Categories
মুক্তমত

রবীন্দ্রনাথ ও বাউল

শিলাইদহে এসেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউল মতবাদের একটি সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি বাউল গানের ভাব-সাধন এখান থেকেই উলোটপালোট করে দেখেছেন। জেনেছেন বাউলদের সম্পর্কেও। সংগ্রহ করেছেন বাউল গান। আর এই বাউল গানের সুর ও ভাব তাঁকে কখন আকৃষ্ট করেছিল, তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। যার প্রভাব তাঁর বেশ কিছু গানে রয়েছে। বাউল মতবাদে আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ যে একজন বড় মাপের আবিস্কারক, এ প্রমাণও তিনি দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে। তখন লালন ফকিরের আনুমানিক বয়স ৮৭ বছর। রবীন্দ্রনাথ আশি বছর তিন মাস বয়সে ২২ শ্রাবন ১৩৪৮ সালে (৭ আগষ্ট ১৯৪১) পরলোকগমন করেন। আর লালন ১৮৯০ সালে ১৭ অক্টোবর প্রায় ১১৬ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ত্রিশ বছর। এই সূত্রে বলা যায়, জমিদারীর কারণে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে এসে লালন ফকিরের জীবিতকালেই জেনেছিলেন। যা তিনি শিলাইদহে না এলে এই সুযোগ পেতেন না। তাঁর প্রাণধর্মের প্রেরণা আর বাউলের প্রেরণার উৎস ছিলো অভিন্ন। তাই বাউলের ‘মনের মানুষ’-তত্ত্বের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র একটি ঐক্য ও সাযুজ্যবোধ সহজেই আবিস্কার করা সম্ভব। বাউলগানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানববাদী জীবনচেতনার প্রেরণা অনুভব করেছিলেন। একারণে নিজে রবীন্দ্র বাউল বলেও ভেবেছেন।

জমিদারী পরিচালনার সূত্রে শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বাউল-ফকির ও বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর সংস্পর্শে আসেন। এখানেই বাউলগানের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। এই শিলাইদহেই বাউল-সংস্পর্শ লাভের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘হারামণি’র ভূমিকায় নিজেই বলেছেন- “শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউলদের সঙ্গে আমার সর্ব্বদাই দেখাসাক্ষাৎ ও আলাপ আলোচনা হ’ত। আমার অনেক গানেই বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞতসারে বাউলসুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে তখন আমার নবীন বয়স, Ñ শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল, ‘কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে/ হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে/ দেশ বিদেশ বেড়াই ঘুরে।’

লালন-শিষ্যদের সঙ্গে শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের দেখাসাক্ষাৎ ও দীর্ঘসময় আলাপ আলোচনা হয়েছে, এ-কথা তিনি কালীমোহন ঘোষের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজেই উল্লেখ করেছেন। লালন-শিষ্যদের মধ্যে পাঁচু শাহ, শীতল শাহ, ভোলাই শাহ, মলম শাহ, মানিক শাহ ও মনিরদ্দীন শাহ শিলাদিহে ঠাকুর কবির কাছে যাতায়াত করতেন বলে জানা যায়। কুঠিবাড়ির সঙ্গে ছেঁউড়িয়ার আখড়ার একটি অন্তরঙ্গ সম্পর্কও হয়েছিল।
শিলাইদহ পোস্ট-অফিসের ডাকহরকরা বাউলকবি গগন হরকরাকে রবীন্দ্রনাথই আবিষ্কার করে দেশ-বিদেশে পরিচিত করেন। বাউলগান রচয়িতা ও সুগায়ক হিসেবে তার বিশেষ খ্যাতি ছিলো। সেই সুবাদে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা ছিল। গগনের থেকেই তিনি বিভিন্ন সাধকের বাউলগান শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রমানসে বাউলচেতনা সঞ্চারের মূলে রয়েছেন লালন ফকির ও গগন হরকরা। বাউলতত্ত্ব ও দর্শন সম্পর্কে তাঁর ধারণা-গঠনে গগনের ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটির ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট।

শিলাইদহে গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ, গোঁসাই রামলাল, গোঁসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী ও লালনের শিষ্যসম্প্রদায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হয়েছে। শিলাইদহ ও ছেঁউড়িয়া-অঞ্চল থেকে সংগৃহীত লালন ফকির ও গগন হরকরার গান তিনি সুধীসমাজে প্রচার করেন। একই সঙ্গে বাউলগান-রচয়িতা কুমারখালীর সাধক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের (১৮৩৩-১৮৯৬) সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের আলাপ-পরিচয়ের কথা জানা যায়। তবে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ ও পিতার সময়ে শিলাইদহে প্রজা-পীড়নের কথা হরিনাথ ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় প্রকাশ করে ঠাকুর-পরিবারের বিরাগভাজন হন। এইসব কারণে উভয়ের মধ্যে খুব একটা সহজ সম্পর্ক ¯’াপিত হতে পারেনি। এরপরও কাঙাল হরিনাথ প্রতিষ্ঠিত কুমারখালী মথুরানাথ মুদ্রাযন্ত্রের বাংলা ১৩০৭ সনের পত্র-নকল খাতার ২২০ নং পত্রে (১০ পৌষ ১৩০৭) জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ হরিনাথের বাউলগীতি-গ্রš’সহ অন্যান্য কয়েকটি গ্রন্থ’ সংগ্রহ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের পরিচিত শিলাইদহ গ্রামের বাউলসাধকদের মধ্যে গোঁসাই রামলাল (১৮৪৬-১৮৯৪) ও গোঁসাই গোপালের (১৮৬৯-১৯১২) নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই দুই সাধকের সাধনপীঠও শিলাইদহ গ্রাম, কবির কুঠিবাড়ির অতি নিকটে। গোঁসাই রামলালের সঙ্গে অবশ্য কবির পরিচয় দীর্ঘ হতে পারেনি। সুকণ্ঠ গোঁসাই গোপালের সাধনতত্ত্ববিষয়ক সঙ্গীতের অনুরাগী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মাঝে-মধ্যে তিনি কুঠিবাড়িতে গোপালকে আমন্ত্রণ জানাতেন গান শোনার জন্য। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ গোঁসাই গোপালেরও কিছু গান সংগ্রহ করেছিলেন। এভাবে তিনি অনেককেই মূল্যায়ন করেছেন এবং অনেকের সাহিত্যকর্ম সংগ্রহও করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁকে আবিস্কারক বলা যেতে পারে। তাঁর সংগ্রহশালা থেকেই এঅঞ্চলের গুণীদের সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

রনজক রিজভী, গণমাধ্যম কর্মী।
www.ranjakrizvy.com
01711787379

Categories
মুক্তমত

বঙ্গবন্ধু কন্যা কথা রেখেছেন…

প্রায় ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে লাখো জনতার সামনে তিনি বলেছিলেন- “সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির জনকের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছু নেই। পিতা-মাতা, ভাই রাসেলকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের মাঝেই তাদের ফিরে পেতে চাই”। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর কথা রেখেছেন। প্রতিশ্রুতি থেকে কখনই সরে যাননি। দেশে ফেরার দিনটির মতো ঝড়-তুফান কখনই তাঁর পিছু ছাড়েনি। তবুও জনগণের পাশেই আছেন। ১৯ বার হত্যা চেষ্টার পরও শেখ হাসিনার ভাবনায় জনগণ ও দেশ। এর জন্যে বারবার তাঁকে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। সামরিক শাসকের অস্ত্র, রক্তচক্ষু, নিষেধাজ্ঞা আর নানামুখী ষড়যন্ত্র তাঁকে রুখতে পারেনি। তবে আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল ঘরে তুলতে দেয়নি ষড়যন্ত্রকারীরা। যার বড় প্রমাণ একানব্বইয়ের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়। কেন আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার পথে এতো বাধা, এতো ষড়যন্ত্র। এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূ-লুণ্ঠিত করা হয়েছে। বাঙালি জাতির অস্তিত্ব বিপন্ন করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরুও সেখান থেকে। বঙ্গবন্ধু ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিরুদ্ধে হুংকার দিয়েছিলেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ উচ্চারণ করেছিলেন। জনগণের পক্ষ ও স্বার্থ নিয়ে কথা বলে অনেকেরই প্রতিপক্ষ হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিকে কখনই প্রশ্রয় দেননি। দেশ ও জাতির কল্যাণ ছিল তাঁর স্বপ্ন ও লক্ষ্য। সেই জায়গা থেকে দেশকে পিছিয়ে দিতেই যতো ষড়যন্ত্র। সাম্প্রদায়িক শক্তি, পরাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদীরা বাংলাদেশকে দেখতে চেয়েছে তলাবিহীন ঝুড়ি। একটি সাম্প্রদায়িক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আধিপত্য বিস্তারও ছিল অগ্রগন্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা পরবর্তী রাজনীতিতে এর অনেক কিছুই দৃশ্যমান হয়েছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এবং পরাশক্তির উত্থান ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে, থাকবে। যা শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকাকালে কখনই সম্ভব হতো না। ষড়যন্ত্রকারীরা জানতো, আওয়ামী লীগ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে অনেক কিছুই বদলে দিতে পারে। আদায় করতেও জানে। দলটির প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এমনই ইতিহাস। আর বঙ্গবন্ধুর তেজদীপ্ত নেতৃত্ব আওয়ামী লীগকে দিয়েছিল ভিন্নমাত্রা। একারণে সেই রক্তের ধারা চিরতরে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টাই ছিল ঘাতকদের লক্ষ্য। আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে বারবার টার্গেট করার কারণও একই।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যদি দেশে না ফিরতেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দায়িত্ব না নিতেন। গণতন্ত্র, উন্নয়ন, প্রগতিশীল রাজনীতি, আধুনিক উন্নত সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আর জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণ কতোটা সম্ভব হতো। এই প্রশ্ন বারবারই সামনে আসে। কেননা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও এখনও চলমান। এরই মধ্যে সাম্প্রদায়িক শক্তি মাঝে মধ্যেই উঁকি দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল বা অংশীদার হতে সেই শক্তি জানান দিচ্ছে। যা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পতাকা নিয়ে শেখ হাসিনা শক্ত হাতে মোকাবেলা করে চলেছেন। দেশের অর্থনীতিসহ সামগ্রীক অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে নতুন এক চক্রান্তে অনেকেই যুক্ত। যা প্রতিহত করা একমাত্র শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব। একারণে বলার অপেক্ষা রাখে না, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না হলে অন্য এক বাংলাদেশকে দেখতে হতো। সাম্প্রদায়িক, পরাজিত শক্তি ও জঙ্গিবাদের উত্থান হতো। তাদের দাপটে পশ্চাৎমুখী হতো দেশ। সম্ভাবনার সব দুয়ার থমকে দাঁড়াতো। দীর্ঘ সামরিক শাসন আর সাম্প্রদায়িক শক্তির অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গঠিত সরকারের সময় পিছিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বকে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন শেখ হাসিনা। বিশ্ব মোড়ল তথা, নীতি নির্ধারণী দেশগুলোর সংলাপে তাঁর অংশগ্রহণ এবং পরামর্শও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। যা বাঙালি জাতির জন্যে গর্বের। এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান সৃষ্টি সামগ্রিক বিষয়েই ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ সবই শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ফল।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আন্দোলন সংগ্রামের রাজনীতি ও সরকার গঠনে সফল। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠা বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন মাইলফলক স্থাপন করেছে। সেই দিন বেশি দূরে নয়; বিশ্ব রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু কন্যা বারবার প্রাসঙ্গিক ও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবেন। সংকটেও সম্ভাবনা কীভাবে জাগিয়ে রাখতে হয়, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হয়, তা শেখ হাসিনার কাছ থেকেই বিশ্বকে শিখতে হবে। তবে বাংলাদেশের রাজনীতি তাঁর কাছ থেকে কতোটা শিখতে পেরেছে। জনগণ কতোখানি নিজেদের বদলেছে। ভাবার সময় এসেছে। কেননা শেখ হাসিনা যতো দূরে দেখতে পান, দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ এবং দেশের মানুষ সেই জায়গা থেকে এখনও অনেক পিছিয়ে। তাই সবাইকে শেখ হাসিনার মতো দূরদর্শী হওয়া দরকার। তবেই সবক্ষেত্রে কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তাহলে জনগণের পিছিয়ে থাকার দায় কে নেবে। অবশ্যই এ দায় সরকারের একার নয়। কারণ রক্ষণশীল মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে জনগণকেই। একই সঙ্গে অসাম্প্রদায়িক চেতনা জাগ্রত করতে হবে। ধর্মপরায়নের লেবাসে জঙ্গিবাদ বা উগ্রপন্থা লালন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। শিক্ষার সত্যিকারের আলো ছড়াতে হবে। এবং সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হলেই কেবল উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতিচর্চা ও বিকাশের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকবে। সেখানে পিছিয়ে থাকার কারণে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে মাঝে-মধ্যে সাম্প্রদায়িক শক্তির উল্লম্ফন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা দূর করতে শেখ হাসিনা নিশ্চয় সফল হবেন। বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে। সফল হতেই হবে। তা না হলে বাঙালি জাতি পিছিয়ে যাবে বহু দূর। অর্জনের বেশির ভাগই কালো ছায়ায় ঢেকে যেতে পারে।

রনজক রিজভী, গণমাধ্যম কর্মী।
rizvynca@gmail.com
01711787379

Categories
মুক্তমত

অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ

বিশ্বকবি, মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। তিনি সাহিত্য সৌধের এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তাঁর অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যকে করেছে ঐশ্বর্যমণ্ডিত। সাহিত্যের সব অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথের ছিল সমান পদচারণা। যেখানে তাঁর চিন্তা-দর্শন, দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি কখনও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন না। সহজ, সামগ্রিক এবং সাম্য ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের বেশিরভাগ সৃষ্টিকর্মে। উদার সংস্কৃতির জগত তাঁকে বাঙালির আত্ম-অন্বেষণে যেমন সহায়তা করেছে। তেমনি বাঙালি সংস্কৃতির রূপকারও হয়ে উঠেছেন। অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী সংস্কৃতি বিকাশে যাঁরা অগ্রগন্য; তাঁদেরও বাতিঘর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি অনেক বিতর্কের বেড়াজাল ভেদ করেছেন। তীব্র বিরোধীতার মুখোমুখি হয়েও রবীন্দ্রনাথ বাঙালির কবি এবং সকল সংকটে নির্ভরতার প্রতীক হয়ে আছেন আজও।

রবীন্দ্রনাথ অবিভক্ত ভারতের কবি। তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এক শ্রেণীর রক্ষণশীল শিক্ষিতরা তাঁকে ভারতীয় এবং হিন্দু কবি বলে প্রচার শুরু করেন। তাদের দাবি এবং পাকিস্তানের বিদ্বেষের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্র সাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চা সংকুচিত হলেও থেমে থাকেনি। পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা অব্যাহত থেকেছে। তাঁর সাহিত্যকর্মে অসাম্পদায়িক চেতনার জয়োগান ক্রমেই ধ্বনিত হতে থাকে। একটি সময় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বলয় থেকে রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের কবি হয়ে ওঠেন।

রবীন্দ্রনাথের অসাম্প্রদায়িক চেতনার স্বরূপ অনুসন্ধানে ধর্মচিন্তা ঘুরে দেখা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপূরুষরা উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। ইংরেজ আমলে রবীন্দ্রনাথের ষষ্ঠতম পূর্ব পুরুষ পঞ্চানন ‘ঠাকুর’ পদবী লাভ করেন। এরপর তাঁর উত্তরসূরীরাও নামের শেষে যুক্ত করতে থাকেন ঠাকুর পদবী। পঞ্চানন ঠাকুরের আদি নিবাস ছিল যশোরে। সেখান থেকে তিনি তৎকালীন কলকাতার গোবিন্দপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। পূর্বপুরুষদের এই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথ যে হিন্দু ব্রাহ্মণ বলা যাবে না। কারণ রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর

(১৮১৭-১৯০৫) ব্রাহ্মধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারি ছিলেন। রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) প্রবর্তিত ‘ব্রাহ্মধর্ম’ ছিল- উদার এবং মানবিক এক ধর্ম বিশ্বাস। তাঁর সংস্পর্শে এসে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধারণা বদলে যায়। এবং পৌত্তলিকতা বর্জন করেন। সেই অনুযায়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী একেশ্বরবাদী ছিলেন।

ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্ম সমাজদের কোনো মূর্তি নেই। জ্ঞান-ভিত্তিক আধুনিক বিজ্ঞানমনষ্ক চিন্তাধারার ভিত্তিতে ব্রাহ্ম মতের ভিত্তি স্থাপিত। তৎকালে অনেক শিক্ষিত জ্ঞানী-গুণী হিন্দু এ মতের অনুসারী হন। তবে রাজা রামমোহন রায় কোনো ধর্ম মন্দির প্রতিষ্ঠা করেননি। সম্পাদন করেন একটি দলিল। সেখানে উল্লেখ আছে, একেশ্বরের উপাসনা এবং জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলে উপাসনায় যোগ দিতে পারবেন এবং কোনোরূপ চিত্রকর্ম, প্রতিমূর্তি, প্রতিমা বা খোদিত মূর্তি এ উপাসনায় স্থান পাবে না। অথচ দেবেন্দ্রনাথ নিজ গৃহে ব্রাহ্মমন্দির স্থাপন করেন। সেখানে নিয়মিত উপাসনা ও ব্রহ্মসঙ্গীত গাওয়া হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শৈশব থেকে এ ধরনের সঙ্গীত শ্রবণের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছেন।

তাঁর বাবা ফরাসি কবি রুমী ও হাফিজের ভক্ত ছিলেন। ইসলামের সুফিবাদ ও বাউল মতাদর্শের প্রতি ভীষণ আকর্ষণও ছিল তাঁর। ছেলেদের ফারসি ভাষা শিক্ষাদানের জন্য বাড়িতে ফারসি মুন্সীও নিয়োগ দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মানস গঠিত হয়েছে বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদর্শে। যে কারণে তাঁর সাহিত্যে এর প্রচ্ছন্ন প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। বলা হয়ে থাকে, বাল্যকাল থেকে উদার চেতনা ও বিশ্বাসের মাঝে বেড়ে ওঠার কারণে রবীন্দ্র সাহিত্য হিন্দু, ব্রাহ্ম, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকেরাও খুব সহজে গ্রহণ করেছে।

১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার জন্য প্রথম কুষ্টিয়ার শিলাইদহে আসেন। এখানে এসেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাউল মতবাদের একটি সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি বাউল গানের ভাব সাধনা এখান থেকেই উলোটপালোট করে দেখেছেন। জেনেছেন বাউলদের সম্পর্কেও। সংগ্রহ করেছেন বাউল গান। আর এই বাউল গানের সুর ও ভাব তাঁকে কখন আকৃষ্ট করেছিল, তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। যার প্রভাব তাঁর বেশ কিছু গানে রয়েছে। বাউল মতবাদে আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ যে একজন বড় মাপের আবিস্কারক, এ প্রমাণও তিনি দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৬১ সালে। তখন লালন ফকিরের আনুমানিক বয়স ৮৭ বছর। রবীন্দ্রনাথ ৮০ বছর তিন মাস বয়সে ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ সালে (৭ আগস্ট ১৯৪১) পরলোকগমন করেন। আর লালন ১৮৯০ সালে ১৭ অক্টোবর প্রায় ১১৬ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ৩০ বছর। এই সূত্রে বলা যায়, জমিদারীর কারণে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে এসে লালন ফকিরের জীবিতকালেই জেনেছিলেন। যা তিনি শিলাইদহে না এলে এই সুযোগ পেতেন না। তাঁর প্রাণধর্মের প্রেরণা আর বাউলের প্রেরণার উৎস ছিলো অভিন্ন। তাই বাউলের ‘মনের মানুষ’-তত্ত্বের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনদেবতা’র একটি ঐক্য ও সাযুজ্যবোধ সহজেই আবিস্কার করা সম্ভব। বাউলগানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মানববাদী জীবনচেতনার প্রেরণা অনুভব করেছিলেন। একারণে নিজে রবীন্দ্র বাউল বলেও ভেবেছেন।

আরও পড়ুন : বাউল মতবাদ ও আবিস্কারক রবীন্দ্রনাথ ভাবনা

জমিদারী পরিচালনার সূত্রে শিলাইদহে এসে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বাউল-ফকির ও বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর সংস্পর্শে আসেন। এখানেই বাউলগানের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। এই শিলাইদহেই বাউল-সংস্পর্শ লাভের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘হারামণি’র ভূমিকায় নিজেই বলেছেন : “শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউলদের সঙ্গে আমার সর্ব্বদাই দেখাসাক্ষাৎ ও আলাপ আলোচনা হ’ত। আমার অনেক গানেই বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিনীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞতসারে বাউলসুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে তখন আমার নবীন বয়স, শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিল, ‘কোথায় পাব তারে/ আমার মনের মানুষ যে রে/ হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে/ দেশ বিদেশ বেড়াই ঘুরে। ‘এ থেকেও খুব সহজে অনুমেয় তিনি বাউলদের ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।

অসাম্প্রদায়িক উদার চেতনার কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবন-চৈতন্যকে গভীরভাবে আলোড়িত করতে পেরেছিলেন। হয়েছেন সবার স্বস্তির ঠিকানা। উৎসব-পার্বন থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি অনুসঙ্গেও মিশে আছে। যেখানে ব্যক্তি আর ধর্মচিন্তা মিশেছে গভীর এক গহ্বরে। প্রাণে আর প্রকৃতিতে শুধু ধ্বনীত হচ্ছে- রবীন্দ্রনাথের গানের কথা- ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি…

রনজক রিজভী
গণমাধ্যম কর্মী।
০১৭১১৭৮৭৩৭৯
ranjakrizvy.com

Categories
মুক্তমত

তবু অনন্ত জাগে

কলিকাতায় পঁচিশ বছর আগে সত্যজিৎ রায় স্মারক বক্তৃতা দিয়াছিলেন অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। সেই বক্তৃতার শিরোনাম ছিল: আওয়ার কালচার দেয়ার কালচার। আমাদের সংস্কৃতি, তাহাদের সংস্কৃতি। বাংলা, ভারত তথা প্রাচ্যের সহিত পশ্চিম দুনিয়ার সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের বিষয়টিকে এই উপলক্ষে নির্বাচন করিবার পিছনে এক দিকে ছিল বক্তা অমর্ত্য সেনের নিজস্ব চিন্তাভাবনা, অন্য দিকে ছিল সত্যজিৎ রায়ের জীবনদর্শন সম্পর্কে তাঁহার গভীর মূল্যায়ন। তাহা এক উদার, সহিষ্ণু, আন্তর্জাতিকতার দর্শন। তাহার মূলে রহিয়াছে আপন সংস্কৃতির গভীর চর্চা ও অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বসংস্কৃতির সহিত সংযোগ সাধন এবং সেই সংযোগ হইতে রসদ সংগ্রহ করিয়া আপন ভাবনা ও সৃষ্টিকে আবার বিশ্বের দরবারে পৌঁছাইয়া দেওয়া। ঘর ও বাহিরের এই নিরন্তর আদানপ্রদানের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি, গত দুই শতাব্দীর বাঙালি তাহারই ধারক এবং বাহক। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়াই সে বৃহৎ বাঙালি হইয়া উঠিতে পারিয়াছিল। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত তাহার শ্রেষ্ঠ প্রতিমূর্তি। সত্যজিৎ রায় সেই ধারার কৃতী অনুসারী। যেমন অমর্ত্য সেনও।

সত্যজিৎ রায় নিজে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। সারা জীবন আপন সৃষ্টিতে, কথায় ও লেখায় তিনি নিজেকে প্রসারিত বিশ্বের নাগরিক হিসাবেই দেখিয়াছেন। ভারতীয় তথা বাঙালির জীবন-ঐতিহ্য ছানিয়া আপন চলচ্চিত্র গড়িয়া তুলিবার সঙ্গে সঙ্গে সেই সৃষ্টিকে বিশ্বের দরবারে হাজির করিবার সুযোগও এই কারণেই তাঁহার নিকট অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। ১৯৮২ সালে এক নিবন্ধে তিনি লিখিয়াছিলেন, পথের পাঁচালী-র দীর্ঘ নির্মাণপর্বের মধ্যেই যখন অপ্রত্যাশিত ভাবে নিউ ইয়র্কের একটি ভবিষ্যৎ প্রদর্শনীতে তাহা দেখাইবার অগ্রিম প্রস্তাব আসে, তখন তাঁহার মন নাচিয়া উঠিয়াছিল। কারণ, তাঁহার অকপট উক্তি: “(ছবিটি নির্মাণের আর্থিক সংস্থানের তীব্র অভাব হেতু) ক্রমাগত বিপুল সঙ্কটে পড়িয়াও যে একটি কারণে আমি হাল ছাড়িয়া দিয়া সমগ্র প্রকল্পটি বন্ধ করিয়া দিই নাই, তাহা হইল এই আশা যে, এক দিন আমার ছবিটি পশ্চিম দুনিয়ার দর্শকদের নিকট পৌঁছাইবে।” ইহাকে নিছক পশ্চিমের বাহবা কুড়াইবার ক্ষুদ্র আগ্রহ মনে করিলে কেবল তাঁহার প্রতি বিরাট অন্যায় হইবে না, অন্যায় হইবে বৃহৎ বাঙালির ধারণাটির প্রতি। সেই বাঙালি আপন কৃতিকে বিশ্বের দরবারে পেশ করিয়া তবেই তাহার মূল্যায়ন করিতে চাহিয়াছে, কূপমণ্ডূকের আত্মপ্রশস্তি এবং পারস্পরিক পৃষ্ঠকণ্ডূয়নে তাহার মন ভরে নাই। সত্যজিৎ বৃহৎ বাঙালি ছিলেন।

আগামী কাল সত্যজিৎ রায়ের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হইতে চলিয়াছে। বাঙালি তাঁহাকে নানা ভাবে স্মরণ করিবে। কোন বাঙালি? সে কি আপন চিন্তায় চেতনায় বৃহৎ? তাহার আত্ম-অন্বেষা কি বিশ্বমুখী? বাহিরের সহিত নিরন্তর আদানপ্রদানের মধ্য দিয়া সে কি আত্মসংস্কৃতির বিকাশ ঘটাইতে আগ্রহী? পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকাইয়া এই প্রশ্নের উত্তরে একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস উঠিয়া আসে। বাঙালি এখন বিভিন্ন বিষয়ে তুচ্ছতার সাধক, বড় করিয়া কিছু ভাবিবার ক্ষমতাই সে যেন হারাইয়াছে। ব্যতিক্রম নিশ্চয় আছে, কিন্তু তাহা ব্যতিক্রম। সত্যজিৎ রায় আজ নাগরিক বাঙালির সমাজকে দেখিলে কী বলিবেন, তাহা লইয়া জল্পনার বিশেষ অবকাশ নাই। শেষ ছবি আগন্তুক-এ মনোমোহন মিত্রের কণ্ঠস্বরে তিনি তাঁহার কঠিন রায় শুনাইয়া দিয়া গিয়াছেন। তবে ইহাও সত্য যে, শেষ পর্যন্ত তিনি মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারান নাই। ছবির উপসংহারে মনোমোহন যখন তাঁহার বালক বন্ধু সাত্যকিকে জিজ্ঞাসা করেন, বড় হইয়া সে কী হইবে না, সেই কথা তাহার মনে আছে কি না, তখন তাহার বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুইটি সটান ছোটদাদুর চোখে রাখিয়া সেই ভাবী নাগরিক উত্তর দেয়: কূপমণ্ডূক। বাঙালি চিরকাল কূপমণ্ডূকই থাকিবে, সত্যজিৎ তাহা ভাবিতেন না।

সূত্র: আনন্দবাজার

Categories
মুক্তমত

প্রসঙ্গ মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারী

সত্য আর মিথ্যা ব্যাপক প্রচলিত দুটি বাংলা শব্দ। এই দুটি শব্দ যেমন একে অপরের পরিপূরক তেমনি বিপরীতও বটে। কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলে শুরু হয় সত্য মিথ্যার লড়াই। যেমন হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারী নিয়ে শুরু হয়েছে সত্য ও মিথ্যার লড়াই। তবে একথা সত্য যে, মিথ্যা খুবই শক্তিশালী একটি শব্দ। সত্য এই শব্দটির ঘোর শত্রু। সে মিথ্যাকে কোনো ভাবেই আরামে থাকতে দেয় না।

যেমন সত্য মিথ্যার এই লড়াই হেফাজতের মামুনুল হককে আরামে থাকতে দিচ্ছে না। আবার তাকে যারা নারীসহ ধরেছেন তারাও আছেন দৌড়ের ওপর। উভয় পক্ষ না হলেও কোনো কোনো পক্ষ যে, ঘটনাটিকে অনুকূলে রাখার জন্য মিথ্যা বয়ান দিচ্ছেন তা অনেকটাই দৃশ্যমান। আর সেই মিথ্যা বয়ানের আবরণকে টেনে আলগা করে দিচ্ছে সত্যের বিনা রশির দড়ি।
যে যত কথাই বলুক না কেন, হেফাজতে মামুনুল হকই যে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী নেতা এটা দিবালোকের মতো সত্য। মামুনুল হক ভারতের অত্যন্ত শক্তিশালী নেতা নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তার শক্তি দেখিয়ে দিয়েছেন। তার কাছে দৃশ্যত সব শক্তিই ফেল। বাংলাদেশে সুবিধা নিতে হলে বিএনপি আওয়ামী লীগ নয় হেফাজতকে তোষণ করতে হবে এটাও তিনি নরেন্দ্র মোদিকে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

শক্তির সঙ্গে নাকি মগজের রয়েছে আড়ি। শক্তি যার কাছে থাকে মগজ তার কাছে থাকতে চায় না। এই হেফাজত নেতার মাথায় কি আছে তা না বলাই শ্রেয়। মাত্র কয়েকদিন আগে তার দলের কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে মারা গেছেন ২০ জন। করোনা মহামারীর নির্দেশনায় সারাদেশ। এমন একটি সময়ে তিনি একজন নারী নিয়ে রিসোর্টে বিনোদন করতে যান কিভাবে?

এখানেই শেষ নয়। রিসোর্টের সিসি ক্যামেরার সামনে দিয়ে ওই নারীকে নিয়ে গেছেন রিসোর্টে। রেজিস্টারে স্ত্রী হিসেবে বিনোদন সঙ্গিনীর নাম লিখেছেন। এরপর যখন স্থানীয়রা এসে চার্জ করেছেন তখন মাথায় টুপি রেখে আল্লার নামে কসম কেটেছেন। বলেছেন আমিনা তাইয়্যেবা তার দ্বিতীয় স্ত্রী। অপর দিকে আমিনা বলেছেন তার নাম জান্নাত আরা ঝর্ণা। এতেই প্রতীয়মান হয় যে ওই নারী তার স্ত্রী নয়। আবার সেই ফাঁদ থেকে ছাড়া পেয়ে মোবাইলে স্ত্রীকে বলেছেন ওই মহিলাটি তার বন্ধু জাফর শহিদুলের স্ত্রী। যদি তাই হয় তবে তিনি কি রিসোর্টে আল্লার নামে কসম কেটে মিথ্যা বয়ান দিয়েছেন? তার আমিনা নিজেকে জান্নাত আরা ঝর্ণা বলে পরিচয় দিয়েছেন। এখানেও দেখা দিয়েছে সত্য মিথ্যার সেই লড়াই।
সন্ধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে পরিবারের মুরুব্বীদের বসিয়ে রেখে দাবি করেছেন ওই মহিলা তার দ্বিতীয় স্ত্রী। এ ব্যাপারে মুরুব্বীরা ছিলেন নিরব। রাতে ঝর্ণাকে ফোন করে তার খোঁজ খবর নিতে গিয়ে নিজেই হয়ে গেছেন সত্যের স্বাক্ষী। ঝর্ণা বলেছেন কি করতে গেলাম আর কি হয়ে গেল।

আসলে তারা কি করতে রিসোর্টে গিয়েছিলেন তা হয়ে উঠলো আরও রহস্যময়। বিষয়টি এমন নয়তো যে ঝর্ণা স্বামী জাফর শহিদুলকে ফেরত পাওয়ার নিবেদন করতে গিয়ে হয়ে গেলেন মামুনুলের দ্বিতীয় স্ত্রী?

আবার রাতে হেফাজতের এক নেতা তার বন্ধু ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদকের কাছে ফোন করে জেনে নিলেন ঘটনাটি ছিল তাদের পাঁতা ফাঁদ। এই দাবি অমূলক নাও হতে পারে।
সে যাই হোক না কেন বিভিন্ন ভিডিও ও অডিও ইতোমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে সত্যের গুড় আঁধারেও মিষ্টি।

Categories
মুক্তমত

গরুদের হারিয়ে মুরগিদের আনন্দ মিছিল

মাংসের দামে গরুদের হারিয়ে দেয়ার ঘটনায় মুরগিরা রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় আনন্দ মিছিল করেছে। মুরগিদের নেতৃস্থানীয়রা বলেছেন, দশকের পর দশক ধরে চলা কঠোর পরিশ্রমের ফসল এবার পাওয়া গেছে। মাংসের দামের নিরিখে গরুরা এখন কম দামি। দাম বেড়েছে মুরগিদের। আর এই অর্জন এসেছে দেশি মুরগিদের ‘পা’ ধরে। স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে এ এক অনন্য অর্জন।

বাজারে গরুর চেয়ে মুরগির মাংসের কেজিপ্রতি দাম বেড়ে যাওয়ার খবরে সন্তোষ প্রকাশ করে সম্প্রতি এমন আনন্দ মিছিল বের করে নিখিল বাংলাদেশ মুরগি সমাজ। তবে সেদিন সব রাজপথে তারা বিচরণ করতে পারেনি। ভিভিআইপি মানুষদের আনাগোনা এবং সে কারণে রাস্তায় যান ও প্রাণী চলাচল নিয়ন্ত্রণ করায়, আনন্দ মিছিলের অভিমুখ বারবার পরিবর্তন করতে হয়। তবে সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় করে যথাসম্ভব চাকচিক্যের সঙ্গে আনন্দ মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল। এ সময় কিছু গরুকে বিমর্ষ চিত্তে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তাদের অনুভূতি জানতে চাওয়া হলেও, শুধু লেজ নাড়ানো ছাড়া মুখ খোলেননি তারা। ইঙ্গিতে জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে তাদের অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে।

সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, বাজারে দুই জাতের মুরগির দাম গরুর মাংসকে ছাড়িয়ে গেছে। সোনালিকা মুরগির দামের কেজি উঠেছে ৩৮০ টাকায়। এ দরে জীবিত মুরগি কিনলে শুধু মাংসের দাম দাঁড়ায় ৫৮০ টাকার মতো। বাজারে এর সমান দামে গরুর মাংসও পাওয়া যায়। অন্যদিকে দেশি মুরগির মাংসের দাম গরুর চেয়ে অনেকটাই বেশি। চামড়া, পশম ও নাড়িভুঁড়ি বাদ দিলে দেশি মুরগির শুধু মাংসের কেজি দাঁড়ায় সাড়ে ৭০০ টাকার মতো।

মুরগির দামের গরম বাতাস বইছে অনলাইন জগতেও। ভার্চ্যুয়াল বাজারে রিয়েল সোনালিকা জাতের মুরগির এক কেজি ওজনের দাম প্রায় ৬৪০ টাকা। আর দেশি মুরগির কেজি দাঁড়াচ্ছে পৌনে ৮০০ টাকার মতো। যদিও গরুর মাংসের কেজি চাওয়া হচ্ছে ৬০০ টাকার নিচে।

নিখিল বাংলাদেশ মুরগি সমাজ আনন্দ মিছিলে জানিয়েছে, কিছুদিন আগে মাংসের চেয়ে ডিমের দাম কম হওয়ায় তারা আন্দোলন করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেই আন্দোলনে ভয় পেয়েই বাজারে এখন মুরগির ন্যায্য দাম উঠেছে। মনুষ্য চরিত্রের সমালোচনা করে এ সময় বলা হয়, ‘আমরা জানি, মানুষেরা বেশির ভাগই শক্তের ভক্ত, নরমের যম। ডিম নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে মনে রাখতে হবে যে ডিম কিন্তু আমরাই পাড়ি। সুতরাং, মানুষকে অন্য অর্থে “ডিম দেওয়া” আমাদের জন্য অসম্ভব কিছু নয়।’

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মাস তিনেক আগের হিসাব তুলনায় নিলে সোনালিকা জাতের মুরগির দাম বেড়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ। দেশি মুরগির দাম বেড়েছে ২৯ শতাংশের মতো। বাজারমূল্যে দেশিদের এমন উত্থানে পিছিয়ে থাকতে চাইছে না ব্রয়লার মুরগিও। কেজিতে দাম বেড়েছে ৩০ টাকার মতো।

নিখিল বাংলাদেশ মুরগি সমাজ আয়োজিত আনন্দ মিছিলে বিতরণ করা লিখিত বিবৃতি অনুযায়ী, মুরগিরা অনেক দিন থেকেই ন্যায্য দাম পাচ্ছিল না। আকারে বড় ও নানাবিধ কারণে গরুদের দাম বাড়িয়ে মুরগিদের আক্ষরিক অর্থেই ‘মুরগি’ বানানো হচ্ছিল। কিন্তু এবার সেই দুষ্টচক্র ভাঙা গেছে। যদিও ডিমের বাজারে এখনো সেভাবে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে না। তবে দেশীয় সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে মাংসের দামের ঘোড়াকে ‘উন্মাদ’ বানিয়ে দেওয়া গেছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি ভেদাভেদ রাখতে চায় না মুরগিদের নেতারা। ব্রয়লারকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে চায় সমৃদ্ধির পথে।

মুরগিদের এমন আনন্দ মিছিলে কিঞ্চিৎ উত্তেজনা-উৎকণ্ঠাও ছিল। রাস্তায় কিছু গরুকে উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুরগিরা আনন্দ পেলেও, যখন ভিভিআইপিদের চলাফেরার কারণে মুরগিদের মিছিলকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢোকার জন্য বাধ্য করা হচ্ছিল, তখন মুরগি নেতারা আতঙ্কিত হয়ে এর প্রতিবাদ শুরু করেন। তাদের আশঙ্কা, এই আনন্দ মিছিলকে ‘প্রতিবাদ মিছিল’ মনে করে হেলমেট পরা সুসজ্জিত কোনো দলকে তাদের ওপর লেলিয়ে দিতে পারে স্বার্থান্বেষী মহল। এ সময় এক মুরগি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা আমাদের ছোট মাথা অনুযায়ী বিশেষ হেলমেটের ক্রয়াদেশ দিয়েছি। তা এখনো আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। সেগুলো পাওয়ার আগপর্যন্ত আমাদের পক্ষে অরক্ষিত অবস্থায় ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব হবে না।’ পরে অবশ্য মুখ খোলা যাবে না, এমন শর্তে তাদের রাস্তার পাশে এক কোণে নির্বিবাদে দাঁড়িয়ে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।

এদিকে মুরগিদের এমন মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে গরুরা হতাশ হলেও এ বিষয়ে ‘গোবন্ধন’ আয়োজনের মতো শক্ত পদক্ষেপ নিতে চাইছে না তারা। জাতীয় গোবৎস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের একজন বিশিষ্ট নেতা বলেন, মানুষের সঙ্গে তারা দ্বন্দ্বে যেতে চাইছেন না। মাস তিনেকের মধ্যেই তারা ফর্মে ফিরে আসবেন বলে ধারণা করছেন। আর তা-ও না হলে কোনো এক ঈদের পর আন্দোলন করা হতে পারে। সেটিই হবে ‘ট্রাম্প কার্ড’।

ওই নেতা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে এ-ও বলেছেন, ‘মুরগিদের আবারও “মুরগি বানানো” সময়ের ব্যাপার মাত্র। স্থানীয় অনেক মানুষও আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হচ্ছেন। ফলে আমাদের সাংগঠনিক শক্তি ক্রমশ বাড়ছে। গরুদের সঙ্গে মানুষদের একটি বিরাট অংশের মস্তিষ্কজনিত যে নিবিড় সম্পর্ক আছে, তাতে মুরগিরা তাদের ছোট মাথা দিয়ে চিড় ধরাতে পারবে না। কথায় আছে, বেশি বাড় বেড়ো না, ঝরে পড়ে যাবে। দেশি-ব্রয়লার সবার ক্ষেত্রেই এমনটা হতে পারে।’

এমন হুমকিতে অবশ্য ভয় পাচ্ছে না সোনালিকা ও দেশিরা। তারা বলছে, মানুষ এমন প্রাণী যে এরা যেদিকে বৃষ্টি হবে, সেদিকেই ছাতা ধরবে। প্রয়োজনে এরা স্বজাতিকেও ‘মুরগি বানায়’, ‘গরু’ বলে গালি দেয়। এমন প্রজাতির প্রাণীকে ‘অলটাইম দৌড়ের ওপর’ রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। সেটা যখন সম্ভব হয়েছে, তখন গরু কোন ছার!

সূত্র: প্রথম আলো।

Categories
মুক্তমত

মুজিব চিরন্তন

বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৭ মার্চ ১৯২০ সালে– সে অনুযায়ী ২০২০ সালকে সামনে রেখে উৎসবমুখর পরিবেশে দেশে-বিদেশে তার জন্মশতবার্ষিকী আয়োজনের ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ২৬ শে মার্চ ২০২১ পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ উদ্‌যাপনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছিল তারও আগে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন যাত্রার প্রাক-মুহূর্তে শুরু হয় বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯। এরূপ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিছু কর্মসূচির বাস্তবায়ন কাজ অসমাপ্ত থাকার বিষয়টি বিবেচনায় এনে সম্প্রতি সরকার এ সময়কে ১৬ই ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে।

মুজিব শতবর্ষ উদ্‌যাপন প্রতিটি বাঙালির জীবন অভিজ্ঞতার অসাধারণ একটি অংশ। তাই এ আয়োজনে বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী বাঙালিরা যার যার অবস্থান থেকে বিপুলভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতিতেও সারা পৃথিবীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা রকম আয়োজন চলছে। মুজিববর্ষের লোগো দেশে-বিদেশে এখন দৃশ্যমান। অন্তর্জালে নানা আয়োজনে সংযুক্ত হচ্ছেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞজন। সারা পৃথিবীতে বাঙালির সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে তারা। সর্বত্রই বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। তাদের আলোচনায়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, আত্মত্যাগ ও জীবনব্যাপী আন্দোলন-সংগ্রাম উদ্ভাসিত হচ্ছে। মুজিববর্ষে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ব্যাপকভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে এটি স্পষ্ট যে বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ে অবিনশ্বর এক আসন নিয়ে আছেন যা বাঙালির হাজার বছরের অতিক্রান্ত ইতিহাসে অন্য কোনো নেতা নিতে পারেনি। বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু, এটি আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য।

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিলে প্রকাশিত নিউজ উইক পত্রিকায় সাংবাদিক লরেন জেনকিন্স বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে লিখেছেন:

তার তেজস্বিতা দুর্দান্ত; পূর্ব পাকিস্তানিরা তাকে ‘মুজিব’ নামে চেনে। তিনি আমাদের বিদেশি সাংবাদিক দলটির সঙ্গে তাঁর বাড়ির বাগানে মুখোমুখি হলেন এবং আবেগদীপ্ত ভাষায় বললেন, “আমার জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধ। তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। আপনারা কি মনে করেন, মেশিনগান আমার জনসাধারণেরে আত্মা ও চেতনা আদৌ নিশ্চিহ্ন করতে পারবে?

বঙ্গবন্ধুর অন্য সকল দূরদর্শী মন্তব্য ও ভবিষ্যদ্বাণীর মতো এই কথাও সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে তার প্রিয় বাঙালির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার চেতনাকে হত্যা করতে পারেনি। এটি আজ তার শাহাদত বরণের এত বছর পর আরও স্পষ্ট হয়েছে যে বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন আলোকশিখা হিসেবে আছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ১৬ অগাস্ট সকালে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ নিয়ে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে যখন হেলিকপ্টার যাত্রা করে, ঘাতক কবলিত বাংলাদেশের সেই শোকাবহ শ্বাসরুদ্ধকর সময়ে কোটি কোটি মানুষ ঘটনার আকস্মিকতায় তাদের শোক ও অশ্রুকে চাপা দিয়ে রেখেছিল। সেই মৃত্যুপুরীতে বঙ্গবন্ধুর শবযাত্রা সম্ভব হয়নি। টুঙ্গিপাড়ায় খুব তাড়াহুড়ো করে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানকে দাফন করা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর অন্তিমযাত্রা চিরবেদনার অংশ হয়ে আছে। যেন এখনও জাতি বহন করে চলেছে তার প্রিয়তম সন্তানের মরদেহ; বহন করবে চিরকাল।

আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী কিংবা জন এফ কেনেডির মৃত্যুর পরে তখন পরিস্থিতি প্রতিকূল ছিল না। জনগণ প্রকাশ্যে শোক প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছিল। ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল আততায়ীর গুলিতে আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যু ঘটে। আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যু আমেরিকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মৃত্যুর পরে তার মরদেহ ওয়াশিংটন থেকে ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। এই দীর্ঘ যাত্রায় ২২ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল– ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, “The light has gone out”। আমাদের জাতীয় জীবনেও নেমে এসেছিল ঘোর অমানিশা যা থেকে আলোর পথে উত্তরণ ছিল সুকঠিন ও শ্বাপদসংকুল পথযাত্রা।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের সেই কালরাতে তারা শুধু বঙ্গবন্ধুকে যে হত্যা করতে চেয়েছিল তা নয়, তারা চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিনাশ করতে– মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের সকল শুভ বোধ, শুভ অর্জনকে ধ্বংস করতে। বিদেশে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুইকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, সেই সঙ্গে বেঁচে যায় বাংলাদেশ। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পর শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই। বহু মানুষ জীবন দিয়েছিল, কিন্তু শেষাবধি ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ফিরে এসেছে।

প্রতিবছর বঙ্গবন্ধু নবভাবে উদ্ভাসিত হচ্ছেন। এবার, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর যুগপৎ মহা-আয়োজনের অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে চলেছে সমগ্র বাঙালি জাতি। এজন্য ১৭-২৬শে মার্চ ২০২১ ‘মুজিব চিরন্তন’ শীর্ষক দশদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, জীবনব্যাপী আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সর্বোপরি তার বৈচিত্র্যময় জীবনের নানান অনুষঙ্গকে উপজীব্য করে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা সাজানো হয়েছে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চের শুভক্ষণে বঙ্গবন্ধুর জ্যোতির্ময় আবির্ভাবকে উপজীব্য করে ১৭ মার্চ ২০২১ তারিখে জাতির পিতার জন্মতিথির জন্য প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে কবিগুরু রবিঠাকুরের মহানায়কের প্রার্থনায় রচিত অমর পঙ্‌ক্তি, ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়’।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ও কালজয়ী ভাষণ, যা বাঙালির জাতীয় জীবনে চূড়ান্ত বাঁকবদল ঘটিয়েছিল, সেটির উপর ভিত্তি করে ১৮ মার্চের অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে ‘মহাকালের তর্জনী’। বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন সত্তা। বাংলাদেশের প্রকৃতি-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে প্রতিটি অনুষঙ্গে জড়িয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু শাশ্বত মহিমাকে উপজীব্য করে ১৯ মার্চের নির্ধারিত থিম কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই অমর পঙ্‌ক্তি ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা’। বঙ্গবন্ধুর যে সাহসী তারুণ্য বাঙালি জাতিকে মুক্তির আন্দোলনে প্রজ্জ্বলিত করেছিল তার ভিত্তিতে ‘তারুণ্যের আলোকশিখা’কে ২০ মার্চের প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়াও জাতির পিতার স্বদেশ নির্মাণের নিরলস প্রচেষ্টা ও সাফল্যগাথার ভিত্তিতে ২১ মার্চে ‘ধ্বংসস্তূপে জীবনের গান’; বাংলা ও বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধকে উপজীব্য করে ২২ মার্চে ‘বাংলার মাটি আমার মাটি’; নারীমুক্তির জন্য জাতির পিতার অসমান্য ভূমিকার ভিত্তিতে ২৩ মার্চে ‘নারীমুক্তি, সাম্য ও স্বাধীনতা’; বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতার বলিষ্ঠ ভূমিকাকে উপজীব্য করে ২৪ মার্চে ‘শান্তি, মুক্তি ও মানবতার অগ্রদূত’; পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার নির্মমতা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে উপজীব্য করে ২৫ মার্চে ‘গণহত্যার কালরাত্রি ও আলোকের অভিযাত্রা’ এবং মহান স্বাধীনতার অতিক্রান্ত ৫০ বছর ও অজস্র ষড়যন্ত্র-প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার বিভিন্ন দিককে উপজীব্য করে ২৬শে মার্চে ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’কে প্রতিপাদ্য হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সম্প্রতি দেশে-বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ অনেক লিখেছেন; তার জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন। যতকাল যাবে তাকে নিয়ে, তার দর্শন, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবোধ নিয়ে আরও লেখা হবে। মূলত মৃত্যুর পরে বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধার যে যাত্রা এখন শুরু হয়েছে তা ‘মুজিব চিরন্তন’-এর যাত্রা। তাই মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের মাধ্যমে বাঙালির এ যাত্রা শেষ হবে না। এটি অন্তহীনভাবে চলবে এবং জাতির সৃজনে, মননে, দর্শনে এবং চিন্তায় বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম এবং আত্মত্যাগের মহিমা আরও উদ্ভাসিত হবে। বুলেট বাঙালির মুক্তির মহানায়কের চেতনা ও আত্মাকে ধ্বংস করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর সেই অবিনাশী চেতনাই মুজিববর্ষে আমাদের ‘মুজিব চিরন্তন’ যাত্রায় আমাদের অসীম প্রেরণা।

লেখক: কবি ও প্রধান সমন্বয়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি।

Categories
মুক্তমত

সাতই মার্চের ৫০ বছর

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ৫০ বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখনো আমার চেতনায়, আমার হৃদয় জুড়ে রয়েছে অসম্ভবকে সম্ভব করার সেই দিনটি। ঘোষণা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিবেন রেসকোর্স ময়দান থেকে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) এবং তা সরাসরি প্রচারিত হবে রেডিও ও টেলিভিশন থেকে। ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারের উদ্দেশ্যে আমরা সবাই প্রস্তুত হলাম ৭ই মার্চ সকাল থেকে। রেডিও-র পরিচালক জনাব আশরাফুজ্জামান খান আমাদেরকে ডেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। বেতার ভবনে দায়িত্বে থাকবেন আশফাকুর রহমান খান ও বাহারাম উদ্দিন সিদ্দিকী, এবং জাহিদুল হক ডিউটি রুমে। রেসকোর্স মাঠে থাকবেন শামসুল আলম ও কাজী রফিক। এবং স্টেজে থাকবেন পরিচালক আশরাফুজ্জামান খান, সহকারী পরিচালক আহমেদ জামান খান এবং অনুষ্ঠান সংগঠক আমি নাসার আহমেদ চৌধুরী। ভাষণ সরাসরি প্রচার এর জন্য উপস্থিত ছিলেন প্রকৌশল বিভাগের কর্মচারীরা। ঐতিহাসিক ভাষণ শুরু হওয়ার মুহূর্তে বাহারাম উদ্দিন সিদ্দিকী আমাদেরকে টেলিফোনে জানালেন, পাক আর্মির মেজর সালেক জানিয়েছেন ভাষণ প্রচার করা যাবে না। ভাষণ প্রচার করা হলে বোমা মেরে রেডিও উড়িয়ে দেওয়া হবে। ততোক্ষণে বঙ্গবন্ধু ভাষণ প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হলো। সারা দেশ তখন পাক আর্মির দখলে। এক টুকরো ছোট কাগজে লিখে বঙ্গবন্ধুর হাতে দেওয়া হলো আপনার ভাষণ পাক আর্মি প্রচার করতে দিচ্ছে না।

সারা দেশ সারা জাতি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল। আমি তখন জীবনের পুরোপুরি ঝুঁকি নিয়ে আমার সঙ্গে নেওয়া ছোট উহার রেকর্ডারে লুকিয়ে সমস্ত ভাষণ রেকর্ড করে ফেললাম। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে রেডিও-টেলিভিশন অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণা করলেন এবং প্রস্তুত থাকতে বললেন। আমরা তার কথামতো সমস্ত ভিডিও প্রচার বন্ধ করে দিলাম এবং আমরা হাতিরপুলে কাজী রফিকের বাসায় আত্মগোপন করে রইলাম। রেডিও প্রচার বন্ধ হওয়ায় পাকিস্তানি সরকার এবং সেনাবাহিনী হতভম্ব হয়ে গেল। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকলো না। যার ফলে সেনাবাহিনী রেডিও-র কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো।

তৎকালীন সেনাপ্রধান রাও ফরমান আলী আশরাফুজ্জামান খানকে অনুরোধ করলেন, দয়া করে আপনারা রেডিও প্রচার শুরু করুন এবং শেখ মুজিবের ভাষণ প্রচার করুন। তখন সেই ভাষণ, যা আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেকর্ড করেছিলাম, সেটাই পরের দিন প্রচার করা হলো। সেই ভাষণ শুনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। নয় মাস লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের সেই সময়ের অবদানের মূল্যায়ন কিন্তু আজও হলো না। এদিকে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই অসহযোগ আন্দোলন, ৭ই মার্চের ভাষণ প্রচার, এবং রেডিও পাকিস্তানের নাম পরিবর্তন করে ঢাকা রেডিও করার জন্য আমাদের ওপর শুরু হলো পাকিস্তান আর্মির স্টিমরোলার চালানো।

পরিচালক আশরাফুজ্জামান সাহেবকে সরিয়ে তার স্থলে আনা হলো প্রাক্তন রেডিও পরিচালক সৈয়দ জিল্লুর রহমানকে। একদিন পাকিস্তান আর্মির কর্নেল কাশেম রেডিওতে এসে হাজির হলেন। একে একে আমরা যারা যারা অসহযোগ আন্দোলনে জড়িত ছিলাম তাদের মধ্যে পরিচালকরা নুরুন্নবী খান, দিলরুবা বেগম, শামসুল আলম, কাজী রফিক সবাইকে সাসপেন্ড করা হলো। আর আমাকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো ক্যান্টনমেন্টে। পরিচালক জিল্লুর রহমান সাহেব আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন ও খুব ভালোবাসতেন। রেডিওতে চাকরি তিনিই আমাকে দিয়েছিলেন। কর্নেল কাশেম জিল্লুর রহমান সাহেবের কক্ষে বসা। সেখানে আমার ডাক পড়লো। আমার সব সহকর্মী আমার প্রাণের জন্য দোয়া শুরু করলো। দুরু দুরু বুকে আমি পরিচালকের কক্ষে হাজির হলাম। জিল্লুর রহমান সাহেব তার চেয়ারে বসা। কর্নেল কাশেম তার পাশে হাতে ব্রিফকেস কোমরে পিস্তল নিয়ে বসে আছেন। জিল্লুর রহমান সাহেব কর্নেল কাশেমকে আগেই বলে রেখেছিলেন যে আমার কোন অফিসারকে ধরে নিতে পারবেন না। এদের ছাড়া আমি রেডিও চালাতে পারবো না।

কর্নেল কাশেম আমাকে জেরা শুরু করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম নাসের চৌধুরী? আমি বললাম, জি স্যার। তুমি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ আমাদের নিষেধ সত্ত্বেও রেকর্ড করেছিলে? আমি বললাম, জি। কেন করেছিলে? আমার উত্তর দেওয়ার পূর্বে জিল্লুর রহমান বললেন, পরিচালকের নির্দেশে রেকর্ড করেছিল। পরের প্রশ্ন, তুমি শেখ মুজিবকে চিরকূট লিখে জানিয়েছিলে তার ভাষণ প্রচার করা হচ্ছে না। আমি বললাম, “না আমি চিরকূট লিখিনি।” কর্নেল বললেন, “আমার কাছে চিরকূটের ছবি আছে তুমি সেটা শেখ মুজিবের হাতে দিচ্ছো।” আমি বললাম, “আমি লেখিনি, আমি দিইনি।” বললেন, “তোমাকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেলে তুমি সবই বলবে।” আমার মনে পড়ে তখন জিল্লুর রহমান সাহেব আমাকে বাঁচাতে কর্নেলকে বললেন, “ও অত্যন্ত ভালো ছেলে। সে একজন ভালো অফিসার ও ভালো গান গায়। মেহেদী হাসানের গান গজল খুব সুন্দর গায়। ওর মামা আলী হাসান পাকিস্তানের সিএসপি অফিসার। সেক্রেটারি। কর্নেল, আমি তার দায়িত্ব নিজে নিচ্ছি।”

আমি আবার আসবো বলে কর্নেল চলে গেলেন। কর্নেল চলে যাওয়ার সাথে সাথে জিল্লুর রহমান আমাকে একদিনের নোটিশে চট্টগ্রাম রেডিওতে বদলি করে দিলেন। আমার প্রাণ রক্ষা পেল। চট্টগ্রামে সাতদিন থাকার পর আমি ঢাকায় ফিরে এলাম। তবে রেডিওতে আর যোগদান করলাম না। ততদিনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমি দেশাত্মবোধক গানের টেপ মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন রুমির মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠাতাম। মুক্তিযোদ্ধা মায়া গ্রুপের সিরাজ উদ্দিন ভূঁইয়া আমার বন্ধু। শেরাটন হোটেলে ও আজিমপুর গার্লস স্কুলে বোমা ফাটাতে তাকে সাহায্য করলাম। ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। ১৭ ডিসেম্বর আবার রেডিওতে দিলাম। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দৈনিক পত্রিকায় আমার নাম প্রকাশিত হলো। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্বীকৃতি আমি আজও পাইনি।

Categories
মুক্তমত

এশিয়ায় বিস্ময়কর ‘ডিজিটাল লিডার’ বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি প্রবন্ধ ৩ মার্চ বুধবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘নিউজউইক’ এ ছাপা হয়েছে। পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো-

এক দশকেরও বেশি আগে বাংলাদেশ ঘোষণা করেছিল, প্রতিষ্ঠার ৫০তম বার্ষিকী বা ২০২১ সালের মধ্যে প্রযুক্তিতে অগ্রগামী দেশ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবে। আমরা যে এটা করতে পারব তা খুব বেশি মানুষ বিশ্বাস করেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে যখন দায়িত্ব নিলেন তখন দেশের মাত্র ২ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন ছিল। অথচ এখন কমপক্ষে ১২ কোটির বেশি বাংলাদেশির হাতে মোবাইল ফোন এবং লাখ লাখ মানুষের কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ আছে, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। ফলে জীবন উন্নত ও নিরাপদ হয়েছে দেশের অগণিত মানুষের।

২০০৯ সালে উচ্চাভিলাষী ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয় দ্রুত সেবা দেয়া, কাগজভিত্তিক সরকারি সেবাকে ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনভিত্তিক প্রোগ্রাম ব্যবহার করে সহজ করে তোলার লক্ষ্যে। ই-সিগনেচার এবং ইলেকট্রনিক ফাইলিং ব্যাপকভাবে চালু করা হয়।

সরকার সারা দেশে ৮৫০০ ডিজিটাল সেন্টারের একটি নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছে, যার মাধ্যমে জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত সব ধরনের সেবা অনলাইনে দেয়া হচ্ছে। জন্ম নিবন্ধন, চাকরি প্রাপ্তি এবং অনলাইনে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি অনেক সহজ হয়েছে। অনেক জাতীয় কর্মসূচি এখন অনলাইনে চলে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে গত বছর লকডাউন দেয়া হয় তখনও সরকারি সেবায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।

নতুন একটি ওয়েবসাইট ব্যবহার করে আদালতের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। কৃষিভিত্তিক একটি পোর্টাল থেকে কৃষকরা আবহাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ আপডেট এবং অন্যান্য তথ্য পাচ্ছেন। কোভিড-১৯ সম্পর্কিত তথ্য সাধারণ নাগরিকদের মোবাইলের মাধ্যমে জানানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে চালু করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সরকারি পোর্টাল, যার মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের সরকারি সেবা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো- সরকারি শতকরা ৮৫ সেবা স্মার্টফোনের মাধ্যমে নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেয়া। শতকরা ১০ ভাগ সেবা পৌঁছে যাবে তাদের ঘরের দরজায়। আর বাকি শতকরা সেবা পেতে মানুষকে সরকারি অফিসগুলোতে যেতে হবে।

পাসপোর্ট পাওয়া থেকে শুরু করে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনসহ সবকিছুই পাওয়া যায় অনলাইনে।

এ সফলতার একটি মূল উপাদান মোবাইল ফোন। বাংলাদেশে চালু করা হয়েছে টোল-ফ্রি জাতীয় জরুরি সেবা হেল্পলাইন ৯৯৯- দুর্ঘটনা, সাইবারক্রাইমসহ যে কোনো অপরাধ, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, অগ্নিকাণ্ড এবং জরুরি চিকিৎসা সেবায় নাগরিকরা এটি ব্যবহার করেন।

ধন্যবাদ সম্মিলিত জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য কৌশলের প্রতি। টেলিমেডিসিন এখন শুধু সম্ভবই নয়, একটি সাধারণ বিষয়, বিশেষ করে অনগ্রসর গ্রামীণ এলাকায়। এ কর্মসূচি মৌলিক স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে থাকে, যা একটি সুস্থ জাতি গঠনে নেতৃত্ব দেয়। এছাড়া সরকার আরও বেশি জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে। সরকারি সেবা বা পণ্য সম্পর্কে অনলাইনে অভিযোগ জমা দেয়া যায় সহজেই।

ব্যাপক সংযুক্তি দেশের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করছে। দক্ষ ও ডিজিটাল জ্ঞানসম্পন্ন কর্মশক্তি গড়ে তোলার জন্য নেয়া হয়েছে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে এবং প্রতি বছর ৫ লাখ গ্রাজুয়েট কর্মী তৈরি হচ্ছে। শুধুমাত্র গত বছর তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় এসেছেন কমপক্ষে ৬৫ হাজার মানুষ।

ডিজিটাল সেন্টারগুলোই কর্ম সৃষ্টির নিয়ামক। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনটি পদের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। ফলে বাংলাদেশ হলো সাইবার কর্মীদের জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র। এই সুযোগ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে যুব সমাজ। অতীতে এদের বেশিরভাগই নিজেদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে জীবন বেছে নেয়ার কথা কল্পনাও করতেন না। কিন্তু বর্তমানে তরুণ বাংলাদেশিরা ক্রমবর্ধমান হারে শহরমুখো, গতিশীল এবং নতুন অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে প্রস্তুত।

ডিজিটালাইজেশন থেকে দারুণ সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩ লাখের বেশি প্রযুক্তি পেশাদার কাজে যুক্ত হয়েছে। আছেন ১০ হাজারের বেশি প্রযুক্তিবিষয়ক উদ্যোক্তা। সবমিলে, বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সেবা থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে ১০০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছেন। এছাড়া সাশ্রয় হচ্ছে ২০০ কোটি ঘন্টা সময়, ৮০০ কোটি ডলার এবং সরকারি অফিসে ১০০ কোটি বার যাওয়া।

আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশ ঊর্ধ্বপানে ছুটে চলেছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথম যোগাযোগবিষয়ক স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করে। এই স্যাটেলাইট নানাবিধ টেলিযোগাযোগ সেবা দেয়ার মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে।

এক বিস্ময়কর আরোহণ!

২০০৮ সালে বাংলাদেশের বার্ষিক অভ্যন্তরীণ জাতীয় প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) হার ছিল শতকরা প্রায় ৫ ভাগ। কিন্তু বর্তমানে এটা শতকরা ৮ ভাগের ওপরে। সহজলভ্য উচ্চমাত্রার যোগাযোগ ব্যবস্থা এই প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রী হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ অনেক কিছু অর্জন করেছে। তবে তার কোনোটিই বাংলাদেশের ইন্টারনেট যুগের নাটকীয় অগ্রগতির চেয়ে বেশি চমকপ্রদ নয়। এমনকি এখন আমরা আমাদের ডিজিটাল বিশেষজ্ঞদের রপ্তানি করছি।

এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশী মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় ডিজিটালাইজেশনের কাজে সহায়তা করছেন বাংলাদেশি প্রশিক্ষকরা।

এটা যে সম্ভব মাত্র এক দশক আগে কেউ তা চিন্তাও করতে পারতেন না।

ভয়েস টিভি/এসএফ

Categories
মুক্তমত

আমৃত্যু শোধ হবে না এই ঋণ

যাত্রাটা শুরু হয়েছিল ১৮ আগস্ট ২০১৩। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের মাত্র ৫ মাস বাকি তখন। যুক্তরাষ্ট্রের আয়েশি জীবন ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে এসে হেটে ছিলাম। কারণ তখন সবেমাত্র আওয়ামী লীগ ৫টা সিটি কর্পোরেশনে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হেরেছে। হেফাজত, বিএনপি, জামাতের বাঁশেরকেল্লা বাহিনীর অপপ্রচারে ত্রাহি অবস্থা। ওই সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে সুযোগ দিয়েছেন তাঁর উপ প্রেসসচিব হিসাবে কাজ করার। সরকারের কাজের প্রচার প্রচারণা, গুজব প্রতিরোধ ও মিডিয়া সেক্টর নিয়ে কাজ করেছি। তবে তখনো সরকারের ব্যাপক উন্নয়নের সুনাম ছিল। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তি ইমেজ ছিল এখনকারমতোই প্রতিদ্বন্দ্বিহীন।

ছোট সময় থেকে এই দলটির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার কারণে এই দায়িত্ব ছিল আমার জন্য বিশাল প্রাপ্তি ও সম্মানের। একে’তো দেশের প্রধানমন্ত্রী আবার তিনি যদি হন বঙ্গবন্ধু কন্যা। পরপর তিন তিনবার নিয়োগ পাবার মত ভাগ্যবান একজন আমি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে এই সৌভাগ্য কয়জনের হয়। আমি সেই ভাগ্যবানদের একজন। অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। আমৃত্যু এই ঋণ শোধ হবেনা। জীবনে যখন যেখানে যেভাবে থাকবো শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও দল ও নেত্রীর জন্য কাজ করে যাবো।

অতপরঃ সুখবর হচ্ছে, আমি সাংবাদিকতার উপর আরো পড়াশোনা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের Hofstra University’তে একটি স্কলারশিপ পেয়েছি। গত সেপ্টেম্বরেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়। সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে চাইনি। কারণ আমি মিডিয়াতে কাজ করা মানুষ। এই সেক্টরেই কাজ করে যেতে চাই। আর উচ্চ শিক্ষার প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুর্বলতা সবাই জানেন। তাঁদের পরিবারের সকলকেই তিনি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে আমাকেও তিনি সেই সুযোগটি দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা নেত্রীর প্রতি।

আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, আমি আমার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য আবেদন পত্র দিয়েছি। কারণ চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগে শিক্ষা ছুটির কোনো বিধান নাই। খারাপ সময়ে যোগদান করে ভালো সময়ে এসে সাড়ে সাত বছরের জার্নি আপাতত শেষ করতে যাচ্ছি। হয়তো আবার দেখা হবে। এই দীর্ঘ যাত্রা পথে যাদের সহযোগিতা পেয়েছি তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, ব্যক্তিগত অনুবিভাগ,দলের নেতাকর্মী এবং সর্বোপরি দেশের সকল মিডিয়ার আলোকিত মানুষেরা। যাদের সহযোগিতা পাইনি, ক্রমাগত বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতা পেয়েছি তাদের প্রতিও অনেক কৃতজ্ঞতা। কারণ তাদের কারণে আমি এই বয়সেই অনেক কিছু শিখেছি যা বাকি জীবন পথ চলতে অনেক সহায়ক হবে। সবাই ভালো থাকবেন। জয়বাংলা।

(লেখাটি প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের ফেসবুক স্ট্যাটাস)