Categories
মুক্তমত

গরুদের হারিয়ে মুরগিদের আনন্দ মিছিল

মাংসের দামে গরুদের হারিয়ে দেয়ার ঘটনায় মুরগিরা রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় আনন্দ মিছিল করেছে। মুরগিদের নেতৃস্থানীয়রা বলেছেন, দশকের পর দশক ধরে চলা কঠোর পরিশ্রমের ফসল এবার পাওয়া গেছে। মাংসের দামের নিরিখে গরুরা এখন কম দামি। দাম বেড়েছে মুরগিদের। আর এই অর্জন এসেছে দেশি মুরগিদের ‘পা’ ধরে। স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে এ এক অনন্য অর্জন।

বাজারে গরুর চেয়ে মুরগির মাংসের কেজিপ্রতি দাম বেড়ে যাওয়ার খবরে সন্তোষ প্রকাশ করে সম্প্রতি এমন আনন্দ মিছিল বের করে নিখিল বাংলাদেশ মুরগি সমাজ। তবে সেদিন সব রাজপথে তারা বিচরণ করতে পারেনি। ভিভিআইপি মানুষদের আনাগোনা এবং সে কারণে রাস্তায় যান ও প্রাণী চলাচল নিয়ন্ত্রণ করায়, আনন্দ মিছিলের অভিমুখ বারবার পরিবর্তন করতে হয়। তবে সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় করে যথাসম্ভব চাকচিক্যের সঙ্গে আনন্দ মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল। এ সময় কিছু গরুকে বিমর্ষ চিত্তে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তাদের অনুভূতি জানতে চাওয়া হলেও, শুধু লেজ নাড়ানো ছাড়া মুখ খোলেননি তারা। ইঙ্গিতে জানিয়েছেন, এ ব্যাপারে তাদের অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হবে।

সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, বাজারে দুই জাতের মুরগির দাম গরুর মাংসকে ছাড়িয়ে গেছে। সোনালিকা মুরগির দামের কেজি উঠেছে ৩৮০ টাকায়। এ দরে জীবিত মুরগি কিনলে শুধু মাংসের দাম দাঁড়ায় ৫৮০ টাকার মতো। বাজারে এর সমান দামে গরুর মাংসও পাওয়া যায়। অন্যদিকে দেশি মুরগির মাংসের দাম গরুর চেয়ে অনেকটাই বেশি। চামড়া, পশম ও নাড়িভুঁড়ি বাদ দিলে দেশি মুরগির শুধু মাংসের কেজি দাঁড়ায় সাড়ে ৭০০ টাকার মতো।

মুরগির দামের গরম বাতাস বইছে অনলাইন জগতেও। ভার্চ্যুয়াল বাজারে রিয়েল সোনালিকা জাতের মুরগির এক কেজি ওজনের দাম প্রায় ৬৪০ টাকা। আর দেশি মুরগির কেজি দাঁড়াচ্ছে পৌনে ৮০০ টাকার মতো। যদিও গরুর মাংসের কেজি চাওয়া হচ্ছে ৬০০ টাকার নিচে।

নিখিল বাংলাদেশ মুরগি সমাজ আনন্দ মিছিলে জানিয়েছে, কিছুদিন আগে মাংসের চেয়ে ডিমের দাম কম হওয়ায় তারা আন্দোলন করেছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেই আন্দোলনে ভয় পেয়েই বাজারে এখন মুরগির ন্যায্য দাম উঠেছে। মনুষ্য চরিত্রের সমালোচনা করে এ সময় বলা হয়, ‘আমরা জানি, মানুষেরা বেশির ভাগই শক্তের ভক্ত, নরমের যম। ডিম নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে মনে রাখতে হবে যে ডিম কিন্তু আমরাই পাড়ি। সুতরাং, মানুষকে অন্য অর্থে “ডিম দেওয়া” আমাদের জন্য অসম্ভব কিছু নয়।’

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মাস তিনেক আগের হিসাব তুলনায় নিলে সোনালিকা জাতের মুরগির দাম বেড়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ। দেশি মুরগির দাম বেড়েছে ২৯ শতাংশের মতো। বাজারমূল্যে দেশিদের এমন উত্থানে পিছিয়ে থাকতে চাইছে না ব্রয়লার মুরগিও। কেজিতে দাম বেড়েছে ৩০ টাকার মতো।

নিখিল বাংলাদেশ মুরগি সমাজ আয়োজিত আনন্দ মিছিলে বিতরণ করা লিখিত বিবৃতি অনুযায়ী, মুরগিরা অনেক দিন থেকেই ন্যায্য দাম পাচ্ছিল না। আকারে বড় ও নানাবিধ কারণে গরুদের দাম বাড়িয়ে মুরগিদের আক্ষরিক অর্থেই ‘মুরগি’ বানানো হচ্ছিল। কিন্তু এবার সেই দুষ্টচক্র ভাঙা গেছে। যদিও ডিমের বাজারে এখনো সেভাবে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে না। তবে দেশীয় সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে মাংসের দামের ঘোড়াকে ‘উন্মাদ’ বানিয়ে দেওয়া গেছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি ভেদাভেদ রাখতে চায় না মুরগিদের নেতারা। ব্রয়লারকে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে চায় সমৃদ্ধির পথে।

মুরগিদের এমন আনন্দ মিছিলে কিঞ্চিৎ উত্তেজনা-উৎকণ্ঠাও ছিল। রাস্তায় কিছু গরুকে উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুরগিরা আনন্দ পেলেও, যখন ভিভিআইপিদের চলাফেরার কারণে মুরগিদের মিছিলকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢোকার জন্য বাধ্য করা হচ্ছিল, তখন মুরগি নেতারা আতঙ্কিত হয়ে এর প্রতিবাদ শুরু করেন। তাদের আশঙ্কা, এই আনন্দ মিছিলকে ‘প্রতিবাদ মিছিল’ মনে করে হেলমেট পরা সুসজ্জিত কোনো দলকে তাদের ওপর লেলিয়ে দিতে পারে স্বার্থান্বেষী মহল। এ সময় এক মুরগি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা আমাদের ছোট মাথা অনুযায়ী বিশেষ হেলমেটের ক্রয়াদেশ দিয়েছি। তা এখনো আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। সেগুলো পাওয়ার আগপর্যন্ত আমাদের পক্ষে অরক্ষিত অবস্থায় ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব হবে না।’ পরে অবশ্য মুখ খোলা যাবে না, এমন শর্তে তাদের রাস্তার পাশে এক কোণে নির্বিবাদে দাঁড়িয়ে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।

এদিকে মুরগিদের এমন মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে গরুরা হতাশ হলেও এ বিষয়ে ‘গোবন্ধন’ আয়োজনের মতো শক্ত পদক্ষেপ নিতে চাইছে না তারা। জাতীয় গোবৎস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের একজন বিশিষ্ট নেতা বলেন, মানুষের সঙ্গে তারা দ্বন্দ্বে যেতে চাইছেন না। মাস তিনেকের মধ্যেই তারা ফর্মে ফিরে আসবেন বলে ধারণা করছেন। আর তা-ও না হলে কোনো এক ঈদের পর আন্দোলন করা হতে পারে। সেটিই হবে ‘ট্রাম্প কার্ড’।

ওই নেতা আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে এ-ও বলেছেন, ‘মুরগিদের আবারও “মুরগি বানানো” সময়ের ব্যাপার মাত্র। স্থানীয় অনেক মানুষও আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হচ্ছেন। ফলে আমাদের সাংগঠনিক শক্তি ক্রমশ বাড়ছে। গরুদের সঙ্গে মানুষদের একটি বিরাট অংশের মস্তিষ্কজনিত যে নিবিড় সম্পর্ক আছে, তাতে মুরগিরা তাদের ছোট মাথা দিয়ে চিড় ধরাতে পারবে না। কথায় আছে, বেশি বাড় বেড়ো না, ঝরে পড়ে যাবে। দেশি-ব্রয়লার সবার ক্ষেত্রেই এমনটা হতে পারে।’

এমন হুমকিতে অবশ্য ভয় পাচ্ছে না সোনালিকা ও দেশিরা। তারা বলছে, মানুষ এমন প্রাণী যে এরা যেদিকে বৃষ্টি হবে, সেদিকেই ছাতা ধরবে। প্রয়োজনে এরা স্বজাতিকেও ‘মুরগি বানায়’, ‘গরু’ বলে গালি দেয়। এমন প্রজাতির প্রাণীকে ‘অলটাইম দৌড়ের ওপর’ রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। সেটা যখন সম্ভব হয়েছে, তখন গরু কোন ছার!

সূত্র: প্রথম আলো।

Categories
মুক্তমত

মুজিব চিরন্তন

বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৭ মার্চ ১৯২০ সালে– সে অনুযায়ী ২০২০ সালকে সামনে রেখে উৎসবমুখর পরিবেশে দেশে-বিদেশে তার জন্মশতবার্ষিকী আয়োজনের ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ২৬ শে মার্চ ২০২১ পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এ উদ্‌যাপনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছিল তারও আগে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন যাত্রার প্রাক-মুহূর্তে শুরু হয় বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯। এরূপ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিছু কর্মসূচির বাস্তবায়ন কাজ অসমাপ্ত থাকার বিষয়টি বিবেচনায় এনে সম্প্রতি সরকার এ সময়কে ১৬ই ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে।

মুজিব শতবর্ষ উদ্‌যাপন প্রতিটি বাঙালির জীবন অভিজ্ঞতার অসাধারণ একটি অংশ। তাই এ আয়োজনে বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী বাঙালিরা যার যার অবস্থান থেকে বিপুলভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতিতেও সারা পৃথিবীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা রকম আয়োজন চলছে। মুজিববর্ষের লোগো দেশে-বিদেশে এখন দৃশ্যমান। অন্তর্জালে নানা আয়োজনে সংযুক্ত হচ্ছেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞজন। সারা পৃথিবীতে বাঙালির সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে তারা। সর্বত্রই বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। তাদের আলোচনায়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, আত্মত্যাগ ও জীবনব্যাপী আন্দোলন-সংগ্রাম উদ্ভাসিত হচ্ছে। মুজিববর্ষে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ব্যাপকভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে এটি স্পষ্ট যে বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ে অবিনশ্বর এক আসন নিয়ে আছেন যা বাঙালির হাজার বছরের অতিক্রান্ত ইতিহাসে অন্য কোনো নেতা নিতে পারেনি। বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু, এটি আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য।

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিলে প্রকাশিত নিউজ উইক পত্রিকায় সাংবাদিক লরেন জেনকিন্স বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে লিখেছেন:

তার তেজস্বিতা দুর্দান্ত; পূর্ব পাকিস্তানিরা তাকে ‘মুজিব’ নামে চেনে। তিনি আমাদের বিদেশি সাংবাদিক দলটির সঙ্গে তাঁর বাড়ির বাগানে মুখোমুখি হলেন এবং আবেগদীপ্ত ভাষায় বললেন, “আমার জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধ। তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। আপনারা কি মনে করেন, মেশিনগান আমার জনসাধারণেরে আত্মা ও চেতনা আদৌ নিশ্চিহ্ন করতে পারবে?

বঙ্গবন্ধুর অন্য সকল দূরদর্শী মন্তব্য ও ভবিষ্যদ্বাণীর মতো এই কথাও সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে তার প্রিয় বাঙালির কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার চেতনাকে হত্যা করতে পারেনি। এটি আজ তার শাহাদত বরণের এত বছর পর আরও স্পষ্ট হয়েছে যে বঙ্গবন্ধু বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন আলোকশিখা হিসেবে আছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ১৬ অগাস্ট সকালে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ নিয়ে টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে যখন হেলিকপ্টার যাত্রা করে, ঘাতক কবলিত বাংলাদেশের সেই শোকাবহ শ্বাসরুদ্ধকর সময়ে কোটি কোটি মানুষ ঘটনার আকস্মিকতায় তাদের শোক ও অশ্রুকে চাপা দিয়ে রেখেছিল। সেই মৃত্যুপুরীতে বঙ্গবন্ধুর শবযাত্রা সম্ভব হয়নি। টুঙ্গিপাড়ায় খুব তাড়াহুড়ো করে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানকে দাফন করা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুর অন্তিমযাত্রা চিরবেদনার অংশ হয়ে আছে। যেন এখনও জাতি বহন করে চলেছে তার প্রিয়তম সন্তানের মরদেহ; বহন করবে চিরকাল।

আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী কিংবা জন এফ কেনেডির মৃত্যুর পরে তখন পরিস্থিতি প্রতিকূল ছিল না। জনগণ প্রকাশ্যে শোক প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছিল। ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল আততায়ীর গুলিতে আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যু ঘটে। আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যু আমেরিকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মৃত্যুর পরে তার মরদেহ ওয়াশিংটন থেকে ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। এই দীর্ঘ যাত্রায় ২২ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল– ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর পণ্ডিত জওহর লাল নেহেরু তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, “The light has gone out”। আমাদের জাতীয় জীবনেও নেমে এসেছিল ঘোর অমানিশা যা থেকে আলোর পথে উত্তরণ ছিল সুকঠিন ও শ্বাপদসংকুল পথযাত্রা।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্টের সেই কালরাতে তারা শুধু বঙ্গবন্ধুকে যে হত্যা করতে চেয়েছিল তা নয়, তারা চেয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিনাশ করতে– মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের সকল শুভ বোধ, শুভ অর্জনকে ধ্বংস করতে। বিদেশে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুইকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, সেই সঙ্গে বেঁচে যায় বাংলাদেশ। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পর শুরু হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই। বহু মানুষ জীবন দিয়েছিল, কিন্তু শেষাবধি ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ফিরে এসেছে।

প্রতিবছর বঙ্গবন্ধু নবভাবে উদ্ভাসিত হচ্ছেন। এবার, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর যুগপৎ মহা-আয়োজনের অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে চলেছে সমগ্র বাঙালি জাতি। এজন্য ১৭-২৬শে মার্চ ২০২১ ‘মুজিব চিরন্তন’ শীর্ষক দশদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম, জীবনব্যাপী আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সর্বোপরি তার বৈচিত্র্যময় জীবনের নানান অনুষঙ্গকে উপজীব্য করে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা সাজানো হয়েছে। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চের শুভক্ষণে বঙ্গবন্ধুর জ্যোতির্ময় আবির্ভাবকে উপজীব্য করে ১৭ মার্চ ২০২১ তারিখে জাতির পিতার জন্মতিথির জন্য প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে কবিগুরু রবিঠাকুরের মহানায়কের প্রার্থনায় রচিত অমর পঙ্‌ক্তি, ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়’।

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ও কালজয়ী ভাষণ, যা বাঙালির জাতীয় জীবনে চূড়ান্ত বাঁকবদল ঘটিয়েছিল, সেটির উপর ভিত্তি করে ১৮ মার্চের অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে ‘মহাকালের তর্জনী’। বঙ্গবন্ধু, বাঙালি ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন সত্তা। বাংলাদেশের প্রকৃতি-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে প্রতিটি অনুষঙ্গে জড়িয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু শাশ্বত মহিমাকে উপজীব্য করে ১৯ মার্চের নির্ধারিত থিম কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই অমর পঙ্‌ক্তি ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা’। বঙ্গবন্ধুর যে সাহসী তারুণ্য বাঙালি জাতিকে মুক্তির আন্দোলনে প্রজ্জ্বলিত করেছিল তার ভিত্তিতে ‘তারুণ্যের আলোকশিখা’কে ২০ মার্চের প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়াও জাতির পিতার স্বদেশ নির্মাণের নিরলস প্রচেষ্টা ও সাফল্যগাথার ভিত্তিতে ২১ মার্চে ‘ধ্বংসস্তূপে জীবনের গান’; বাংলা ও বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধকে উপজীব্য করে ২২ মার্চে ‘বাংলার মাটি আমার মাটি’; নারীমুক্তির জন্য জাতির পিতার অসমান্য ভূমিকার ভিত্তিতে ২৩ মার্চে ‘নারীমুক্তি, সাম্য ও স্বাধীনতা’; বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতির পিতার বলিষ্ঠ ভূমিকাকে উপজীব্য করে ২৪ মার্চে ‘শান্তি, মুক্তি ও মানবতার অগ্রদূত’; পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার নির্মমতা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে উপজীব্য করে ২৫ মার্চে ‘গণহত্যার কালরাত্রি ও আলোকের অভিযাত্রা’ এবং মহান স্বাধীনতার অতিক্রান্ত ৫০ বছর ও অজস্র ষড়যন্ত্র-প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার বিভিন্ন দিককে উপজীব্য করে ২৬শে মার্চে ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’কে প্রতিপাদ্য হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সম্প্রতি দেশে-বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ অনেক লিখেছেন; তার জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন। যতকাল যাবে তাকে নিয়ে, তার দর্শন, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবোধ নিয়ে আরও লেখা হবে। মূলত মৃত্যুর পরে বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধার যে যাত্রা এখন শুরু হয়েছে তা ‘মুজিব চিরন্তন’-এর যাত্রা। তাই মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপনের মাধ্যমে বাঙালির এ যাত্রা শেষ হবে না। এটি অন্তহীনভাবে চলবে এবং জাতির সৃজনে, মননে, দর্শনে এবং চিন্তায় বঙ্গবন্ধুর জীবন, কর্ম এবং আত্মত্যাগের মহিমা আরও উদ্ভাসিত হবে। বুলেট বাঙালির মুক্তির মহানায়কের চেতনা ও আত্মাকে ধ্বংস করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর সেই অবিনাশী চেতনাই মুজিববর্ষে আমাদের ‘মুজিব চিরন্তন’ যাত্রায় আমাদের অসীম প্রেরণা।

লেখক: কবি ও প্রধান সমন্বয়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি।

Categories
মুক্তমত

সাতই মার্চের ৫০ বছর

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ৫০ বছর হয়ে গেল। কিন্তু এখনো আমার চেতনায়, আমার হৃদয় জুড়ে রয়েছে অসম্ভবকে সম্ভব করার সেই দিনটি। ঘোষণা ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিবেন রেসকোর্স ময়দান থেকে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দি উদ্যান) এবং তা সরাসরি প্রচারিত হবে রেডিও ও টেলিভিশন থেকে। ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারের উদ্দেশ্যে আমরা সবাই প্রস্তুত হলাম ৭ই মার্চ সকাল থেকে। রেডিও-র পরিচালক জনাব আশরাফুজ্জামান খান আমাদেরকে ডেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। বেতার ভবনে দায়িত্বে থাকবেন আশফাকুর রহমান খান ও বাহারাম উদ্দিন সিদ্দিকী, এবং জাহিদুল হক ডিউটি রুমে। রেসকোর্স মাঠে থাকবেন শামসুল আলম ও কাজী রফিক। এবং স্টেজে থাকবেন পরিচালক আশরাফুজ্জামান খান, সহকারী পরিচালক আহমেদ জামান খান এবং অনুষ্ঠান সংগঠক আমি নাসার আহমেদ চৌধুরী। ভাষণ সরাসরি প্রচার এর জন্য উপস্থিত ছিলেন প্রকৌশল বিভাগের কর্মচারীরা। ঐতিহাসিক ভাষণ শুরু হওয়ার মুহূর্তে বাহারাম উদ্দিন সিদ্দিকী আমাদেরকে টেলিফোনে জানালেন, পাক আর্মির মেজর সালেক জানিয়েছেন ভাষণ প্রচার করা যাবে না। ভাষণ প্রচার করা হলে বোমা মেরে রেডিও উড়িয়ে দেওয়া হবে। ততোক্ষণে বঙ্গবন্ধু ভাষণ প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হলো। সারা দেশ তখন পাক আর্মির দখলে। এক টুকরো ছোট কাগজে লিখে বঙ্গবন্ধুর হাতে দেওয়া হলো আপনার ভাষণ পাক আর্মি প্রচার করতে দিচ্ছে না।

সারা দেশ সারা জাতি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল। আমি তখন জীবনের পুরোপুরি ঝুঁকি নিয়ে আমার সঙ্গে নেওয়া ছোট উহার রেকর্ডারে লুকিয়ে সমস্ত ভাষণ রেকর্ড করে ফেললাম। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে রেডিও-টেলিভিশন অফিস-আদালত বন্ধ ঘোষণা করলেন এবং প্রস্তুত থাকতে বললেন। আমরা তার কথামতো সমস্ত ভিডিও প্রচার বন্ধ করে দিলাম এবং আমরা হাতিরপুলে কাজী রফিকের বাসায় আত্মগোপন করে রইলাম। রেডিও প্রচার বন্ধ হওয়ায় পাকিস্তানি সরকার এবং সেনাবাহিনী হতভম্ব হয়ে গেল। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকলো না। যার ফলে সেনাবাহিনী রেডিও-র কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো।

তৎকালীন সেনাপ্রধান রাও ফরমান আলী আশরাফুজ্জামান খানকে অনুরোধ করলেন, দয়া করে আপনারা রেডিও প্রচার শুরু করুন এবং শেখ মুজিবের ভাষণ প্রচার করুন। তখন সেই ভাষণ, যা আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেকর্ড করেছিলাম, সেটাই পরের দিন প্রচার করা হলো। সেই ভাষণ শুনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। নয় মাস লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের সেই সময়ের অবদানের মূল্যায়ন কিন্তু আজও হলো না। এদিকে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই অসহযোগ আন্দোলন, ৭ই মার্চের ভাষণ প্রচার, এবং রেডিও পাকিস্তানের নাম পরিবর্তন করে ঢাকা রেডিও করার জন্য আমাদের ওপর শুরু হলো পাকিস্তান আর্মির স্টিমরোলার চালানো।

পরিচালক আশরাফুজ্জামান সাহেবকে সরিয়ে তার স্থলে আনা হলো প্রাক্তন রেডিও পরিচালক সৈয়দ জিল্লুর রহমানকে। একদিন পাকিস্তান আর্মির কর্নেল কাশেম রেডিওতে এসে হাজির হলেন। একে একে আমরা যারা যারা অসহযোগ আন্দোলনে জড়িত ছিলাম তাদের মধ্যে পরিচালকরা নুরুন্নবী খান, দিলরুবা বেগম, শামসুল আলম, কাজী রফিক সবাইকে সাসপেন্ড করা হলো। আর আমাকে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো ক্যান্টনমেন্টে। পরিচালক জিল্লুর রহমান সাহেব আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন ও খুব ভালোবাসতেন। রেডিওতে চাকরি তিনিই আমাকে দিয়েছিলেন। কর্নেল কাশেম জিল্লুর রহমান সাহেবের কক্ষে বসা। সেখানে আমার ডাক পড়লো। আমার সব সহকর্মী আমার প্রাণের জন্য দোয়া শুরু করলো। দুরু দুরু বুকে আমি পরিচালকের কক্ষে হাজির হলাম। জিল্লুর রহমান সাহেব তার চেয়ারে বসা। কর্নেল কাশেম তার পাশে হাতে ব্রিফকেস কোমরে পিস্তল নিয়ে বসে আছেন। জিল্লুর রহমান সাহেব কর্নেল কাশেমকে আগেই বলে রেখেছিলেন যে আমার কোন অফিসারকে ধরে নিতে পারবেন না। এদের ছাড়া আমি রেডিও চালাতে পারবো না।

কর্নেল কাশেম আমাকে জেরা শুরু করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম নাসের চৌধুরী? আমি বললাম, জি স্যার। তুমি শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ আমাদের নিষেধ সত্ত্বেও রেকর্ড করেছিলে? আমি বললাম, জি। কেন করেছিলে? আমার উত্তর দেওয়ার পূর্বে জিল্লুর রহমান বললেন, পরিচালকের নির্দেশে রেকর্ড করেছিল। পরের প্রশ্ন, তুমি শেখ মুজিবকে চিরকূট লিখে জানিয়েছিলে তার ভাষণ প্রচার করা হচ্ছে না। আমি বললাম, “না আমি চিরকূট লিখিনি।” কর্নেল বললেন, “আমার কাছে চিরকূটের ছবি আছে তুমি সেটা শেখ মুজিবের হাতে দিচ্ছো।” আমি বললাম, “আমি লেখিনি, আমি দিইনি।” বললেন, “তোমাকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেলে তুমি সবই বলবে।” আমার মনে পড়ে তখন জিল্লুর রহমান সাহেব আমাকে বাঁচাতে কর্নেলকে বললেন, “ও অত্যন্ত ভালো ছেলে। সে একজন ভালো অফিসার ও ভালো গান গায়। মেহেদী হাসানের গান গজল খুব সুন্দর গায়। ওর মামা আলী হাসান পাকিস্তানের সিএসপি অফিসার। সেক্রেটারি। কর্নেল, আমি তার দায়িত্ব নিজে নিচ্ছি।”

আমি আবার আসবো বলে কর্নেল চলে গেলেন। কর্নেল চলে যাওয়ার সাথে সাথে জিল্লুর রহমান আমাকে একদিনের নোটিশে চট্টগ্রাম রেডিওতে বদলি করে দিলেন। আমার প্রাণ রক্ষা পেল। চট্টগ্রামে সাতদিন থাকার পর আমি ঢাকায় ফিরে এলাম। তবে রেডিওতে আর যোগদান করলাম না। ততদিনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমি দেশাত্মবোধক গানের টেপ মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন রুমির মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাঠাতাম। মুক্তিযোদ্ধা মায়া গ্রুপের সিরাজ উদ্দিন ভূঁইয়া আমার বন্ধু। শেরাটন হোটেলে ও আজিমপুর গার্লস স্কুলে বোমা ফাটাতে তাকে সাহায্য করলাম। ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। ১৭ ডিসেম্বর আবার রেডিওতে দিলাম। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দৈনিক পত্রিকায় আমার নাম প্রকাশিত হলো। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্বীকৃতি আমি আজও পাইনি।

Categories
মুক্তমত

এশিয়ায় বিস্ময়কর ‘ডিজিটাল লিডার’ বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের একটি প্রবন্ধ ৩ মার্চ বুধবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘নিউজউইক’ এ ছাপা হয়েছে। পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো-

এক দশকেরও বেশি আগে বাংলাদেশ ঘোষণা করেছিল, প্রতিষ্ঠার ৫০তম বার্ষিকী বা ২০২১ সালের মধ্যে প্রযুক্তিতে অগ্রগামী দেশ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবে। আমরা যে এটা করতে পারব তা খুব বেশি মানুষ বিশ্বাস করেনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে যখন দায়িত্ব নিলেন তখন দেশের মাত্র ২ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন ছিল। অথচ এখন কমপক্ষে ১২ কোটির বেশি বাংলাদেশির হাতে মোবাইল ফোন এবং লাখ লাখ মানুষের কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ আছে, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত। ফলে জীবন উন্নত ও নিরাপদ হয়েছে দেশের অগণিত মানুষের।

২০০৯ সালে উচ্চাভিলাষী ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয় দ্রুত সেবা দেয়া, কাগজভিত্তিক সরকারি সেবাকে ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনভিত্তিক প্রোগ্রাম ব্যবহার করে সহজ করে তোলার লক্ষ্যে। ই-সিগনেচার এবং ইলেকট্রনিক ফাইলিং ব্যাপকভাবে চালু করা হয়।

সরকার সারা দেশে ৮৫০০ ডিজিটাল সেন্টারের একটি নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছে, যার মাধ্যমে জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত সব ধরনের সেবা অনলাইনে দেয়া হচ্ছে। জন্ম নিবন্ধন, চাকরি প্রাপ্তি এবং অনলাইনে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি অনেক সহজ হয়েছে। অনেক জাতীয় কর্মসূচি এখন অনলাইনে চলে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে গত বছর লকডাউন দেয়া হয় তখনও সরকারি সেবায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি।

নতুন একটি ওয়েবসাইট ব্যবহার করে আদালতের কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে। কৃষিভিত্তিক একটি পোর্টাল থেকে কৃষকরা আবহাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ আপডেট এবং অন্যান্য তথ্য পাচ্ছেন। কোভিড-১৯ সম্পর্কিত তথ্য সাধারণ নাগরিকদের মোবাইলের মাধ্যমে জানানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে চালু করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম সরকারি পোর্টাল, যার মাধ্যমে প্রায় সব ধরনের সরকারি সেবা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো- সরকারি শতকরা ৮৫ সেবা স্মার্টফোনের মাধ্যমে নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেয়া। শতকরা ১০ ভাগ সেবা পৌঁছে যাবে তাদের ঘরের দরজায়। আর বাকি শতকরা সেবা পেতে মানুষকে সরকারি অফিসগুলোতে যেতে হবে।

পাসপোর্ট পাওয়া থেকে শুরু করে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনসহ সবকিছুই পাওয়া যায় অনলাইনে।

এ সফলতার একটি মূল উপাদান মোবাইল ফোন। বাংলাদেশে চালু করা হয়েছে টোল-ফ্রি জাতীয় জরুরি সেবা হেল্পলাইন ৯৯৯- দুর্ঘটনা, সাইবারক্রাইমসহ যে কোনো অপরাধ, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, অগ্নিকাণ্ড এবং জরুরি চিকিৎসা সেবায় নাগরিকরা এটি ব্যবহার করেন।

ধন্যবাদ সম্মিলিত জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য কৌশলের প্রতি। টেলিমেডিসিন এখন শুধু সম্ভবই নয়, একটি সাধারণ বিষয়, বিশেষ করে অনগ্রসর গ্রামীণ এলাকায়। এ কর্মসূচি মৌলিক স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে থাকে, যা একটি সুস্থ জাতি গঠনে নেতৃত্ব দেয়। এছাড়া সরকার আরও বেশি জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে। সরকারি সেবা বা পণ্য সম্পর্কে অনলাইনে অভিযোগ জমা দেয়া যায় সহজেই।

ব্যাপক সংযুক্তি দেশের অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করছে। দক্ষ ও ডিজিটাল জ্ঞানসম্পন্ন কর্মশক্তি গড়ে তোলার জন্য নেয়া হয়েছে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে এবং প্রতি বছর ৫ লাখ গ্রাজুয়েট কর্মী তৈরি হচ্ছে। শুধুমাত্র গত বছর তথ্যপ্রযুক্তি পেশায় এসেছেন কমপক্ষে ৬৫ হাজার মানুষ।

ডিজিটাল সেন্টারগুলোই কর্ম সৃষ্টির নিয়ামক। প্রতিটি কেন্দ্রে তিনটি পদের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী।

দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। ফলে বাংলাদেশ হলো সাইবার কর্মীদের জন্য এক উর্বর ক্ষেত্র। এই সুযোগ নিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে যুব সমাজ। অতীতে এদের বেশিরভাগই নিজেদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে জীবন বেছে নেয়ার কথা কল্পনাও করতেন না। কিন্তু বর্তমানে তরুণ বাংলাদেশিরা ক্রমবর্ধমান হারে শহরমুখো, গতিশীল এবং নতুন অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে প্রস্তুত।

ডিজিটালাইজেশন থেকে দারুণ সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩ লাখের বেশি প্রযুক্তি পেশাদার কাজে যুক্ত হয়েছে। আছেন ১০ হাজারের বেশি প্রযুক্তিবিষয়ক উদ্যোক্তা। সবমিলে, বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সেবা থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে ১০০ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছেন। এছাড়া সাশ্রয় হচ্ছে ২০০ কোটি ঘন্টা সময়, ৮০০ কোটি ডলার এবং সরকারি অফিসে ১০০ কোটি বার যাওয়া।

আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশ ঊর্ধ্বপানে ছুটে চলেছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথম যোগাযোগবিষয়ক স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করে। এই স্যাটেলাইট নানাবিধ টেলিযোগাযোগ সেবা দেয়ার মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে।

এক বিস্ময়কর আরোহণ!

২০০৮ সালে বাংলাদেশের বার্ষিক অভ্যন্তরীণ জাতীয় প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) হার ছিল শতকরা প্রায় ৫ ভাগ। কিন্তু বর্তমানে এটা শতকরা ৮ ভাগের ওপরে। সহজলভ্য উচ্চমাত্রার যোগাযোগ ব্যবস্থা এই প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রী হাসিনার অধীনে বাংলাদেশ অনেক কিছু অর্জন করেছে। তবে তার কোনোটিই বাংলাদেশের ইন্টারনেট যুগের নাটকীয় অগ্রগতির চেয়ে বেশি চমকপ্রদ নয়। এমনকি এখন আমরা আমাদের ডিজিটাল বিশেষজ্ঞদের রপ্তানি করছি।

এশিয়ায় আমাদের প্রতিবেশী মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় ডিজিটালাইজেশনের কাজে সহায়তা করছেন বাংলাদেশি প্রশিক্ষকরা।

এটা যে সম্ভব মাত্র এক দশক আগে কেউ তা চিন্তাও করতে পারতেন না।

ভয়েস টিভি/এসএফ

Categories
মুক্তমত

আমৃত্যু শোধ হবে না এই ঋণ

যাত্রাটা শুরু হয়েছিল ১৮ আগস্ট ২০১৩। বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের মাত্র ৫ মাস বাকি তখন। যুক্তরাষ্ট্রের আয়েশি জীবন ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে এসে হেটে ছিলাম। কারণ তখন সবেমাত্র আওয়ামী লীগ ৫টা সিটি কর্পোরেশনে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হেরেছে। হেফাজত, বিএনপি, জামাতের বাঁশেরকেল্লা বাহিনীর অপপ্রচারে ত্রাহি অবস্থা। ওই সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে সুযোগ দিয়েছেন তাঁর উপ প্রেসসচিব হিসাবে কাজ করার। সরকারের কাজের প্রচার প্রচারণা, গুজব প্রতিরোধ ও মিডিয়া সেক্টর নিয়ে কাজ করেছি। তবে তখনো সরকারের ব্যাপক উন্নয়নের সুনাম ছিল। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তি ইমেজ ছিল এখনকারমতোই প্রতিদ্বন্দ্বিহীন।

ছোট সময় থেকে এই দলটির সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার কারণে এই দায়িত্ব ছিল আমার জন্য বিশাল প্রাপ্তি ও সম্মানের। একে’তো দেশের প্রধানমন্ত্রী আবার তিনি যদি হন বঙ্গবন্ধু কন্যা। পরপর তিন তিনবার নিয়োগ পাবার মত ভাগ্যবান একজন আমি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে এই সৌভাগ্য কয়জনের হয়। আমি সেই ভাগ্যবানদের একজন। অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। আমৃত্যু এই ঋণ শোধ হবেনা। জীবনে যখন যেখানে যেভাবে থাকবো শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও দল ও নেত্রীর জন্য কাজ করে যাবো।

অতপরঃ সুখবর হচ্ছে, আমি সাংবাদিকতার উপর আরো পড়াশোনা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের Hofstra University’তে একটি স্কলারশিপ পেয়েছি। গত সেপ্টেম্বরেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়। সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে চাইনি। কারণ আমি মিডিয়াতে কাজ করা মানুষ। এই সেক্টরেই কাজ করে যেতে চাই। আর উচ্চ শিক্ষার প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুর্বলতা সবাই জানেন। তাঁদের পরিবারের সকলকেই তিনি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে আমাকেও তিনি সেই সুযোগটি দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা নেত্রীর প্রতি।

আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, আমি আমার পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য আবেদন পত্র দিয়েছি। কারণ চুক্তি ভিত্তিক নিয়োগে শিক্ষা ছুটির কোনো বিধান নাই। খারাপ সময়ে যোগদান করে ভালো সময়ে এসে সাড়ে সাত বছরের জার্নি আপাতত শেষ করতে যাচ্ছি। হয়তো আবার দেখা হবে। এই দীর্ঘ যাত্রা পথে যাদের সহযোগিতা পেয়েছি তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, ব্যক্তিগত অনুবিভাগ,দলের নেতাকর্মী এবং সর্বোপরি দেশের সকল মিডিয়ার আলোকিত মানুষেরা। যাদের সহযোগিতা পাইনি, ক্রমাগত বিরোধিতা ও প্রতিবন্ধকতা পেয়েছি তাদের প্রতিও অনেক কৃতজ্ঞতা। কারণ তাদের কারণে আমি এই বয়সেই অনেক কিছু শিখেছি যা বাকি জীবন পথ চলতে অনেক সহায়ক হবে। সবাই ভালো থাকবেন। জয়বাংলা।

(লেখাটি প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের ফেসবুক স্ট্যাটাস)

Categories
বিনোদন মুক্তমত

একটি হিরোর গেলো জান, নামটি হলো শাকিব খান

সেলিম খান এবার হলো সবার প্রাণ
তাইনা দেখে একটি হিরোর গেলো জান
নামটি হলো শাকিব খান।

সেলিম খান একশতটা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে, এ সংবাদে কে কতটুকু খুশি হয়েছে আমি জানি না, তবে আমি ততটুকু খুশি হয়েছি যতটুকু খুশি ছোটবেলা ঈদের চাঁদ দেখলে হতাম। আমি কিন্তু ঐ একশত চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে নেই। তবুও এতখুশি হয়েছি এ জন্য আমাদের চলচ্চিত্র অঙ্গন আবার নতুন করে প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে পাবে। বলতে গেলে আমাদের চলচ্চিত্র একরকম প্রযোজক শূন্য হয়ে পড়েছিলো। এবার সেই শূন্যতা আবার পূর্ণ হতে চলেছে, আজ এই আনন্দে শুধু আমি আনন্দিত নই, আনন্দিত গোটা চলচ্চিত্র। তবে এরই মধ্যে চলচ্চিত্রের একজনকে খুশি হতে দেখলাম না, অনলাইন সোশ্যাল মাধ্যমগুলোতে দেখলাম সেখানে শাকিব খানের কথা শুনে আমার মনে হলো এতে তার হিংসা হয়েছে।

যদিও সে কারো নাম ধরে কথা বলেনি তবুও আমার মনে হলো সেলিম খানের একশতটি চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়েই কথা বলেছে। কাকে যেন স্টুপিডও বলেছে। কিন্তু ওর তো এমন হিংসা করার কথা নয় কারণ সে আমাদের কোনো প্রযোজক নয়, সে শুধু মাত্র একজন নায়ক। আজকাল সে টুকটাক ইংরেজী শব্দও ব্যবহার করছে, কোকিলের মত অনেকেই সুর ধরতে চায় কিন্তু কোকিলের ডাক তো অন্য পাখি ডাকতে পারে না এবং দাড়কাক কখনো ময়ূর সাজতে পারে না।

শাকিব খান বর্তমানে এক নাম্বার নায়ক হলেও সে ভেবে দেখেনি ওর জন্য বর্তমানে চলচ্চিত্র প্রায় ধ্বংসের পথে। এর কারণ হলো চলচ্চিত্রে ব্যবসা না থাকা সত্বেও ৩০/৪০ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক নেয় শুনেছি, সে যদি চলচ্চিত্রকে ভালোবাসতো তাহলে ঐ পারিশ্রমিকের ৪ ভাগের ১ ভাগ টাকা পারিশ্রমিক নিয়ে অভিনয় করতো।

দুই নাম্বার কারণ হলো, ৩০ দিনে একটি চলচ্চিত্র যদি শেষ করা যায় সেখানে তার নন কো-অপারেশনের জন্য দুই মাসের অধিক সময় লেগে যায়। উল্লেখ থাকে যে, বর্তমানে একদিন শুটিং করতে প্রযোজকের ব্যয় হয় ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। এখন ৩০ দিনের পরিবর্তে যদি শাকিব খানের জন্য ৬০ দিন সময় ব্যয় হয় তাহলে ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার অধিক ব্যায় হয়। শাকিবের এমন আচরণে মনে হয় প্রযোজকের টাকা তার পৈত্রিক সম্পত্তি ছাড়া আর কিছুই না। আমি টাকা খরচ করাবো তাতে কার কি আসে যায়? বাহ্।

আমার শেষ কথা হলো সবার উচিত সেলিম খানকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, কাহিনীকার ও গীতিকার

Categories
মুক্তমত

বিপর্যয় রোধে জাতীয় ভাষানীতি প্রয়োজন

ভাষা-পরিস্থিতি সতত পরিবর্তনশীল। কোনো নির্দিষ্ট দেশের ভাষা-পরিস্থিতি কখনো স্থির থাকে না। কিন্তু ভাষা-পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তন ঘটে, তা সে দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির অনুকূলেও ঘটতে পারে, আবার প্রতিকূলেও ঘটতে পারে। অনুকূলে ঘটলে তা গ্রহণযোগ্য হয়; আর যদি প্রতিকূলে ঘটলে হয় অগ্রহণযোগ্য। কারণ, কোনো দেশের ভাষা–পরিস্থিতিতে নেতিবাচক পরিবর্তন সে দেশে দীর্ঘমেয়াদি ভাষা-রাজনৈতিক অস্থিরতা বয়ে আনে।

বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি পরিবর্তিত হচ্ছে। পরিবর্তনের ছাপ সমাজ ও সংস্কৃতিতে পরিদৃষ্ট হচ্ছে। তবে ইদানীং তা ঘটছে সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিকূলে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে ভাষা–সংশ্লিষ্ট নানা সমস্যা, যাকে বলা যেতে পারে ভাষিক সমস্যা। এসব ভাষিক সমস্যার কোনো কোনোটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ প্রধানত বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত একটি প্রতিসম রাষ্ট্র হওয়ায়, দেশের ভাষা-পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে উদ্ভূত ভাষিক সমস্যাগুলো প্রকটভাবে প্রতিভাত হচ্ছে না। সে জন্য জাতীয় নেতৃত্ব ভাষা-পরিস্থিতিগত সমস্যাকে সমস্যা হিসেবে আমলে নিচ্ছে না। বর্তমান বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতির নেতিবাচক পরিবর্তনের ধারায় যেসব ভাষিক সমস্যা পরিদৃষ্ট হচ্ছে, তা নিম্নরূপ:
‌‌
১. ভাষিক আধিপত্যবাদের কবলে পড়ে বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি নেতিবাচক দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে। ভাষিক আধিপত্যবাদ হলো ভাষিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কর্তৃক অনুবর্তী জাতির ভাষাকে দুর্বল করে দেওয়ার কৌশল বিশেষ। বস্তুত ইংরেজি, আরবি ও হিন্দি আধিপত্যবাদের কবলে নিপতিত হয়ে বাংলা ভাষা তার মর্যাদা ও কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

২. ইংরেজি ও নানা আঞ্চলিক উপাদানে দুষ্ট হয়ে বাংলা ভাষা উচ্চারণ, ব্যাকরণ ও বাগর্থিক মাপকাঠিতে তার সৌষ্ঠব হারাচ্ছে। তা ছাড়া বাংলা ভাষা ইংরেজি (ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরবি) ভাষার তুলনায় মর্যাদা হারাচ্ছে। শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষাকে আর মর্যাদার চোখে দেখা হচ্ছে না।

৩. বাংলা মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কওমি মাদ্রাসাগুলোয় যথাক্রমে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি মাধ্যমে শিক্ষা পরিচালিত হলেও ভাষা শিক্ষার অব্যবস্থাপনার ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যথাক্রমে বাংলা, ইংরেজি ও আরবিতে দক্ষতার অবনমন ঘটে চলেছে।

৪. শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ব্যবহারের ব্যাপকতা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাকে গ্রাস করে চলেছে। ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় ইংরেজি দক্ষতা অর্জনের বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে পুরো জনগোষ্ঠীকে সাংজ্ঞাপনিক ইংরেজি (communicative English)-তে দক্ষ করার সরকারি ও ধনিক শ্রেণির উদ্যোগ নানা নেতিবাচক সামাজিক-সাংস্কৃতিক উপসর্গের জন্ম দিচ্ছে। এক গবেষণা থেকে যেসব উপসর্গ চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলো হলো ক. দেশে একটি বাংলা বিমুখ নতুন প্রজন্মের সৃজন ঘটছে, খ. ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ইংরেজিকরণ ঘটছে এবং ইংরেজি মাধ্যমে অফিস-আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। গ. বাংলা ও ইংরেজির ভাষা সংসর্গজাত মিশেল ভাষার (বাংলিশ) বিস্তার ঘটছে এবং ঘ) দৃশ্যমান ও শ্রাব্য উভয় প্রকার ভাষিক বিশৃঙ্খলা পরিদৃষ্ট হচ্ছে।

৫. বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার সুবিধা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে আরবি, ফারসি, সংস্কৃত ও পালি ইত্যাদি ভাষাগুলোকে কেবল ধর্মচর্চার মাধ্যম হিসেবে আটকে রাখা হয়েছে। ধর্মচর্চায় ব্যবহৃত এ ভাষাগুলোর শিক্ষায় ও প্রয়োগে প্রচুর জাতীয় বাজেট জড়িত। কিন্তু এগুলো জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির নিয়ামক হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেসব উদ্দেশ্যে ব্যবহারে ব্যর্থতার কারণে দেশ বিশ্বায়নের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

৬. বাংলাদেশের বিদেশি ভাষা শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া দরকার বিশ্বায়ন আদর্শভিত্তিক। কিন্তু বিশ্বায়ন নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে ভাষানীতি সমর্থিত একটি ভাষা শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্টি না করে অপরিকল্পিতভাবে বিদেশি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে এবং তা বিশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। সে কারণে দেশে এখন মেরুদণ্ডহীন বিশৃঙ্খল বিদেশি ভাষা শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

৭. অপরিকল্পিত ভাষা শিক্ষাব্যবস্থার ফলে শিক্ষা খাতে অপচয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। কোনো নীতি বা পরিকল্পনা বিবেচনায় না নিয়ে ইংরেজি ভাষা শিক্ষাকে বনিয়াদি শিক্ষা হিসেবে প্রচলন করা হয়েছে। অন্যদিকে ভাষাগত দক্ষতা মূল্যায়নের বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয়েছে, সে কারণে ইংরেজি শিক্ষায় ব্যাপৃত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে রয়েছে। ফলে দেশে ভাষা-শিক্ষায় ব্যয়িত অর্থের সমপরিমাণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

৮. ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর ভাষাকে তার গঠন, মর্যাদা ও প্রায়োগিকতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতি মাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, আবার কখনো কখনো অবহেলা করা হচ্ছে। সরকারি প্রশাসনের আওতায় পরিচালিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নামক জাতীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও বাজেট দেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষা গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় করা হচ্ছে অথচ বাংলা ভাষা উন্নয়নের লক্ষ্যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না।

এই আলোচনা থেকে যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে তা হলো, বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি নেতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ফলে নানা ভাষিক সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, পৃথিবীর দেশে দেশে ভাষা-পরিস্থিতির নেতিবাচক পরিবর্তনজনিত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যা থেকে দেশকে সুরক্ষার লক্ষ্যে ভাষানীতি প্রণয়ন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বিপর্যস্ত ভাষা-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি ভাষানীতি প্রয়োজন।

কারণ, একটি জাতীয়তাবাদী ভাষানীতি প্রণীত ও বাস্তবায়িত হলে সরকার ভাষা–পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রশাসনিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে এবং তা বাস্তবায়নের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হবে এবং তা বাস্তবায়ন সম্ভব হলে বাংলাদেশ ভাষিক সমস্যাজনিত রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে নিষ্কৃতি পাবে।

এ বি এম রেজাউল করিম ফকির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও টোকিও বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব অতিথি শিক্ষক।

Categories
মুক্তমত

জলবায়ুর ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল বিশ্ব নাগরিক হতে আগ্রহী ভারত

প্যারিস চুক্তির পাঁচ বছর পর সেই সব উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে রয়েছে, যারা কেবল তাদের `সবুজ‘ লক্ষ্যই পূরণ করে না। বরং আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে আগ্রহী। সাম্প্রতিক জলবায়ু লক্ষ্য সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য আরও উঁচুতে স্থির করতে হবে। কেননা আমরা আমাদের অতীতের দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাহ্য করতে পারি না। তিনি আরও যোগ করেছেন যে, ভারত কেবল প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যই অর্জন করবে না বরং তাকে ছাড়িয়ে যাবে।

২০১৯ সালে জাতিসংঘ ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটে মোদী বলেছিলেন যে, এক টন প্রচারের চেয়ে এক আউন্স অনুশীলনের মূল্য বেশি। জলবায়ু কর্ম ও জলবায়ু লক্ষ্য সংক্রান্ত বিষয়ে নেতৃত্ব দিতে আমাদের সমাজের পুরো যাত্রায় আমরা জ্বালানী, শিল্প, পরিবহন, কৃষি এবং প্রাকৃতিক স্থানগুলির সুরক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে ব্যবহারিক পদক্ষেপ নিচ্ছি।

ভারত অনুধাবন করে যে, সাইলো’র ভেতরে থেকে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যে লড়াই করা যায় না। এর জন্যে একটি সংহত, বিস্তৃত এবং সামগ্রিক পদ্ধতির প্রয়োজন। প্রয়োজন উদ্ভাবন, এবং নতুন ও টেকসই প্রযুক্তি গ্রহণ করা। এই অপরিহার্য বিষয়গুলি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ভারত তার জাতীয় উন্নয়নমূলক এবং শিল্পকৌশলগত পরিকল্পনাগুলিতে জলবায়ুকে মূলধারায় রেখেছে।

জলবায়ু কৌশলগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে শক্তি। আমরা বিশ্বাস করি যে, ভারত একটি পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এবং আমরা কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদনকারী উৎস থেকে পুনর্নবায়নযোগ্য এবং অ-জীবাশ্ম-জ্বালানী উৎসগুলিতে শক্তি রূপান্তরে নেতৃত্ব দিচ্ছি।

আমরা ভারতের পুনর্নবায়নযোগ্য জ্বালানী সম্ভাবনার সদ্ব্যবহারের লক্ষ্য রাখি। আমাদের পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তি ক্ষমতা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম এবং সক্ষমতা সম্প্রসারনের যে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সেটিও বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম। এর বেশিরভাগ অংশই আসবে সূর্য থেকে। যা সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শক্তির উৎস।

আমরা ইতোমধ্যে অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি। আমরা প্রাথমিকভাবে ২০২২ সালের মধ্যে ১৭৫ গিগাওয়াট পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা আরও এগিয়ে গিয়ে, আগামী দুই বছরে ২২০ গিগাওয়াট পেরিয়ে যাওয়ার আশা করছি। আরও বেশি উচ্চাভিলাষী হয়ে ২০৩০ এর মধ্যে আমাদের ৪৫০ গিগাওয়াট লক্ষ্য রয়েছে।

২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে বিদ্যুৎ শক্তির ৪০% অ-জীবাশ্ম জ্বালানী উৎস থেকে উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের অর্থনীতির নিঃসরণের তীব্রতাকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৩-৩৫% হ্রাস করার লক্ষ্যে ২০০৫ সাল থেকে চলমান একটি সমান্তরাল প্রচেষ্টার সঙ্গে এই পরিষ্কার শক্তির উদ্যম হাত মিলিয়ে চলেছে।

এলইডি বাতি ব্যবহারের জাতীয় অভিযান `উজালা প্রকল্প‘ প্রতি বছর কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করছে ৩৮.৫ মিলিয়ন টন। `উজ্জ্বলা প্রকল্প‘, যার আওতায় ৮০ মিলিয়নেরও বেশি পরিবারকে পরিষ্কার রান্নার গ্যাসের সংযোগ সরবরাহ করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পরিষ্কার শক্তি উদ্যোগ।

জলবায়ু বিষয়ক কার্যক্রম ও স্থায়িত্বকে সরকারি পরিকল্পনার মধ্যে আনা হচ্ছে। যা একাধিক ক্ষেত্র জুড়ে বাস্তবায়ন যোগ্য। ১০০টি শহরকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে আরও টেকসই এবং অভিযোজিত হতে সহায়তা করার জন্যে কাজ করছে আমাদের স্মার্ট সিটিস মিশন।

আগামী চার বছরের মধ্যে বায়ু দূষণ (পিএম ২.৫ এবং পিএম ১০) ২০-৩০% হ্রাস করার লক্ষ্যে জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। জল জীবন অভিযান, যার লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে গ্রামীণ ভারতের সমস্ত পরিবারে স্বতন্ত্র গৃহস্থালির কল সংযোগের মাধ্যমে নিরাপদ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে পানীয় জল সরবরাহ করা। এর একটি দৃঢ় স্থায়িত্বের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে।

আরও গাছ লাগানো হচ্ছে এবং একটি কার্বন `সিঙ্ক‘ তৈরি করতে পতিত জমিগুলো পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে। যা ২.৫-৩ বিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিতে পারে। আমরা সবুজ পরিবহন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে কাজ করছি। বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলোতে তার দূষণ নির্গমনের জন্যে পরিচিত ক্ষেত্রগুলোকে পরিশোধনের জন্যে দ্রুতবেগে কাজ করছি।

ভারতে নির্মিত হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের অবকাঠামো। যেমন গণ পরিবহন ব্যবস্থা, গ্রিন হাইওয়ে এবং নৌপথ। ই-মবিলিটি ইকোসিস্টেম নামক একটি জাতীয় বৈদ্যুতিক গতিশীলতা পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য ভারতের রাস্তায় সমস্ত যানবাহনের ৩০% এর বেশি যেন বৈদ্যুতিক হয়।

যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলির মধ্যে ভারতের অবস্থান। তাই এই উদ্যোগগুলি আমাদের নিজেদের ভালোর জন্যেই গ্রহণ করা হয়েছে।

আমরা স্বীকার করি, এখনও অনেক দীর্ঘ পথ যেতে হবে। তবে এই প্রচেষ্টাগুলোর সুফল ইতোমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। ২০০৫-২০১৪ সময়ে ভারতের কার্বন নিঃসরণের তীব্রতা ২১% কমেছে। পরের দশকে আমরা আরও অনেকটা কমিয়ে আনার প্রত্যাশা করছি।

ভারত জলবায়ু ক্ষেত্রের দায়িত্বশীল বিশ্ব নাগরিক হতে আগ্রহী। আমরা কেবল আমাদের প্যারিস চুক্তির প্রতিশ্রুতিগুলো ছাড়িয়ে যাচ্ছি না। আমরা জলবায়ু কর্মে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিতে নানান উদ্ভাবনী ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।

আমরা ‘ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স’ এবং ‘কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেসিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করেছি। যেগুলো কার্বন হ্রাসের জন্যে বৈশ্বিক পথ তৈরিতে কাজ করছে। ৮০টিরও বেশি দেশ ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্স-এ যোগ দিয়েছে। যার ফলে এটি পরিণত হয়েছে দ্রুত বর্ধমান আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর একটিতে।

জাতীয় পদক্ষেপ এবং দায়িত্বশীল আন্তর্জাতিক নাগরিকত্বের এই সমন্বয় ভারতকে উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে অনন্য করে তুলেছে। একই সঙ্গে এটি জলবায়ু সম্পর্কে চিন্তাভাবনা এবং কার্যক্রমে নেতৃস্থানীয় হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উপলব্ধি করার জন্যে সঠিক কক্ষপথে রেখেছে।

লেখক : পররাষ্ট্র সচিব, ভারত

সুত্র :  টমসন রয়টার ফাউন্ডেশন

ভয়েস টিভি/এমএইচ

Categories
মুক্তমত

‘টিকা’ টিপ্পনী

আমি গতকালকে টিকা নিয়ে এসেছি। সবাই জিজ্ঞেস করছে, “কেমন লাগছে?” কিছু একটা চমকপ্রদ উত্তর দিতে পারলে ভালো লাগত। শরীরের ভেতর বেয়াদব-বেয়াক্কেল-বেতমিজ করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিষেধক তৈরি করার বিশাল দজ্ঞযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে কিন্তু বাইরে থেকে তার কিছুই বুঝতে পারছি না। এমনকি হাতের যেখানে সুচ ফোটানো হয়েছে সেখানেও কোনো ব্যথা নেই। বাংলা ভাষায় ‘শরীর ম্যাজম্যাজ’ বলে একটা অসাধারণ কথা আছে- গতকাল সেই কথাটা বলা যায় কিনা চিন্তাভাবনা করেছি কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারিনি।

টিকা দিতে যাওয়ার আগে আমার ছেলে-মেয়ে দেশের বাইরে থেকে জানিয়েছে “সেজেগুজে যাবে, অবশ্যই ছবি তুলে পাঠাবে।” পুরুষ মানুষ কেমন করে সাজগোজ করে বিষয়টা আমার জন্য দুর্বোধ্য হওয়ার কারণে সেটা আমার স্ত্রীর জন্যে প্রযোজ্য বলে ধরে নিয়েছি। টিকা নেয়ার সময় ছবি তোলা হয়েছে, হাতে সুচ ফোটানো নিয়ে আমার ভেতরে এক ধরনের আতংক কাজ করছিল বলে মাস্ক দিয়ে মুখের প্রায় পুরোটুকু ঢেকে থাকার পরও চেহারায় এক ধরনের ফাঁসির আসামির ভাব চলে এসেছে! তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো টিকা দেয়ার জন্য সুচ ফোটানোর সময় বিন্দুমাত্র ব্যথা লাগেনি। এই সিরিঞ্জের সুচ কি খুবই সরু নাকি বয়স হওয়ার কারণে অন্য অনেক অনুভূতির সাথে ব্যথার অনুভূতিও চলে যাচ্ছে সেটি বুঝতে পারলাম না!

যারা সিরিঞ্জের সুচকে ভয় পান তাদেরকে অভয় দিয়ে বলতে পারি, এই প্রথম আমি বিন্দুমাত্র ব্যথা না পেয়ে একটা ইনজেকশন নিয়েছি। টিকা দেয়ার সময় ভয়ের আর কোনো কারণ নেই, তবে স্থানীয় সাংসদ কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যানরা যে নিজেরাই টিকা দিতে শুরু করেছেন, সেই বিপদ সম্পর্কে আমি অবশ্য কোনো অভয়বাণী শোনাতে পারছি না। (তবে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নির্বুদ্ধিতার তালিকায় এটি নিঃসন্দেহে একটা অসাধারণ সংযোজন- ভবিষ্যতে অনেক জায়গায় এর উদাহরণ দেয়া যাবে!)

গত কিছুদিন পরিচিতদের সাথে কথা বলার সময় অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে, “স্যার আপনি কি টিকা নেবেন?” আমি বলেছি, “অবশ্যই নেব! কতদিন থেকে এই টিকার জন্য অপেক্ষা করছি!” তখন বেশিরভাগই বলেছে, “কিন্তু স্যার একটু দেখেশুনে কি নেয়া উচিত না? ইন্ডিয়ান জিনিস, কী না কী দিয়ে দিচ্ছে!”

সারা পৃথিবীতে এই টিকা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রোজেনিকার যে টিকাটি আমরা নিচ্ছি সেই একই টিকার জন্য ইউরোপের সবগুলো দেশ হা-হুতাশ করছে। কেন এখনও টিকা পাওয়া যাচ্ছে না সেটা নিয়ে হুমকি-ধামকি চলছে, মামলা মোকদ্দমা হয় হয় অবস্থা! আমাদের দেশের কূটনীতিকদের ভেতর যারা চালাক চতুর তারা সেই দেশের ওপর ভরসা করে না থেকে এক ফ্লাইটে এসে টিকা নিয়ে অন্য ফ্লাইটে চলে যাচ্ছেন বলে শুনছি। আমাদের দেশের বিদেশী কূটনীতিকেরা রীতিমতো সারি বেধে এসে এই টিকা নিয়ে যাচ্ছেন, তাদের অনেকেই নিজের দেশে থাকলে এখন এই টিকা পেতেন না। ইন্ডিয়ার যে সেরাম ইনস্টিটিউটে এই টিকা তৈরি হয়েছে সেটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টিকা প্রস্তুতকারক, সারা পৃথিবীতে বহুদিন থেকে তারা টিকা সরবরাহ করে যাচ্ছে। আমাদের সরকার অনেক বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে কারো দান খয়রাতের ওপর নির্ভর করে না থেকে নিজের টাকা দিয়ে টিকা বায়না করে রেখেছে, এমন একটি টিকা বেছে নিয়েছে যে টিকা সংরক্ষণ এবং বিতরণের প্রযুক্তি আমাদের দেশেই আছে, সব নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে সেই টিকা সময়মতো আমাদের দেশে চলে এসেছে, আমার চুল পেকেছে বলে সবার আগে আমি সেই টিকা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছি। কিছু স্বল্পবুদ্ধির মানুষ বলছে এটা ‘মুরগির টিকা’ সেজন্য আমি সেই টিকা নেব না এটা কি কখনো হতে পারে? যারা আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন আমি টিকা নেব কিনা, আমি উল্টো তাদের জিজ্ঞেস করি, “আমাকে দেখে কি এত বোকা মনে হয়, যে আমি জেনেশুনে এই সুযোগটি লুফে নেব না?”

আমি একেবারে গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি রাজনীতি করার জন্য যারা এই টিকার গীবত গাইছেন তারাও রাতের অন্ধকারে, মুখে মাস্ক এবং চোখে গগলস পরে গোপনে সেই টিকা নিতে যাবেন!

আমার টিকা নেয়ার অভিজ্ঞতাটুকু চমৎকার, হাসপাতালে পৌঁছানোর পরে ১৫ মিনিটের ভেতর টিকা নেয়া শেষ! নিবন্ধিত সবারই একটা ক্রমিক নম্বর থাকে, সেটা খুঁজে বের করতেই একটু সময় লেগেছে, আমাদের মোবাইল টেলিফোনে যখন তারিখ জানানো হয়েছে তখন ক্রমিক নম্বরটি নির্ধারিত হয়ে গিয়ে থাকলে সেই এসএমএসেই ক্রমিক নম্বরটি জানিয়ে দিলে ভলান্টিয়ারদের যন্ত্রণা নিশ্চয়ই আরো একটু কম হতো। আমরা টিকা নেয়ার সময় নানা ভঙ্গীতে ছবি তুলেছি, অন্যদের কেউ কেউ বলেছেন তাদের ছবি তুলতে দেয়া হয়নি—আমার মনে হয় শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে যেহেতু টিকা দেয়াটি উৎসবের রূপ নিতে যাচ্ছে, সবাইকে একটু ছবি তুলতে দিলে সমস্যা কী?

সব বড় প্রক্রিয়াতে ছোট বড় কিছু সমস্যা হবেই, তখন এই সমস্যার সমাধান করতে হয়। এখানেও তাই, নিবন্ধন করার সময় যাদের ছোট বড় সমস্যা হচ্ছে তারা যেন কাউকে তার সমস্যার কথা জানাতে পারে তার একটা ব্যবস্থা থাকলে মন্দ হতো না। একটি হটলাইন থাকলে সরাসরি ভলান্টিয়াররা সাহায্য করতে পারত। (বহুকাল আগে আমরা যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএমএস করে ভর্তি নিবন্ধনের ব্যবস্থা করেছিলাম তখন বেশ কয়েকটি চব্বিশ ঘণ্টার হটলাইন রেখেছিলাম। এ ধরনের নূতন একটা পদ্ধতিতে ছেলেমেয়েদের কী ধরনের সমস্যা হয় সেটা সম্পর্কে একটা ধারণা করার জন্য হটলাইনের একটা টেলিফোন আমি আমার নিজের কাছে রেখেছিলাম। টেলিফোনটা যে আমার কাছে ছিল ছেলেমেয়েরা সেটা জানত না এবং মাঝে মাঝেই তাদের গালমন্দ শুনতে হতো! একদিন গভীর রাতে ফোন বেজেছে, আমি ঘুম থেকে উঠে টেলিফোন ধরেছি, জিজ্ঞেস করেছি, “কী সমস্যা? আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারি?” তখন অন্য পাশ থেকে একজন বলল, “না, কোনো সমস্যা নাই। আপনারা দাবি করছেন এটা ২৪ ঘণ্টার হটলাইন তাই পরীক্ষা করে দেখছি আসলেই ২৪ ঘণ্টা চালু আছে কিনা!” আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের রসবোধ আকাশ ছোঁয়া!)

টিকা নেবার জন্য আমরা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করেছি, আমাদের বাসায় কম্পিউটার আছে, ওয়াইফাই আছে, আমরা ‘ক্যাপচা’ এবং ‘ওটিপি’ কি জিনিস জানি। কিন্তু এদেশে নিশ্চয়ই অনেকে আছেন যাদের টিকা নেয়া প্রয়োজন কিন্তু কম্পিউটার এবং ওয়াইফাই সংক্রান্ত ব্যাপারে তারা আমাদের মতো সৌভাগ্যবান নন। তাদের নিবন্ধনের ব্যাপারটি কীভাবে করা হবে সেটি দেখার জন্য আমি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।

তবে শেষ কথা বলে দিই, যারা টিকা নিয়েছেন তাদেরকে অভিনন্দন। আমাদের পরিবারের বয়স্করা সবাই টিকা নিয়ে এসে কেক কেটে উৎসব করে খুবই নাটকীয় ভঙ্গীতে তার ছবি তুলে প্রিয়জনদের কাছে পাঠিয়েছি! যারা এখনো জানেন না, তাদেরকে মনে করিয়ে দেই, টিকা সত্যিকার কার্যকর হতে হতে কিন্তু দুই সপ্তাহ লেগে যাবে, কাজেই টিকা নিয়ে এখনই ‘বন্ধনহীন মুক্তজীবনে’ ঝাপিয়ে পড়া যাবে না—অন্য অনেক কিছুর সাথে মাস্কের বন্ধনটা যেন থাকে!

Categories
মুক্তমত

শেখ মুজিবের সুচিন্তা থেকে আজকের বাঙালিরও শেখার আছে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে একটা কথা মনে হচ্ছে। তিনি শুধু বাংলার বন্ধু ছিলেন না, তাঁর ভূমিকা ছিল আরও অনেক বড়, এবং অতুলনীয়। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের মহান রাজনৈতিক নায়ক, বাংলার সবচেয়ে সমাদৃত মানুষ, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার। বাংলাদেশের জনজীবনে তাঁর প্রভাব আজও বিপুল। তাঁকে ‘বাংলাদেশের জনক’ বা বঙ্গবন্ধু বলাটা নিতান্তই কম বলা। তিনি যে এর চেয়ে বড় কোনও অভিধা চাননি, সেটা তাঁর সম্পর্কে আমাদের একটা সত্য জানায়— তিনি নাম কিনতে চাননি, মানুষ তাঁকে অন্তর থেকে ভালবাসত।

এক জন অতি চমৎকার মানুষ এবং এক মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে, তাঁর চিন্তাভাবনা কেন আজকের পক্ষেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সে-বিষয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাঁর পরিচ্ছন্ন চিন্তা ও দৃষ্টির সম্পদ কেউ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। তাঁর সেই চিন্তাভাবনা আজ আমাদের বড় রকমের সহায় হতে পারে। উপমহাদেশ আজ আদর্শগত বিভ্রান্তির শিকার হয়ে এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে চলেছে, এই দুর্দিনে পথনির্দেশ এবং প্রেরণার জন্য আমাদের বঙ্গবন্ধুর কাছে সাহায্য চাইবার যথেষ্ট কারণ আছে। শেখ মুজিবের চিন্তা এবং বিচার-বিশ্লেষণ যে সব দিক থেকে আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, এখানে তার কয়েকটির উল্লেখ করতে চাই।

প্রথমত, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রবক্তা হিসেবে শেখ মুজিব ছিলেন অগ্রগণ্য। তাঁর দৃষ্টান্ত থেকে এই বিষয়ে সব দেশেরই শেখার আছে। বর্তমান ভারতের পক্ষে তো বটেই, বঙ্গবন্ধুর ধারণা ও চিন্তা উপমহাদেশের সব দেশের পক্ষেই শিক্ষণীয়। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে বাংলাদেশ অনেক উত্থানপতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তিনি কেমন বাংলাদেশ চান, বঙ্গবন্ধু সে কথা পরিষ্কার করে বলেছিলেন। তাই আমরা খুব সহজেই ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে তাঁর অবস্থানটা বুঝে নিতে পারি।

এ-কথা জোর দিয়ে বলব যে, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং লোকেদের স্বক্ষমতা-র মধ্যে যোগসূত্রটি শেখ মুজিবকে প্রভূত অনুপ্রেরণা দিত (স্বক্ষমতা শব্দটি ইংরাজি ‘ফ্রিডম’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করছি)। ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতার যে ধারণা বহুলপ্রচলিত, তাতে ধর্মের প্রতি সাধারণ ভাবে একটা বিরূপতা পোষণ করা হয়ে থাকে। এই ধারায় মনে করা হয়, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কখনও কোনও ধর্মীয় ক্রিয়াকর্মকে উৎসাহ দেবে না, বা সাহায্য করবে না। আমেরিকায় মাঝেমধ্যে এই গোত্রের ধর্মনিরপেক্ষতা অনুশীলনের চেষ্টা হয়েছে, তবে সে দেশের বেশির ভাগ মানুষের মনে ঈশ্বর এবং খ্রিস্টধর্মের আসন এতটাই পাকা যে, সেই উদ্যোগ কখনওই খুব একটা এগোতে পারেনি। যে কোনও রকমের ধর্মীয় আচার থেকে রাষ্ট্রকে দূরে রাখতে ফরাসিরা তুলনায় অনেক বেশি সফল, কিন্তু ধর্মকে সম্পূর্ণ বর্জন করে চলার চরম ধর্মনিরপেক্ষতার লক্ষ্য সে দেশেও দূরেই থেকে গেছে। এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা পরিষ্কার: ধর্মনিরপেক্ষতার এমন কোনও অর্থ কখনওই তাঁর চিন্তায় স্থান পায়নি, যা মানুষের ধর্মাচরণের স্বক্ষমতাকে অস্বীকার করবে। যাঁদের ধর্মবিশ্বাস গভীর, তাঁদের কাছে এই স্বক্ষমতা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই কারণেই ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্ম-বিরোধিতা হিসেবে দেখবার চিন্তাধারাকে মুজিবুর রহমান বিশেষ মূল্য দেননি। ধর্মীয় আচারকে এড়িয়ে চলার বা ‘ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার’ তাগিদে ধর্মাচরণের স্বক্ষমতাকে অস্বীকার করার কোনও প্রয়োজন তিনি বোধ করেননি। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ অনুসরণ অর্থে শেখ মুজিব ঠিক কী বুঝতে চেয়েছিলেন? ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকায় বাংলাদেশের আইনসভায় সে-দিনের নবীন ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের সংবিধান গ্রহণের সময় তিনি বলেছিলেন:

“আমরা ধর্মাচরণ বন্ধ করব না… মুসলমানরা তাঁদের ধর্ম পালন করবেন… হিন্দুরা তাঁদের ধর্ম পালন করবেন… বৌদ্ধরা তাঁদের ধর্ম পালন করবেন… খ্রিস্টানরা তাঁদের ধর্ম পালন করবেন… আমাদের আপত্তি শুধু ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে।”

ধর্মাচরণের স্বক্ষমতাকে এখানে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। যাকে বর্জন করতে বলা হচ্ছে তা হল ধর্মকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করা, তাকে রাজনীতির উপকরণ বানানো। এটি এক ধরনের স্বক্ষমতা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা রাষ্ট্রকে লোকের নিজের নিজের ধর্মাচরণে হস্তক্ষেপ করতে বারণ করে। বস্তুত, আমরা আরও এক পা এগিয়ে গিয়ে বলতে পারি: মানুষকে স্ব-ইচ্ছা অনুযায়ী ধর্মাচরণের স্বক্ষমতা ভোগ করতে সাহায্য করা উচিত, কেউ যাতে কারও ধর্মাচরণে বাধা দিতে না পারে সে জন্য যা করণীয় করা উচিত। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের ভূমিকা আছে।

দুঃখের কথা হল, ইদানীং ভারতে এই নীতি ও আদর্শ বেশ বড় রকমের বাধার সম্মুখীন। বিভিন্ন ধর্মের প্রতি আচরণে প্রায়শই বৈষম্য করা হচ্ছে, হিন্দুত্বের প্রতি পক্ষপাতিত্ব সম্পন্ন কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে, এমনকি নাগরিকত্বের প্রশ্নেও, তাদের পছন্দসই ধর্মগোষ্ঠীর মানুষকে বিশেষ সুযোগসুবিধা দিচ্ছে। ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিশেষ সম্প্রদায়ের (যেমন, মুসলমান, বা নিম্নবর্ণের হিন্দু বা আদিবাসী) বিশেষ বিশেষ খাদ্য (যেমন, গোমাংস) নিষিদ্ধ করার ফরমান জারি হয়েছে, যে হেতু এ ব্যাপারে অন্য ধর্মের কিছু লোকের (বিশেষত গোঁড়া হিন্দুদের) আপত্তি আছে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের বিবাহে নিয়ন্ত্রণ, কখনও বা নিষেধাজ্ঞা, জারি করা হচ্ছে— সংশ্লিষ্ট ধর্মমতে এমন বিবাহ নিয়ে কোনও সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও। এবং, বিবাহের উদ্দেশ্যে জোর করে মেয়েদের ধর্মান্তর করানোর নানা কাহিনি প্রচার করা হচ্ছে, অথচ বিভিন্ন মামলার সূত্রে প্রায়শই ধরা পড়েছে যে এ-সব গল্প একেবারেই ভুয়ো।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিকে মোগল সম্রাট আকবর যথেষ্ট পরিষ্কার ধারণা নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল এই যে, লোকে নিজে যে ভাবে যে ধর্ম পালন করতে চায় তাতে কোনও বাধা দেওয়া উচিত নয়। রাষ্ট্র এই স্বক্ষমতা রক্ষায় সচেষ্ট থাকবে, কিন্তু কোনও ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দেবে না।

দেখা যাচ্ছে, এখানে ধর্মনিরপেক্ষতার দু’টি নীতি কাজ করছে: (১) বিভিন্ন ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণে কোনও ‘অ-সমতা’ থাকবে না (আকবর এই ব্যাপারটিতে জোর দিয়েছিলেন) এবং (২) ‘ধর্মকে রাজনৈতিক কারণে বা প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে না’ (বঙ্গবন্ধুর কাছে যা গুরুত্ব পেয়েছিল)। এ-দুটো ঠিক এক নয়। কিন্তু দুই আদর্শের যে কোনওটি লঙ্ঘিত হলে লোকের ধর্মীয় স্বক্ষমতা একই ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে, কারণ সাধারণত এক ধর্মের তুলনায় অন্য ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্বের কারণেই ধর্মীয় স্বক্ষমতা খর্ব করা হয়ে থাকে। ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলিতেও এর অনেক প্রমাণ মেলে।

শেখ মুজিব, এবং আকবর, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি যে ভাবে পরিষ্কার করেছিলেন, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া কেবল ভারতে নয়, অনেক দেশেই গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকায় বা ইউরোপে অনুরূপ নানা বৈষম্য, যেমন জাতিগত বা নৃগোষ্ঠীগত অসাম্য বিষয়ক রাজনৈতিক আলোচনাতেও এই ধারণা প্রাসঙ্গিক। উপমহাদেশে, পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশে সমকালীন নানা বিতর্কে ও বিক্ষোভে জড়িত বিভিন্ন প্রশ্নেও তা আলো ফেলতে পারে।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দেখলে বোঝা যায়, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিটা বিশেষ উদ্বেগজনক, কারণ অনেকগুলো দশক ধরে এ-দেশে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের চর্চা এই সে-দিন অবধি অনেক দেশের তুলনায় বেশ সবল ছিল। দেশের কিছু রাজ্যে আসন্ন নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেমন, পশ্চিমবঙ্গে আগামী এপ্রিল-মে মাসে বিধানসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। ধর্মনিরপেক্ষতার মূল প্রশ্নগুলি নিয়ে, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু তার যে মৌলিক শর্তাবলির কথা বলেছিলেন সেই সব বিষয়ে এখন বড় রকমের আলোচনার প্রয়োজন। তার কারণ, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ মেনে চলার— এবং লঙ্ঘন করার— ব্যাপারে নানা রাজনৈতিক দলের আচরণ কিছু রাজ্যের ভোটের লড়াইয়ে বিশেষ প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার না করার যে নীতিতে বঙ্গবন্ধু জোর দিয়েছিলেন, এই প্রসঙ্গে তা অতি গুরুত্বপূর্ণ— শুধু বাংলা নয়, গোটা বিশ্বের পক্ষেই। বঙ্গবন্ধুকে তাই ‘বিশ্ববন্ধু’ হিসেবেও আমরা সম্মান জানাতে পারি।

শেখ মুজিব যে কেবল ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্বক্ষমতা প্রসারের জায়গা থেকে দেখেছিলেন তা নয়, সাধারণ ভাবেই স্বক্ষমতার গুরুত্ব সম্পর্কে তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। বস্তুত, যে মাতৃভাষার দাবি আদায়ের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, স্বক্ষমতার প্রশ্নটি ছিল তার একেবারে কেন্দ্রে, মাতৃভাষা ব্যবহারের স্বক্ষমতার দাবির সঙ্গে বাঙালি জাতির ধারণাটিও ওই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সম্পৃক্ত হয়ে যায়।

এটা একটা প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় উপমহাদেশের বিভিন্ন বিষয়েই, যেমন শ্রীলঙ্কায় সিংহলি ও তামিল ভাষার আপেক্ষিক গুরুত্বের ব্যাপারে। শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক নেতারা শেখ মুজিবের ভাষা বিষয়ক চিন্তাভাবনার প্রতি মনোযোগী হলে এবং মাতৃভাষার প্রতি লোকের মমতা ও শ্রদ্ধাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন স্বীকার করলে হয়তো সে দেশের যুদ্ধ এবং বিপুল রক্তক্ষয় অনেকটাই কম হতে পারত। ভাষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সামাজিক বিশ্লেষণের যে প্রজ্ঞা, তার গুরুত্ব বাংলার সীমা ছাড়িয়ে বহু দূরে প্রসারিত।

ভারতের স্বাধীনতার অল্প কালের মধ্যেই সমস্ত প্রধান ভাষাকে দেশের সংবিধানে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দেওয়ার ফলে অনেক গুরুতর সমস্যা এড়ানো গিয়েছিল। সেটা শেখ মুজিব স্বদেশের বড় নেতা হয়ে ওঠার অনেক আগেকার কথা বটে, কিন্তু তাঁর চিন্তাধারার কিছু কিছু দিক ভারতের এই ভাষা-নীতির ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। জাতীয় ভাষার সাংবিধানিক মর্যাদা প্রধান ভাষাগুলিকে গুরুত্ব দিয়েছিল বটে, কিন্তু হিন্দি ও ইংরেজিকে সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহারের ফলে অন্য প্রধান ভারতীয় ভাষাগুলির সঙ্গে তাদের একটা অসমতা তৈরি হয়, যার কিছুটা হয়তো অনিবার্য ছিল। যাঁদের মাতৃভাষা হিন্দি (বা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, ইংরেজি), অন্যদের তুলনায় তাঁরা কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে যান। সরকারি কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাষার মধ্যে সমতা বিধানের প্রশ্নটি বাস্তবের সাপেক্ষেই বিচার করতে হবে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে অসাম্যের ব্যাপারটাকে হয়তো আরও বেশি গুরুত্ব সহকারে দেখার দরকার আছে।

এ-সমস্যাটা হয়তো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও কিছুটা প্রাসঙ্গিক, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে প্রশ্নটি আরও অনেক বড়। সেখানকার ভাষাগুলি সংস্কৃত থেকে আসেনি, এসেছে প্রধানত প্রাচীন তামিল থেকে। একটু অতিসরলীকরণের ঝুঁকি নিয়ে বলা যায়, শেখ মুজিব বরাবর স্বক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, এবং মর্যাদা, স্বীকৃতি, সরকারি কাজে বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের মতো বিষয়গুলিকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই দেখা দরকার।

শেষ করার আগে সমতার প্রসার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর চিন্তাভাবনা নিয়ে দু’একটা কথা বলা যেতে পারে। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অবিভক্ত পাকিস্তান থেকে আলাদা হওয়ার ও স্বাধীনতার যে দাবি তোলে, তার পিছনে বড় ভূমিকা নিয়েছিল সমতা প্রসারের প্রশ্ন। ১৯৭০-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের প্রচারপর্বে বিভিন্ন ভাষণে দেশের নানা বর্গের মানুষের সামনে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সমতার প্রশ্নটিকে পেশ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে সমতার প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়ে তার ভিত্তিতে তিনি এই নীতির উপর জোর দেন যে, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের অন্য সমস্ত নাগরিকের সমান অধিকার এবং সুযোগ ভোগ করার স্বত্ব থাকা চাই।’

পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, কিন্তু সমতার আদর্শ থেকে সংখ্যালঘুদের ন্যায্য অধিকারের এই দাবি ঘোষণা আওয়ামী লীগের সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, তার একটা বড় কারণ ছিল বঙ্গবন্ধুর নীতিনিষ্ঠ সওয়াল (জাতীয় আইনসভায় পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ)। ন্যায্য লক্ষ্য পূরণের জন্য সুষ্ঠু যুক্তিপ্রয়োগ যে কার্যকর হতে পারে, বঙ্গবন্ধুর জীবনের ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নানা কাহিনিতে তার প্রমাণ আছে। সেটাও কম শিক্ষণীয় নয়।

ইতিহাসের একটি ব্যাপার উল্লেখ করে কথা শেষ করব। বঙ্গবন্ধু তাঁর নৈতিক আদর্শগুলির সঙ্গে বাংলার পুরনো মূল্যবোধের সম্পর্কের কথা অনেক বারই বলেছেন। সমতার প্রতি তাঁর আগ্রহের তেমন কোনও ঐতিহাসিক যোগসূত্র আছে কি? উত্তরে বলা যায়: হ্যাঁ, আছে। যেমন, অনেক কাল আগে থেকেই বাংলার সমাজসচেতন কবি ও চারণদের কবিতায় সমতার ধারণাটি গুরুত্ব পেয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের মতো বিদ্রোহী কবির লেখায় তো বটেই, একেবারে প্রথম যুগের বাংলা কবিতাতেও এমন সূত্রের সন্ধান আছে।

একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। দশম শতাব্দীর বাংলা ভাষায় লেখা চর্যাপদ-এ আমরা পড়ি, বৌদ্ধ কবি সিদ্ধাচার্য ভুসুকু তাঁর নদীপথে পূর্ববঙ্গে যাওয়ার কথা লিখছেন। পূর্বগামী সেই যাত্রাপথে তাঁর নানা অভিজ্ঞতা হয়, যেমন, জলদস্যুরা তাঁর সব কিছু লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় (ভুসুকু বলেন তিনি সে জন্য বিলাপ করবেন না), আবার সমাজের সবচেয়ে নিম্নবর্গের এক জন নারীর— এক চণ্ডালিকার— সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় (তিনি এই বিবাহে পুলকিত হন)। এবং, সিদ্ধাচার্য— আজ থেকে হাজার বছর আগে— সমতার বন্দনা করে লেখেন:

বাজ ণাব পাড়ী পঁউয়া খালেঁ বাহিউ।

অদঅ বঙ্গালে দেশ লুড়ি।।

আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী।

নিঅ ঘরিণী চণ্ডালী লেলী।।

(পেড়ে এনে বজ্রনাও পদ্মখালে বাওয়া/ লুট করে নিল দেশ অদ্বয় বঙ্গাল/ আজকে ভুসুকু হল (জাতিতে) বঙ্গালি/ চণ্ডালীকে (ভুসুকুর) পত্নীরূপে পাওয়া।)

দেখা যাচ্ছে, হাজার বছর আগেও এক জন ‘যথার্থ বাঙালি’র মূল্যবোধগুলি কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হত। মনে রাখা দরকার, এই মূল্যবোধগুলোর অন্যতম ছিল সমতার সমাদর। এখানে ইতিহাসের ধারাবাহিকতার কিছু প্রমাণ আছে। সিদ্ধাচার্য যাঁদের ‘যথার্থ বাঙালি’ বলেছেন, তাঁরা যে আদর্শগুলির সমাদর করতেন, সেই ঐতিহ্যবাহিত মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের সংযোগ সাধন করা যায়, যে ধর্মনিরপেক্ষতা আজ আমাদের পক্ষে বিশেষ দরকারি। এই বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর উজ্জ্বল চিন্তাভাবনা আমাদের প্রেরণা দিতে পারে।

(২৭ জানুয়ারি ২০২১ লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স আয়োজিত সভায় প্রদত্ত বক্তৃতা অবলম্বনে লেখা)

সূত্র: আনন্দবাজার।

ভয়েস টিভি/এসএফ