পে এখন পর্যন্ত খুবই সফলভাবে করোনার মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এটি কি আমাদের দেশের জন্য একটি অসাধারণ ঘটনা নয়?

করোনার সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনো বের হয়নি, কিন্তু যখনই কিছু একটা সফল পদ্ধতি বের হয়েছে আমরা কিন্তু সাথে সাথে বাংলাদেশে সেটার বাস্তবায়ন হতে দেখেছি। এখন দেশে করোনা থেকে আরোগ্য হওয়া মানুষের প্লাজমা নিয়ে চিকিৎসা প্রায় রুটিন মাফিক হচ্ছে। রেমডেসিভির নামে একটা ওষুধ কার্যকর বলে প্রমাণিত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের দেশের ওষুধ কোম্পানি সেটা তৈরি করতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস যখন গবেষণা করে ঘোষণা দিল ডেক্সামেথাসন নামে একটা স্টেরয়েড করোনার জটিল রোগীদের জন্য প্রায় মহৌষধ তখন আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম আমাদের দেশে এটি খুবই সস্তা একটা ওষুধ। শুধু তাই নয় আমাদের ডাক্তাররা অনেকদিন থেকেই জটিল করোনা রোগীদের এটা দিয়ে চিকিৎসা করে আসছেন। কীভাবে কীভাবে জানি করোনার চিকিৎসা নিয়ে দেশের মানুষের ভেতর এক ধরনের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়ে গেছে, আমার পরিচিত যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের প্রায় সবাই হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এখানেই শেষ নয়, আমাদের দেশে বিভিন্ন মাত্রার পিপিই তৈরি হয়েছে এবং বিদেশে রফতানি হয়েছে। ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়ার নেতৃত্বে চট্টগ্রামে একশ সিটের একটা ফিল্ড হাসপাতাল শুধু তৈরি হয়নি সেখানে রোগীদের চিকিৎসা হচ্ছে। (সেদিন খবরে দেখলাম চট্টগ্রামে পরপর দুদিন কেউ কারোনায় মারা যায়নি!) “পে ইট ফরওয়ার্ড বাংলাদেশ” নামে আমার একটা প্রিয় সংগঠন অনেকদের নিয়ে সারাদেশের জন্য অক্সিজেন ব্যাংক তৈরি করেছে, বাসায় চিকিৎসা করার সময় অক্সিজেনের প্রয়োজন হলে সেখান থেকে অক্সিজেন নেয়া সম্ভব। কী সুন্দর একটি উদ্যোগ।

আমাদের দেশে করোনাভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রশিক্ষক নানা ধরনের মেডিকেল যন্ত্রপাতি তৈরি করছেন, সেগুলো ব্যবহারও হচ্ছে। এইসব খবর শুনে কি একটুখানি প্রশান্তি অনুভব করা যায় না? তার বদলে কেন জ্বালা অনুভব করবো? কেন ভালো একটা খবর পড়ে সুন্দর একটা কথা বলব না? কেন উৎসাহ দেব না? কেন তাচ্ছিল্য করব? টিটকারি করব? ছোট করার চেষ্টা করব? যারা এগুলো করে আনন্দ পায়, তাদেরকে বলব একবার একটা সুন্দর কথা বলে দেখতে, তখন নিজের ভেতর কেমন একটা প্রশান্তি অনুভব হয় সেটা দেখে তারা নিজেরাই অবাক হয়ে যাবে। আমি প্রয়োজনে কোনোকিছু সমালোচনা করতে নিষেধ করছি না, কিন্তু সেটা সমালোচনা হতে হবে, গালাগাল, খিস্তি হতে পারবে না।

সারা পৃথিবীতে অর্থনীতি নিয়ে আতঙ্ক, আমরাও আতঙ্কিত। ধরেই নিয়েছিলাম প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিটেন্স কমে আসবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়বে। কিন্তু সে রকম কিছু চোখে পড়ছে না, বরং রেকর্ড রেমিটেন্স, রেকর্ড রিজার্ভের খবর পাচ্ছি। কিন্তু বাংলাদেশ যতজন করোনায় মারা যাচ্ছে, প্রায় তার সমান সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক বিদেশ বিভুঁইয়ে মারা যাচ্ছেন। সেই খবর পড়ে মন ভারাক্রান্ত হয়। আমরা তাদের থেকে শুধু নিচ্ছি, তাদের কিছু দিচ্ছি না ভেবে নিজেদের অপরাধী মনে হয়।

করোনার সময় শুধু যে নিরবচ্ছিন্নভাবে ভালো ভালো ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে সেটি সত্যি নয়। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ছাঁটাই করা একটা ভয়াবহ খবর। ফ্যাক্টরির মালিক শ্রমিক মিলে একটা বড় পরিবারের মতো হওয়ার কথা, দুঃসময়ে মালিক-শ্রমিক একসাথে কষ্ট করবে কিন্তু মালিকরা নিজেদের সম্পদ রক্ষা করার জন্য শ্রমিকদের ছুঁড়ে ফেলে দেবে এটা কেমন করে হয়? করোনার এই দুঃসময়েও আমরা প্রায় নিয়মিত ভাবে দেখছি শ্রমিকরা তাদের বেতন-ভাতার জন্য রাস্তা অবরোধ করে বসে আছে। কেন?

আমরা হঠাৎ করে দেখতে পাচ্ছি সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের যে প্রেসক্রিপশন মেনে এগুলো বন্ধ করা হচ্ছে সেই প্রেসক্রিপশন আমরা সবাই অনেক দেশে অনেকবার দেখেছি। পৃথিবীতে সবাই এখন পরিবেশ নিয়ে সচেতন, তাই সারা পৃথিবীতে পাটের বিশাল চাহিদা। ভারতবর্ষে নুতন পাটকল তৈরি হচ্ছে, আমরা সেই সময়টাতে পাটকল বন্ধ করে দিচ্ছি। আমি হিসাব মেলাতে পারি না।

আমার মনে আছে বেশ অনেক বছর আগে খুলনায় পাট শ্রমিকরা খুব দুঃসময়ের মাঝে ছিল, তাদের অবস্থাটা সবার চোখের সামনে আনার জন্য খুলনায় একটা লঙ্গরখানা খোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, অনেকের সাথে আমিও সেখানে গিয়েছিলাম। সরকারের রক্তচক্ষু কাকে বলে আমি সেবার সেটা টের পেয়েছিলাম। মানুষ যখন শুধু একটা সংখ্যা হয়ে যায়, যখন তাদের পরিবার থাকে না, আপনজন থাকে না, আত্মসম্মান থাকে না, ভবিষ্যৎ থাকে না তখন সেটা খুব একটা কষ্টের ব্যাপার। আমরা সমস্যাগুলোর মূলে কেন হাত দিই না? পাটকলগুলো বন্ধ না করে আধুনিকায়ন করা কি এতই দুঃসাধ্য একটা ব্যাপার?

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু অনেক আশা নিয়ে বাংলাদেশের পাটকলগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত করেছিলেন। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীর বছরে সেই পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে, এই দেশে কেউ তাঁর দীর্ঘশ্বাসটুকু শুনতে পাচ্ছে না?

লেখক : শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী।

ভয়েস টিভি/এএস

Categories
জাতীয় মুক্তমত

ছয় দফা বাঙালির ‌’স্বাধীনতার সনদ’

৭ জুন, ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছয় দফা দিবস পালন উপলক্ষে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। নিবন্ধটি নীচে তুলে ধরা হলো: সূত্র: বাসস

আমরা ৭ জুন ৬-দফা দিবস হিসেবে পালন করি। ২০২০ সালে বাঙালির জীবনে এক অনন্য বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের জন্য এ বছরটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ব্যাপক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী প্রবাসী বাঙালিরাও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ইউনেস্কো এ দিবসটি উদ্যাপনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত দেশগুলিও প্রস্তুতি নিয়েছিল। জাতিসংঘ ইতোমধ্যে একটি স্মারক ডাক টিকিট প্রকাশ করেছে।

যখন এমন ব্যাপক আয়োজন চলছে, তখনই বিশ্বব্যাপী এক মহামারি দেখা দিল। করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামক এক সংক্রামক ব্যাধি বিশ্ববাসীকে এমনভাবে সংক্রমিত করছে যে, বিশ্বের প্রায় সকল দেশই এর দ্বারা আক্রান্ত এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক – সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশও এ ভাইরাস থেকে মুক্ত নয়। এমতাবস্থায়, আমরা জনস্বার্থে সকল কার্যক্রম বিশেষ করে যেখানে জনসমাগম হতে পারে, সে ধরনের কর্মসূচি বাতিল করে দিয়ে কেবল রেডিও, টেলিভিশন বা ডিজিটাল মাধ্যমে কর্মসূচি পালন করছি।

১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ ৬-দফা ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমি পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, শ্রদ্ধা জানাই আমার মা বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেসাকে। ৭ জুনের কর্মসূচি সফল করতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। স্মরণ করি, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে শাহাদাৎবরণকারী আমার পরিবারের সদস্যদের। শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় ৪-নেতাকে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহিদ ও নির্যাতিত মা-বোনকে।

৬-দফা দাবির আত্মপ্রকাশ

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে কাউন্সিল মুসলিম লীগের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালের সভাপতিত্বে বিরোধীদলের সম্মেলন শুরু হয়। সাবজেক্ট কমিটির এই সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয়-দফা দাবি পেশ করেন। প্রস্তাব গৃহীত হয়না। পূর্ব বাংলার ফরিদ আহমদও প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।

৬ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েকটি পত্রিকা এ দাবি সম্পর্কে উল্লেখ করে বলে যে, পাকিস্তানের দুটি অংশ বিচ্ছিন্ন করার জন্যই ৬-দফা দাবি আনা হয়েছে। ১০ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাংবাদিক সম্মেলন করে এর জবাব দেন। ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা ফিরে আসেন। বিমান বন্দরেই তিনি সাংবাদিকদের সামনে ৬-দফা সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরেন।

৬-দফা দাবিতে পাকিস্তানের প্রত্যেক প্রদেশকে স্বায়ত্বশাসন দেয়ার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দল এ দাবি গ্রহণ বা আলোচনা করতেও রাজি হয়নি। বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন ঢাকায়।

আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটিতে ৬-দফা দাবি পাশ করা হয়। আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে এ দাবি গ্রহণ করা হয়। ব্যাপকভাবে এ দাবি প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় দলের নেতৃবৃন্দ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান সফর করে জনগণের কাছে এ দাবি তুলে ধরবেন। ৬-দফা দাবির উপর বঙ্গবন্ধুর লেখা একটি পুস্তিকা দলের সাধারণ সম্পাদকের নামে প্রকাশ করা হয়। লিফলেট, প্যাম্ফলেট, পোস্টার ইত্যাদির মাধ্যমেও এ দাবিনামা জনগণের কাছে তুলে ধরা হয়।

কেন ৬-দফা দাবি

১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল সে যুদ্ধের সময় পূর্ববঙ্গ বা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এ অঞ্চলের সুরক্ষার কোন গুরুত্বই ছিল না। ভারতের দয়ার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছিল পূর্ব বাংলাকে। ভারত সে সময় যদি পূর্ববঙ্গে ব্যাপক আক্রমণ চালাত, তাহলে ১২শ মাইল দূর থেকে পাকিস্তান কোনভাবেই এ অঞ্চলকে রক্ষা করতে পারত না। অপরদিকে তখনকার যুদ্ধের চিত্র যদি পর্যালোচনা করি, তাহলে আমরা দেখি পাকিস্তানের লাহোর পর্যন্ত ভারত দখল করে নিত যদি না বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকেরা সাহসের সঙ্গে ভারতের সামরিক আক্রমণের মোকাবেলা করত।

পূর্ব পাকিস্তানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর কোন শক্তিশালী ঘাঁটি কখনও গড়ে তোলা হয়নি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশনের একটা হেড কোয়ার্টার ছিল খুবই দুর্বল অবস্থায়। আর সামরিক বাহিনীতে বাঙালির অস্তিত্ব ছিল খুবই সীমিত। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বাঙালিদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল।

পদবী পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ববঙ্গ

জেনারেল ৩ জন ০

মেজর জেনারেল ২০ জন ০

ব্রিগেডিয়ার ৩৪ জন ০

কর্নেল ৪৯ জন ১ জন (বাংলা বলতেন না)

লে. কর্নেল ১৯৮ ২ জন

মেজর ৫৯০ জন ১০ জন

নৌ বাহিনী অফিসার ৫৯৩ জন ৭ জন

বিমান বাহিনী অফিসার ৬৪০ জন ৪০ জন

অর্থাৎ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে সর্বোচ্চ পদে তা-ও লে. কর্নেল পদে মাত্র ২ জন বাঙালি অফিসার ছিলেন। অথচ যুদ্ধের সময়বাঙালি সৈনিকেরাই সবচেয়ে সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন। ঐ যুদ্ধের পর তাসখন্দে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা তাসখন্দ চুক্তি নামে পরিচিত। সেখানেও পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বা নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। একটু পিছন ফিরে তাকালে আমরা দেখি যে, বাঙালির বিরুদ্ধে সব সময় পাকিস্তানের শাসক চক্র বৈমাত্রীয়সুলভ আচরণ করেছে।

প্রথম আঘাত হানে বাংলা ভাষা বা আমাদের মাতৃভাষার উপর। তারা আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার কেড়ে নেয়ার চক্রান্ত শুরু করে। রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করে বাঙালিরা। সে ভাষা আন্দোলন শুরু করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালে। মূলতঃ তখন থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানীদের শাসন-শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে হবে।

বাঙালিরা সব সময়ই পশ্চিমাদের থেকে শিক্ষা-দীক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চায় সমৃদ্ধ ছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা ছিল এ অঞ্চলের মানুষের। জনসংখ্যার দিক থেকেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি। ৫৬ ভাগ মানুষের বসবাস ছিল পূর্ববঙ্গে।

পূর্ববঙ্গের উপার্জিত অর্থ কেড়ে নিয়ে তারা গড়ে তোলে পশ্চিম পাকিস্তান। বাঙালিদের উপর অত্যাচার করাই ছিল শাসকদের একমাত্র কাজ। ১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অন্যান্য দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে জয়লাভ করে। মুসলীম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু ৯২ক ধারা অর্থাৎ ইমার্জেন্সি জারি করে তারা নির্বাচিত সরকার বাতিল করে দেয়। পূর্ববঙ্গে চালু করে কেন্দ্রীয় শাসন। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে যখন ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখনও ষড়যন্ত্র থেমে থাকে না। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে। এভাবেই বার বার আঘাত আসে বাঙালিদের উপর।

৬-দফার প্রতি জনসমর্থন

আইয়ুব খানের নির্যাতন-নিপীড়নের পটভূমিতে যখন ৬-দফা পেশ করা হয়, অতি দ্রুত এর প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আমার মনে হয় পৃথিবীতে এ এক বিরল ঘটনা। কোন দাবির প্রতি এত দ্রুত জনসমর্থন পাওয়ার ইতিহাস আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সমগ্র পূর্ব বাংলা সফর শুরু করেন। তিনি যে জেলায় জনসভা করতেন সেখানেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হত, গ্রেফতার করা হত। জামিন পেয়ে তিনি আবার অন্য জেলায় সভা করতেন। এভাবে পরপর তিনি ৮ বার গ্রেফতার হন মাত্র দুই মাসের মধ্যে। এরপর ১৯৬৬ সালের ৮ মে নারায়ণগঞ্জে জনসভা শেষে ঢাকায় ফিরে আসার পর ধানমন্ডির বাড়ি থেকে তাঁকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। ৯ মে তাঁকে কারাগারে প্রেরণ করে। তৎকালীন সরকার একের পর এক মামলা দিতে থাকে।

একইসঙ্গে দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা শুরু হয়। সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ছাত্রনেতা, শ্রমিক নেতাসহ অগণিত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করে।

১৯৬৬ সালের ১৩ মে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ দিবস পালন উপলক্ষে জনসভা করে। জনসভায় জনতা ৬-দফার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। ৩০-এ মে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির (ওয়ার্কিং কমিটি) সভা হয় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী। ৭ জুন প্রদেশব্যাপী হরতাল ডাকা হয় এবং হরতাল সফল করার সর্বাত্মক উদ্যোগগ্রহণ করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের অনেক সভা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির বাড়িতে অনুষ্ঠিত হত।

৭ জুনের হরতালকে সফল করতে আমার মা বেগম ফজিলাতুননেসা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ছাত্র নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে তিনি দিক-নির্দেশনা দেন। শ্রমিক নেতা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি সব ধরনের সহযোগিতা করেছিলেন। পাকিস্তানী শাসকদের দমনপীড়ন-গ্রেফতার সমানতালে বাড়তে থাকে। এর প্রতিবাদে সর্বস্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়। ৬-দফা আন্দোলনের সঙ্গে পূর্ব বাংলার সকল স্তরের মানুষ – রিক্সাওয়ালা, স্কুটারওয়ালা, কলকারখানার শ্রমিক, বাস-ট্রাক-বেবিটেক্সি চালক, ভ্যান চালক, ক্ষুদে দোকানদার, মুটে-মজুর, দিনমজুর – সকলে এ আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন।

পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ও রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান যে কোন উপায়ে এই আন্দোলন দমন করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেয় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানকে। কিন্তু তাদের শত নির্যাতন উপেক্ষা করে বাংলাদেশের মানুষ ৭ জুনের হরতাল পালন করে ৬-দফার প্রতি তাঁদের সমর্থন জানিয়ে দেন। পাকিস্তান সরকার উপযুক্ত জবাব পায়। দুঃখের বিষয়হল বিনা উসকানিতে জনতার উপর পুলিশ গুলি চালায়। শ্রমিক নেতা মনু মিয়াসহ ১১ জন নিহত হন। আন্দোলন দমন করতে নির্যাতনের মাত্রা যত বাড়তে থাকে, সাধারণ মানুষ ততবেশি আন্দোলনে সামিল হতে থাকেন।

৭ জুন হরতাল সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন: ‘‘১২ টার পরে খবর পাকাপাকি পাওয়া গেল যে, হরতাল হয়েছে। জনগণ স্বতষ্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছেন। তাঁরা ৬-দফা সমর্থন করে আর মুক্তি চায়। বাঁচতে চায়, খেতে চায়, ব্যক্তি স্বাধীনতা চায়, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি, কৃষকদের বাঁচার দাবি তাঁরা চায়, এর প্রমাণ এই হরতালের মধ্যে হয়েই গেল” (কারাগারের রোজনামচা পৃ: ৬৯)।

১৯৬৬ সালের ১০ ও ১১ জুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভায় হরতাল পালনের মাধ্যমে ৬-দফার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করায় ছাত্র-শ্রমিক ও সাধারণ জনগণকে ধন্যবাদ জানানো হয়। পূর্ববঙ্গের মানুষ যে স্বায়ত্বশাসন চায়, তারই প্রমাণ এই হরতালের সফলতা। এ জন্য সভায় সন্তোষ প্রকাশ করা হয়।

১৭, ১৮ ও ১৯-এ জুন নির্যাতন- নিপীড়ন প্রতিরোধ দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীর বাড়িতে বাড়িতে কালো পতাকা উত্তোলন এবং তিন-দিন সকলে কালো ব্যাজ পড়বে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। হরতালে নিহতদের পরিবারগুলোকে আর্থিক সাহায্য এবং আহতদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য একটা তহবিল গঠন এবং মামলা পরিচালনা ও জামিনের জন্য আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি আইনগত সহায়তা কমিটি গঠন করা হয়। দলের তহবিল থেকে সব ধরনের খরচ বহন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আন্দোলনের সকল কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করারও নির্দেশনা দেয়া হয়।

৬-দফা দাবির ভিত্তিতে স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন আরও ব্যাপকভাবে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য সভা, সমাবেশ, প্রতিবাদ মিছিল, প্রচারপত্র বিলিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এই দাবির প্রতি ব্যাপক জনমত গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়।

এদিকে সরকারি নির্যাতনও বৃদ্ধি পেতে থাকে। তবে যত বেশি নির্যাতন আইয়ুব-মোনায়েম গং-রা চালাতে থাকে, জনগণ তত বেশি তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন এবং সকল নিপীড়ন উপেক্ষা করে আরও সংগঠিত হতে থাকেন।

১৯৬৬ সালের ২৩ ও ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং আন্দোলন দ্বিতীয় ধাপে এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এ আন্দোলন কেন্দ্র থেকে জেলা, মহকুমা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তীব্রতর হতে থাকে।

সরকারও নির্যাতনের মাত্রা বাড়াতে থাকে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব প্রাপ্তদের একের পর এক গ্রেফতার করতে থাকে। অবশেষে একমাত্র মহিলা সম্পাদিকা অবশিষ্ট ছিলেন। আমার মা সিদ্ধান্ত দিলেন তাঁকেই ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হোক। আওয়ামী লীগ সে পদক্ষেপ নেয়।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা

পাকিস্তান সরকার নতুন চক্রান্ত শুরু করল। ১৯৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে নিয়ে যায়। অত্যন্ত গোপনে রাতের অন্ধকারে সেনাবাহিনীর দ্বারা এ কাজ করানো হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়া হয়, যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে অধিক পরিচিতি পায়।

এই মামলায় ১-নম্বর আসামি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে আরও ৩৪ জন সামরিক ও অসামরিক অফিসার ও ব্যক্তিকে আসামি করে।

অপরদিকে ৬-দফা দাবি নস্যাৎ করতে পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু নেতাদের দিয়ে ৮-দফা নামে আরেকটি দাবি উত্থাপন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তবে এতে তেমন কাজ হয়না। উঁচুস্তরের কিছু নেতা বিভ্রান্ত হলেও ছাত্র-জনতা বঙ্গবন্ধুর ৬-দফার প্রতিই ঐক্যবদ্ধ থাকেন।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা অর্থাৎ রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান মামলার মূল অভিযোগ ছিল যে, আসামিরা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এ কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বক্তব্য ছিল: আমরা পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ ভাগ, সংখ্যাগুরু। আমরা বিচ্ছিন্ন হব কেন? আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই, স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই। যারা সংখ্যালগিষ্ঠ, তারা বিচ্ছিন্ন হতে পারে, সংখ্যাগরিষ্ঠরা নয়।

এই মামলা দেয়ার ফলে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে। বাংলার মানুষের মনে স্বাধীনতা অর্জনের আকাক্ষা ও চেতনা শাণিত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বদলীয়ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়। ছাত্ররা ৬-দফাসহ ১১-দফা দাবি উত্থাপন করে আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জেলা, মহকুমায়আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ক্যান্টনমেন্টের ভিতরেই কোর্ট বসিয়ে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করা শুরু হয়। অপরদিকে জেল, জুলুম, গুলি, ছাত্র হত্যা, শিক্ষক হত্যাসহ নানা নিপীড়ন ও দমন চালাতে থাকে আইয়ুব সরকার।

পাকিস্তানী সরকারের পুলিশী নির্যাতন, নিপীড়ন ও দমনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ স্বতষ্ফুর্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করে। তাঁরা রাস্তায় নেমে আসে। সরকারপন্থী সংবাদপত্র থেকে শুরু করে থানা, ব্যাংক, সরকারের প্রশাসনিক দপ্তরে পর্যন্ত হামলা চালাতে শুরু করে। সমগ্র বাংলাদেশ তখন অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়।

‘আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করো, জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই’ – এ ধরনের শ্লোগানে শ্লোগানে স্কুলের ছাত্ররাও রাস্তায়নেমে আসে। এরই এক পর্যায়ে ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এই মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে বন্দিখানায় হত্যা করা হয়। মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাঁদের আশঙ্কা হয় এভাবে শেখ মুজিবকেও হত্যা করবে। সাধারণ মানুষ ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করতে অগ্রসর হয়। জনতা মামলার বিচারক প্রধান বিচারপতির বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে যান। প্রচুর গণআন্দোলনের মুখে ২১ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগড়তলা মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে একটা সামরিক জিপে করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ধানমন্ডির বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে। অন্য বন্দিদেরও মুক্তি দেয়া হয়।

ভাষা আন্দোলন-স্বায়ত্বশাসন থেকে স্বাধীনতা: ৬ দফার সফলতা

গণআন্দোলনে আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতা দখল করে সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান। ৬-দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সমগ্র পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৭০ সালের ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঘোষণা দেন পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ’।

কিন্তু বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় পাকিস্তানী সামরিক জান্তা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের মানুষ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন।

অসহযোগ আন্দোলন থেকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করে বাঙালি জাতি। ২৫ মার্চ পাকিস্তানী সামরিক জান্তা গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ৯ মাসের যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি চূড়ান্ত বিজয়অর্জন করে। বাঙালিরা একটি জাতি হিসেবে বিশ্বে মর্যাদা পায়, পায় জাতিরাষ্ট্র – স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ।

Categories
মুক্তমত সারাদেশ

অনলাইন ক্লাশ এবং ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট অর্জন

#রতন কুমার মজুমদার#
বিশ্বব্যপি কোভিট ১৯ সংক্রমনের ফলে যখন সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেছে , লক্ষ লক্ষ ছাত্র ছাত্রী যখন অলস সময় কাটাচ্ছে তখন শিক্ষামন্ত্রনালয়ের একটি যুগান্তকারি সিদ্ধান্ত হলো বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা টিভি এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর জন্য অনলাইনে ক্লাশ নিয়া। এর কোন বিকল্পও ছিল না কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলবে সেটা ছিল অনিশ্চিত।

মন্ত্রনালয় এবং মাউশির সিদ্ধান্ত মোতাবেক কিছু সংখ্যাক প্রতিষ্ঠান কলেজের নিজস্ব ফেসবুক পেজে বা গ্রুপে ক্লাশ নেয়া শুরু করে। এতে করে প্রথম পর্যায়ে ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে তেমন সাড়া না পেলেও সময় অতিক্রান্তের সাথে সাথে অনলাইন ক্লাশের প্রতি ছাত্র ছাত্রীদের আগ্রহ বেড়েছে এবং ক্লশে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের অনেকগুলো দেশ প্রতিষ্ঠান বন্ধকালীন সময়ে অনলাইনে ক্লাশ নিশ্চিত করেছে।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অনলাইনে ক্লাশের উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট অর্জনে অনলাইন ক্লাশের কোন বিকল্প নেই। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বাংলাদেশে জন্য একটি সুযোগ। একটি দেশের জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামো অনুযায়ী কর্মক্ষম জনসংখ্যা (১৫-৫৯ বছর) যখন নির্ভরশীল জনসংখ্যাকে (০-১৪ বছর এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে) ছাড়িয়ে যায় তখন সে দেশে একটি সুযোগের সৃষ্টি হয় ।

জনসংখ্যার বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন সোনালি সময় পার করছে। আমাদের নির্ভরশীল জনসংখ্যার চেয়ে কর্মক্ষম জনসংখ্যা বেশি। জনসংখ্যার ১৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এখন শতকরা ৬৮ ভাগ। জনমিতির পরিভাষায় এটাই হলো একটি দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ। কোন জাতির ভাগ্যে এ ধরনের জনমিতিক সুবর্ণকাল একবারই আসে যা থাকে কমবেশি ৩০-৩৫ বছর। বাংলাদেশ এই সোনালি সময়ে পদার্পণ করেছে ২০১২ সাল থেকে যা শেষ হবে ২০৪০ এর দিকে।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড একটি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাব ফেলে। এজন্য অনেক চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেই একটি দেশকে জনসংখ্যার এই সুযোগ নিতে হয়। চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলায় সফলতার ওপরই নির্ভর করে এই সুযোগ কতটা জাতির জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে। তাই জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষম বিশাল অংশকে মানবসম্পদে পরিণত করে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে কাজে লাগানোই মুখ্য বিষয়। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়টিই বার বার বলার চেষ্টা করেছেন। এর ওপরই নির্ভর করে জনমিতির সুযোগ ঘরে তোলা না তোলা। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সে প্রেক্ষাপটে বলেছেন আমাদের তরুন প্রজন্মকে কাজে লাগিয়ে আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট অর্জন করতে হবে। এ প্রজন্ম যাতে করে একটি মুহূর্তও হেলায় নষ্ট না করে তাই তিনি অনলাইন ক্লাশের প্রতি জোর দিয়েছেন।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসে অনলাইন ক্লাশের প্রতি জোড় দিয়েছে। কিছু কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও তাতে ব্যপক সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। সঠিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে মানসম্মত মানবসম্পদ গড়ে তোলা খুবই অপরিহার্য। একটি দেশ তার প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষকে মানবসম্পদ বানাতে পারবে কি-না সেটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জটি এখন আমাদের সামনে। এ চ্যালেঞ্জ আমাদের মোকাবেলা করতে হবে।
এবার একটু আলোকপাত করা যাক অনলাইন ক্লাশের সুবিধা অসুবিধাগুলো।

১। স্মার্ট ফোন : কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যে পরিমান ছাত্র ছাত্রী আছে বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী তাদের ৯০% ছাত্র ছাত্রী স্মার্টফোন ব্যবহার করে। এছাড়া অনেকেই লেপটপ এবং ট্যাব ব্যবহার করে। অনলাইন ক্লাশে এ সুবিধাটা নিশ্চিত ভাবে একটি ইতিবাচক দিক।

২। ইন্টারনেট সংযোগ : এখন গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন ফোন কোম্পানীগুলোর নেটওয়ার্ক রয়েছে। অনায়াসে শিক্ষার্থীরা সে সুযোগটি নিতে পারে। তবে কোন কোন যায়গায় নেটওয়ার্কের দুর্বলতা রয়েছে। তবে তা একেবারে সামান্য।

৩। শিক্ষকদের দক্ষতা : অনলাইনে ক্লাশ নেয়ার কিছু শিক্ষকের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। আমরা ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছি কিন্তু আমাদের অনেক প্রবীন শিক্ষক এ পদ্ধতির সাথে নিজেদের খাপখাইয়ে নিতে পারেনি। কারো কারো ক্ষেত্রে অনাগ্রহও দেখা যায়। কিন্তু যেহেতু এ পদ্ধতি বর্তমান সময়ে অত্যাবশ্যক তাই যেকোন উপায়ে হোক উক্ত শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে এ কাজে সামিল হতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই।

৪। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ : বর্তমানে অনলাইনে ক্লাশ নেয়ার ক্ষেত্রে অনেকগুলো সফটওয়ার আছে। যেমন ফেসবুক লাইভ ইউ টিউব লাইভ , জুম , কোর্সেরা , গুগল ক্লাশরুম, মাইক্রোসফট টিম, হ্যাংআউট, অভিএস স্টুডিও এর মত সফটওয়ার এখন হাতের নাগালে রয়েছে। এছাড়া মোবাইলে পাওয়াও পয়েন্ট এবং স্ক্রিন রেকর্ডার দিয়েও ক্লাশ রেডি করা যায়। কিন্তু এ পদ্ধতিগুলো অনেক শিক্ষক এখনো রপ্ত করতে পারেনি বা আগ্রহ নেই। তাই সল্প সময়ের ট্রেনিং এর মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করা যায়।
৫। সুবিধা : ক্লাশরুমে শিক্ষকরা যেভাবে ক্লাশ নেয় তার চেয়ে অনলাইনে ক্লাশ শিক্ষার্থীদের নানামূখি সুবিধা দিচ্ছে।
ক) শিক্ষকরা যখন অনলাইনে ক্লাশগুলো নেয় তখন শিক্ষার্থী লাইভে প্রশ্ন করলে শিক্ষক তা এড্রেস করতে পারে।
খ) ক্লাশটি অনলাইনে রেকর্ডেড থেকে যায় । শিক্ষার্থী কোন কারণে লাইভে অংশ নিতে না পারলে তার সুবিধামত সময়ে ক্লাশটি দেখে নিতে পারে।
গ) কলেজে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাশ নিতে হয়। কিন্তু অনলাইনে শিক্ষক রাতের বেলায়ও ক্লাশ এটেন্ড করতে পারে এবং শিক্ষার্থীরা সেই সময়ে অংশ নিতে পারে।

সবেচেয়ে বেশী দরকার যেটি সেটি হলো আমাদের মাইন্ডসেট। একটি প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষকরা যদি একটি টিমওয়ার্কে কাজ করে তবে অনলাইন পদ্ধতিটির অনেক সুফল পাবে শিক্ষার্থীরা। নানারকম সীমাবদ্ধতার পরও এর কোন বিকল্প নেই। অনলাইনে ক্লাশ নেয়াটা সকল প্রতিষ্ঠানে পুরোদমে শুরু হয়ে গেলে এর ত্রুটি বিচ্যুতিগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করা যাবে।

নানা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেই একাজে এগোতে হবে। দক্ষ জনসংখ্যার সুযোগ কাজে লাগানোর মাধমেইজাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া আজ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। চীনের মতো রাষ্ট্র তাদের বিশাল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত করেই আজ এতদূর এগিয়ে গেছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের এই সুযোগ কাজে লাগাতে শিক্ষামন্ত্রনালয়ের এ পদক্ষেপের মাধ্যমেই ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসাবে আমরা আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হব।

-অধ্যাপক রতন কুমার মজুমদার, অধ্যক্ষ্য, পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর ।

Categories
মুক্তমত সারাদেশ

দক্ষ টিমওয়ার্কের কাছে হারলো করোনা !

রতন কুমার মজুমদার ♦মুক্তমত♦

করোনা হেরে গেল একটি দক্ষ টিমওয়ার্কের কাছে। ভালো কিছু করতে হলে টিম ওয়ার্কের বিকল্প নেই – এই কথা অতি সত্যি যে ভালো টিম ওয়ার্ক করতে পারলে যে কোনও অসাধ্য সাধন করা যায়। অভিজ্ঞতা দিয়ে বড় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেয়া যায় শুধুমাত্র ভালো টিম ওয়ার্ক এর জোরে। একটি ভালো টিম ওয়ার্ক তখনই হয় যখন টিমের প্রতিটি সদস্য নিজের দায়িত্বে পুরোপুরি ১০০% নিবেদিত থেকে ভালোভাবে নিজের কাজ করেন, এবং অন্যদের কাজে সাহায্য করেন। একটি টিমকে ভালো টিম ওয়ার্ক করতে হলে টিম মেম্বারদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো থাকার পাশাপাশি কাজের স্বার্থে একজন আরেকজনকে সাহায্য করার মনোভাব থাকতে হবে। এখানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দেয়া যাবে না। আর যেটি থাকতে হবে সেটা হলো যোগ্য নেতৃত্ব।

বলছিলাম এবছর এস এস সি পরীক্ষার ফল প্রকাশের কথা। নীরবে নিভৃতে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করারর পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজ ফলাফল প্রকাশ করলেন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে। করোনা পরিস্থিতির কারণে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে যখন সরাদেশ লকডাউনে গেল তখন এস এস সি পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে গেল কারণ পরীক্ষক বা প্রধান পরীক্ষক থেকে ওএমআরগুলো তখন পর্যন্ত বোর্ডে পৌছায়নি। প্রায় ৪০% ওএমআর তখনও প্রধান পরীক্ষকের নিকট থেকে গিয়েছিল।

এমন পরিস্থিতিতে ছাত্র ছাত্রী এবং অভিভাবকদের কথা চিন্তা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যত দ্রুত সম্ভব ফলপ্রকাশ করার নির্দেশ দিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী এবং মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রী বিকল্প পদ্ধতিতে ওএমআরগুলো বোর্ডে নিয়ে আসার জন্য বোর্ড চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দিলেন। শুধু তাই নয় সার্বক্ষণিক মনিটরিং করেছেন কাজের অগ্রগতি। দফায় দফায় জুম মিটিং করেছেন চেয়ারম্যানদের সাথে।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ পেয়েই বোর্ডের চেয়াম্যান থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কর্মযজ্ঞে নেমে গেলেন। নিজস্ব বাহকের মাধ্যমে এবং পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে বিশেষ ব্যবস্থায় ওএমআর গুলো তিন দিনের মধ্যেই সংগ্রহ করে ফেল্লেন। এখানে জেলা প্রশাসকরাও ভূমিকা রেখেছেন। তখন একদিকে চলছিল লকডাউন অপরদিকে রোজার ছুটি। এ ছুটির মধ্যেই রাত দিন পরিশ্রম করে ওএমআরগুলো স্কেনিং করা থেকে শুরু করে প্রসেসিং সব কাজগুলো একটি টিমওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন করে ফেল্লেন ঝুকির মধ্যেও। ব্যাপারটি একদিকে জটিল ছিল আবার অবিশ্বাস্য ছিল। সকল রকমের স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাতদিন কাজ করে এ কর্মযজ্ঞ শেষ করলেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে।

প্রথমে যেকথাটা বল্লাম নেতৃত্ব এবং টিমওয়ার্ক। অভিজ্ঞতা দিয়ে বড় প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দেয়া যায় শুধুমাত্র ভালো টিম ওয়ার্ক এর জোরে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্বে সকল বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের পরিশ্রমের ফসল আজকের এস এস সি এর ফলাফল। পুরো একটি টিম কাজ করছে আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে। যদিও অনেকের মনে সন্দেহ ছিল কাজটি সুচারুরূপে করা যাবে কিনা । কিন্তু সকলের দক্ষতা আর আন্তরিকতায় এবং যোগ্য নেতৃত্বে পরাজিত হলো করোনা । করোনা আটকিয়ে রাখতে পারেনি ফলাফল। করোনা হেরে গেল একটি দক্ষ নেতৃত্ব ও টিমের কাছে।
-অধ্যাপক রতন কুমার মজুমদার
অধ্যক্ষ, পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর :

Categories
মুক্তমত সারাদেশ

জাল পরা বাসন্তি আর পানিতে নামাজ পড়া একই সূত্রে গাঁথা…

১৯৭৪ সালে পাক-মার্কিন পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে কুড়িগ্রামের চিলমারির প্রত্যন্ত অঞ্চলের জেলেপাড়ার এক হতদরিদ্র পরিবারের বাক্‌ ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বাসন্তীকে নিয়ে একটি ট্র্যাজেডি নাটকের মঞ্চায়ন করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে তা আপনারা অবহিত আছেন।

কুড়িগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত এলাকা চিলমারীর জেলে পাড়ার বাক প্রতিবন্ধী বাসন্তী ও তার কাকাতো বোন দুর্গতির জাল পরিহিত লজ্জা নিবারণের একটি ছবি ১৯৭৪ সালে ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। অভাবের তাড়নায় সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারছিল না বলে ছবিটিতে দেখানো হয়।

সেই বহুল আলোচিত ছবির ফটোগ্রাফার ছিলেন ইত্তেফাকেরই নিজস্ব আলোক চিত্রি, রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া থানার মহিপুরের আফতাব আহমদ। পরবর্তীতে বেরিয়ে আসে ছবিটি ছিল সম্পূর্ণ সাজানো। বঙ্গবন্ধুকে ব্যর্থ প্রমান করতে বাসন্তী ও দুর্গতিকে নিয়ে প্রকাশিত সাজানো সেই ছবিটি ছিল হলুদ সাংবাদিকতা ও নোংরা রাজনীতির খেলা। যে খেলার মুখোশ উম্মোচিত হলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় অনেক প্রতিবেদনও ছাপা হয়।

এ ফটো সাংবাদিক আফতাব উদ্দিন জামাত নেতা ইউপি চেয়ারম্যান আনসার আলীকে ইউনিয়ন পরিষদ সভাকক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে দু’জনে নাটক সাজানোর জন্য চলে যান জেলে পল্লীতে। সেখানে পরিকল্পিতভাবে বাসন্তীর সমস্ত শরীরে মাছ ধরার জাল পড়িয়ে লজ্জা নিবারণের মিথ্যে সান্তনা বুকে নিয়ে একটি মেয়ে কলা গাছের ভেলায় চড়ে পাতা সংগ্রহ করছেন, বন্যার পানিতে আরেকজন সাদৃশ্য নারী শ্রীমতি দূর্গতি রাণী বাঁশ হাতে ভেলার অন্য প্রান্তে বসে নিয়ন্ত্রণ করছেন ভেলাটিকে।

পরে এ ছবি ও একটি প্রতিবেদন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়া মাত্রই দেশে-বিদেশে তোলপাড় শুরু হয়। ছবিটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্ব মানবতার মনকে নাড়া দিয়ে ওঠে। ওই ছবিটিকে সম্বল করে জনতার সামনে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকারের ব্যর্থতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসে এতটুকুও ত্রুটি রাখেনি স্বাধীনতা বিরোধীরা। বাসন্তির জাল পরা ছবিটিকে ঘিরে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে ক্ষমতাসীন মুজিব সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে ছবিটিকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বলে আখ্যায়িত করা হয়। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছিল বিষয়টি পরিকল্পিত ছিল।

১৯৭৪ এর পর ২০২০ সালের  কয়রা অঞ্চলে চুয়াত্তরের মত আরেকটি নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে গতকাল ঈদের দিন। ২১ মে আম্পানে দেশের দক্ষিন পশ্চিমাঞ্জলে ক্ষয়িক্ষতি হয়েছে, জলোচ্ছাস হয়েছে। অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ঘরবাড়ী পানিতে তলিয়ে গেল। মানুষ অসহায় হয়ে পরলো। এলাকার লোকজন মিলে সেখানে ভাঙ্গা বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করলো।

দুষ্টচক্ররা সেখানকার ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলোর সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে চুয়াত্তরের মত ২০২০ সালে আরেক আফতা উদ্দিন খুলনা দক্ষিন জেলা জামায়াতের আমীর ও কয়রা উপজেলার প্রাক্তন চেয়ারম্যান মাওলানা তমিজ উদ্দিন এর মঞ্চে আবির্ভাব হলো। ১৪/৮/২০১৪ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা তমিজ উদ্দিনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ১৫/৮/২০১৪ দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় তার মুক্তি চেয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল। তার সাথে যুক্ত হলো জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির এক নেতা যার বাড়ী কয়রা অঞ্চলে।

ঈদের দিন তারা কয়রা এলাকায় এসে যারা বাঁধ নির্মানের চেষ্টা করছিল তাদেরকে জড়ো করে সেখানকার পানিতে নেমে ঈদের নামাজ আদায় করার ব্যবস্থা করা হয়। অথচ যে যায়গায় পানিতে নামাজ পড়া হয়েছে তার আসে পাশের এলাকায় শুকনো যায়গা ছিল। কিন্তু তারা সেখানে না গিয়ে পানিতেই ঈদের নামাজ পড়েছে। পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিতভাবে ভিডিও এবং ছবি তুলেছে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ছাত্রটি যার সাথে শিবিরের সংল্লিষ্টতা রয়েছে বলে প্রচার আছে। নামাজের পরপরই সেই ছবি তুলে দেয়া হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়ার কাছে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ছবিটি ব্যাপক প্রচারিত হলে এর পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা শুরু হয়। তারই প্রেক্ষিতে অনুসন্ধন করে এবং ঐ এলাকার অনেকের সাথে আলাপ করে জানা যায় এমন একটি নাটক মঞ্চস্থ করা হবে তার পরিকল্পনা করা হয় দুদিন আগেই। অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরো কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বের হয়ে আসে। পানিতে দাড়িয়ে যে ঈদের নামাজ পড়া হয়েছিল সে নামাজে ঈমামতি করেছে সেই ২০১৪ সালে গ্রেফতার হওয়া জামাত নেতা। এতে আর বুঝতে বাকি থাকে না যে ঘটনাটি কি ঘটেছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরুর পর নামাজের পক্ষে কেউ কেউ বলতে চেয়েছেন এটি ছিল প্রতিকি প্রতিবাদ। এবার দেখা যাক পানিতে নামাজ পড়া নিয়ে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুজি।
১। কয়রা অঞ্চলে যেখানটা প্লাবিত হয়েছে সেখানে বা তার আসেপাশে এমন কোন উচু যায়গা কি ছিল না যেখানে নামাজ পড়া যায় ? অনেকেতো এক কিলোমিটার হেটে গিয়েও নামাজ পড়েন। এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি তাদের কাছে।

২। নামাজ , পূজা ধর্মীয় বিষয়। এগুলো করতে হয় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র যায়গায়। তারা পানিতে যেখানে নামাজ পড়েছে সে যায়গাটি কি পবিত্র ছিল। জলোচ্ছাসে সারা এলাকার মল মুত্রে সয়লাব ছিল যায়গাটি। এছাড়া নামাজ পড়তে হলে অজু করতে হয়। অপবিত্র যায়গায় নামার সাথে সাথেইতো তাদের অজু নষ্ট হয়ে গেছে। নামাজের মত ধর্মীয় একটি বিষয় নিয়ে তামাশা করা হয়েছে সেটাও গর্হিত কাজ হয়েছে। এর উত্তরও পাওয়া যায়নি।

৩। নামাজের ৩০ মিনিটের মধ্যে এই ছবি এবং ভিডিও মিডিয়াতে চলে আসলো কিভাবে সেটাও প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। আজাদ নামের যে ছেলেটি ছবি এবং ভিডিও করেছে সে তার ফেসবুকে একটি স্টেটাস দিয়েছে এ ঘটনার দুদিন আগে এমন একটি নামাজ হবে তার প্রচারণা চালানো হয়েছিল। সেও ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত ছিল।

১৯৭৪ সালে বাসন্তিকে জাল পরানো হয়েছিল, নাকি দারিদ্র্যের কারণে তিনি নিজেই জাল পরে সম্ভ্রম রক্ষা করেছিলেন, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক চলেছিল । কিন্তু ৭৪-এর দুর্ভিক্ষের পর বাসন্তির আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। কেউ আর বাসন্তির খোজ খবর রাখেনি।
এদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি বেদনাময় অধ্যায়ের নাম।

-অধ্যাপক রতন কুমার মজুমদার।
অধ্যক্ষ, পুরানবাজার ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর এর ফেসবুক ওয়াল থেকে নেয়া

Categories
জাতীয় মুক্তমত

বাউল মতবাদ ও আবিস্কারক রবীন্দ্রনাথ ভাবনা

রনজক রিজভী :

সাহিত্য সৌধের কালজয়ী এক প্রতিভার নাম কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ তাঁর ১৫৯তম জন্মজয়ন্তী। তিনি নিজেকে কেন্দ্রবিন্দু করেই ঘুরেছেন সাহিত্যাঙ্গন। একারণে নিজের উদাহরণ হয়েছেন নিজেই। এই মহাপুরুষের সাহিত্য সাধনার স্থান অনেকগুলো থাকলেও সাহিত্যতীর্থ ছিল একটাই। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ। এখানে এসে তিনি বাউল ভাবনার সহজ মানুষসহ পেয়েছেন গ্রামীণ জীবনের ছোঁয়া। এখানকার সুর বৈচিত্র আর ভৌগলিক প্রেক্ষাপটেই তিনি হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রবাউল।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউল মতবাদের একটি সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে শিলাইদহে। তিনি বাউল গানের ভাব-সাধন এখান থেকেই উলোটপালোট করে দেখেছেন। জেনেছেন বাউলদের সম্পর্কেও। সংগ্রহ করেছেন বাউল গান। আর এই বাউল গানের সুর ও ভাব তাঁকে কখন আকৃষ্ট করেছিল, তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। যার প্রভাব তাঁর বেশ কিছু গানে রয়েছে। এনিয়ে কেউ-কেউ বিভ্রান্তিকর কথা বললেও রবীন্দ্রসমুদ্র সম্পর্কে তাদের জানার সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ পায়। বাউল মতবাদে আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ যে একজন বড় মাপের আবিস্কারক, এ প্রমাণও তিনি দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে। তখন লালন ফকিরের আনুমানিক বয়স ৮৭ বছর। রবীন্দ্রনাথ আশি বছর তিন মাস বয়সে ২২ শ্রাবন ১৩৪৮ সালে (৭ আগষ্ট ১৯৪১) পরলোকগমন করেন। আর লালন ১৮৯০ সালে ১৭ অক্টোবর প্রায় একশত ষোল বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ত্রিশ বছর। এই সূত্রে বলা যায়, জমিদারীর কারণে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে এসে লালন ফকিরকে জেনেছিলেন। যখন লালন ফকির জীবিত ছিলেন। যা তিনি শিলাইদহে না এলে এই সুযোগ পেতেন না। তাঁর প্রাণধর্মের প্রেরণা আর বাউলের প্রেরণার উৎস ছিলো অভিন্ন। তাই বাউলের ‘মনের মানুষ’ তত্ত্বের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র একটি ঐক্য ও সাযুজ্যবোধ সহজেই আবিস্কার করা সম্ভব। বাউলগানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানববাদী জীবনচেতনার প্রেরণা অনুভব করেছিলেন। একারণে নিজে রবীন্দ্র বাউল বলেও ভেবেছেন।

জমিদারী পরিচালনার সূত্রে শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বাউল-ফকির ও বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর সংস্পর্শে আসেন। এখানেই বাউলগানের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। এই শিলাইদহেই বাউল-সংস্পর্শ লাভের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘হারামণি’র ভূমিকায় নিজেই বলেছেন: ‘শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউলদের সঙ্গে আমার সর্ব্বদাই দেখাসাক্ষাৎ ও আলাপ আলোচনা হ’ত। আমার অনেক গানেই বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞতসারে বাউলসুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে তখন আমার নবীন বয়স, Ñশিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল, ‘কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে/ হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে/ দেশ বিদেশ বেড়াই ঘুরে।’

লালন-শিষ্যদের সঙ্গে শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের দেখাসাক্ষাৎ ও দীর্ঘসময় আলাপ আলোচনা হয়েছে, এ-কথা তিনি কালীমোহন ঘোষের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজেই উল্লেখ করেছেন। লালন-শিষ্যদের মধ্যে পাঁচু শাহ, শীতল শাহ, ভোলাই শাহ, মলম শাহ, মানিক শাহ ও মনিরদ্দীন শাহ শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবির কাছে যাতায়াত করতেন বলে জানা যায়। কুঠিবাড়ির সঙ্গে ছেঁউড়িয়ার আখড়ার একটি অন্তরঙ্গ সম্পর্কও হয়েছিল।

শিলাইদহ পোস্ট-অফিসের ডাকহরকরা বাউলকবি গগন হরকরাকে রবীন্দ্রনাথই আবিষ্কার করে দেশ-বিদেশে পরিচিত করেন। বাউলগান রচয়িতা ও সুগায়ক হিসেবে তার বিশেষ খ্যাতি ছিলো। সেই সুবাদে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। গগনের থেকেই তিনি বিভিন্ন সাধকের বাউলগান শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রমানসে বাউলচেতনা সঞ্চারের মূলে রয়েছেন লালন ফকির ও গগন হরকরা। বাউলতত্ত্ব ও দর্শন সম্পর্কে তাঁর ধারণা-গঠনে গগনের ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটির ভূমিকা খুবই স্পষ্ট।

শিলাইদহে গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ, গোঁসাই রামলাল, গোঁসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী ও লালনের শিষ্যসম্প্রদায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হয়েছে। শিলাইদহ ও ছেঁউড়িয়া-অঞ্চল থেকে সংগৃহীত লালন ফকির ও গগন হরকরার গান তিনি সুধীসমাজে প্রচার করেন। একই সঙ্গে বাউলগান-রচয়িতা কুমারখালীর সাধক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের (১৮৩৩-১৮৯৬) সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের আলাপ-পরিচয়ের কথা জানা যায়। তবে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ ও পিতার সময়ে শিলাইদহে প্রজা-পীড়নের কথা হরিনাথ ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় প্রকাশ করে ঠাকুর-পরিবারের বিরাগভাজন হন। এইসব কারণে উভয়ের মধ্যে খুব একটা সহজ সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারেনি। এরপরও কাঙাল হরিনাথ প্রতিষ্ঠিত কুমারখালী মথুরানাথ মুদ্রাযন্ত্রের বাংলা ১৩০৭ সনের পত্র-নকল খাতার ২২০ নং পত্রে (১০ পৌষ ১৩০৭) জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ হরিনাথের বাউলগীতি-গ্রন্থসহ অন্যান্য কয়েকটি গ্রন্থ সংগ্রহ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের পরিচিত শিলাইদহ গ্রামের বাউলসাধকদের মধ্যে গোঁসাই রামলাল (১৮৪৬-১৮৯৪) ও গোঁসাই গোপালের (১৮৬৯-১৯১২) নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই দুই সাধকের সাধনপীঠও শিলাইদহ গ্রাম, কবির কুঠিবাড়ির খুব কাছে। গোঁসাই রামলালের সঙ্গে অবশ্য কবির পরিচয় দীর্ঘ হতে পারেনি। সুকণ্ঠ গোঁসাই গোপালের সাধনতত্ত্ববিষয়ক সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মাঝে-মধ্যে তিনি কুঠিবাড়িতে গোপালকে আমন্ত্রণ জানাতেন গান শোনার জন্য। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ গোঁসাই গোপালেরও কিছু গান সংগ্রহ করেছিলেন। এভাবে তিনি অনেককেই মূল্যায়ন করেছেন এবং অনেকের সাহিত্যকর্ম সংগ্রহও করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁকে আবিস্কারক বলা যেতে পারে। তাঁর সংগ্রহশালা থেকে এঅঞ্চলের অনেক গুণীজনকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।