Categories
ধর্ম

যাবতীয় কল্যাণ লাভের দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগফিরলি, ওয়ারহামনি, ওয়াহদিনি, ওয়ারজুকনি।

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন এবং আমাকে জীবিকা দান করুন।

উপকার : আবু মালিক আল আশজাঈ (রহ.) তাঁর বাবার সূত্রে বলেন, কোনো লোক ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূল (সা.) তাকে এই দোয়া শিখিয়ে দিতেন। (মুসলিম, হাদিস : ৬৭৪২)

Categories
ধর্ম

আল্লাহর সহযোগিতা লাভের দোয়া

উচ্চারণ : লা-হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।

অর্থ : আল্লাহর সহযোগিতা ছাড়া কারো (ভালো কর্মের দিকে) এগিয়ে যাওয়া এবং (খারাপ কর্ম থেকে) ফিরে আসার সামর্থ্য নেই।

উপকার : আবু মুসা (রা.) বলেন, আমরা কোনো এক সফরে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন মানুষরা উচ্চৈঃস্বরে তাকবির পাঠ করছিলেন। রাসুল (সা.) বলেন, হে মানবজাতি! তোমার জীবনের ওপর সদয় হও। কেননা তোমরা তো কোনো বধির অথবা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না। নিশ্চয় তোমরা ডাকছ সর্বশ্রোতা, নিকটবর্তী সত্তাকে, যিনি তোমাদের সঙ্গেই আছেন। আবু মুসা (রা.) বলেন, আমি তাঁর পিছে ছিলাম। তখন আমি বলছিলাম, আল্লাহর সহযোগিতা ছাড়া কোনো ভালো কাজের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এবং মন্দ কর্ম থেকে ফিরে আসার সামর্থ্য নেই।

তখন রাসুল (সা.) বলেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে কায়স! আমি তোমাকে জান্নাতের গুপ্তধনসমূহের মধ্যে কোনো একটি গুপ্তধনের কথা জানিয়ে দেব? আমি বললাম, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি এই (উপরোক্ত) দোয়া পড়ো। (মুসলিম, হাদিস : ৬৭৫৫)

Categories
ধর্ম

ফিতনামুক্ত থাকার দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবি জাহান্নামা, ওয়া আউজুবিকা মিন আজাবিল কবরি, ওয়া আউজুবিকা মিন ফিতনাতিল মাসিহিদ দাজ্জালি, ওয়া আউজুবিকা মিন ফিতনাতিল মাহইয়া ওয়াল মামাত।

অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে জাহান্নামের আজাব থেকে আশ্রয় চাই, কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই, আশ্রয় চাই মাসিহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে এবং আশ্রয় চাই জীবন-মরণের বিপদাপদ থেকে।

উপকার : আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) এই দোয়াটি এমনভাবে শেখাতেন, যেভাবে তাদের কোরআনের সুরা শেখাতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৪২)

Categories
ধর্ম

ভয়-ভীতি মুক্ত হওয়ার দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাসতুর আউরাতি ওয়া আ-মিন রওআতি।

অর্থ : হে আল্লাহ, আমার দোষত্রুটিগুলো ঢেকে রাখুন এবং ভীতিপ্রদ বিষয়গুলো থেকে আমাকে নিরাপদ রাখুন।

উপকার : জুবায়ের ইবনে আবু সুলাইমান ইবনে জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) বলেন, আমি ইবনে উমর (রা.)-কে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা.) সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়া পড়তেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৭৪)

Categories
ধর্ম

সঠিক পথে থাকার দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াস সাদাদ।

অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হিদায়াত ও সরল পথ প্রার্থনা করছি।

উচ্চারণ : হজরত আলী (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) আমাকে এই দোয়া পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (রিয়াদুস সালেহিন, হাদিস : ২৫০)

Categories
ধর্ম

জামাতে নামাজ আদায়ের গুরুত্ব

ইসলামের প্রতিটি বিধানেই দুনিয়া ও আখিরাতের অসংখ্য কল্যাণ নিহিত আছে। ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত প্রতিটি হৃদয় সেসব কল্যাণ উপলব্ধি ও অবলোকন করে। মুমিনের জীবনে ঈমানের পর আবশ্যকীয় একটি বিধান হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়। এর কল্যাণ বলে শেষ করা যাবে না। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের পদ্ধতিগত বিধান হচ্ছে- জামাতে আদায় করা। এই বিধানটিরও তাগিদের সঙ্গে বহুবিধ ফায়দার কথা হাদিস শরিফে উল্লেখ রয়েছে। যার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো-

জামাতে নামাজ আদায়ের তাগিদ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। ইরশাদ হয়েছে-‘তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু করো’ (সূরা : বাকারা : ৪৩)। অর্থাৎ জামাতে নামাজ আদায়কারীদের সাথে নামাজ আদায় করো।

নবীজী সা. সারা জীবন জামাতে নামাজ আদায় করে দেখিয়েছেন, নামাজ জামাতে আদায় করতে হয়। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সা: সারা জীবন জামাতের সাথেই নামাজ আদায় করেছেন। এমনকি ইন্তেকালপূর্ব অসুস্থতার সময়ও জামাত ছাড়েননি। সাহাবায়ে কেরামের পুরো জীবনও সেভাবে অতিবাহিত হয়েছে (বুখারি-হাদিস : ৬৪৪)।

পুরুষের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই জামাতে আদায় করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা, যা ওয়াজিবের সাথে তুলনীয় (অর্থাৎ এটি ওয়াজিবের কাছাকাছি) (মুসলিম, হাদিস : ১০৯৩)।

শরিয়ত অনুমোদিত কোনো ওজর বা অপারগতা ছাড়া জামাতে শরিক না হওয়া বৈধ নয়। যে ব্যক্তি জামাত ত্যাগে অভ্যস্ত হয়ে যায়, সে গুনাহগার হবে (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬৪)।

জামাতে নামাজ আদায় করলে এক রাকাতে ২৭ রাকাতের সওয়াব লাভ হয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘জামাতে নামাজের ফজিলত একাকী নামাজের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি’ (মুসলিম-১৪৭৭)।

জামাতে নামাজ আদায় করলে প্রতি কদমে নেকি লাভ হয় এবং গুনাহ মাফ হয়। সাথে একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি হয়। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, নবীজী সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে পবিত্রতা লাভ করে মসজিদে এসে নামাজ আদায় করে তার প্রতি কদমে একটি নেকি দেয়া হয়। একটি করে গুনাহ মাফ করা হয়। একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয় (মুসলিম-১০৯৩)।

জামাতে নামাজ আদায় করলে প্রথম কাতারের সওয়াব লাভ করার সুযোগ হয়। নবীজী সা. ইরশাদ করেছেন, মানুষ যদি আজান এবং প্রথম কাতারে নামাজের সওয়াব জানতো তাহলে প্রয়োজনে লটারি করে হলেও তারা তা লাভ করতো (বুখারি- হাদিস : ৬১৫)।

জামাতে নামাজ আদায় করলে সারা রাত ইবাদতের সওয়াব লাভ করা যায়। রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ইশার নামাজ জামাতে আদায় করে সে যেন অর্ধরাত্রি ইবাদত করল। আবার যদি ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করে তবে সে যেন পূর্ণ রাত ইবাদত করল (মুসলিম-১৪৯১)।

জামাতে নামাজ আদায় করলে সারা দিন আল্লাহর হেফাজতে থাকা যায়। নবীজী সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করে, সে আল্লাহর হেফাজতে থাকে। আল্লাহর হেফাজতে থাকা ব্যক্তিকে যে কষ্ট দেবে, আল্লাহ তাকে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন (মাজমাউজ জাওয়ায়েদ-২/২৯)।

বিনা ওজরে জামাত পরিত্যাগকারীর নিন্দায় নবীজী কঠোর কথা বলেছেন। রাসূল সা: বলেন, ‘আমার প্রাণ যাঁর হাতে, তাঁর শপথ করে বলছি, আমার ইচ্ছা হয় আমি কাঠ সংগ্রহ করার নির্দেশ দেই আর নামাজের আজান দেয়ার জন্য হুকুম দেই। তারপর আমি এক ব্যক্তিকে হুকুম করি, যেন সে লোকদের নামাজের ইমামতি করে। আর আমি ওই সব লোকদের দিকে যাই, যারা নামাজের জামাতে হাজির হয়নি এবং তাদের বাড়িঘরগুলো আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেই’ (বুখারি, হাদিস : ৬১৮)।

তবে কিছু অপারগতার কারণে জামাতে উপস্থিত না হওয়ার অনুমতি আছে। যথা-
১. যদি মুষলধারে বৃষ্টি হয় (বুখারি : ১১২৬)।
২. প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, ঘর থেকে বের হলে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকলে জামাতে শরিক না হওয়ার অবকাশ আছে (বুখারি : ৬২৬)।
৩. রাস্তায় বেশি কাদা হলে (বদরুল মুনির : ৪/৪১৯)।
৪. অতি আঁধার হওয়া (জমউল জাওয়ামে : ১/৩০৫৮)।
৫. রাতে যদি অতিমাত্রায় মেঘ হয় (মুসনাদে আহমাদ : ৫৩০২)।
৬. অসুস্থ হলে (আবু দাউদ : ৪৬৪)।
৭. দৃষ্টিহীন ব্যক্তির জন্য (সহিহ বুখারি : ৬২৭)।
৮. এমন বৃদ্ধ, যিনি মসজিদে আসতে সক্ষম নন (ইবনে মাজাহ : ৭৮৫)।
৯. কোনো রোগীর সেবাশুশ্রƒষায় আত্মনিয়োজিত থাকলে (প্রাগুক্ত)।
১০. ঘন ঘন প্রস্রাব-পায়খানার বেগ হলে (তিরমিজি : ১৩২)।
১১. বন্দি অবস্থায় (ইবনে মাজাহ: ৭৮৫)।
১২. এক পা বা উভয় পা কর্তিত হলে (আবু দাউদ : ৪৬৪)।
১৩. এমন রোগ হওয়া, যার কারণে চলতে অক্ষম। যেমন অর্ধাঙ্গ রোগ ইত্যাদি (প্রাগুক্ত)।
১৪. খানা সামনে, সেও ক্ষুধার্ত, মনের আকর্ষণ খানার দিকে। এমন অবস্থায় জামাতে না গেলেও চলবে (সহিহ বুখারি : ৬৩১)।
১৫. সফরের প্রস্তুতি গ্রহণের সময় (সহিহ বুখারি : ৩/৬৭)।
১৬. জামাতে নামাজ আদায় করতে গেলে কোনো সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে জামাত ত্যাগ করতে পারবে (আবু দাউদ : ৪৬৪)।
১৭. জামাতে যাওয়ার কারণে ট্রেন, ফ্লাইট বা গাড়ি চলে যাওয়ার আশঙ্কা হলে জামাতে শরিক না হওয়ার অনুমতি আছে (আবু দাউদ : ৪৬৪)।

উল্লেখ্য, মহিলাদের জন্য মসজিদ থেকে ঘরে নামাজ আদায় করা উত্তম।

মসজিদে না গিয়ে বাড়িতে নামাজ পড়বে। এটাই নবীজীর পছন্দ। সুতরাং মহিলারা বাড়িতে আদায় করবেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমীন।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামেয়া রাহমানিয়া দারুল ইসলাম, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা

Categories
ধর্ম

আল্লাহ নিজে দেবেন যে দোয়ার পুরস্কার

উচ্চারণ : ইয়া রব্বি লাকাল হামদু কামা ইয়ামবাগি লিজালালি ওয়াজহিকা ওয়ালি আজিমি সুলতনিক।

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনার মহিমান্বিত চেহারার এবং আপনার রাজত্বের উপযোগী প্রশংসা আপনার জন্য।

উপকার : আব্দুল্লাহ বিন উমার (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন যে আল্লাহর কোনো এক বান্দা এই দোয়া পড়লে ফেরেশতারা হতবাক হলেন এবং তাঁরা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না তা কিভাবে লিপিবদ্ধ করবেন। তাই তাঁরা আসমানে আরোহণ করে বলেন, হে আমাদের প্রভু! আপনার এক বান্দা এমন এক বাক্য বলেছে, যা আমরা কিভাবে লিখব বুঝে উঠতে পারছি না।…মহান আল্লাহ তাঁদের বলেন, আমার বান্দা যেভাবে বলেছে তদ্রূপই লিখে রাখো। আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের সময় আমি তাকে তার বিনিময় দান করব। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৮০১)

Categories
ধর্ম

গুনাহ মাফের দোয়া

উচ্চারণ : আসতাগফিরুল্লাহাল আজিমাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম, ওয়া আতুবু ইলাইহি।

অর্থ : আমার মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। যিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী এবং তাঁর কাছে তাওবা করি।

উপকার : আবু সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, কোনো লোক (শোয়ার জন্য) হয়ে তিনবার এই দোয়া পড়বে। আল্লাহ তাআলা তার গুনাহগুলো মাফ করে দেন, যদিও তা সমুদ্রের ফেনারাশির সমতুল্য হয়ে থাকে, যদিও তা গাছের পাতার মতো অসংখ্য হয়, যদিও তা টিলার বালুরাশির সমান হয়, যদিও তা দুনিয়ার দিনসমূহের সমসংখ্যক হয়। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৯৭)

Categories
ধর্ম

ইসলামে পোশাকের বিধান

আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর। আর তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস নং-৯১) মানুষের সৌন্দর্য, রুচিবোধ ও ব্যক্তিত্ব যার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তা হলো পোশাক। বাংলায় পোশাক শব্দটির কুরআন-হাদিসের ভাষা হলো ‘লিবাস’। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বনি আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে আর অবতীর্ণ করেছি সাজ-সজ্জার পোশাক; আর তাকওয়ার পোশাকই উত্তম।’ (আল কুরআন-৭ : ২২) আল্লাহর নিয়ম মেনে জান্নাতে সর্বপ্রথম পোশাক পরেছিলেন হজরত আদম ও হাওয়া আ.। আর তা কৌশলে খোলার ব্যবস্থা করেছিল মানবতার প্রকাশ্য শত্রু ইবলিশ।

পোশাক খুলে নগ্ন করে দেয়ার বিষয়টি খুবই ন্যক্কারজনক বলেই মহান আল্লাহ তায়ালা তা কুরআনে স্থান দিয়ে বলেন, ‘অতঃপর প্রতারণাপূর্বক তাদেরকে সম্মত করে ফেলল। অনন্তর যখন তারা বৃক্ষ আস্বাদন করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের সামনে খুলে গেল এবং তারা নিজের ওপর বেহেশতের পাতা জড়াতে লাগল।’ (আল কুরআন-৭:২২) তাহলে দেখা গেল পোশাক যদি নাও থাকে মুসলমানদের নগ্ন থাকা যায় না। গাছের পাতা দিয়ে হলেও লজ্জা রক্ষার চেষ্টা করতে হয়। আর দ্বিতীয়বারের মতো জাহেলি যুগে হজ পালনকারীদের বিভ্রান্ত করে পবিত্রতম স্থান আল্লাহর ঘর কাবাঘরের তাওয়াফ করার সময়ও শয়তান পোশাক খুলতে সক্ষম হয়েছিল এই বলে যে, তোমাদের (সেই সময়ের হাজীদের) পরনের সব পোশাক যেহেতু হারাম অর্থের তাই এ পোশাকও হারাম হওয়ায় তাওয়াফ কবুল হবে না।

জাহেলিয়াতের যুগে হজের কার্য সম্পাদনের সময় পোশাক খুলে তাওয়াফের আইন করে শয়তান নগ্ন করে দিয়েছিল এবং সে সময়ের জনগণ লুফে নিয়ে তা বহু বছর পালন করেছিল। ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর আগমনের পর মানব জীবনের যত পর্যায় রয়েছে তার সর্বত্র তিনি আল্লাহর কাছ থেকে সবার জন্য এনে দিলেন কালজয়ী আদর্শ, বিজ্ঞানময় সভ্যতা ও সংস্কৃতি। তার মধ্যে শালীন ও উপকারী পোশাক অন্যতম। আর পোশাকের সংজ্ঞা ও বিধিনিষেধ জারি করলেন কোন পোশাক শালীন পরিধান করা উচিত আর কোনটি পরিত্যাজ্য। নিজে প্রচলিত সমাজের পোশাক পরে পৃথিবীর সব পোশাক তিনি স্বাধীনভাবে পরার অনুমতি দিলেন শুধু ক্ষতিকর পোশাক ছাড়া।

অসংখ্য গ্রহণযোগ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, আল্লাহর রাসূল সা. বৈধ কাপড়ও পুরুষের টাখনোর নিচে পরা (বুখারি হাদিস নং ৫৪৫০), রেশমি কাপড়, শরীরের অভ্যন্তর দেখা যায় এমন পাতলা কাপড়, অন্য ধর্মের ধর্মীয় পোশাক, বেদ্বীনদের সংস্কৃতির অংশ এমন পোশাক, এমন পোশাক যা পরলে উলঙ্গ মনে হয়, বিপরীত লিঙ্গের পোশাক, এতটুকু কাপড় পরা যাতে সতর ঢাকে না, অতিমাত্রায় লাল ও হলুদ রঙের, বিকৃত রুচির, শরীরের আকৃতি প্রকাশ করে এমন আঁটসাঁট পোশাক, কৃপণতা প্রকাশ করে এমন পোশাক এবং অহঙ্কারের পোশাক নিষেধ করেছেন। সবচেয়ে প্রশংসনীয় পোশাক হলো যে রঙ, কাটিং ও ডিজাইন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সা: পরেছেন। ইসলামে অননুমোদিত পোশাক যেহেতু চিহ্নিত তাই পোশাকের স্বাধীনতার সীমানা ব্যাপক ও সীমাহীন।

আর তিনি মুমিন মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন এমন কিছু পোশাক যা তার পুরো দেহের কোনো অংশকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রকাশ করে। কারণ নারীর আপাদমস্তক যৌনাঙ্গের ন্যায় ঢেকে রাখার হুকুম রাখে। তার বৈধ পোশাকও এতটা আকর্ষণীয় হবে না যা অন্যকে আকর্ষণ করে। শ্রমজীবী, কর্মজীবী বা গৃহিণী যে-ই হোক না কেন একই হুকুম সমানভাবে প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে যে নারী নিজ দেহের যতটুকু যতবার যতদিন গাইরি মাহরামের সামনে প্রকাশ করবে সে ততটুকু ততবার ততদিন হারাম কাজের পাপী হবে। শুধু তা-ই নয়, এরকম নারী পরিবার ও সমাজের জন্য অভিশাপের কারণ। ইসলাম নির্দেশিত পোশাক পরা নিছক কোনো সংস্কৃতি নয়, কোনো দলের বা মতের ইউনিফর্ম নয়, এটা সুস্পষ্ট ইবাদত। যা পালনে রয়েছে সওয়াব ও পালন না করলে রয়েছে নিন্দা বা জাহান্নাম। কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রের নিয়ম দ্বারা এ ইবাদত সীমাবদ্ধ হবে না।

ইসলামে অনুমোদিত সব পোশাকই ইসলামী। কোনো সন্ত্রাসী, বেদ্বীন কাফির-মুশরিক যদি ইসলামের পোশাক পরে কোনো অপকর্ম করে তবে সে দায় ইসলাম ও মুসলমানের নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পোশাক পরিধানের হুকুম দুটি- ১. ফরজ এবং ২. উত্তম ও বৈধ।

ফরজ পোশাক পরতে যদি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সমাজ বা রাষ্ট্র বাধা দেয় তবে তা মানা যাবে না। সে ক্ষেত্রে হয় তার প্রতিবাদ করতে হবে নচেত সে স্থান পরিত্যাগ করতে হবে। দ্বিতীয় হুকুম অনুযায়ী উত্তম বলতে ইসলামের মডেল ও আদর্শ মুহাম্মদ সা:-এর কাটিং ও ডিজাইনে পোশাক পরিধান করা এবং বৈধ বলতে ইসলামে নিষেধ নয় এমন পোশাক পরিধান করা। বিষয়টি ব্যক্তির ঈমানি জোর, ব্যক্তিগত রুচিবোধ ও ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে তার আবেগ ও অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল। কোনো বাধা বা নিষেধাজ্ঞা থাকলে সাময়িক ছাড় দেয়া যেতে পারে তবে চিরতরে ছেড়ে দেয়া যাবে না। আর স্বাধীনতা থাকলে উত্তমটা গ্রহণ করাই উচিত। এক্ষেত্রে সমালোচনা, কটূক্তি বা বাঁকা চাহনিকে পাত্তা দেয়া ঠিক হবে না।

প্রত্যেক মুমিনের উচিত হারাম পোশাক পরিধান থেকে বেঁচে থাকা এবং উত্তম পোশাক পরিধানে অভ্যস্ত হওয়া। মহান আল্লাহ আমাদের সে তাওফিক দান করুন।

লেখক : আরবি প্রভাষক, শহর গোপিনপুর ফাজিল মাদরাসা

Categories
ধর্ম

সালাম : সৌহার্দ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক

‘সালাম’ ইসলামের অনুপম বৈশিষ্ট্য, নবীজী সা:-এর অন্যতম সুন্নত এবং শিষ্টাচার, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও আভিজাত্যের প্রতীক। ‘সালাম’- এর বাক্য বিনিময়ের দ্বারা অভিবাদন জানানোর পাশাপাশি পারস্পরিক কল্যাণকামিতার দোয়া করা হয় এবং এটি অনুমতি প্রার্থনায়ও সহায়ক হিসেবে কাজ করে। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারো গৃহে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নেবে এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম দেবে, এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।’ (সূরা নূর, আয়াত-২৭)

মানবসভ্যতায় যত অভিবাদনবাক্য বা রীতি প্রচলিত রয়েছে, তার কোনোটির তুলনা সালামের সাথে হতে পারে না। এটি এত ব্যাপক অর্থবোধক, সৌন্দর্যময় এবং তাৎপর্যপূর্ণ- যার বিশেষত্ব অন্য সব ক’টিতে অনুপস্থিত। সোজা কথায়, এটি সর্বোচ্চ, সর্বশ্রেষ্ঠ, অতুলনীয় এবং অদ্বিতীয়। যেমন- ‘আসসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ’- বাক্যের মাধ্যমে অভিবাদন, শ্রদ্ধা বা প্রীতি জানানোর সাথে সাথে এ দোয়াও করা হয় যে, ‘আপনার ওপর শান্তি, আল্লাহর অনুগ্রহ ও কল্যাণ বর্ষিত হোক’। সর্বোপরি, ‘সালাম’ বিনিময়ের মাধ্যমে মহান আল্লাহর স্মরণ করা হয়, স্মৃতিপটে তাঁর অনুগ্রহের কথা জাগ্রত হয়। পারস্পরিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের প্রতিশ্রুতিকে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

মাপকাঠিতে ‘সালাম’-এর সাথে অন্য যেকোনো সম্ভাষণ বাক্য তুলনা করলে এত গভীর অর্থবোধক ও প্রাঞ্জল পাবেন না; বরং দুনিয়ার সব ক’টি স্বাগত বাক্যই সবদিক থেকে ‘সালাম’-এর তুলনায় সীমিত এবং স্বল্প অর্থজ্ঞাপক। যেমন- আমাদের একটি অভিবাদনবাক্য হচ্ছে- ‘শুভ সকাল’ এটির প্রতিশব্দ ‘গুড মর্নিং’ বা ‘সাবাহাল খাইর’- এগুলোর কোনোটিই ‘সালাম’-এর বাক্যের মতো মাহাত্ম্যপূর্ণ নয়, বরং এতটাই সীমিত যে- কেউ কস্মিনকালেও সকালের বাইরে মধ্যাহ্নে, বিকেলবেলা বা রাতে তা বলবে না, বরং ‘সকাল’ শব্দ পরিবর্তন করে উপযুক্ত শব্দ প্রয়োগ করে বলবে। ‘সালাম’-এর কোনো জুড়ি নেই। এটি সাহিত্য ও আভিজাত্যে কালোত্তীর্ণ এবং সর্বজনীন। দিনের শুরু কিংবা রাতের শেষ প্রহর, যেকোনো সময় অনায়াসে ‘আসসসালামু আলাইকুম…’ বলা যায় এবং এটি থেকে উত্তম কোনো শুভেচ্ছাবাক্য নাই-ও বটে।

আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর তোমাদেরকে যখন অভিবাদন করা হয় তখন তোমরা তা থেকে উত্তম প্রত্যাভিবাদন করবে বা তারই অনুরূপ করবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর হিসাব গ্রহণকারী’ (সূরা নিসা, আয়াত-৮৬)। এ আয়াতের প্রথমাংশে আল্লাহ তায়ালা অভিবাদন প্রদানকারীকে প্রত্যুত্তরে আরো উত্তম বাক্য দিয়ে অভিবাদন জানানোর জন্য সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন। যা ইসলামের সৌন্দর্য, কৌলীন্য ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক। ‘সালাম’-এর ব্যাপারে ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে- মুসলমানরা পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাতে একে অন্যকে সালাম দেবে। এ ক্ষেত্রে রাজা-প্রজা, ছোট-বড়, শিক্ষক-ছাত্র, চাকর-মনিব, ধনী-দরিদ্র, আরবি-অনারবি, উঁচু-নীচুর কোনো ফারাক নেই। এমনকি কোমলমতি শিশুদের সালাম করাও রাসূল সা:-এর শিক্ষা ও আদর্শ। আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, একবার তিনি একদল শিশুর পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে তিনি তাদের সালাম করে বললেন, রাসূল সা:ও তা করতেন (বুখারি : ৬২৪৭)। হ্যাঁ, ছোট বড়কে, পথচারী উপবিষ্টকে, আরোহণকারী পদাতিককে, আগন্তুক মেজবানকে, কমসংখ্যক লোক অধিকসংখ্যক লোককে আগে ‘সালাম’ দেয়া উত্তম বলে হাদিসে পাওয়া যায়। ব্যক্তিত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব, হিংসা, অহঙ্কার ইত্যাদি কারণে আগে ‘সালাম’ প্রদানে অনেক সময় অনীহা, অনাগ্রহ কাজ করে। এটি দূর করে যারা আগে ‘সালাম’ দিতে পারেন, হাদিসে তাদের জন্য অধিক পুণ্য ও অহঙ্কারমুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে আগে সালাম করে সে অহঙ্কারমুক্ত।’ (বায়হাকি)

আবদুুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত, এক লোক নবীজী সা:-কে জিজ্ঞেস করলেন, ইসলামে কোন কাজ উত্তম? তিনি বললেন, ‘তুমি মানুষজনকে আহার দেবে, পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে সালাম দেবে।’ (বুখারি : ৬২৩৬)

আরও পড়ুন : সালাম নিয়ে বিতর্ক, সেই ঢাবি অধ্যাপকের বিরুদ্ধে মামলা

‘সালাম’ পারস্পরিক প্রীতি-ভালোবাসা, দয়া-মমতা সৃষ্টি ও সম্পর্ক উন্নয়নে উল্লেøখযোগ্যভাবে কাজ করে। অধিক হারে সালাম বিনিময়ে অহমিকা, কদর্যতা, বিদ্বেষ, কঠোরতা ইত্যাদি নিন্দনীয় স্বভাব দূর হয়। রাসূল সা: বলেছেন, ‘তোমরা মুমিন (পরিপূর্ণ) না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালোবাসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের ঈমান পূর্ণ হবে না, আমি কি তোমাদেরকে একটি বিষয় শিক্ষা দেবো, যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালোবাসবেÑ তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের প্রসার করো।’ (মুসলিম)

ভুল উচ্চারণে সালাম দেয়া ছিল কুচক্রী ইহুদিদের ঘৃণ্য স্বভাব। সুতরাং এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। আবদুুল্লøাহ ইবনে উমর রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, ‘ইহুদিরা যখন তোমাদের প্রতি আসসামু আলাইকুম (তোমাদের মৃত্যু হোক) বলে সালাম দেয়, তখন তাদেরকে ‘ওয়া আলাইকা’ বলে উত্তর দাও। (মুসলিম : ৫৫৪৭)

আসুন, রাসূল সা:-এর আদর্শে উজ্জীবিত হই। শুদ্ধভাবে একে অন্যকে অধিকহারে বিশুদ্ধভাবে সালাম দেই এবং পিয়ারা নবীজী সা:-এর প্রিয় হই।

লেখক : সহকারী শিক্ষক, শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা, সিলেট।