Categories
ধর্ম

শত্রুর অনিষ্ট থেকে বাঁচার দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্না নাজআলুকা ফি নুহুরিহিম ওয়া নাউজুবিকা মিন শুরুরিহিম

অর্থ : হে আল্লাহ! আমরা তাদের মোকাবেলায় আপনাকে যথেষ্ট ভাবছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।

উপকার : আবু বুরদা ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো সম্প্রদায় দ্বারা ক্ষতির আশঙ্কা করতেন, তখন এই দোয়া পড়তেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৭)

ভয়েসটিভি/এএস

Categories
ধর্ম

সম্পদ লাভ করলে যে দোয়া পড়তে হয়

উচ্চারণ : ‘ইয়া রব্বি, লা-গিনান লি আন বারাকাতিক’।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আপনার বরকত থেকে আমি অমুখাপেক্ষী নই।’

উপকার : আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, একদা আইয়ুব (আ.) গোসল করছিলেন। এমন সময় তাঁর ওপর স্বর্ণের একঝাঁক পঙ্গপাল পতিত হলো। তিনি সেগুলো দুই হাতে ধরে কাপড়ে রাখতে লাগলেন। তখন তাঁর রব তাঁকে ডেকে বলেন, হে আইয়ুব, তুমি যা দেখতে পাচ্ছ, তা থেকে কি আমি তোমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিইনি? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, হে রব, কিন্তু আমি আপনার বরকত থেকে মুখাপেক্ষীহীন নই। (বুখারি, হাদিস : ৩৩৯১)

Categories
ধর্ম

ঘুমাতে গেলে পড়ার দোয়া

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা কিনি আজাবাকা ইয়াওমা তাজমাউ ইবাদাকা আও তাবআছু ইবাদাকা।’

অর্থ : ‘হে আল্লাহ, যেদিন তুমি তোমার বান্দাদের একত্র করবে অথবা পুনর্জীবিত করবে, সেদিন আমাকে তোমার আজাব থেকে হিফাজত রেখো।’

উপকার : হুজায়ফা ইবনে ইয়ামান (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন নবী (সা.) ঘুমানোর ইচ্ছা করতেন, সে সময় তিনি নিজের (ডান) হাত মাথার নিচে রেখে এই দোয়া পড়তেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৯৮)

Categories
ধর্ম

কোরআনে বর্ণিত সত্য স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা

স্বপ্ন সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে নির্দেশনা পাওয়া যায়। পবিত্র কোরআন আটটি স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে এবং স্বপ্ন ব্যাখ্যাকে জ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। কোরআনের বাচনভঙ্গিতে প্রতীয়মান হয় যে স্বপ্ন এক ধরনের দিব্য জ্ঞান। নবীদের ক্ষেত্রে যা ওহির সমতুল্য। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত পাঁচটি স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো।

১. ইউসুফ (আ.)-কে সেজদা করা বিষয়ক স্বপ্ন : পবিত্র কোরআনে ইউসুফ (আ.) কর্তৃক ১১টি নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্র তাঁকে সেজদা করার এক প্রতীকধর্মী স্বপ্ন বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ করো, ইউসুফ তার পিতাকে বলেছিল, হে আমার পিতা, আমি তো দেখেছি ১১টি নক্ষত্র, এবং সূর্য ও চন্দ্র। আমি দেখলাম তারা আমাকে সিজদা করছে। তিনি বলেন, হে আমার বৎস, তোমার স্বপ্নবৃত্তান্ত তোমার ভাইদের কাছে প্রকাশ কোরো না।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৪-৫)#

শৈশব থেকেই ইউসুফ (আ.) ছিলেন সরল ও সত্যবাদী। এই স্বপ্নের মাধ্যমে সুসংবাদ দেওয়া হয় যে তাঁকে আল্লাহ ১১ ভাই ও মাতা-পিতা অপেক্ষা বহু ঊর্ধ্বে স্থাপন করবেন। ইউসুফ (আ.) ওই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় পবিত্র কোরআনে বলা হয়, ‘অতঃপর তারা যখন ইউসুফের কাছে উপস্থিত হলো তখন সে তার মাতা-পিতার জন্য তার সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করেছিল এবং বলেন, আল্লাহর ইচ্ছায় নিরাপদে মিসরে প্রবেশ করুন। এবং সে তাঁর মাতা-পিতাকে উচ্চ সিংহাসনে আরোহণ করাল এবং তারা তার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল। সে বলল, হে আমার পিতা, এটাই আমার আগের স্বপ্নের পূরণ! আল্লাহ তা সত্যে পরিণত করেছেন।’# (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৯৯-১০০)

২. ইউসুফ (আ.)-এর দুই কারাসঙ্গীর স্বপ্ন : ইউসুফ (আ.)-কে কারাগারে প্রবেশের দিন ঘটনাক্রমে দুজন যুবক কারাগারে প্রবেশ করে। কাতাদাহ (রা.) বলেন, যুবকদ্বয়ের একজন ছিল বাদশাহর সুরাবাহী এবং অন্যজন ছিল তার রুটি প্রস্তুতকারী। আল্লামা সুদ্দি (রহ.) বলেন, তাদের বন্দি করার কারণ হচ্ছে, তারা বাদশাহর খাদ্যে ও পানীয়তে বিষ মেশানোর ষড়যন্ত্র করেছিল বলে বাদশাহ সন্দেহ করেন। কোরআনে তাদের স্বপ্নের বিবরণ নিম্নরূপ—‘তাঁর সঙ্গে দুজন কারাগরে এসেছিল। তাদের একজন বলেছিল, আমি নিজেকে মদ নিংড়াতে দেখলাম। অন্যজন বলেছিল, আমি নিজেকে মাথায় করে রুটি বহন করতে দেখলাম এবং পাখিরা সেখান থেকে খাচ্ছিল। তুমি আমাদের এর তাৎপর্য বলে দাও। আমরা তো তোমাকে ভালো কাজ করতে দেখেছি।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৩৭)#

স্বপ্নের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘হে আমার কারাসঙ্গী দুজন, তোমাদের দুজনের একজন তার মালিকের পানের জন্য সুরা ঢালবে। অপরজন শূলবিদ্ধ হবে। অতঃপর পাখিরা তার মস্তক থেকে খাবে। যে বিষয়ে তোমরা জানতে চেয়েছিলে তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৪১)

৩. মিসরের শাসকের স্বপ্ন : পবিত্র কোরআন ইউসুফ (আ.)-এর সমকালীন মিসরীয় অধিপতির স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যাকে অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপন করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(মিসরের) অধিপতি বলেছিল, আমি দেখেছি সাতটি মোটা গাভি, যাদের সাতটি শীর্ণকায় গাভি খেয়ে ফেলল এবং সাতটি সবুজ শস্যের শীষ ও সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানরা, যদি তোমরা আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারো তবে স্বপ্নের তাৎপর্য বোলো।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৪৩)

আল্লাহ ইউসুফ (আ.)-এর ব্যাখ্যা পবিত্র কোরআনে তুলে ধরে বলেন, ‘(ইউসুফ) বললেন, তোমরা সাত বছর একাদিক্রমে চাষ করবে, অতঃপর তোমরা যে শস্য কর্তন করবে, তার মধ্যে সামান্য পরিমাণ তোমরা আহার করবে; এবং তা ছাড়া আর সমস্ত শীষসহ রেখে দেবে। তারপর আসবে সাতটি ভীষণ বছর। আগে যা তোমরা সঞ্চিত রেখেছিলে, লোকে তা খেয়ে ফেলবে—সামান্য কিছু সংরক্ষিত ছাড়া। সে সময়ের পরে আসবে এক বছর যখন মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হবে এবং যখন মানুষ প্রচুর (ফলের রস ও তেল) নিংড়াবে।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৪৭-৪৮)

৪. ইবরাহিম (আ.)-এর স্বপ্ন : ইবরাহিম (আ.) তাঁর সাত বা ১৩ বছর বয়সী পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করার যে স্বপ্ন দেখেন তা এমন—তিনি বললেন : ‘হে পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে তোমাকে জবাই করছি; এখন তোমার অভিমত কী দেখো।…তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে!’ (সুরা সাফফাত, আয়াত : ১০২-১০৫)#

‘আত-তাফসির আল-কাবির’ গ্রন্থে ওই স্বপ্ন সম্পর্কে বলা হয়েছে যে ইবরাহিম (আ.) ৮ জিলহজ রাতে সর্ব প্রথম স্বপ্ন দেখেন একমাত্র পুত্রকে নিজ হাতে জবাই করছেন। অতঃপর ৯ তারিখ রাতে তিনি আবার একই স্বপ্ন দেখেন। ফলে তিনি বুঝতে পারলেন এটা স্বপ্ন। তারপর দশম রাতে তিনি আবার একই স্বপ্ন দেখেন এবং পুত্রকে কোরবানি বাস্তবায়নে উদ্যোগী হন।

৫. বদর বিষয়ক স্বপ্ন : রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিমদের নিয়ে যখন মদিনা থেকে বের হচ্ছিলেন বা পথে কোনো মনজিলে অবস্থান করছিলেন তখন তিনি স্বপ্নে কাফেরদের সেনাবাহিনী দেখলেন। তাঁর সামনে যে দৃশ্যপট পেশ করা হয় তাতে শত্রুসেনাদের সংখ্যা খুব বেশি নয় বলে তিনি অনুমান করতে পেরেছেলিন। এ স্বপ্নের বিবরণ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করুন, তোমার স্বপ্নে আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছিলেন যে তারা সংখ্যায় স্বল্পসংখ্যক। যদি তিনি তোমাকে দেখাতেন যে তারা সংখ্যায় অধিক, তবে তোমরা নিশ্চয়ই সাহস হারাতে এবং অবশ্যই তোমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বির্তকে লিপ্ত হতে। কিন্তু আল্লাহ (তোমাদের) রক্ষা করেছিলেন, যেহেতু তিনি সবার হৃদয়ের কথা বিশেষভাবে অবহিত।’ (সুরা আনফাল, আয়াত : ৪৩)#

পবিত্র কোরআনের বিধৃত এসব স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা থেকে এটা বলা যায় যে স্বপ্ন জ্ঞানের এমন একটি প্রচ্ছন্ন মাধ্যম যা মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক প্রকার দৈববাণী। মানুষ অন্তর্দৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক উপায়ে স্বপ্নের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

Categories
ধর্ম

দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা লাভের দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল মুআফাতা ফিদ্দুনইয়া ওয়াল আখিরাহ।

অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা কামনা করি।

উপকার : আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যত ধরনের দোয়া করে, তার মধ্যে এই দোয়ার চেয়ে উত্তম কোনো দোয়া নেই।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৮৫১)

Categories
ধর্ম

গুনাহ মাফের দোয়া

উচ্চারণ : আতুবু ইলাল্লাহি মিম্মা আজনাবতু।

অর্থ : আমি যে অপরাধ করেছি, তা থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

উপকার : আয়েশা (রা.) বলেন, একবার তিনি ছবিযুক্ত গদি ক্রয় করেন। রাসুল (সা.) তা দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন—প্রবেশ করেননি। তখন আয়েশা (রা.) এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৫৭)

Categories
ধর্ম

যেসব কারণে মহানবী (সা.) কান্না করেছেন

আল্লাহর ভয়ে অশ্রু বিসর্জন দেওয়া মহান আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়। তাই মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর ভয়ে বেশি বেশি অশ্রু বিসর্জন দিতেন। এ ছাড়া তিনি মৃত্যুর স্মরণে, উম্মতের প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে ও প্রিয় সাহাবি ও পরিবারবর্গদের দুঃখ-কষ্টে তাদের ব্যথায় ব্যথিত হয়ে কেঁদেছেন। আজকে এমন কিছু সময়ের স্মরণ করব, যে সময়গুলো প্রিয় নবীর নয়ন মোবারক থেকে অশ্রু ঝরেছিল।

উম্মতের মাগফিরাতের জন্য : আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআনে ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়াসংবলিত আয়াত, ‘হে আমার রব, এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্য হবে তুমি তো ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ৩৬) পাঠ করেন। আর ঈসা (আ.) বলেছেন, ‘তুমি যদি তাদের শাস্তি দাও তাহলে তারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাদের ক্ষমা করো, তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা : আল মায়েদা, আয়াত : ১১৮)

তারপর তিনি তাঁর উভয় হাত উঠালেন এবং বলেন, হে আল্লাহ, আমার উম্মত, আমার উম্মত! আর কেঁদে ফেলেন। তখন মহান আল্লাহ বলেন, হে জিবরাইল, মুহাম্মদের কাছে যাও, তোমার রব তো সবই জানেন-তাঁকে জিজ্ঞেস করো, তিনি কাঁদছেন কেন? জিবরাইল (আ.) এসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) যা বলেছিলেন, তা তাঁকে অবহিত করলেন। আর আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, হে জিবরিইল, তুমি মুহাম্মদের কাছে যাও এবং তাঁকে বলো, নিশ্চয়ই আমি (আল্লাহ) আপনার উম্মতের ব্যাপারে আপনাকে সন্তুষ্ট করে দেব, আপনাকে অসন্তুষ্ট করব না।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৮৭)

অসুস্থ সাহাবিকে দেখতে গিয়ে : আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.) রোগাক্রান্ত হলেন। নবী (সা.) আবদুর রাহমান ইবনে আওফ সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে তাঁকে দেখতে এলেন। তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে পরিজনের মধ্যে দেখতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তার কি মৃত্যু হয়েছে! তাঁরা বলল, না। হে আল্লাহর রাসুল, তখন নবী (সা.) কেঁদে ফেলেন। নবী (সা.)-এর কান্না দেখে উপস্থিত লোকেরা কাঁদতে লাগলেন। (বুখারি, হাদিস : ১৩০৪)

শিশুপুত্রের শোকে : জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আবদুর রাহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর হাত ধরে তাকে নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ পুত্র ইবরাহিম (রা.)-এর কাছে গেলেন। তাঁকে তিনি মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পেলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে কোলে তুলে নিলেন এবং কাঁদলেন। আবদুর রাহমান (রা.) তাকে বলেন, আপনিও কাঁদছেন? আপনি কি কান্না করতে বারণ করেননি? তিনি বলেন, না; বরং আমি দুটি নির্বোধসুলভ ও পাপাচারমূলক চিৎকার নিষেধ করেছি; বিপদের সময় চিৎকার করা, মুখমণ্ডলে আঘাত করা এবং জামার সম্মুখভাগ ছিঁড়ে ফেলা আর শয়তানের মতো (চিৎকার) কান্নাকাটি করা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১০০৫)

মৃত্যুপথযাত্রী নাতিকে কোলে নিয়ে : উসামাহ ইবনে জায়দ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আছে, রাসুল (সা.)-এর কোনো এক কন্যার এক ছেলের মৃত্যু উপস্থিত হলে তিনি তাকে দেখতে যান। সেখানে প্রবেশ করলে তখন তারা শিশুটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে দিলেন। আর তখন বাচ্চার বুকের মধ্যে এক অস্বস্তি বোধ হচ্ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, আমার ধারণা নবী (সা.) তখন বলেছিলেন, এ তো যেন মশকের মতো। এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) কাঁদলেন। তা দেখে সাদ ইবনে উবাদাহ (রা.) বলেন, আপনি কাঁদছেন? তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর দয়ালু বান্দাদের ওপরই দয়া করেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৭৪৪৮)

কোরআন তিলাওয়াত শুনে : ইবরাহিম (আ.) বলেন, একদিন নবী (সা.) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে বলেন, তুমি আমাকে কোরআন তিলাওয়াত করে শোনাও।…অতঃপর তিনি (আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ) সুরা নিসার প্রথম থেকে ‘হে নবী, একটু ভেবে দেখুন তো সে সময় এরা কী করবে, যখন আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্য থেকে একজন করে সাক্ষী হাজির করব, আর এসব লোকের জন্য আপনাকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করব।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪১)

এ আয়াত পর্যন্ত তাকে পড়ে শোনালেন। এতে তিনি (সা.) কেঁদে ফেলেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৭৫৪)

মায়ের কবরের পাশে : আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবী (সা.) তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করেন। তিনি কান্নাকাটি করেন এবং তাঁর সঙ্গের লোকদেরও কাঁদান। অতঃপর তিনি বলেন, আমি আমার রবের কাছে তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। আমি আমার রবের কাছে তাঁর কবর জিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব তোমরা কবর জিয়ারত করো। কেননা তা তোমাদের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৫৭২)

নামাজের মধ্যে কান্না : মুতাররিফ (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বলেন, আমি দেখেছি রসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ আদায় করছিলেন এবং সে সময় তাঁর বুক থেকে জাঁতা পেষার আওয়াজের মতো কান্নার আওয়াজ হচ্ছিল।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৯০৪)

খাদিজা (রা.)-এর স্মরণে : মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.) তাঁর প্রয়াত স্ত্রী খাদিজা (রা.)-এর কথা মনে করে কান্না করেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬৯২)

মৃত্যুর স্মরণে : বারা (রা.) থেকে বর্ণিত, আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে এক জানাজায় উপস্থিত ছিলাম। তিনি কবরের কিনারে বসে কাঁদলেন, এমনকি তাঁর চোখের পানিতে মাটি ভিজে গেল। অতঃপর তিনি বলেন, ‘হে ভাই সব, তোমাদের অবস্থাও তার মতোই হবে, সুতরাং তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১৯৫)

প্রিয় সাহাবিদের শাহাদতবরণের খবর দিতে গিয়ে : আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) জায়দ, জাফর ও আবদুল্লাহ (রা.)-এর মৃত্যু সংবাদ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসার আগেই আমাদের শুনিয়েছিলেন। তিনি বলছিলেন, জায়দ (রা.) পতাকা ধারণ করে শাহাদাত লাভ করেছে। অতঃপর জাফর (রা.) পতাকা ধারণ করে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করল। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) পতাকা হাতে নিয়ে শাহাদাত লাভ করল। তিনি যখন এ কথাগুলো বলছিলেন তখন তাঁর দুই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। (অতঃপর বলেন) আল্লাহ তাআলার তরবারিগুলোর এক তরবারি অর্থাৎ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ পতাকা উঠিয়েছেন। অবশেষে আল্লাহ মুসলিমদের বিজয় দিয়েছেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৭৫৭)

Categories
ধর্ম

ভয়ভীতিমুক্ত হওয়ার দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাসতুর আউরাতি ওয়া আ-মিন রওআতি।

অর্থ : হে আল্লাহ, আমার দোষত্রুটিগুলো ঢেকে রাখুন এবং ভীতিপ্রদ বিষয়গুলো থেকে আমাকে নিরাপদ রাখুন।

উপকার : জুবায়ের ইবনে আবু সুলাইমান ইবনে জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) বলেন, আমি ইবনে ওমর (রা.)-কে বলতে শুনেছি, রাসুল (সা.) সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়া পড়তেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৭৪)

Categories
ধর্ম

অভাব থেকে বাঁচার দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াততুকা ওয়াল আফাফা ওয়াল গিনা

অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হিদায়াত, তাকওয়া, পবিত্রতা ও সচ্ছলতা কামনা করছি।

উপকার : আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এ দোয়া পাঠ করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭০৭৯)

Categories
ধর্ম

যাপিত জীবনে মহানবী (সা.)-এর ব্যক্তিত্ববোধ

মহানবী (সা.)-এর নাতি হাসান ইবনে আলী (রা.) তাঁর মামা হিন্দ ইবনে আবি হালার [খাদিজা (রা.)-এর প্রথম ঘরের ছেলে] কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি নিম্নোক্ত বর্ণনা দেন—রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা উম্মতকে নিয়ে চিন্তিত থাকতেন এবং তাদের নিয়ে ভাবতেন। তাঁর কোনো অবসর ছিল না। বেশির ভাগ সময় চুপ করে থাকতেন, প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না। স্পষ্ট ভাষায় উঁচু আওয়াজে কথা বলতেন। নবীজি (সা.) অল্প শব্দ-বাক্যে বেশি মর্ম বোঝাতেন। তিনি সিদ্ধান্তমূলক কথা বলতেন—তাতে কোনো বাহুল্য থাকত না, তা সংক্ষিপ্ত হতো না। তিনি দুরাচারী ও ব্যক্তিত্বহীন ছিলেন না। আল্লাহর সামান্য নিয়ামতকেও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করতেন। মহানবী (সা.) কোনো কিছুর নিন্দা করতেন না, এমনকি তিনি খাবারেরও ভুল ধরতেন না, আবার তার প্রশংসাও করতেন না। পৃথিবী ও পার্থিব বিষয়াশয় তাঁকে ক্ষুব্ধ করত না। যখন সত্যের ব্যাপারে কোনো সীমা লঙ্ঘন হতো তখন তাঁর সামনে কেউ দাঁড়াতে পারত না, যতক্ষণ না তিনি প্রতিকার করতেন। তবে তিনি কখনো ব্যক্তিগত বিষয়ে ক্ষুব্ধ হতেন না এবং ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধও নিতেন না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন ইঙ্গিত করতেন পুরো হাত দিয়ে ইঙ্গিত করতেন। বিস্মিত হলে হাত উল্টাতেন। কথা বলার সময় দুই হাত মেলাতেন। ডান হাতের তালু দিয়ে বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিতে চাপ দিতেন। রাগান্বিত হলে পুরোপুরি বিমুখ হতেন। আনন্দিত হলে দৃষ্টি অবনত করতেন। বেশির ভাগ সময় মুচকি হাসতেন, ফলে তার শুভ্র বরফের মতো সুন্দর দাঁতগুলো প্রকাশ পেত। তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদাশীল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণকারী। তাঁর চেহারা মোবারক পূর্ণিমার চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করত। তাঁর পায়ের উপরি ভাগ ছিল মসৃণ। দৃঢ়ভাবে কদম ফেলে চলতেন এবং বিনয়ের সঙ্গে দ্রুত হেঁটে যেতেন। যখন তিনি হাঁটতেন মনে হতো উঁচু-নিচু অসমতল ভূমি থেকে থেকে নেমে আসছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কারো দিকে তাকাতেন পুরোপুরি তাকাতেন। তিনি সাহাবিদের পেছনে পেছনে চলতেন এবং কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে প্রথমে সালাম দিতেন।

নবী করিম (সা.) অশালীন ও নির্লজ্জ ছিলেন না। তিনি রাস্তা-ঘাট ও বাজারে উঁচু আওয়াজে কথা বলতেন না। মন্দের প্রতিকার মন্দ দিয়ে করতেন না; বরং ক্ষমা করতেন, উপেক্ষা করতেন। আল্লাহর জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ছাড়া তিনি কখনো কাউকে আঘাত করেননি। সেবক ও স্ত্রীদেরও তিনি কখনো প্রহার করেননি। (বর্ণনাকারী বলেন) আমি তাঁকে তাঁর প্রতি অবিচারকারীদের থেকে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করতে দেখিনি, যতক্ষণ না আল্লাহর সীমা লঙ্ঘিত হতো। আল্লাহর সীমা লঙ্ঘিত হলে তিনি প্রচণ্ড রাগান্বিত হতেন। নবীজি (সা.)-কে যখন দুটি কাজের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার ইচ্ছাধিকার দেওয়া হতো, তিনি সহজটি বেছে নিতেন। ঘরে তিনি সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন—কাপড় সেলাই করতেন, বকরির দুধ দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজে করতেন।

তিনি অপ্রয়োজনীয় কোনো কথা বলতেন না। মানুষকে আপন করে নিতেন, দূরে ঠেলে দিতেন না। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান দিতেন এবং তাকে তাদের অভিভাবক নিযুক্ত করতেন। তিনি মানুষকে সতর্ক করতেন এবং তাদের থেকে নিজেও সতর্ক থাকতেন। তবে তিনি কারো সঙ্গে মলিন চেহারায় কথা বলতেন না এবং মন্দ আচরণ করতেন না। তিনি সঙ্গী-সাথির খোঁজ রাখতেন এবং সাধারণ মানুষের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইতেন। ভালোকে ভালো বলতেন এবং তার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। মন্দকে মন্দ বলতেন এবং তা প্রতিহত করতেন। মধ্যমপন্থী ছিলেন এবং তাঁর কথায় কোনো বিরোধ ছিল না। তিনি উম্মতের ব্যাপারে কখনো অমনোযোগী হতেন না, যেন তাদের ভেতর উদাসীনতা তৈরি হয়ে না যায় বা তারা ক্লান্তি বোধ করে। যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তিনি প্রস্তুত থাকতেন। সত্য থেকে কখনো পিছপা হতেন না এবং তা উপেক্ষাও করতেন না। মানুষের ভেতর সর্বোত্তম ব্যক্তিরাই ছিলেন তাঁর সঙ্গী। সাহাবিদের মধ্যে তিনিই তাঁর কাছে উত্তম ছিলেন, যিনি সবচেয়ে বেশি কল্যাণকামী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি মর্যাদাশীল ছিলেন, যে মানুষকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করতেন।

নবীজি (সা.) ওঠা-বসার সময় আল্লাহকে স্মরণ করতেন। কোনো বৈঠকে উপস্থিত হলে তার শেষ প্রান্তে (যেখানে জায়গা পেতেন) বসে যেতেন এবং অন্যদেরও এমনটি করার নির্দেশ দিতেন। বৈঠকে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতেন। তাঁর বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সবাই নিজেকে সবচেয়ে সম্মানী মনে করত। কেউ কোনো প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে বা তাঁর সঙ্গে বসলে তিনি ধৈর্যসহ সময় দিতেন, যতক্ষণ না সেই ব্যক্তি উঠে যেত। কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি তাঁর প্রয়োজন পূরণ করতেন অথবা তাকে কথা দিয়ে সান্ত্বনা দিতেন। নবীজি (সা.)-এর হাসিমুখ ও উত্তম আচরণ ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। তিনি ছিলেন তাদের জন্য পিতৃতুল্য। অধিকার লাভের ক্ষেত্রে সব মানুষ তাঁর কাছে ছিল সমান। তাঁর বৈঠক ছিল জ্ঞান, লজ্জা, ধৈর্য ও আমানতদারিতার বৈঠক। সেখানে কারো আওয়াজ উঁচু হতো না, কারো সম্মান নষ্ট করা হতো না, কারো দোষচর্চা করা হতো না। অংশগ্রহণকারী সবাই ছিল সমান—তবে আল্লাহভীতির ভিত্তিতে মর্যাদা লাভ করত। তারা ছিল বিনয়ী। ফলে বড়দের প্রতি সম্মান ও ছোটদের প্রতি স্নেহ প্রকাশ করা হতো, যার প্রয়োজন আছে, তাকে প্রাধান্য দেওয়া হতো এবং ভিনদেশিদের ভালো-মন্দের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখা হতো।

উল্লেখ্য, হাদিসের প্রথম অংশ ইমাম তিরমিজি (রহ.) তাঁর ‘আশ-শামায়িলুল মুহাম্মাদিয়্যা’তে বর্ণনা করেছেন। অন্য অংশ হাদিসের অন্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। উল্লিখিত বিবরণটি সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.)-এর ‘মুখতারাত’ গ্রন্থ থেকে গৃহীত।