Categories
বিনোদন মুক্তমত

একটি হিরোর গেলো জান, নামটি হলো শাকিব খান

সেলিম খান এবার হলো সবার প্রাণ
তাইনা দেখে একটি হিরোর গেলো জান
নামটি হলো শাকিব খান।

সেলিম খান একশতটা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে, এ সংবাদে কে কতটুকু খুশি হয়েছে আমি জানি না, তবে আমি ততটুকু খুশি হয়েছি যতটুকু খুশি ছোটবেলা ঈদের চাঁদ দেখলে হতাম। আমি কিন্তু ঐ একশত চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে নেই। তবুও এতখুশি হয়েছি এ জন্য আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গন আবার নতুন করে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে পাবে। বলতে গেলে আমাদের চলচ্চিত্র একরকম প্রযোজক শূন্য হয়ে পড়েছিলো। এবার সেই শূন্যতা আবার পূর্ণ হতে চলেছে, আজ এই আনন্দে শুধু আমি আনন্দিত নই, আনন্দিত গোটা চলচ্চিত্র। তবে এরই মধ্যে চলচ্চিত্রের একজনকে খুশি হতে দেখলাম না, অনলাইন সোশ্যাল মাধ্যমগুলোতে দেখলাম সেখানে শাকিব খানের কথা শুনে আমার মনে হলো এতে তার হিংসা হয়েছে।

যদিও সে কারো নাম ধরে কথা বলেনি তবুও আমার মনে হলো সেলিম খানের একশতটি চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়েই কথা বলেছে। কাকে যেন স্টুপিডও বলেছে। কিন্তু ওর তো এমন হিংসা করার কথা নয় কারণ সে আমাদের কোনো প্রযোজক নয়, সে শুধু মাত্র একজন নায়ক। আজকাল সে টুকটাক ইংরেজী শব্দও ব্যবহার করছে, কোকিলের মত অনেকেই সুর ধরতে চায় কিন্তু কোকিলের ডাক তো অন্য পাখি ডাকতে পারে না এবং দাড়কাক কখনো ময়ূর সাজতে পারে না।

শাকিব খান বর্তমানে এক নাম্বার নায়ক হলেও সে ভেবে দেখেনি ওর জন্য বর্তমানে চলচ্চিত্র প্রায় ধ্বংসের পথে। এর কারণ হলো চলচ্চিত্রে ব্যবসা না থাকা সত্বেও ৩০/৪০ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক নেয় শুনেছি, সে যদি চলচ্চিত্রকে ভালোবাসতো তাহলে ঐ পারিশ্রমিকের ৪ ভাগের ১ ভাগ টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে অভিনয় করতো।

দুই নাম্বার কারণ হলো, ৩০ দিনে একটি চলচ্চিত্র যদি শেষ করা যায় সেখানে তার নন কো-অপারেশনের জন্য দুই মাসের অধিক সময় লেগে যায়। উল্লেখ থাকে যে, বর্তমানে একদিন শুটিং করতে প্রযোজকের ব্যয় হয় ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। এখন ৩০ দিনের পরিবর্তে যদি শাকিব খানের জন্য ৬০ দিন সময় ব্যয় হয় তাহলে ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার অধিক ব্যায় হয়। শাকিবের এমন আচরণে মনে হয় প্রযোজকের টাকা তার পৈত্রিক সম্পত্তি ছাড়া আর কিছুই না। আমি টাকা খরচ করাবো তাতে কার কি আসে যায়? বাহ্।

আমার শেষ কথা হলো সবার উচিত সেলিম খানকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, কাহিনীকার ও গীতিকার

Categories
মুক্তমত

বিপর্যয় রোধে জাতীয় ভাষানীতি প্রয়োজন

ভাষা-পরিস্থিতি সতত পরিবর্তনশীল। কোনো নির্দিষ্ট দেশের ভাষা-পরিস্থিতি কখনো স্থির থাকে না। কিন্তু ভাষা-পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন ঘটে, তা সে দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির অনুকূলেও ঘটতে পারে, আবার প্রতিকূলেও ঘটতে পারে। অনুকূলে ঘটলে তা গ্রহণযোগ্য হয়; আর যদি প্রতিকূলে ঘটলে হয় অগ্রহণযোগ্য। কারণ, কোনো দেশের ভাষা–পরিস্থিতিতে নেতিবাচক পরিবর্তন সে দেশে দীর্ঘমেয়াদি ভাষা-রাজনৈতিক অস্থিরতা বয়ে আনে।

বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে। পরিবর্তনের ছাপ সমাজ ও সংস্কৃতিতে পরিদৃষ্ট হচ্ছে। তবে ইদানীং তা ঘটছে সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিকূলে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ভাষা–সংশ্লিষ্ট নানা সমস্যা, যাকে বলা যেতে পারে ভাষিক সমস্যা। এসব ভাষিক সমস্যার কোনো কোনোটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রধানত বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি প্রতিসম রাষ্ট্র হওয়ায়, দেশের ভাষা-পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত ভাষিক সমস্যাগুলো প্রকটভাবে প্রতিভাত হচ্ছে না। সে জন্য জাতীয় নেতৃত্ব ভাষা-পরিস্থিতিগত সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে আমলে নিচ্ছে না। বর্তমান বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতির নেতিবাচক পরিবর্তনের ধারায় যেসব ভাষিক সমস্যা পরিদৃষ্ট হচ্ছে, তা নিম্নরূপ:
‌‌
১. ভাষিক আধিপত্যবাদের কবলে পড়ে বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি নেতিবাচক দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে। ভাষিক আধিপত্যবাদ হলো ভাষিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কর্তৃক অনুবর্তী জাতির ভাষাকে দুর্বল করে দেওয়ার কৌশল বিশেষ। বস্তুত ইংরেজি, আরবি ও হিন্দি আধিপত্যবাদের কবলে নিপতিত হয়ে বাংলা ভাষা তার মর্যাদা ও কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

২. ইংরেজি ও নানা আঞ্চলিক উপাদানে দুষ্ট হয়ে বাংলা ভাষা উচ্চারণ, ব্যাকরণ ও বাগর্থিক মাপকাঠিতে তার সৌষ্ঠব হারাচ্ছে। তা ছাড়া বাংলা ভাষা ইংরেজি (ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরবি) ভাষার তুলনায় মর্যাদা হারাচ্ছে। শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষাকে আর মর্যাদার চোখে দেখা হচ্ছে না।

৩. বাংলা মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কওমি মাদ্রাসাগুলোয় যথাক্রমে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি মাধ্যমে শিক্ষা পরিচালিত হলেও ভাষা শিক্ষার অব্যবস্থাপনার ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যথাক্রমে বাংলা, ইংরেজি ও আরবিতে দক্ষতার অবনমন ঘটে চলেছে।

৪. শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ব্যবহারের ব্যাপকতা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাকে গ্রাস করে চলেছে। ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় ইংরেজি দক্ষতা অর্জনের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে পুরো জনগোষ্ঠীকে সাংজ্ঞাপনিক ইংরেজি (communicative English)-তে দক্ষ করার সরকারি ও ধনিক শ্রেণির উদ্যোগ নানা নেতিবাচক সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপসর্গের জন্ম দিচ্ছে। এক গবেষণা থেকে যেসব উপসর্গ চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো হলো ক. দেশে একটি বাংলা বিমুখ নতুন প্রজন্মের সৃজন ঘটছে, খ. ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ইংরেজিকরণ ঘটছে এবং ইংরেজি মাধ্যমে অফিস-আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। গ. বাংলা ও ইংরেজির ভাষা সংসর্গজাত মিশেল ভাষার (বাংলিশ) বিস্তার ঘটছে এবং ঘ) দৃশ্যমান ও শ্রাব্য উভয় প্রকার ভাষিক বিশৃঙ্খলা পরিদৃষ্ট হচ্ছে।

৫. বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সুবিধা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ও পালি ইত্যাদি ভাষাগুলোকে কেবল ধর্মচর্চার মাধ্যম হিসেবে আটকে রাখা হয়েছে। ধর্মচর্চায় ব্যবহৃত এ ভাষাগুলোর শিক্ষায় ও প্রয়োগে প্রচুর জাতীয় বাজেট জড়িত। কিন্তু এগুলো জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির নিয়ামক হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেসব উদ্দেশ্যে ব্যবহারে ব্যর্থতার কারণে দেশ বিশ্বায়নের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

৬. বাংলাদেশের বিদেশি ভাষা শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া দরকার বিশ্বায়ন আদর্শভিত্তিক। কিন্তু বিশ্বায়ন নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে ভাষানীতি সমর্থিত একটি ভাষা শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্টি না করে অপরিকল্পিতভাবে বিদেশি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং তা বিশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। সে কারণে দেশে এখন মেরুদণ্ডহীন বিশৃঙ্খল বিদেশি ভাষা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

৭. অপরিকল্পিত ভাষা শিক্ষাব্যবস্থার ফলে শিক্ষা খাতে অপচয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো নীতি বা পরিকল্পনা বিবেচনায় না নিয়ে ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকে বনিয়াদি শিক্ষা হিসেবে প্রচলন করা হয়েছে। অন্যদিকে ভাষাগত দক্ষতা মূল্যায়নের বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয়েছে, সে কারণে ইংরেজি শিক্ষায় ব্যাপৃত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে রয়েছে। ফলে দেশে ভাষা-শিক্ষায় ব্যয়িত অর্থের সমপরিমাণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

৮. ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষাকে তার গঠন, মর্যাদা ও প্রায়োগিকতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি মাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, আবার কখনো কখনো অবহেলা করা হচ্ছে। সরকারি প্রশাসনের আওতায় পরিচালিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নামক জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও বাজেট দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করা হচ্ছে অথচ বাংলা ভাষা উন্নয়নের লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না।

এই আলোচনা থেকে যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে তা হলো, বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি নেতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ফলে নানা ভাষিক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, পৃথিবীর দেশে দেশে ভাষা-পরিস্থিতির নেতিবাচক পরিবর্তনজনিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা থেকে দেশকে সুরক্ষার লক্ষ্যে ভাষানীতি প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিপর্যস্ত ভাষা-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি ভাষানীতি প্রয়োজন।

কারণ, একটি জাতীয়তাবাদী ভাষানীতি প্রণীত ও বাস্তবায়িত হলে সরকার ভাষা–পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশাসনিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে এবং তা বাস্তবায়নের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হবে এবং তা বাস্তবায়ন সম্ভব হলে বাংলাদেশ ভাষিক সমস্যাজনিত রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে নিষ্কৃতি পাবে।

এ বি এম রেজাউল করিম ফকির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও টোকিও বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব অতিথি শিক্ষক।

Categories
মুক্তমত

জলবায়ুর ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল বিশ্ব নাগরিক হতে আগ্রহী ভারত

প্যারিস চুক্তির পাঁচ বছর পর সেই সব উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে রয়েছে, যারা কেবল তাদের `সবুজ‘ লক্ষ্যই পূরণ করে না। বরং আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে আগ্রহী। সাম্প্রতিক জলবায়ু লক্ষ্য সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য আরও উঁচুতে স্থির করতে হবে। কেননা আমরা আমাদের অতীতের দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাহ্য করতে পারি না। তিনি আরও যোগ করেছেন যে, ভারত কেবল প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যই অর্জন করবে না বরং তাকে ছাড়িয়ে যাবে।

২০১৯ সালে জাতিসংঘ ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটে মোদী বলেছিলেন যে, এক টন প্রচারের চেয়ে এক আউন্স অনুশীলনের মূল্য বেশি। জলবায়ু কর্ম ও জলবায়ু লক্ষ্য সংক্রান্ত বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে আমাদের সমাজের পুরো যাত্রায় আমরা জ্বালানী, শিল্প, পরিবহন, কৃষি এবং প্রাকৃতিক স্থানগুলির সুরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে ব্যবহারিক পদক্ষেপ নিচ্ছি।

ভারত অনুধাবন করে যে, সাইলো’র ভেতরে থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যে লড়াই করা যায় না। এর জন্যে একটি সংহত, বিস্তৃত এবং সামগ্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন। প্রয়োজন উদ্ভাবন, এবং নতুন ও টেকসই প্রযুক্তি গ্রহণ করা। এই অপরিহার্য বিষয়গুলি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ভারত তার জাতীয় উন্নয়নমূলক এবং শিল্পকৌশলগত পরিকল্পনাগুলিতে জলবায়ুকে মূলধারায় রেখেছে।

জলবায়ু কৌশলগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে শক্তি। আমরা বিশ্বাস করি যে, ভারত একটি পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং আমরা কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদনকারী উৎস থেকে পুনর্নবায়নযোগ্য এবং অ-জীবাশ্ম-জ্বালানী উৎসগুলিতে শক্তি রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছি।

আমরা ভারতের পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানী সম্ভাবনার সদ্ব্যবহারের লক্ষ্য রাখি। আমাদের পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তি ক্ষমতা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এবং সক্ষমতা সম্প্রসারনের যে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেটিও বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম। এর বেশিরভাগ অংশই আসবে সূর্য থেকে। যা সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎস।

আমরা ইতোমধ্যে অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি। আমরা প্রাথমিকভাবে ২০২২ সালের মধ্যে ১৭৫ গিগাওয়াট পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আরও এগিয়ে গিয়ে, আগামী দুই বছরে ২২০ গিগাওয়াট পেরিয়ে যাওয়ার আশা করছি। আরও বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে ২০৩০ এর মধ্যে আমাদের ৪৫০ গিগাওয়াট লক্ষ্য রয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে বিদ্যুৎ শক্তির ৪০% অ-জীবাশ্ম জ্বালানী উৎস থেকে উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের অর্থনীতির নিঃসরণের তীব্রতাকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩-৩৫% হ্রাস করার লক্ষ্যে ২০০৫ সাল থেকে চলমান একটি সমান্তরাল প্রচেষ্টার সঙ্গে এই পরিষ্কার শক্তির উদ্যম হাত মিলিয়ে চলেছে।

এলইডি বাতি ব্যবহারের জাতীয় অভিযান `উজালা প্রকল্প‘ প্রতি বছর কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করছে ৩৮.৫ মিলিয়ন টন। `উজ্জ্বলা প্রকল্প‘, যার আওতায় ৮০ মিলিয়নেরও বেশি পরিবারকে পরিষ্কার রান্নার গ্যাসের সংযোগ সরবরাহ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পরিষ্কার শক্তি উদ্যোগ।

জলবায়ু বিষয়ক কার্যক্রম ও স্থায়িত্বকে সরকারি পরিকল্পনার মধ্যে আনা হচ্ছে। যা একাধিক ক্ষেত্র জুড়ে বাস্তবায়ন যোগ্য। ১০০টি শহরকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে আরও টেকসই এবং অভিযোজিত হতে সহায়তা করার জন্যে কাজ করছে আমাদের স্মার্ট সিটিস মিশন।

আগামী চার বছরের মধ্যে বায়ু দূষণ (পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০) ২০-৩০% হ্রাস করার লক্ষ্যে জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। জল জীবন অভিযান, যার লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে গ্রামীণ ভারতের সমস্ত পরিবারে স্বতন্ত্র গৃহস্থালির কল সংযোগের মাধ্যমে নিরাপদ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানীয় জল সরবরাহ করা। এর একটি দৃঢ় স্থায়িত্বের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

আরও গাছ লাগানো হচ্ছে এবং একটি কার্বন `সিঙ্ক‘ তৈরি করতে পতিত জমিগুলো পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। যা ২.৫-৩ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিতে পারে। আমরা সবুজ পরিবহন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে কাজ করছি। বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলোতে তার দূষণ নির্গমনের জন্যে পরিচিত ক্ষেত্রগুলোকে পরিশোধনের জন্যে দ্রুতবেগে কাজ করছি।

ভারতে নির্মিত হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের অবকাঠামো। যেমন গণ পরিবহন ব্যবস্থা, গ্রিন হাইওয়ে এবং নৌপথ। ই-মবিলিটি ইকোসিস্টেম নামক একটি জাতীয় বৈদ্যুতিক গতিশীলতা পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য ভারতের রাস্তায় সমস্ত যানবাহনের ৩০% এর বেশি যেন বৈদ্যুতিক হয়।

যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলির মধ্যে ভারতের অবস্থান। তাই এই উদ্যোগগুলি আমাদের নিজেদের ভালোর জন্যেই গ্রহণ করা হয়েছে।

আমরা স্বীকার করি, এখনও অনেক দীর্ঘ পথ যেতে হবে। তবে এই প্রচেষ্টাগুলোর সুফল ইতোমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। ২০০৫-২০১৪ সময়ে ভারতের কার্বন নিঃসরণের তীব্রতা ২১% কমেছে। পরের দশকে আমরা আরও অনেকটা কমিয়ে আনার প্রত্যাশা করছি।

ভারত জলবায়ু ক্ষেত্রের দায়িত্বশীল বিশ্ব নাগরিক হতে আগ্রহী। আমরা কেবল আমাদের প্যারিস চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো ছাড়িয়ে যাচ্ছি না। আমরা জলবায়ু কর্মে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে নানান উদ্ভাবনী ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।

আমরা ‘ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স’ এবং ‘কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেসিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করেছি। যেগুলো কার্বন হ্রাসের জন্যে বৈশ্বিক পথ তৈরিতে কাজ করছে। ৮০টিরও বেশি দেশ ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স-এ যোগ দিয়েছে। যার ফলে এটি পরিণত হয়েছে দ্রুত বর্ধমান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর একটিতে।

জাতীয় পদক্ষেপ এবং দায়িত্বশীল আন্তর্জাতিক নাগরিকত্বের এই সমন্বয় ভারতকে উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে অনন্য করে তুলেছে। একই সঙ্গে এটি জলবায়ু সম্পর্কে চিন্তাভাবনা এবং কার্যক্রমে নেতৃস্থানীয় হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উপলব্ধি করার জন্যে সঠিক কক্ষপথে রেখেছে।

লেখক : পররাষ্ট্র সচিব, ভারত

সুত্র :  টমসন রয়টার ফাউন্ডেশন

ভয়েস টিভি/এমএইচ

Categories
মুক্তমত

‘টিকা’ টিপ্পনী

আমি গতকালকে টিকা নিয়ে এসেছি। সবাই জিজ্ঞেস করছে, “কেমন লাগছে?” কিছু একটা চমকপ্রদ উত্তর দিতে পারলে ভালো লাগত। শরীরের ভেতর বেয়াদব-বেয়াক্কেল-বেতমিজ করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিষেধক তৈরি করার বিশাল দজ্ঞযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে কিন্তু বাইরে থেকে তার কিছুই বুঝতে পারছি না। এমনকি হাতের যেখানে সুচ ফোটানো হয়েছে সেখানেও কোনো ব্যথা নেই। বাংলা ভাষায় ‘শরীর ম্যাজম্যাজ’ বলে একটা অসাধারণ কথা আছে- গতকাল সেই কথাটা বলা যায় কিনা চিন্তাভাবনা করেছি কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারিনি।

টিকা দিতে যাওয়ার আগে আমার ছেলে-মেয়ে দেশের বাইরে থেকে জানিয়েছে “সেজেগুজে যাবে, অবশ্যই ছবি তুলে পাঠাবে।” পুরুষ মানুষ কেমন করে সাজগোজ করে বিষয়টা আমার জন্য দুর্বোধ্য হওয়ার কারণে সেটা আমার স্ত্রীর জন্যে প্রযোজ্য বলে ধরে নিয়েছি। টিকা নেয়ার সময় ছবি তোলা হয়েছে, হাতে সুচ ফোটানো নিয়ে আমার ভেতরে এক ধরনের আতংক কাজ করছিল বলে মাস্ক দিয়ে মুখের প্রায় পুরোটুকু ঢেকে থাকার পরও চেহারায় এক ধরনের ফাঁসির আসামির ভাব চলে এসেছে! তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো টিকা দেয়ার জন্য সুচ ফোটানোর সময় বিন্দুমাত্র ব্যথা লাগেনি। এই সিরিঞ্জের সুচ কি খুবই সরু নাকি বয়স হওয়ার কারণে অন্য অনেক অনুভূতির সাথে ব্যথার অনুভূতিও চলে যাচ্ছে সেটি বুঝতে পারলাম না!

যারা সিরিঞ্জের সুচকে ভয় পান তাদেরকে অভয় দিয়ে বলতে পারি, এই প্রথম আমি বিন্দুমাত্র ব্যথা না পেয়ে একটা ইনজেকশন নিয়েছি। টিকা দেয়ার সময় ভয়ের আর কোনো কারণ নেই, তবে স্থানীয় সাংসদ কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যানরা যে নিজেরাই টিকা দিতে শুরু করেছেন, সেই বিপদ সম্পর্কে আমি অবশ্য কোনো অভয়বাণী শোনাতে পারছি না। (তবে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নির্বুদ্ধিতার তালিকায় এটি নিঃসন্দেহে একটা অসাধারণ সংযোজন- ভবিষ্যতে অনেক জায়গায় এর উদাহরণ দেয়া যাবে!)

গত কিছুদিন পরিচিতদের সাথে কথা বলার সময় অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে, “স্যার আপনি কি টিকা নেবেন?” আমি বলেছি, “অবশ্যই নেব! কতদিন থেকে এই টিকার জন্য অপেক্ষা করছি!” তখন বেশিরভাগই বলেছে, “কিন্তু স্যার একটু দেখেশুনে কি নেয়া উচিত না? ইন্ডিয়ান জিনিস, কী না কী দিয়ে দিচ্ছে!”

সারা পৃথিবীতে এই টিকা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রোজেনিকার যে টিকাটি আমরা নিচ্ছি সেই একই টিকার জন্য ইউরোপের সবগুলো দেশ হা-হুতাশ করছে। কেন এখনও টিকা পাওয়া যাচ্ছে না সেটা নিয়ে হুমকি-ধামকি চলছে, মামলা মোকদ্দমা হয় হয় অবস্থা! আমাদের দেশের কূটনীতিকদের ভেতর যারা চালাক চতুর তারা সেই দেশের ওপর ভরসা করে না থেকে এক ফ্লাইটে এসে টিকা নিয়ে অন্য ফ্লাইটে চলে যাচ্ছেন বলে শুনছি। আমাদের দেশের বিদেশী কূটনীতিকেরা রীতিমতো সারি বেধে এসে এই টিকা নিয়ে যাচ্ছেন, তাদের অনেকেই নিজের দেশে থাকলে এখন এই টিকা পেতেন না। ইন্ডিয়ার যে সেরাম ইনস্টিটিউটে এই টিকা তৈরি হয়েছে সেটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টিকা প্রস্তুতকারক, সারা পৃথিবীতে বহুদিন থেকে তারা টিকা সরবরাহ করে যাচ্ছে। আমাদের সরকার অনেক বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে কারো দান খয়রাতের ওপর নির্ভর করে না থেকে নিজের টাকা দিয়ে টিকা বায়না করে রেখেছে, এমন একটি টিকা বেছে নিয়েছে যে টিকা সংরক্ষণ এবং বিতরণের প্রযুক্তি আমাদের দেশেই আছে, সব নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে সেই টিকা সময়মতো আমাদের দেশে চলে এসেছে, আমার চুল পেকেছে বলে সবার আগে আমি সেই টিকা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছি। কিছু স্বল্পবুদ্ধির মানুষ বলছে এটা ‘মুরগির টিকা’ সেজন্য আমি সেই টিকা নেব না এটা কি কখনো হতে পারে? যারা আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন আমি টিকা নেব কিনা, আমি উল্টো তাদের জিজ্ঞেস করি, “আমাকে দেখে কি এত বোকা মনে হয়, যে আমি জেনেশুনে এই সুযোগটি লুফে নেব না?”

আমি একেবারে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি রাজনীতি করার জন্য যারা এই টিকার গীবত গাইছেন তারাও রাতের অন্ধকারে, মুখে মাস্ক এবং চোখে গগলস পরে গোপনে সেই টিকা নিতে যাবেন!

আমার টিকা নেয়ার অভিজ্ঞতাটুকু চমৎকার, হাসপাতালে পৌঁছানোর পরে ১৫ মিনিটের ভেতর টিকা নেয়া শেষ! নিবন্ধিত সবারই একটা ক্রমিক নম্বর থাকে, সেটা খুঁজে বের করতেই একটু সময় লেগেছে, আমাদের মোবাইল টেলিফোনে যখন তারিখ জানানো হয়েছে তখন ক্রমিক নম্বরটি নির্ধারিত হয়ে গিয়ে থাকলে সেই এসএমএসেই ক্রমিক নম্বরটি জানিয়ে দিলে ভলান্টিয়ারদের যন্ত্রণা নিশ্চয়ই আরো একটু কম হতো। আমরা টিকা নেয়ার সময় নানা ভঙ্গীতে ছবি তুলেছি, অন্যদের কেউ কেউ বলেছেন তাদের ছবি তুলতে দেয়া হয়নি—আমার মনে হয় শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে যেহেতু টিকা দেয়াটি উৎসবের রূপ নিতে যাচ্ছে, সবাইকে একটু ছবি তুলতে দিলে সমস্যা কী?

সব বড় প্রক্রিয়াতে ছোট বড় কিছু সমস্যা হবেই, তখন এই সমস্যার সমাধান করতে হয়। এখানেও তাই, নিবন্ধন করার সময় যাদের ছোট বড় সমস্যা হচ্ছে তারা যেন কাউকে তার সমস্যার কথা জানাতে পারে তার একটা ব্যবস্থা থাকলে মন্দ হতো না। একটি হটলাইন থাকলে সরাসরি ভলান্টিয়াররা সাহায্য করতে পারত। (বহুকাল আগে আমরা যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএমএস করে ভর্তি নিবন্ধনের ব্যবস্থা করেছিলাম তখন বেশ কয়েকটি চব্বিশ ঘণ্টার হটলাইন রেখেছিলাম। এ ধরনের নূতন একটা পদ্ধতিতে ছেলেমেয়েদের কী ধরনের সমস্যা হয় সেটা সম্পর্কে একটা ধারণা করার জন্য হটলাইনের একটা টেলিফোন আমি আমার নিজের কাছে রেখেছিলাম। টেলিফোনটা যে আমার কাছে ছিল ছেলেমেয়েরা সেটা জানত না এবং মাঝে মাঝেই তাদের গালমন্দ শুনতে হতো! একদিন গভীর রাতে ফোন বেজেছে, আমি ঘুম থেকে উঠে টেলিফোন ধরেছি, জিজ্ঞেস করেছি, “কী সমস্যা? আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?” তখন অন্য পাশ থেকে একজন বলল, “না, কোনো সমস্যা নাই। আপনারা দাবি করছেন এটা ২৪ ঘণ্টার হটলাইন তাই পরীক্ষা করে দেখছি আসলেই ২৪ ঘণ্টা চালু আছে কিনা!” আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের রসবোধ আকাশ ছোঁয়া!)

টিকা নেবার জন্য আমরা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করেছি, আমাদের বাসায় কম্পিউটার আছে, ওয়াইফাই আছে, আমরা ‘ক্যাপচা’ এবং ‘ওটিপি’ কি জিনিস জানি। কিন্তু এদেশে নিশ্চয়ই অনেকে আছেন যাদের টিকা নেয়া প্রয়োজন কিন্তু কম্পিউটার এবং ওয়াইফাই সংক্রান্ত ব্যাপারে তারা আমাদের মতো সৌভাগ্যবান নন। তাদের নিবন্ধনের ব্যাপারটি কীভাবে করা হবে সেটি দেখার জন্য আমি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।

তবে শেষ কথা বলে দিই, যারা টিকা নিয়েছেন তাদেরকে অভিনন্দন। আমাদের পরিবারের বয়স্করা সবাই টিকা নিয়ে এসে কেক কেটে উৎসব করে খুবই নাটকীয় ভঙ্গীতে তার ছবি তুলে প্রিয়জনদের কাছে পাঠিয়েছি! যারা এখনো জানেন না, তাদেরকে মনে করিয়ে দেই, টিকা সত্যিকার কার্যকর হতে হতে কিন্তু দুই সপ্তাহ লেগে যাবে, কাজেই টিকা নিয়ে এখনই ‘বন্ধনহীন মুক্তজীবনে’ ঝাপিয়ে পড়া যাবে না—অন্য অনেক কিছুর সাথে মাস্কের বন্ধনটা যেন থাকে!

Categories
মুক্তমত

শেখ মুজিবের সুচিন্তা থেকে আজকের বাঙালিরও শেখার আছে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে একটা কথা মনে হচ্ছে। তিনি শুধু বাংলার বন্ধু ছিলেন না, তাঁর ভূমিকা ছিল আরও অনেক বড়, এবং অতুলনীয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মহান রাজনৈতিক নায়ক, বাংলার সবচেয়ে সমাদৃত মানুষ, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার। বাংলাদেশের জনজীবনে তাঁর প্রভাব আজও বিপুল। তাঁকে ‘বাংলাদেশের জনক’ বা বঙ্গবন্ধু বলাটা নিতান্তই কম বলা। তিনি যে এর চেয়ে বড় কোনও অভিধা চাননি, সেটা তাঁর সম্পর্কে আমাদের একটা সত্য জানায়— তিনি নাম কিনতে চাননি, মানুষ তাঁকে অন্তর থেকে ভালবাসত।

এক জন অতি চমৎকার মানুষ এবং এক মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে, তাঁর চিন্তাভাবনা কেন আজকের পক্ষেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সে-বিষয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাঁর পরিচ্ছন্ন চিন্তা ও দৃষ্টির সম্পদ কেউ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। তাঁর সেই চিন্তাভাবনা আজ আমাদের বড় রকমের সহায় হতে পারে। উপমহাদেশ আজ আদর্শগত বিভ্রান্তির শিকার হয়ে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলেছে, এই দুর্দিনে পথনির্দেশ এবং প্রেরণার জন্য আমাদের বঙ্গবন্ধুর কাছে সাহায্য চাইবার যথেষ্ট কারণ আছে। শেখ মুজিবের চিন্তা এবং বিচার-বিশ্লেষণ যে সব দিক থেকে আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, এখানে তার কয়েকটির উল্লেখ করতে চাই।

প্রথমত, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা হিসেবে শেখ মুজিব ছিলেন অগ্রগণ্য। তাঁর দৃষ্টান্ত থেকে এই বিষয়ে সব দেশেরই শেখার আছে। বর্তমান ভারতের পক্ষে তো বটেই, বঙ্গবন্ধুর ধারণা ও চিন্তা উপমহাদেশের সব দেশের পক্ষেই শিক্ষণীয়। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে বাংলাদেশ অনেক উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তিনি কেমন বাংলাদেশ চান, বঙ্গবন্ধু সে কথা পরিষ্কার করে বলেছিলেন। তাই আমরা খুব সহজেই ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে তাঁর অবস্থানটা বুঝে নিতে পারি।

এ-কথা জোর দিয়ে বলব যে, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং লোকেদের স্বক্ষমতা-র মধ্যে যোগসূত্রটি শেখ মুজিবকে প্রভূত অনুপ্রেরণা দিত (স্বক্ষমতা শব্দটি ইংরাজি ‘ফ্রিডম’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করছি)। ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতার যে ধারণা বহুলপ্রচলিত, তাতে ধর্মের প্রতি সাধারণ ভাবে একটা বিরূপতা পোষণ করা হয়ে থাকে। এই ধারায় মনে করা হয়, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কখনও কোনও ধর্মীয় ক্রিয়াকর্মকে উৎসাহ দেবে না, বা সাহায্য করবে না। আমেরিকায় মাঝেমধ্যে এই গোত্রের ধর্মনিরপেক্ষতা অনুশীলনের চেষ্টা হয়েছে, তবে সে দেশের বেশির ভাগ মানুষের মনে ঈশ্বর এবং খ্রিস্টধর্মের আসন এতটাই পাকা যে, সেই উদ্যোগ কখনওই খুব একটা এগোতে পারেনি। যে কোনও রকমের ধর্মীয় আচার থেকে রাষ্ট্রকে দূরে রাখতে ফরাসিরা তুলনায় অনেক বেশি সফল, কিন্তু ধর্মকে সম্পূর্ণ বর্জন করে চলার চরম ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষ্য সে দেশেও দূরেই থেকে গেছে। এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা পরিষ্কার: ধর্মনিরপেক্ষতার এমন কোনও অর্থ কখনওই তাঁর চিন্তায় স্থান পায়নি, যা মানুষের ধর্মাচরণের স্বক্ষমতাকে অস্বীকার করবে। যাঁদের ধর্মবিশ্বাস গভীর, তাঁদের কাছে এই স্বক্ষমতা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই কারণেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্ম-বিরোধিতা হিসেবে দেখবার চিন্তাধারাকে মুজিবুর রহমান বিশেষ মূল্য দেননি। ধর্মীয় আচারকে এড়িয়ে চলার বা ‘ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার’ তাগিদে ধর্মাচরণের স্বক্ষমতাকে অস্বীকার করার কোনও প্রয়োজন তিনি বোধ করেননি। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ অনুসরণ অর্থে শেখ মুজিব ঠিক কী বুঝতে চেয়েছিলেন? ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকায় বাংলাদেশের আইনসভায় সে-দিনের নবীন ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের সংবিধান গ্রহণের সময় তিনি বলেছিলেন:

“আমরা ধর্মাচরণ বন্ধ করব না… মুসলমানরা তাঁদের ধর্ম পালন করবেন… হিন্দুরা তাঁদের ধর্ম পালন করবেন… বৌদ্ধরা তাঁদের ধর্ম পালন করবেন… খ্রিস্টানরা তাঁদের ধর্ম পালন করবেন… আমাদের আপত্তি শুধু ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে।”

ধর্মাচরণের স্বক্ষমতাকে এখানে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। যাকে বর্জন করতে বলা হচ্ছে তা হল ধর্মকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করা, তাকে রাজনীতির উপকরণ বানানো। এটি এক ধরনের স্বক্ষমতা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা রাষ্ট্রকে লোকের নিজের নিজের ধর্মাচরণে হস্তক্ষেপ করতে বারণ করে। বস্তুত, আমরা আরও এক পা এগিয়ে গিয়ে বলতে পারি: মানুষকে স্ব-ইচ্ছা অনুযায়ী ধর্মাচরণের স্বক্ষমতা ভোগ করতে সাহায্য করা উচিত, কেউ যাতে কারও ধর্মাচরণে বাধা দিতে না পারে সে জন্য যা করণীয় করা উচিত। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের ভূমিকা আছে।

দুঃখের কথা হল, ইদানীং ভারতে এই নীতি ও আদর্শ বেশ বড় রকমের বাধার সম্মুখীন। বিভিন্ন ধর্মের প্রতি আচরণে প্রায়শই বৈষম্য করা হচ্ছে, হিন্দুত্বের প্রতি পক্ষপাতিত্ব সম্পন্ন কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে, এমনকি নাগরিকত্বের প্রশ্নেও, তাদের পছন্দসই ধর্মগোষ্ঠীর মানুষকে বিশেষ সুযোগসুবিধা দিচ্ছে। ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিশেষ সম্প্রদায়ের (যেমন, মুসলমান, বা নিম্নবর্ণের হিন্দু বা আদিবাসী) বিশেষ বিশেষ খাদ্য (যেমন, গোমাংস) নিষিদ্ধ করার ফরমান জারি হয়েছে, যে হেতু এ ব্যাপারে অন্য ধর্মের কিছু লোকের (বিশেষত গোঁড়া হিন্দুদের) আপত্তি আছে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের বিবাহে নিয়ন্ত্রণ, কখনও বা নিষেধাজ্ঞা, জারি করা হচ্ছে— সংশ্লিষ্ট ধর্মমতে এমন বিবাহ নিয়ে কোনও সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও। এবং, বিবাহের উদ্দেশ্যে জোর করে মেয়েদের ধর্মান্তর করানোর নানা কাহিনি প্রচার করা হচ্ছে, অথচ বিভিন্ন মামলার সূত্রে প্রায়শই ধরা পড়েছে যে এ-সব গল্প একেবারেই ভুয়ো।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে মোগল সম্রাট আকবর যথেষ্ট পরিষ্কার ধারণা নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, লোকে নিজে যে ভাবে যে ধর্ম পালন করতে চায় তাতে কোনও বাধা দেওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্র এই স্বক্ষমতা রক্ষায় সচেষ্ট থাকবে, কিন্তু কোনও ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দেবে না।

দেখা যাচ্ছে, এখানে ধর্মনিরপেক্ষতার দু’টি নীতি কাজ করছে: (১) বিভিন্ন ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণে কোনও ‘অ-সমতা’ থাকবে না (আকবর এই ব্যাপারটিতে জোর দিয়েছিলেন) এবং (২) ‘ধর্মকে রাজনৈতিক কারণে বা প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে না’ (বঙ্গবন্ধুর কাছে যা গুরুত্ব পেয়েছিল)। এ-দুটো ঠিক এক নয়। কিন্তু দুই আদর্শের যে কোনওটি লঙ্ঘিত হলে লোকের ধর্মীয় স্বক্ষমতা একই ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে, কারণ সাধারণত এক ধর্মের তুলনায় অন্য ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণেই ধর্মীয় স্বক্ষমতা খর্ব করা হয়ে থাকে। ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলিতেও এর অনেক প্রমাণ মেলে।

শেখ মুজিব, এবং আকবর, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি যে ভাবে পরিষ্কার করেছিলেন, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া কেবল ভারতে নয়, অনেক দেশেই গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকায় বা ইউরোপে অনুরূপ নানা বৈষম্য, যেমন জাতিগত বা নৃগোষ্ঠীগত অসাম্য বিষয়ক রাজনৈতিক আলোচনাতেও এই ধারণা প্রাসঙ্গিক। উপমহাদেশে, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশে সমকালীন নানা বিতর্কে ও বিক্ষোভে জড়িত বিভিন্ন প্রশ্নেও তা আলো ফেলতে পারে।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখলে বোঝা যায়, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিটা বিশেষ উদ্বেগজনক, কারণ অনেকগুলো দশক ধরে এ-দেশে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের চর্চা এই সে-দিন অবধি অনেক দেশের তুলনায় বেশ সবল ছিল। দেশের কিছু রাজ্যে আসন্ন নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেমন, পশ্চিমবঙ্গে আগামী এপ্রিল-মে মাসে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ধর্মনিরপেক্ষতার মূল প্রশ্নগুলি নিয়ে, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু তার যে মৌলিক শর্তাবলির কথা বলেছিলেন সেই সব বিষয়ে এখন বড় রকমের আলোচনার প্রয়োজন। তার কারণ, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ মেনে চলার— এবং লঙ্ঘন করার— ব্যাপারে নানা রাজনৈতিক দলের আচরণ কিছু রাজ্যের ভোটের লড়াইয়ে বিশেষ প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার না করার যে নীতিতে বঙ্গবন্ধু জোর দিয়েছিলেন, এই প্রসঙ্গে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ— শুধু বাংলা নয়, গোটা বিশ্বের পক্ষেই। বঙ্গবন্ধুকে তাই ‘বিশ্ববন্ধু’ হিসেবেও আমরা সম্মান জানাতে পারি।

শেখ মুজিব যে কেবল ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্বক্ষমতা প্রসারের জায়গা থেকে দেখেছিলেন তা নয়, সাধারণ ভাবেই স্বক্ষমতার গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। বস্তুত, যে মাতৃভাষার দাবি আদায়ের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, স্বক্ষমতার প্রশ্নটি ছিল তার একেবারে কেন্দ্রে, মাতৃভাষা ব্যবহারের স্বক্ষমতার দাবির সঙ্গে বাঙালি জাতির ধারণাটিও ওই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সম্পৃক্ত হয়ে যায়।

এটা একটা প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় উপমহাদেশের বিভিন্ন বিষয়েই, যেমন শ্রীলঙ্কায় সিংহলি ও তামিল ভাষার আপেক্ষিক গুরুত্বের ব্যাপারে। শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক নেতারা শেখ মুজিবের ভাষা বিষয়ক চিন্তাভাবনার প্রতি মনোযোগী হলে এবং মাতৃভাষার প্রতি লোকের মমতা ও শ্রদ্ধাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন স্বীকার করলে হয়তো সে দেশের যুদ্ধ এবং বিপুল রক্তক্ষয় অনেকটাই কম হতে পারত। ভাষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সামাজিক বিশ্লেষণের যে প্রজ্ঞা, তার গুরুত্ব বাংলার সীমা ছাড়িয়ে বহু দূরে প্রসারিত।

ভারতের স্বাধীনতার অল্প কালের মধ্যেই সমস্ত প্রধান ভাষাকে দেশের সংবিধানে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়ার ফলে অনেক গুরুতর সমস্যা এড়ানো গিয়েছিল। সেটা শেখ মুজিব স্বদেশের বড় নেতা হয়ে ওঠার অনেক আগেকার কথা বটে, কিন্তু তাঁর চিন্তাধারার কিছু কিছু দিক ভারতের এই ভাষা-নীতির ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। জাতীয় ভাষার সাংবিধানিক মর্যাদা প্রধান ভাষাগুলিকে গুরুত্ব দিয়েছিল বটে, কিন্তু হিন্দি ও ইংরেজিকে সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহারের ফলে অন্য প্রধান ভারতীয় ভাষাগুলির সঙ্গে তাদের একটা অসমতা তৈরি হয়, যার কিছুটা হয়তো অনিবার্য ছিল। যাঁদের মাতৃভাষা হিন্দি (বা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, ইংরেজি), অন্যদের তুলনায় তাঁরা কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে যান। সরকারি কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাষার মধ্যে সমতা বিধানের প্রশ্নটি বাস্তবের সাপেক্ষেই বিচার করতে হবে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে অসাম্যের ব্যাপারটাকে হয়তো আরও বেশি গুরুত্ব সহকারে দেখার দরকার আছে।

এ-সমস্যাটা হয়তো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও কিছুটা প্রাসঙ্গিক, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে প্রশ্নটি আরও অনেক বড়। সেখানকার ভাষাগুলি সংস্কৃত থেকে আসেনি, এসেছে প্রধানত প্রাচীন তামিল থেকে। একটু অতিসরলীকরণের ঝুঁকি নিয়ে বলা যায়, শেখ মুজিব বরাবর স্বক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, এবং মর্যাদা, স্বীকৃতি, সরকারি কাজে বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের মতো বিষয়গুলিকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই দেখা দরকার।

শেষ করার আগে সমতার প্রসার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাভাবনা নিয়ে দু’একটা কথা বলা যেতে পারে। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অবিভক্ত পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার ও স্বাধীনতার যে দাবি তোলে, তার পিছনে বড় ভূমিকা নিয়েছিল সমতা প্রসারের প্রশ্ন। ১৯৭০-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের প্রচারপর্বে বিভিন্ন ভাষণে দেশের নানা বর্গের মানুষের সামনে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সমতার প্রশ্নটিকে পেশ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সমতার প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়ে তার ভিত্তিতে তিনি এই নীতির উপর জোর দেন যে, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের অন্য সমস্ত নাগরিকের সমান অধিকার এবং সুযোগ ভোগ করার স্বত্ব থাকা চাই।’

পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, কিন্তু সমতার আদর্শ থেকে সংখ্যালঘুদের ন্যায্য অধিকারের এই দাবি ঘোষণা আওয়ামী লীগের সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, তার একটা বড় কারণ ছিল বঙ্গবন্ধুর নীতিনিষ্ঠ সওয়াল (জাতীয় আইনসভায় পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ)। ন্যায্য লক্ষ্য পূরণের জন্য সুষ্ঠু যুক্তিপ্রয়োগ যে কার্যকর হতে পারে, বঙ্গবন্ধুর জীবনের ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানা কাহিনিতে তার প্রমাণ আছে। সেটাও কম শিক্ষণীয় নয়।

ইতিহাসের একটি ব্যাপার উল্লেখ করে কথা শেষ করব। বঙ্গবন্ধু তাঁর নৈতিক আদর্শগুলির সঙ্গে বাংলার পুরনো মূল্যবোধের সম্পর্কের কথা অনেক বারই বলেছেন। সমতার প্রতি তাঁর আগ্রহের তেমন কোনও ঐতিহাসিক যোগসূত্র আছে কি? উত্তরে বলা যায়: হ্যাঁ, আছে। যেমন, অনেক কাল আগে থেকেই বাংলার সমাজসচেতন কবি ও চারণদের কবিতায় সমতার ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের মতো বিদ্রোহী কবির লেখায় তো বটেই, একেবারে প্রথম যুগের বাংলা কবিতাতেও এমন সূত্রের সন্ধান আছে।

একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। দশম শতাব্দীর বাংলা ভাষায় লেখা চর্যাপদ-এ আমরা পড়ি, বৌদ্ধ কবি সিদ্ধাচার্য ভুসুকু তাঁর নদীপথে পূর্ববঙ্গে যাওয়ার কথা লিখছেন। পূর্বগামী সেই যাত্রাপথে তাঁর নানা অভিজ্ঞতা হয়, যেমন, জলদস্যুরা তাঁর সব কিছু লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় (ভুসুকু বলেন তিনি সে জন্য বিলাপ করবেন না), আবার সমাজের সবচেয়ে নিম্নবর্গের এক জন নারীর— এক চণ্ডালিকার— সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় (তিনি এই বিবাহে পুলকিত হন)। এবং, সিদ্ধাচার্য— আজ থেকে হাজার বছর আগে— সমতার বন্দনা করে লেখেন:

বাজ ণাব পাড়ী পঁউয়া খালেঁ বাহিউ।

অদঅ বঙ্গালে দেশ লুড়ি।।

আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী।

নিঅ ঘরিণী চণ্ডালী লেলী।।

(পেড়ে এনে বজ্রনাও পদ্মখালে বাওয়া/ লুট করে নিল দেশ অদ্বয় বঙ্গাল/ আজকে ভুসুকু হল (জাতিতে) বঙ্গালি/ চণ্ডালীকে (ভুসুকুর) পত্নীরূপে পাওয়া।)

দেখা যাচ্ছে, হাজার বছর আগেও এক জন ‘যথার্থ বাঙালি’র মূল্যবোধগুলি কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হত। মনে রাখা দরকার, এই মূল্যবোধগুলোর অন্যতম ছিল সমতার সমাদর। এখানে ইতিহাসের ধারাবাহিকতার কিছু প্রমাণ আছে। সিদ্ধাচার্য যাঁদের ‘যথার্থ বাঙালি’ বলেছেন, তাঁরা যে আদর্শগুলির সমাদর করতেন, সেই ঐতিহ্যবাহিত মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের সংযোগ সাধন করা যায়, যে ধর্মনিরপেক্ষতা আজ আমাদের পক্ষে বিশেষ দরকারি। এই বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর উজ্জ্বল চিন্তাভাবনা আমাদের প্রেরণা দিতে পারে।

(২৭ জানুয়ারি ২০২১ লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স আয়োজিত সভায় প্রদত্ত বক্তৃতা অবলম্বনে লেখা)

সূত্র: আনন্দবাজার।

ভয়েস টিভি/এসএফ

Categories
মুক্তমত

মদ ও মাতালের গল্প

বাঙালির সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি। মদ নিয়েও। মদে পুষ্টি নেই। এ জিনিস পেটে চালান করলে বাড়তি কোনো সুবিধা পাওয়া যায়, এমনটাও নয়। তারপরও এ জিনিসের প্রতি একটা দুর্দমনীয় লোভ ও আসক্তি দেখা যায়। মদ প্রকাশ্যে কেনা যায় না। খাওয়া যায় না। প্রচুর ভেজাল থাকে। ভেজাল মদ গিলে নিয়মিত মানুষ মরে। আর এই বিষাক্ত জিনিসের দামও অনেক চড়া। তারপরও দেশে মদ বিক্রি হয়। অনেকে মদ পান করে। অনেকে মারাও পড়ে।

ইউরোপ-আমেরিকার মানুষজনের কাছে মদ্যপান জাস্ট একটা রিফ্রেশমেন্ট। কিন্তু বাঙালির কাছে এ এক জটিল মনস্তাত্বিক রসদ। মদ নিয়ে এদেশের মানুষের অনেক ছুঁতমার্গ আছে। আছে নানা সংস্কার, গল্প-কাহিনি আর মিথ্যে মোহ। অনেকে মদ খেয়ে মাতলামি করেন। যদিও মাতলামি করাটা নিম্নবিত্ত স্ট্যাটাস হিসেবে ধরা হয়। সাধারণত দেশে তৈরি কমদামি বাংলা মদ খেয়ে এক শ্রেণির মানুষ মাতলামি করেন। আবার উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের কাছে মদপান একটা বিপ্লবে এসে ঠেকেছে। সন্ধ্যায় ঘরের কোণে, বারে কিংবা ক্লাবে হাল্কা চুমুক। রাজা-উজির মারা। চাষের পাঙ্গাস মাছ আর ব্রয়লার মুরগি সুলভ ও সস্তা হওয়ার কারণে যে দেশে প্রোটিনের ঘাটতি কমেছে এবং এ কারণে করোনাভাইরাস এদেশে সুবিধা করতে পারেনি, বাজারে পেঁয়াজের দাম কেমন সের্গেই বুবকার রেকর্ডের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, গলির মোড়ে যে লোকটা চা বিক্রি করে, সে আসলে কোটিপতি কি না, ডনাল্ড ট্রাম্প আসলে কেজিবির এজেন্ট কিনা, পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিরা কে কতটা মদ খেয়েছেন, দেশের ভবিষ্যৎ মন্ত্রী-এমপি-আমলা-ব্যবসায়ীদের হাত ধরে কতটা অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে, এই রকম আরও অনেক জরুরি ব্যাপারে সুচিন্তিত মতামত দেওয়া ছাড়া মদ্যপদের আর কোনো ভূমিকা সমাজে দেখা যায় না।

আবেগপ্রবণ বাঙালির হৃদয় বেশ নরমসরম আর যকৃৎ আপাতদৃষ্টিতে শক্তিশালী ও সাহসী। নেশাখোর দেবদাস বাঙালির প্রিয় চরিত্র। মাইকেলের সাহিত্য কিংবা ঋত্বিক ঘটকের সিনেমার থেকে মদপান নিয়ে আলোচনা হয় বেশি। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, বিদ্যাসাগর, শেরেবাংলা, ভাসানী প্রমুখ ব্যক্তিরা মদপান করতেন, এমন কথা ভুলেও বাঙালি শুনতে চায় না। আসলে বাঙালি অদ্ভুত ভাবে নিজের মনের মধ্যেই চরিত্রের রূপায়ণ করে। ভালো-খারাপের গণ্ডি টেনে দেয়।

যাহোক, মদের মতো তরল বিষয় নিয়ে সিরিয়াস আলোচনা না করাই ভালো। বরং আমাদের সমাজে যারা মদ্যপ বা মদপান করে যারা মাতাল হন, তাদের নিয়ে খানিকটা আলোচনা করা যাক। মদপান করে মাতাল হওয়া বা মাতলামি করা মদের দোষ নাকি ওই ব্যক্তির গুণ-এ নিয়ে স্থির কোনো সিদ্ধান্তে আসা মুশকিল। বিশেষজ্ঞ মত হচ্ছে, মদ খেলেই কেউ মাতাল হয় না। অনেকে ইচ্ছা করে মাতলামি করে। মাতালের ভাব ধরে। আবার বহু মানুষ আছে যারা জাতে মাতাল তালে ঠিক, এদের দেখে মাতালদের বিচার করা ঠিক হবে না। যারা সামান্য মদ খেয়েই মাতলামি করে, চিৎকার কিংবা গালাগাল করে, উচ্চস্বরে বেসুরো গান গায়, বউয়ের গায়ে হাত তোলে, তারা নিকৃষ্ট শ্রেণির মাতাল। মানুষ হিসেবেও তারা একেবারেই ফালতু। তাদের এড়িয়ে চলাই ভালো।

চার্লি চ্যাপলিনের সিটি লাইট সিনেমায় একজন বড়লোককে দেখা যায়, যে কিনা মদ খেলেই চ্যাপলিনকে আমন্ত্রণ করে ভালো ভালো খাবার খাওয়াতো, যত খুশি টাকা বিলিয়ে দিত। কিন্তু সকালে যখন তার নেশা কেটে যেত তখন আর চ্যাপলিনকে চিনতে পারত না। লাথি মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিত। এই সিনেমার গল্প থেকে বোঝা যায়, মদ খেলে মানুষের মন উদারও হয়!

তবে আমাদের সমাজে মাতালরা বড় বেশি অবহেলিত। মান-ইজ্জতের ভয়ে নিজেরাও বড় গলায় কথা বলতে পারেন না। এমনকি সমাজের রক্তচক্ষুর ভয়ে তাদের মদও গিলতে হয় লুকিয়ে লুকিয়ে। যখন বাজারে জিনিসিপত্রের দাম বাড়ে, তখন কত লোক প্রতিবাদে মুখর হয়, মিটিং-মিছিল হয় দাম কমানোর জন্য। টেলিভিশনের টকশোতে বক্তারা টেবিল উড়িয়ে দেন কথার তোপে। অথচ মদের দাম হু হু করে বাড়লেও এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ নেই, প্রতিরোধ নেই, কোনো আলাপ-আলোচনা নেই পর্যন্ত। হতভাগ্য মাতালরা কেবল বেশি দাম দিয়ে মদ খেয়ে দেবদাসের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এরা এতই নিরীহ ও ভালোমানুষ যে মদের দাম বৃদ্ধি নিয়ে কখনও কোনো প্রতিবাদ করেনি। বিনা প্রতিবাদে সরকারের অন্যায় মেনে নিয়েছে বারবার!

রক্ষণশীল বেরসিকরা বলবেন, মদের দাম বাড়িয়েছে, বেশ করেছে, আরও বাড়ানো উচিত। মানুষ ভাত খেতে পায় না, আর ওরা আছে মদ নিয়ে। মদের দাম আরও বাড়ুক, আরও বেশি করে বিষাক্ত জিনিস দিয়ে ওই জিনিস তৈরি হোক, মাতালগুলো ভেজাল ও বিষাক্ত মদ খেয়ে সাফ হয়ে যাক। সমাজের কলঙ্ক ঘুচুক। আসলে এ ধরনের কথা যারা বলেন, তারা খুবই নির্মম ও পাষাণ হৃদয়ের মানুষ। তাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম-ভালোবাসা নেই।

মাতালদের ব্যাপারে সবাই নাক গলায়, কিন্তু মাতালরা অন্য কারো ব্যাপারে নাক গলায় না। জগৎ-সংসার নিয়ে তারা একেবারেই নির্বিকার। লোকে মাতালদের মিছেই বদনাম করে। আমাদের এলাকায় এক ভদ্রলোককে চিনতাম যিনি খুব সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। কিন্তু তিনি যখন মদপান করতেন তখন নিজেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মতো ক্ষমতাবান মনে করতেন। তিনি যখন মদের আসর থেকে বের হতেন, তখন সেখানে সার দিয়ে রিকশা দাঁড়িয়ে থাকত শুধু তার জন্য। এই দৃশ্যটা ছিল দেখবার মতো। সব রিকশাওয়ালা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকত। কেউ যদি ভুল করে তাকে বলত, আমার রিকশায় আসুন, তাহলে তিনি তার রিকশায় যেতেন না। উনি তো তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট! এই প্রেসিডেন্টকে রিকশাওয়ালা ডাকবে কেন? তার যেটা পছন্দ হতো, সেই রিকশাতেই উঠতেন। তাই সব রিকশাওয়ালা দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতেন। যে রিকশায় তিনি উঠতেন, নামবার সময় পয়সা গুনে দিতেন না। পকেটে হাত ঢুকিয়ে যা বের হতো সেটাই দিয়ে দিতেন। যদি এক হাজার টাকার নোট দুইটা বের হয়, তিনি অম্লান বদনে তাই দিয়ে দিতেন। মাতালদের মধ্যে এমন দিলদরিয়া মানুষ এখনও রয়েছে। একজন মাতালের কাহিনি শুনেছি, যিনি বার থেকে বের হওয়ার সময়, বয়-বেয়ারা-পিয়ন থেকে শুরু করে সামনে যাকেই পেতেন তাকেই টিপস দিতেন। বারের সামনে একটা নেড়ি কুকুর শুয়ে থাকতো। ভদ্রলোক এই কুকুরটাকেও নিয়মিত টিপস দিতেন!

এক লেখক লিখেছেন: মদের অনেক গুণ আছে। মন ভালো নেই? বোতল খুলে দুই ঢোক মেরে দিন, দেখবেন দুনিয়াটা একেবারে অন্যরকম মনে হচ্ছে। ক্লান্তি লাগছে? জটিল সমস্যায় পড়েছেন? একটু মেরে দিলেই মনটা ফুরফুরে হয়ে যাবে। নিজেকে স্রেফ প্রজাপতি মনে হবে। ভাঙ্গা ঘরে বসে স্বর্গ দেখতে চান? অন্ধকারের মধ্যে প্রেয়সীকে দেখতে চান? জোছনায় ভিজতে চান? দুই পেগ মেরে দিন। দেখবেন, আপনি যা চান, যেভাবে চান, তাই পেয়ে যাচ্ছেন। তখন ঝগড়াটে বউকেও সোফিয়া লরেনের মতো কোমল মনে হবে। নিজেকে আলেকজান্ডারের মতো দিগ্বিজয়ী বীর মনে হবে। তবে এই বীর ও বীরত্বের ব্যাপারটা সাধারণত মেয়েরা মানতে পারেন না। তাই তারা ঘোরতর মদবিরোধী। কারণ মদ খেলেই ছেলেরা একেকজন ‘বীর’ বনে যান। জীবন দিতে এবং জীবন নিতে তখন আর ভয় পান না। কিন্তু এমন পুরুষ তো মেয়েদের পছন্দ নয়। হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, মেয়েরা প্রশংসা করে সিংহের কিন্তু ভালবাসে গাধাকে। মদ খেয়ে অনেকে ‘পুরুষসিংহ’ হয়ে যান। তাই মেয়েরা সেই ‘সিংহ’ এবং তার স্রষ্টা মদকে এতটা অপছন্দ করেন!

আমাদের জটিল-কঠিন-বিয়োগান্ত জীবনে মদ্যপরা কিন্তু বিরাট বিনোদন। তারা নিয়মিত বিনোদন যুগিয়ে যান। এক লোকের কাহিনি জানি, যিনি একবার পর্যাপ্ত দেশি মদ খেয়ে বাসে উঠেছেন। তার শরীর দিয়ে ভুরভুর করে গন্ধ বেরোচ্ছে, তাই পাশের লোকেরা মুখে রুমাল চাপা দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ তার মাথায় একটা প্রশ্ন আসে। তিনি পাশের যাত্রীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, ভাই, শুনছেন?

যাত্রীটি শুনতে না পাওয়ার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে রইল।

এবার লোকটি সেই সহযাত্রীর কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে বললেন, ভাই শুনছেন? আমি খুব একটা সমস্যায় পড়েছি।

এবার যাত্রীটি বিরক্ত হয়ে বললেন, কি সমস্যা হয়েছে আপানার? এত বিরক্ত করছেন কেন?

ভদ্রলোক খুব অমায়িকভাবে জানতে চাইলেন, ভাই আমি কি বাসে উঠেছি?

যাত্রীটি কথা না বাড়িয়ে বললেন, হ্যাঁ উঠেছেন।

কিন্তু লোকটির তাতেও যেন ধাঁধা কাটছে না। সে আবার বলল, ভাই সত্যি করে বলেন তো, আমি কি বাসে উঠেছি?

মাতালের এই কাণ্ড দেখে যাত্রিটি খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি উঠেছেন।

ভদ্রলোক এরপর জানতে চাইলেন, আপনি কি আমাকে চেনেন? যাত্রীটি পড়লেন মহাফ্যাসাদে। তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, না!

এবার ভদ্রলোক বললেন, আপনি কি আগে কখনও আমাকে দেখেছেন?

যাত্রীটির উত্তর: না! আগে আপনাকে কখনও দেখিনি।

এবার ভদ্রলোক মোক্ষম অস্ত্রটি ছাড়লেন, যদি আমাকে কোনোদিন নাই দেখে থাকেন, তবে এত নিশ্চিত হয়ে কী করে বললেন, যে আমিই বাসে উঠেছি?

এর উত্তর কি দেবে ভেবে না পেয়ে যাত্রীটি পরের স্টপেজে পড়িমরি করে নেমে পড়লেন!

Categories
মুক্তমত

করোনা পরবর্তী স্বাস্থ্য জটিলতা

সাধারণত Mild and Moderate ইনফেকশন ১৪ দিনে এবং Severe and Critical ইনফেকশন ২৮ দিনে ভালো হয়। এর পরেও যদি কোন রোগীর করোনা সংক্রান্ত জটিলতা থেকে যায় তখন এটাকে Post Covid কিংবা Long Covid Syndrome বলা হয়ে থাকে।

এই জটিলতা বিভিন্ন রুপে প্রকাশ পেতে পারে। যার মধ্যে প্রধানতম হলো ডি-কন্ডিশনিং সিন্ড্রোম যার মানে হলো প্রচণ্ড দুর্বলতা – মাংসপেশীর শক্তি কমে যাওয়া এবং স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে না পারা। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এ অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে যেমন রোগী যদি ৫ মিনিট হাটতে পারে সময়ের ব্যবধানে এটা আস্তে আস্তে বাড়াতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ফিজিওথেরাপি করা যেতে পারে।

এই সমস্যা উপসর্গযুক্ত এবং উপসর্গবিহীন উভয় প্রকার করোনা রোগীর ক্ষেত্রেই হতে পারে। এছাড়াও বিভিন্ন অংগে অসুস্থতা হতে পারে যেমন ফুসফুসে কাশি-শ্বাস কষ্ট- অক্সিজেন কমে যাওয়া – অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠা ইত্যাদি সমস্যা দীর্ঘদিন থাকতে পারে।

হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দ (Rythm) এ সমস্যাসহ মায়োকার্ডাইটিস হতে পারে। স্নায়ু তন্ত্রের সমস্যার মধ্যে -মনোসংযোগ কমে যাওয়া- মাথা খালি খালি লাগা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে খিঁচুনীও হতে পারে। মানসিক অসুবিধা হিসাবে Post Traumatic Stress Disorder [ PTSD] যার লক্ষণ হিসেবে হতাশা-অবসাদ গ্রস্ততা- অস্বাভাবিক আচরণ -আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেখা দিতে পারে।

কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া; নতুন করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া।  তবে অনেক ক্ষেত্রে তিন মাসের মধ্যে এটা কমে যায়। চর্মরোগের মধ্য একজিমা – শরীরে ফুস্কুড়ি পড়া ইত্যাদি হতে পারে।

চিকিৎসকের পরামর্শ মত এসকল সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়াই বাঞ্চনীয়। এরইমধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে পোষ্ট কোভিড ক্লিনিকের কার্যক্রম চালু আছে। আশা করি এটার পরিধি আরো প্রসারিত হবে।

সাধারণত Mild & Moderate Covid ১০ দিন এবং Severe & Critical Covid ২১ দিন ভাইরাস ছড়াতে পারে। একবার কোভিডে আক্রান্ত হলে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে সুস্থ ঘোষণার পরেও রোগী অসুস্থ বোধ করছেন বিশেষ করে জ্বর জ্বর ভাব ( তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রির নীচে) থাকে এটা পোস্ট কোভিডের ই একটি অংশ। কোন কারণে ভাইরাস শরীর থেকে পুরো পুরি অপসারিত হতে না পারলে শরীরে ইমিউনোলজিক্যাল প্রতিক্রিয়ায় এ সকল উপসর্গ দেখা দেয় এবং পরীক্ষা করলে পুনরায় পজিটিভ পাওয়া যেতে পারে।

তবে এরইমধ্যে যুক্তরাজ্যে আবিষ্কৃত নতুন ধরনের ভাইরাস দ্বারা পুনঃসংক্রমন ঘটতেও পারে। পুনশ্চঃ যাদের কনফার্মড কোভিড হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে তাদের আর ভ্যাক্সিন নেয়ার প্রয়োজন হবে না ৷

কোভিডে মৃত্য হার সাধারণ ভাবে- এক শতাংশ। তবে যাদের বয়স ষাটোর্ধ্ব  তাদের ক্ষেত্রে দশ শতাংশ এবং সত্তর থেকে আশি বছরের মধ্য এটা ১৫-২০ শতাংশ। ডায়বেটিস -উচ্চ রক্তচাপ- ষ্ট্রোক-স্থুলকায় (বিএম আই ৩০ এর উপর); সিওপিডি-হাঁপানী- ইমিউনোডেফিসিয়েন্সী ইত্যাদি ক্ষেত্রে মৃত্যুহার বেশি। আমাদের দেশে মৃত্যুহার কম প্রদর্শিত হওয়ার একটা বড় কারণ হলো এখানে বৃদ্ধ লোকের সংখ্যা  কম। উন্নত দেশে বৃদ্ধাশ্রমে অনেক লোকের বসবাসের কারণে তাদের আক্রান্ত ও মৃত্যু হার বেশি প্রদর্শিত।

ভ্যাক্সিনের প্রতি আমাদের দুর্বলতা এবং অতি নির্ভরশীলতা কমাতে হবে কারণ ভ্যাক্সিন আসলেও পর্যায়ক্রমে এটি সবাই পেতে অনেক সময় লেগে যাবে তাই ২০২১ বছর পুরোটাকেই আমরা সামাজিক দূরত্ব-হাত ধোয়া ইত্যাদি স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা এবং  শতভাগ লোককে সঠিকভাবে মাস্ক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করণের পাশাপাশি বাধ্য করতে হবে।

করোনা মহামারীর আনুষঙ্গিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে আমদেরকে কমপক্ষে আরো তিনটি অতিমারী মোকাবেলা করতে হবে যেমন- ডিকন্ডিশনিং-ডায়াবেটিস-মানসিক অসুস্থতা যার জন্য প্রয়োজন হবে দীর্ঘ কালীন সুসংগঠিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা।

লেখক : সভাপতি বিএমএ ফেনী

ভয়েস টিভি/ডিএইচ

Categories
মুক্তমত

বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা থেকে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, বাঙালি জাতির প্রাণের স্পন্দন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও হবে। কিন্তু সামান্য কিছু শব্দগুচ্ছে কয়েক পৃষ্ঠা লিখে তাঁর গুণগ্রাহী শেষ করা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কর্মই ছিলো দেশের জন্যে, দেশের মানুষের জন্যে। দেশের মানুষকে ভালোবেসে বঙ্গবন্ধুর মত সংগ্রাম করেছেন এমন নেতা সারাবিশ্বে খুব কমই দেখা যায়। ভালোবাসার সবচেয়ে বড় নিদর্শন একটি বৃহৎ, স্বতন্ত্র, সার্বভৌম, স্বাধীন ভূখণ্ড; সেটি হলো সবুজ-শ্যামল দেশ আমাদের এই মাতৃভূমি প্রিয় বাংলাদেশ।

দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা কেমন ছিলো সেটা বঙ্গবন্ধু তাঁর শৈশবেই দেখিয়েছেন। শৈশব থেকে আমৃত্যু মেহনতি মানুষের দুঃখগুলো নিজের করে নিয়েছেন, আর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু কখনো নিজের ন্যুনতম সুখ বা আরাম-আয়েশের কথা চিন্তা করেননি। সর্বদাই চেয়েছেন দেশের মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকে, স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে। নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের এই প্রকৃত বন্ধু পরিবার পরিজনসহ নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন তিনি বাংলার মাটি ও মানুষের কত আপন ছিলেন।

কথিত আছে, শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্ব পুরুষ ছিলেন শেখ আউয়াল। তিনি মোগল শাসনামলে বাগদাদ থেকে ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসেন। তাঁর পুত্র আব্দুল হামিদ এবং আব্দুল হামিদের পুত্র বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমান। লুৎফর রহমান ও সায়রা খাতুনের ঘরে ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-মাতা আদর করে তাঁকে খোকা বলে ডাকতেন। এই খোকাই হলেন সর্বকালের সেরা বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চার বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়।

বঙ্গবন্ধুর শৈশব কেটেছে পিতৃভূমি টুঙ্গিপাড়ায়। টুঙ্গিপাড়ার মেঠো পথের ধুলোবালি মেখে, বর্ষার পানি-কাদা মেখে, নদীতে সাঁতার কেটে, খেলাধুলা করে তাঁর শৈশব কেটেছে। ফুটবল ছিল তার প্রিয় খেলা। পাখি আর জীবজন্তুর প্রতি ছিল গভীর মমতা। তিনি দোয়েল ও বাবুই পাখি খুব ভালোবাসতেন। বাড়িতে শালিক, ময়না, বানর ও কুকুর পুষতেন। কারাগারের রোজনামচা থেকে জানতে পারি, কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি মুরগী পুষতেন, অবসরে পাখির সঙ্গে গল্প করতেন, কাকের সঙ্গেও তাঁর ছিল অম্ল-মধুর সম্পর্ক। মুরগী অসুস্থ হলেও তিনি কষ্ট অনুভব করতেন।

গ্রাম বাংলার মাটি আর মানুষ তাঁকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করতো। তিনি গ্রামের মানুষদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সেই ছোটবেলা থেকে গভীরভাবে অনুধাবন করেন। আর প্রতিবেশী গরীব মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁর কোমল মন চরমভাবে ব্যথিত করতো। বাড়ি থেকে চাল-ডালসহ বিভিন্ন জিনিস বাবা-মাকে জানিয়ে, আবার মাঝে মাঝে চুরি করে গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হামিদ মাস্টার ছিলেন তাঁর গৃহশিক্ষক। তাঁর স্যার তখন গরিব ও মেধাবী ছাত্রদের সাহায্য করার জন্যে একটি সংগঠন করেছিলেন। তিনি ছিলেন এই সংগঠনের প্রধান কর্মী। বাড়ি বাড়ি ধান চাল সংগ্রহ করে ছাত্রদের সাহায্য করেছেন।

তিনি যখন গোপালগঞ্জ মিশনারী স্কুলের ছাত্র সে সময় একবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ওই স্কুল পরিদর্শনে আসে। সাহসী কিশোর মুজিব সেবার স্কুল ঘর মেরামত ও ওই অঞ্চলের অনুন্নত অবস্থার প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে তরুণ মুজিব বিক্ষোভ সংগঠিত করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর অঙ্গীকার আদায় করেন। দেশভাগের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়নের জন্যে ভর্তি হন। কিন্তু চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ঔদাসীন্যের বিরুদ্ধে তাদের বিক্ষোভ প্রদর্শনে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়েই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ বঞ্চিত হন।

১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠনে প্রধান সংগঠকদের একজন ছিলেন শেখ মুজিব। জেলে থাকা অবস্থায় নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন। মূলত দেশের মেহনতি মানুষের উপর শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক অন্যায়-অত্যাচার তাঁকে সংগ্রাম করতে শিখিয়েছে। তাই পরবর্তী জীবনে তিনি কোনো শক্তির কাছে আত্মসমর্পন করেননি, মাথানত করেননি।

সর্বকালের এই সেরা বাঙালি পাাকিস্তান পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে যখন ভাষণ দিতেন, তখন কখনোই পূর্ব-পাকিস্তান বলতেন না- বলতেন পূর্ব বাংলা। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র শেখ মুজিব অনবদ্য ভূমিকা রাখেন। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ এবং বাঁচার দাবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি পেশ করেন। বঙ্গবন্ধু ছোটদেরকে খুব ভালোবাসতেন। কচিকাঁচার মেলা ও খেলাঘর ছিল তাঁর প্রিয় সংগঠন।

২৫ শে মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর হামলা চালিয়েছিলেন। তিনি তখন নিজ বাসভবনেই ছিলেন। চাইলে তিনি আত্মগোপনে যেতে পারতেন, কিন্তু যাননি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন, তিনি মনে করেছিলেন- পাকিস্তানীরা তাঁকে পেলে হয়তো সাধারণ জনগণের কোনো ক্ষতি করবে না। ওইদিন আটক করে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানের কারাগারে তাঁকে আটক করে রেখেছিল। তাঁর জন্যে পাকিস্তানি কারাগার এলাকায় কবর খুঁড়ে রেখেছিল, কিন্তু তিনি পাকিস্তানীদের সঙ্গে কোনো ধরণের আপোস করেননি। দেশের মানুষের দোয়া ও ভালবাসার জোরে তিনি স্বদেশে ফিরে এসেছিলেন।

ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনার শক্তি কোথায়?’ বঙ্গবন্ধু জবাবে বলেন, ‘আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি।’ আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আর আপনার দুর্বল দিকটা কী?’ বঙ্গবন্ধু উত্তরে বললেন, ‘আমি আমার জনগণকে খুব বেশি ভালোবাসি।’

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারা ভোগ করেন। বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। কিন্তু একটি দিনও ব্যক্তিগত কারণে কারা ভোগ করেননি। শুধু দেশের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে গিয়ে জীবনের এতগুলি দিন অন্ধকার কারাগারে কাটিয়েছেন, শুধু মানুষকে ভালোবেসে।

৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার হয়ে এক হাজার ২১ দিন কারা ভোগ শেষে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণ-অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তি পান। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধী দেওয়া হয়। তিনি তো এই উপাধীরই যোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এ দেশের শাসক নই, আমরা এ দেশের সেবক- একথা মনে রাখতে হবে। জনগণের সেবার জন্যেই আমরা নির্বাচিত হয়েছি এবং তাদের সেবাতেই আমাদের আত্মনিয়োগ করতে হবে’। (জীবন ও রাজনীতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান)

তিনি সাধারণত সিনিয়র ব্যতিত সবাইকেই ভালোবেসে ‘তুই’ সম্মোধন করতেন। কারণ তিনি সবাইকেই আপন ভাবতেন। তাঁর বিভিন্ন সময়ের কথার মধ্যেও ভালোবাসার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলতেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হবার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। প্রধানমন্ত্রী আসে এবং যায়। কিন্তু যে ভালোবাসা ও সম্মান দেশবাসী আমাকে দিয়েছেন, তা আমি সারাজীবন মনে রাখবো। সাত কোটি বাঙ্গালির ভালোবাসার কাঙ্গাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারব না। দেশ থেকে সর্বপ্রকার অন্যায়, অবিচার ও শোষণ উচ্ছেদ করার জন্যে দরকার হলে আমি আমার জীবন উৎসর্গ করব।’

সব সময় জনগণ ছিল তাঁর প্রথম চাওয়া ও পাওয়া। দেশ স্বাধীন হলে ৯ মাস ১৬ দিন কারাবাস শেষে যেদিন দেশে ফিরলেন তিনি সেদিন প্রথম গেলেন জনগণের কাছে, পরিবারের কাছে যাননি। বিমান থেকে নেমে সোজা গেলেন রেসকোর্স ময়দানে, যেখানে জনগণ তাঁর জন্যে অপেক্ষা করছিল।

পরবর্তীতে তিনি ঘোষণা করলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’ (সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৭)। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন গ্রামীণ সমাজে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশের প্রতিটি গ্রামে গণমুখী সমবায় সমিতি গঠন করা হবে, যেখানে গরিব মানুষ যৌথভাবে উৎপাদন যন্ত্রের মালিক হবেন; যেখানে সমবায়ের সংহত শক্তি গরিব মানুষকে জোতদার-ধনী কৃষকের শোষণ থেকে মুক্তি দেবে; যেখানে মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীরা গরিবের শ্রমের ফসল আর লুট করতে পারবে না; যেখানে শোষণ ও কোটারি স্বার্থ চিরতরে উচ্ছেদ হয়ে যাবে।

তাঁর প্রখর স্মৃতিশক্তি ছিল। তিনি যাকে একবার দেখতেন, সহজে ভুলতেন না। রিকশাওয়ালা, পুলিশ, জেলহাজতে থাকা কয়েদী কাউকেই ভুলতেন না। তাদের বাবা-মায়ের নাম যদি শুনতেন, তিনি সেটাও মনে রাখতেন। কারাগারে থাকা অবস্থায় বাড়ি থেকে ভালো খাবার গেলে একা খেতেন না, সবাইকে নিয়ে খেতেন। কারাবন্দিদের বিভিন্ন আবদার যথাসম্ভব পূরণ করতেন। তার সেলের পাশেই ছিল পাগলদের জায়গা, এইসব পাগলদের জন্যেও তার খুব দরদ ছিল। পাগলদের যন্ত্রণা নিরবে সহ্য করতেন, কিন্তু মুখ ফুটে বা চেহারা কখনো বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। (কারাগারের রোজনামচা)

স্বাধীনতার পরে এসে তিনি জনগণকে ভুলে যাননি। তিনি বলতেন, ‘এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।’ সরকারি কর্মচারীদের বলতেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের জনগণের সঙ্গে মিশে যেতে হবে। তারা জনগণের খাদেম, সেবক, ভাই। তারা জনগণের বাপ, জনগণের ছেলে, জনগণের সন্তান। তাদের এই মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। সমস্ত সরকারি কর্মচারীকেই আমি অনুরোধ করি, যাদের অর্থে আমাদের সংসার চলে তাদের সেবা করুন।’

তিনি শুধু দেশের মানুষ নয়, সমগ্র মানবজাতিকেই ভালোবাসতেন। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত নোটবুকে লিখেছেন, ‘একজন মানুষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসাবে যা কিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কিত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর গোপালগঞ্জের ঈদগাহ ময়দানে এক গণ-সংবর্ধনায় বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু জনপ্রিয়তা হারিয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়, অথচ আমি ঢাকার বিমানবন্দর থেকে বনানী, শেরেবাংলা নগর, টুঙ্গীপাড়া ও সেখান থেকে গোপালগঞ্জ আসার পথে লাখো জনতার যে সম্মান, ভালোবাসা পেয়েছি তা বঙ্গবন্ধুর জন্যেই।’

আরও পড়ুন : বঙ্গবন্ধুর প্রতি কৃষকের হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা

বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই; কিন্তু প্রেরণার উৎস হয়ে, এক অনুপম আদর্শ হয়ে আমাদের মাঝে মিশে আছেন। তাঁর আদর্শ অন্ধকারে আমাদের পাথেয়। তাঁর ভালোবাসার ফল আমরা ভোগ করছি ঠিকই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারছি না। তাঁর ভালোবাসার ঋণ আজো শোধ করতে পারিনি, বরং আরও বেশি ঋণী হয়ে যাচ্ছি বেখেয়ালেই।

লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক

Categories
মুক্তমত

সীমা এবং সীমা লঙ্ঘন

গত কিছুদিন ‘বিতর্ক’ শব্দটি পত্রপত্রিকায় খুব ঘনঘন এসেছে। যদিও আমার মনে হয়েছে, শব্দটি যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি। কোনো একটা বিষয় নিয়ে বিতর্ক করতে হলে তার পক্ষে যে রকম যুক্তি থাকতে হয় ঠিক সেরকম বিপক্ষেও যুক্তি থাকতে হয়। যদি একটা বিষয়ে এর বিপক্ষে গলায় জোর ছাড়া অন্য কোনো যুক্তি না থাকে তখন সেটাকে ‘বিতর্কিত’ বিষয় বলা হলে বিষয়টিকে নিয়ে অনেক বড় অবিচার করা হয়। আমাদের দেশে সম্প্রতি ঠিক এটাই করা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় আলোচনা চলছে যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে ‘বিতর্ক’ হচ্ছে; এমনকি স্বয়ং মন্ত্রীরা ঘোষণা দিয়েছেন অতি শীঘ্রই এই বিতর্কের অবসান ঘটানো হবে। তাহলে কী মেনে নেওয়া হলো যে এই দেশে ভাস্কর্য একটি বিতর্কিত বিষয় এবং এই শিল্পটি শেখার আগে, প্রয়োগ করার আগে, কিংবা উপভোগ করার আগে আমাদের চিন্তাভাবনা করার প্রয়োজন আছে?

মানুষ শুধু বুদ্ধিমান প্রাণী নয়, তাদের ভেতর সৌন্দর্য অনুভব করার, উপভোগ করার এবং সেটি সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে। এটি একটি সহজাত প্রবৃত্তি, একটি অবোধ শিশুকেও মা সুর করে ঘুম পাড়ানি গান শুনিয়ে শান্ত করেন। আমরা কবিতা পড়ি, আবৃত্তি করি এবং কবিতা লিখি। আমরা গান শুনি, রাত জেগে ক্লাসিকাল সঙ্গীত উপভোগ করি। পৃথিবীতে কত ভিন্ন ভিন্ন বাদ্যযন্ত্র তৈরি হয়েছে, মানুষের ভেতর কত রকম সুর। পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন দেশে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে সেগুলো বিকশিত হয়েছে, কিন্তু তাদের ভেতর এক ধরনের বিস্ময়কর মিল আছে। আমরা ছবি আঁকি, মুগ্ধ হয়ে একটা সুন্দর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছি, যে শিশুটি এখনো দুই পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারে না, তাকেও কোলে নিয়ে একটি অপূর্ব পেইন্টিংয়ের সামনে দাঁড়ালে সে মুগ্ধ চোখে সেটির দিকে তাকিয়ে থাকে। সৌন্দর্য উপভোগ করা মানুষের একটি সহজাত ক্ষমতা, একটা ছোট শিশুর মস্তিষ্কটিতেও সেটি বিকশিত হতে শুরু করে।

জশুয়া বেল নামে একজন জগদ্বিখ্যাত বেহালাবাদক রয়েছেন যার বেহালা শোনার জন্য শ্রোতারা শত শত ডলার দিয়ে কনসার্ট শুনতে যান। একবার তাঁকে রাজি করানো হয়েছিল যে, তিনি ভিখিরি সেজে ওয়াশিংটন ডিসির মেট্রো রেল স্টেশনে বেহালা বাজিয়ে ভিক্ষে করবেন, রেলযাত্রীদের প্রতিক্রিয়া কী হয় সেটা পরীক্ষা করে দেখা হবে। বড় মানুষেরা তার বেহালা বাজানোকে গুরুত্ব না দিয়ে ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করে চলে গেছে। ছোট শিশুরা জশুয়া বেলকে চেনে না কিন্তু তারপরেও মুগ্ধ হয়ে তার বেহালা শুনতে চেয়েছে, তার সামনে থেকে নড়তে চায়নি। অবাক হবার কিছু নেই, শিল্পকলার জন্য ভালোবাসা আমাদের রক্তের ভেতর থাকে, এই ভালোবাসাটুকুই আমাদেরকে পৃথিবীর অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করে রেখেছে।

সেজন্য আমরা একেবারে শৈশব থেকে শিশুদের শিল্পকলা শেখাতে চাই। আমাদের পাঠ্যসূচিতে আমরা শিল্পকলা যুক্ত করেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চারুকলা বিভাগ রয়েছে, শিল্পীমনা ছেলেমেয়েরা সেখানে ছবি আঁকা শিখতে যায়। আমাদের দেশে নাটকের দল আছে, তারা মঞ্চে নাটক করে আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখি। নৃত্যকলা বিভাগ আছে, সেখানে ছেলেমেয়েরা নাচ শেখে। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক নৃত্য সম্মেলন হয়, সারা পৃথিবী থেকে সেখানে নৃত্যশিল্পীরা আসেন, আমরা এই অপূর্ব শিল্পকলা দেখে মুগ্ধ হই। আমাদের দেশে আমরা চলচ্চিত্র উৎসব করি, সেখানে সারা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রগুলো দেখানো হয়। কোভিডের এই দুঃসময়ে ঘরবন্দী মানুষের সময় কাটানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘরে বসে চলচ্চিত্র উপভোগ করা। একটি অসাধারণ চলচ্চিত্র একটি দেশের মানুষের ভেতর গভীর দেশপ্রেমের জন্ম দিয়েছে পৃথিবীতে সেরকম উদাহরণের কোনো অভাব নেই। এই শিল্পমাধ্যমের সাথে পরিচিত করার জন্য আমরা এই দেশে শিশু চলচ্চিত্র উৎসব পর্যন্ত আয়োজন করে থাকি। শিল্পকলা একটা জাতির মানসিক বিকাশের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ তাই পৃথিবীর সব দেশে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় থাকে, আমাদের দেশেও আছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে সাংস্কৃতিক চর্চাকে উৎসাহ দেওয়া হয়, বিকশিত করা হয়।

নানা ধরনের শিল্পমাধ্যমের মতো ভাস্কর্য একটি শিল্প মাধ্যম। যারা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাস্কর্যগুলো নিজের চোখে একবার দেখেছে তারা কখনোই সেগুলো ভুলতে পারবে না। ওয়াশিংটন ডিসিতে লিংকন মেমোরিয়াল হলের ভেতর শ্বেত পাথরের তৈরি আব্রাহাম লিংকনের একটি বিশাল এবং অপূর্ব ভাস্কর্য রয়েছে। ফ্লোরেন্সে রয়েছে মাইকেল এঞ্জেলোর তৈরি পৃথিবীর অন্যতম ভাস্কর্য ‘ডেভিড’। একজন রক্ত-মাংসের মানুষ যে এরকম একটি শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারে সেটি নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস হয় না। ভ্যাটিকানে রয়েছে মাইকেল এঞ্জেলোর ‘পিয়েতা’ নামে আরো একটি অপূর্ব ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যগুলো আমি নিজের চোখে দেখতে পেরেছি বলে সব সময় নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে এসেছি। এক সময় দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগতো— আজকাল দেশের বাইরে যেতে ইচ্ছা করে না, যদি কোথাও যাই তখন সেখানকার আর্ট মিউজিয়ামে পেইন্টিং বা ভাস্কর্যগুলো দেখতে পাবো সেটিই একমাত্র আকর্ষণ হিসেবে রয়ে গেছে। রাশিয়ার সুবিশাল ভাস্কর্য ‘মাতৃভূমির ডাক’ নিজের চোখে দেখার একটি গোপন ইচ্ছা মাঝে মাঝে বুকের ভেতর জেগে ওঠে।

ভাস্কর্য একটি অসাধারণ শিল্প মাধ্যম, পৃথিবীর মানুষ হিসেবে সেই মাধ্যম দেখার, উপভোগ করার এবং সৃষ্টি করার অধিকার আমার জন্মগত অধিকার। কেউ যদি আমাকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চায় তাহলে সে আসলে আমাকে আমার মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে! সেটি কি কেউ করতে পারে? কারো যদি সেটি উপভোগ করার ক্ষমতা না থাকে কিংবা উপভোগ করতে না চায় তাহলে সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার পুরো অধিকার তার আছে। কিন্তু তারা কোনোভাবেই অন্যদের সেটা থেকে বঞ্চিত করার কথা বলতে পারবে না। সেই অধিকার কেউ তাকে দেয়নি।

ভাস্কর্যের বিরোধিতা কি ওখানেই থেমে থাকবে? নাকি এই বিরোধিতা ধীরে ধীরে আমাদের দেশের অন্য শিল্পমাধ্যমের জন্যেও প্রযোজ্য হতে শুরু করবে? আমরা সবাই জানি আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ভেতর সেটা এর মাঝে ঢুকে গেছে। তাদের আবদার শুনে আমাদের সিলেবাস থেকে ‘বিধর্মীদের’ লেখা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বাস হয়, বাংলাদেশে এটা ঘটেছে? তাদের বিবেচনায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও নিশ্চয়ই একজন ‘বিধর্মী’ তার লেখা জাতীয় সংগীত সরিয়ে দেওয়ার কথাবার্তা কি আমরা মাঝে-মধ্যেই শুনতে পাই না? যে সমস্ত কারণে ভাস্কর্যের বিরোধিতা করা হয় তার সবগুলো কি ছবির বেলাতেও প্রযোজ্য নয়? তাহলে এই দেশ থেকে ছবিও কী ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ করার দাবি শুরু হবে না? সেখানে কী শেষ হয়ে যাবে? তারপর কি নৃত্যকলা বন্ধ করার দাবি আসবে? মঞ্চে নাটক করা, চলচ্চিত্র কী নিরাপদ থাকবে? আমরা তখন কী করব? সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়কে একটি অপ্রয়োজনীয় মন্ত্রণালয় হিসেবে বন্ধ করে দেব?

যাই হোক আমি সত্যিই এটা বিশ্বাস করি না— এটি শুধুমাত্র আমার ক্ষোভের কথা। কিছু ধর্মান্ধ মানুষের অযৌক্তিক কথা শুনে আমার দেশের মূল আদর্শ থেকে, স্বপ্ন থেকে আমরা বিচ্যুত হয়ে যাব সেটা কখনোই হতে পারে না। তাই সামনের কয়েকটা দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ— আমরা এখন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে চাই এই রাষ্ট্র এখন কী সিদ্ধান্ত নেয়। মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার আস্ফালন করা হয়েছে, এই দেশে বঙ্গবন্ধু শুধু একজন মানুষ নন, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ সমার্থক। তাই বঙ্গবন্ধুর অবমাননা আর বাংলাদেশের অবমাননার মাঝে খুব বড় পার্থক্য নেই।

আমি জানি না, আমাদের রাষ্ট্র কী এখন অনুভব করতে পারছে যে, এখন এই ধর্মান্ধ মানুষদের অর্থহীন কাজকর্মের সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়ার সময় হয়েছে? স্পষ্ট করে এখনই তাদের জানিয়ে দিতে হবে তাদেরকে ঠিক কতটুকু সীমানার ভেতরে থাকতে হবে?

তাদের কাছে যদি অন্য কোনো যুক্তি পৌঁছানো না যায়, অন্তত একটি যুক্তি নিশ্চয়ই পৌঁছানো যাবে, পবিত্র কোরআন শরীফে অনেকবার সীমা লঙ্ঘনকারীদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। তারা যেটা করছে, সেটা যদি সীমা লঙ্ঘন না হয়ে থাকে তাহলে কোনটা সীমা লঙ্ঘন?

লেখক : শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক

Categories
মুক্তমত

বানান ভুলের নানান কারণ

আজকের আলোচনা বানান ভুলের নানান কারণ নিয়ে। বাংলা ভাষায় বানান নিয়ে যেসব বিভ্রান্তি ও অনাচার চলছে তা ভাষার মর্যাদার জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি ভাষা ব্যবহারকারীদের জন্যও অমর্যাদাপূর্ণ ও বিব্রতকর। ভাষা ব্যবহারে অশুদ্ধির পেছনে অনেক কারণ রয়েছে।

বিশেষত বানান ভুলের ক্ষেত্রে অন্য যত কারণই থাকুক না কেন এগুলোর মূলে রয়েছে বানানের নিয়ম জানার ক্ষেত্রে আগ্রহ ও নিষ্ঠার অভাব। এটি ভাষার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বানানের অশুদ্ধি প্রধানত তিনটি কারণে ঘটে থাকে— ক. উচ্চারণ দোষে, খ. শব্দগঠন ত্রুটিতে এবং গ. শব্দের অর্থগত বিভ্রান্তিতে। এছাড়া, বহুবচনের দ্বিত্ব ব্যবহার, বিশেষ্য ও বিশেষণ সম্পর্কে ধারণার অভাব, শব্দকে বিনা প্রয়োজনে নারীবাচক করা ইত্যাদি কারণে শব্দের অপপ্রয়োগ ঘটে থাকে।

আরও পড়ুন- বর্ষসেরা শব্দ ‘লকডাউন’

অনেকেই বলে থাকেন— বলার সময় আমরা যেভাবেই বলি না কেন, লেখার সময় অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। ‘বলার সময় আমরা যেভাবেই বলি না কেন’— এরূপ স্বাধীনতাও ভাষা ও বানানের শুদ্ধতার জন্য ক্ষতিকর। বস্তুত বলার সময়ও আমাদের সতর্ক হতে হবে। লেখার ক্ষেত্রে যদি আমরা পরিপূর্ণ শুদ্ধতা আশা করি, তাহলে বলার ক্ষেত্রেও আমাদের শুদ্ধতার খুব কাছাকাছিই পৌঁছতে হবে।

বানানের অশুদ্ধির প্রধান কারণগুলো এখন সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক।

উচ্চারণ দোষে অশুদ্ধি:
বানানের অশুদ্ধির একটি প্রধান কারণ উচ্চারণ দোষ। আঞ্চলিক ভাষার উচ্চারণ প্রভাব থেকে অনেকেই মুক্ত হতে পারেন না, অন্যদিকে শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণের প্রতি সতর্কও থাকেন না। এই উচ্চারণ বিকৃতির প্রভাবে বানানেও অশুদ্ধি ঘটে। যেমন— ‘অত্যধিক’ শব্দকে ‘অত্যাধিক’ লেখা, ‘অদ্যাপি’কে ‘অদ্যপি’ লেখা বা ‘অনটন’কে ‘অনাটন’ লেখার মূলে রয়েছে এগুলোকে পড়ার সময় অশুদ্ধভাবে উচ্চারণ করার প্রভাব। সাহিত্যে চলতি ভাষার ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার লিখিত রূপে, বিশেষ করে বানানের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

শব্দগঠন ত্রুটির জন্য অশুদ্ধি:
শব্দের গঠনরীতি সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে বানান-বিভ্রান্তি ঘটে থাকে। শুদ্ধ বানানের জন্য শব্দ বা পদগঠনের নিয়মাবলি জানা অপরিহার্য। তাই বানানের শুদ্ধ্যশুদ্ধি বিচারে ব্যাকরণের আলোচনা অপরিহার্য। এ অপরিহার্যতার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। আমরা বিশেষ্য-বিশেষণকে যথাযথভাবে চিহ্নিত না করার কারণে বেশ কিছু বানান অহরহ ভুল করে থাকি। যেমন— ‘উৎকর্ষ’কে ‘উৎকর্ষতা’, ‘সখ্য’কে ‘সখ্যতা’, ‘সৌজন্য’কে ‘সৌজন্যতা’ লিখি। এভাবে ‘দরিদ্রতা’ বা ‘দারিদ্র্য’ এর পরিবর্তে ভুলভাবে ‘দারিদ্র্যতা’ লেখা হয়।

কারো মৃত্যুর পর শোকবার্তায় প্রায়শই বলা হয়— তার ‘বিদেহী’ আত্মার কল্যাণ কামনা করি। ‘বিদেহী’ একটি অশুদ্ধ শব্দ। ‘বিদেহ’ শব্দের অর্থ দেহশূন্য বা অশরীরী। বিদেহ শব্দটিই বিশেষণ, কাজেই এর শেষে ঈ-প্রত্যয় যোগে পুনরায় বিশেষণ করা ভুল। ‘উল্লেখিত’ শব্দটি ব্যাকরণ-সিদ্ধ নয়। অভিধানেও নেই। শুদ্ধ হলো উল্লিখিত। শব্দটি সন্ধির নিয়মে গঠিত (উল্লিখিত = উৎ + লিখিত)।

শব্দের অর্থগত বিভ্রান্তিতে অশুদ্ধি:
শব্দের যথাযথ অর্থ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান না থাকার কারণেও সঠিক শব্দ প্রয়োগে বিভ্রান্তি ঘটে থাকে। নিমন্ত্রণপত্রে প্রায়শই লেখা হয়— ‘আপনি স্বপরিবার আমন্ত্রিত’। এখানে ‘স্বপরিবার’ শব্দটি একটি ভুল প্রয়োগ। সঠিক প্রয়োগ হবে— ‘আপনি সপরিবার আমন্ত্রিত’। লক্ষণীয় ‘স্বপরিবার’ অর্থ নিজ পরিবার, আর ‘সপরিবার’ অর্থ পরিবারসহ। এখানে কার্যত পরিবারসহ অর্থাৎ পরিবারের অন্য সদস্যদের সহকারে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। তবে বাংলায় ক্রিয়া-বিশেষণরূপে ‘সপরিবারে’ ব্যাকরণসম্মত না হলেও প্রচলিত।

বিভিন্ন স্থানে রাস্তার নামে ‘স্মরণী’ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ‘সরণি’ শব্দের অর্থ রাস্তা। কাজেই বিভিন্ন ব্যক্তির স্মরণে রাস্তার নাম করতে হলে লিখতে হবে— শহিদ তাজউদ্দিন সরণি, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সরণি, নজরুল সরণি, ইত্যাদি।

‘উদ্দেশ’ এবং ‘উদ্দেশ্য’ শব্দ দুটি ব্যবহারে অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। ‘উদ্দেশ’ শব্দের অর্থ গন্তব্য, খোঁজ ইত্যাদি। অন্যদিকে, উদ্দেশ্য শব্দের অর্থ অভিপ্রায়, মতলব, তাৎপর্য, প্রয়োজন ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী গত সন্ধ্যায় লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়েছেন। — এখানে ‘উদ্দেশ্যে’ নয় ‘উদ্দেশে’ লিখতে হবে। কোন উদ্দেশে এখানে ঘুরঘুর করছ?— এখানে ‘উদ্দেশে’ নয় ‘উদ্দেশ্যে’ লিখতে হবে।

ফতোয়া ও ফতুয়া এই দুয়ের গোলমাল কথ্য ও লেখ্য উভয় ক্ষেত্রেই ঘটে। ফতোয়া হচ্ছে ইসলাম ধর্মশাস্ত্র-সম্মত সিদ্ধান্ত বা রায়। আর ফতুয়া গায়ে পরার জামাবিশেষ। প্রায়শই এ দুটির একটির স্থলে অন্যটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

স্বাক্ষর ও সাক্ষর নিয়েও বিড়ম্বনা কম নয়। ‘স্ব’ মানে ‘নিজ’ আর ‘স’ মানে ‘সাথে’ বা ‘সহিত’। অতএব, ‘দস্তখত’ বা ‘সই’ বা নিজ চিহ্ন-সংকেত বোঝাতে ‘স্বাক্ষর’ হবে আর অক্ষর জ্ঞান আছে এ রকম বোঝাতে হবে ‘সাক্ষর’। এভাবে, সংখ্যার পরিমাণ বুঝাতে ‘লক্ষ’, আর উদ্দেশ্য অর্থে হবে ‘লক্ষ্য’। আবার ক্রিয়াপদ হিসেবে ‘লক্ষ করা’ অর্থ দেখা এবং ‘লক্ষ্য করা’ অর্থ লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করা। ‘এমনই’ অর্থ এতই, এই পরিমাণ, এই রকম। আর ‘এমনি’ অর্থ অকারণে। যেমন— ক. ঐশী এমনই বখে গিয়েছিল যে সে মা-বাবাকে হত্যা করলো। খ. সব কিছু কি এমনি এমনি হয়?

বাহুল্যজনিত অশুদ্ধি:
স্বাস্থ্য, স্বাগত, স্বাগতম এসব শব্দের মধ্যে ‘সু’ বা ভালো অর্থ নিহিত আছে। কাজেই এগুলোর আগে আরেকবার ‘সু’ লাগিয়ে সুস্বাস্থ্য, সুস্বাগত বা সুস্বাগতম করা বাহল্যজনিত অশুদ্ধি। ‘অশ্রুজল’ একটি অশুদ্ধ শব্দ, কেননা অশ্রু শব্দের অর্থ চোখের জল, অশ্রু’র সাথে জল যোগ করলে তা হবে বাহুল্য। অশ্রুজল শব্দে এ বাহুল্য ব্যবহারের জন্য বাঙালিরা সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে। কাব্য, গান, গদ্য সর্বত্রই তিনি নির্বিচারে এ অশুদ্ধ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যেমন— ‘তারি লাগি যত ফেলেছি অশ্রুজল’ অথবা ‘কিন্তু অশ্রুজল ভর্ৎসনা মানিলো না’, ‘দুই নেত্র পল্লব হইতে টপ টপ করিয়া অশ্রুজল পড়িতে লাগিল’, ইত্যাদি।

বহুবচনের দ্বিত্ব ব্যবহার আরেকটি বহুল ব্যবহৃত বাহুল্যজনিত অশুদ্ধি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ তার এক সাম্প্রতিক লেখায় এ বিষয়ে মন্তব্য করেন: ‘কোন লেখক এ ত্রুটি থেকে মুক্ত তা খুঁজে বের করাও প্রায় দুরূহ হয়ে ওঠে। ’ সব প্রকাশ মাধ্যমগুলো, সকল সংস্থাসমূহ, সব ছাত্ররা, দক্ষিণাঞ্চলের সব জেলাসমূহে ইত্যাদি লেখা আমরা যেখানে সেখানে দেখতে পাই। এগুলোর শুদ্ধ প্রয়োগ হবে— সব প্রকাশ মাধ্যম অথবা প্রকাশ মাধ্যমগুলো, সকল সংস্থা অথবা সংস্থাসমূহ, সব ছাত্র অথবা ছাত্ররা, দক্ষিণাঞ্চলের সব জেলায় অথবা দক্ষিণাঞ্চলের জেলাসমূহে।

কেবলমাত্র, শুধুমাত্র এগুলোও বাহুল্য দোষে অশুদ্ধ। শুদ্ধপ্রয়োগ হবে— কেবল বা মাত্র বা শুধু।

শব্দ-সংক্ষেপে অশুদ্ধি:
শব্দ-সংক্ষেপ করার জন্য আগে বিসর্গ এবং অনুস্বার ব্যবহার করা হতো। আমরা এখনো নামের আগে উত্তরাধিকার সূত্রে মোহাম্মদ এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে ব্যবহার করে আসছি ‘মোঃ’ অথবা ‘মো:’। এখানে বিসর্গ (ঃ) হচ্ছে একটি পৃথক বর্ণ এবং কোলন (:) হচ্ছে একটি বিরাম চিহ্ন, কাজেই এগুলোর কোনোটিই শব্দ সংক্ষেপে ব্যবহৃত হওয়া সমীচীন নয়। প্রমিত বানানে শব্দ-সংক্ষেপ করার ক্ষেত্রে কেবল বিন্দু বা ডট (.) চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। কাজেই অনুরূপ অন্যান্য শব্দ-সংক্ষেপ সা., ডা., ড., কি.মি., ইত্যাদি হবে।

পৃথক শব্দ একত্রীকরণ এবং একক শব্দ পৃথকীকরণ:
আমরা অনেক সময় দুটি ভিন্ন শব্দকে একত্রে লিখে অথবা একক শব্দকে আলাদা করে লিখে শব্দের অশুদ্ধ প্রয়োগ করি। যেমন— ‘না’ একটি পৃথক শব্দ, তাই ক্রিয়াপদের সাথে এ শব্দটি একত্রে লেখা অশুদ্ধ। লিখতে হবে ‘চলে না’, ‘চলি না’, ‘বলি না, ইত্যাদি। আবার ‘নি’ কিন্তু পৃথক শব্দ নয়, এটি একান্তভাবেই পরাশ্রিত। এই পরনির্ভরতার কারণেই ‘নি’-কে পূর্ববর্তী শব্দের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া উচিত। লেখা উচিত ‘করিনি’, ‘বলিনি’, ইত্যাদি। -যুক্ত, -মুক্ত, -ভাবে, -গুলো, -গুলি, -সমূহ এগুলো বিভক্তি হিসেবে শব্দের সাথে একত্রে লিখতে হবে। তবে যুক্ত করা, মুক্ত করা, সে ভাবে আছে ইত্যাদি ক্ষেত্রে ‘যুক্ত’, ‘মুক্ত’, ‘ভাবে’ আলাদা শব্দ।

কিছু কিছু শব্দযুগল আছে যেগুলো একত্রে লিখলে এক অর্থ এবং আলাদাভাবে লিখলে অন্য অর্থ প্রকাশ করে। যেমন— ‘এক রকম’ (পৃথক শব্দ)— একই ধরনের বা এক ধরনের, ‘একরকম’ (একক শব্দ)— প্রায়ই, কোনোভাবে; ‘তার মধ্যে’ (পৃথক শব্দ)— কোনো কিছুর অভ্যন্তরে, তারমধ্যে (একক শব্দ)— অন্তর্বর্তী সময়ের মধ্যে।

অহেতুক স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহার:
দাপ্তরিক বা পেশাগত পদের ক্ষেত্রে অহেতুক স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহার করা ঠিক নয়। পদ যেখানে প্রধান শিক্ষক, প্রভাষক, অধ্যাপক, সদস্য, লেখক সেখানে অনর্থক সমস্যা তৈরি করে ‘প্রধান শিক্ষিকা’, ‘প্রভাষিকা’, ‘অধ্যাপিকা’, ‘সদস্যা’, ‘লেখিকা’ ইত্যাদি লেখা পরিহার করতে হবে।

প্রথাগত অভ্যাস:
বিশ্ববিদ্যালয় বা মহিলা কলেজ বললে অচেনা-অজানা মনে হয়; কিন্তু ইউনিভার্সিটি/ভার্সিটি বা গার্লস কলেজ বললে রিকশাওয়ালাও দ্রুত চেনে। খাঁটি বাংলায় জল বা ঈশ্বর বললে আমরা বুঝি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। আমাদের এই প্রথাগত সমস্যার কারণ হলো বাংলাভাষা ও ব্যাকরণ সম্পর্কে না জানা। একই উচ্চারণে ন-ণ, শ-ষ-স, ই-য়, ত-ৎ, ই-ঈ, উ-ঊ, ছ-স একাধিক বর্ণ থাকাও আমাদের প্রথাগত সমস্যাকে প্রকট করেছে। অনেক শব্দ তো ব্যাকরণের নিয়মে অশুদ্ধ হলেও বহুল প্রচলনের জন্য স্বীকৃত শব্দের মর্যাদা পেয়ে গেছে। যেমন— ব্যাকরণ অনুসারে শুদ্ধ শব্দ ইতোমধ্যে, কিন্তু ইতিমধ্যে বলতে বলতে বাংলাভাষী মানুষ এত অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে যে এর শুদ্ধি-অশুদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা অর্থহীন— এরূপ মন্তব্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

শোনা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের সময় বানান ভুলের জন্য নম্বর না কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়। অনেক শিক্ষক ও ভাষার শুদ্ধতা বিষয়ে চিন্তাশীল লেখকের মতে, এরূপ নির্দেশনার অর্থ বানান ভুলভাবে লেখার প্রতি অনুমোদন দেওয়া এবং বানানের শুদ্ধতা একটি গুরুত্বহীন বিষয় বলে উপস্থাপন করা। কর্তৃপক্ষের এরূপ নির্দেশনার মধ্যেও আমাদের প্রথাগত অভ্যাসের সুস্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়।

অনেকেই বাংলা একাডেমির বারংবার পরিবর্তিত নির্দেশনাকেও বানানের বিড়ম্বনার জন্য বিশেষভাবে দায়ী করে থাকেন। ভাষা আন্দোলনের এত বছর পর এসে এই তো সেদিন ‘বাংলা একাডেমী’ ‘বাংলা একাডেমি’ হলো।

শেষ কথা:
বানান ভুল পরিহার করার ব্যাপারটি প্রায় পুরোপুরিই ব্যক্তিগত শিক্ষা ও আয়ত্তের ব্যাপার। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজের ভুল বানানগুলো খেয়াল করে দক্ষতা ও উৎকর্ষ অর্জন করতে হয়। ভাষা শুদ্ধ করে লেখার জন্য দরকার সামান্য আগ্রহ ও একটু মমতা। অনেক ক্ষেত্রে বানান ভুলের কারণ অজ্ঞতা নয়, অসাবধানতা ও অমনোযোগিতা।

তাই ভুল পরিহারের জন্য লেখা শেষ করার পর ধীরে-সুস্থে আবার তা পড়ে দেখা উচিত। বানান শুদ্ধ আছে কি না সে সম্পর্কে সন্দেহপ্রবণতা বানান দক্ষতা অর্জনে ভালো কাজ দেয়। কোনো শব্দের বানান নিয়ে সন্দেহ হলে চট করে অভিধানের সঙ্গে তা মিলিয়ে নেয়া প্রয়োজন। সন্দেহ হলেই আলসেমি কিংবা অনুমানের ওপর নির্ভর না করে সঙ্গে সঙ্গে অভিধান দেখে বানান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এভাবে অভিধান দেখতে দেখতে একসময় বানানে দক্ষ হয়ে ওঠা যাবে।

ভয়েস টিভি/ডিএইচ